হােসেনের এক প্রায়ই স্যাসত বাসায়। সে পরীর সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ করত। পরী কোনাে কোনাে দিন ইচ্ছে করেই সেই বন্ধুটির সঙ্গে ণড়াতে যেত। ফিরতে রাত হ’ত প্রায় সময়ই। পরী চাইত, হােসেনের মনে একটু শো দেখা দিক। ঈর্ষার কিছু জীবাণু কিলবিল করে উঠুক তাঁর মনে। কিন্তু সে কিছুই হয় নি। হােসেন নির্বিকার ও নিরাসক্ত। হাল ছেড়ে দিয়ে নিজেকে গুটি।
নিল পরী। লীনা-–পান্না এল সংসারে। যমক্স মেয়ে একা সামলান মুশকিল। রাত জাগা, কাপড় বদলে দেওয়া, ঘড়ি দেখে দেখে দুধ বানান—এ সব করতে করতে এক সময় পরীর মনে হল সংসারটা এমন কিছু খারাপ জায়গা নয়। হােসেনের মতাে স্বামী নিয়ে সুখী হতে বাধা নেই। | কিন্তু হােসেন যদি আরাে একটু কাছে আসত! পরীর কত কী আছে গল্প করবার। সে-সব যদি সে মন দিয়ে শুনত। কথার মাঝখানে থেমে গিয়ে যদি না বলত—পরী, আজ বড়াে ঘুম পাচ্ছে, তাহলে জীবনটা অনেক বেশি অর্থবহ ও সুরভিত হত না?
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
ময়মনসিংহ এসে গেল প্রায়। এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি স্টেশনে গাড়ি এসে থেমেছে। ছাত্রদের দলটি নেমে যাওয়াতে কামরাটি একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে। হােসেন সাহে বই বন্ধ করে জানালা দিয়ে গলা বের করলেন। চমৎকার ইউনিভার্সিটি। সবুজে সুবজে ছয়লাপ। সাদা রঙের বড়াে বড়াে দালানগুলিকে দ্বীপের মতাে লাগছে। রাস্তার দুপাশে নারকেল গাছের সারি। পরী বলল, ‘লীনার জ্বর আর নেই। দেখ তো ক’টা বাজে।’
‘দশটা পনেরআড়াই ঘন্টা লেট। পান্ন বলল, ‘আড়াই ঘন্টা লেট হলে কী হয় বাবা? ‘খুব মজা হয়। জুতাে পরে নাও পান্না, আর দেরি নেই।’
লীনাকে শুইয়ে রেখে পরী টয়লেটে গিয়ে চুল আঁচড়াল। পান্নার জুতাে পরিয়ে দিল। লীনার ঘুম ভাঙিয়ে, তার জামা বদলে দিল। বেশ লাগছে তার। পরী হালকা গলায় বলল, ‘জরীর গায়ে–হলুদ কি হয়ে গেল?
তােমার জন্যে নিশ্চয়ই অপেক্ষা করবে। পরী হাসিমুখে বলল, ‘বউ সাজলে জরীকে কেমন দেখাবে কে জানে? হােসেন সাহেব জবাব দিলেন না। তিনি খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছেন।
দুর থেকে স্টেশনের লাল দালান দেখা যাচ্ছে। লাইন বদল হওয়ার ঘটাং ঘটাং শব্দ আসছে। হােসেন সাহেব হঠাৎ বললেন, পরী, আনিসের চিঠির কথাটা মনে আছে? বড়াে কষ্ট লাগছে।’
পরী বলল, ‘আনিস বাঁচবে তাে?
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
‘না। স্পাইনাল কর্ডের লম্বােসেকরেল রিজিওন ডেমেইড। তাছাড়া শুধু পেরাপ্লেজিয়া নয়, আরাে সব জটিলতা দেখা দিয়েছে। শুনেছি পেথিড্রিন দিতে হয়।
পরী গম্ভীর হয়ে পড়ল। হােসেন সাহেব বললেন, “কাল রাত থেকে আনিসের
চিঠির কথা মনে পড়ছে। তােমার কাছে আছে সেটা।
না নেই।
চিঠিটি আনিস পরীকে অনেক ভণিতা করে লিখেছিল। পাঁচ বৎসরে আনিস মাত্র চারটি চিঠি লিখেছিল। ছয়–সাত লাইনের দায়সারা গােছের চিঠি। কিন্তু শেষ চিঠিটি ছিল সুদীর্ঘ। চিঠিতে অনেক কায়দা–কানুন করে লিখেছে সে জরীকে বিয়ে করতে চায়। কাউকে বলতে লজ্জা পাচ্ছে। তবে জরীর কোনাে আপত্তি নেই। এখন একমাত্র ভরসা পরী, পরী যদি দয়া করে কিছু একটা করে তাহলে সারা জীবন সে–ইত্যাদি ইত্যাদি। | পরী এ চিঠি পেয়ে হাসবে কি কাঁদবে ভেবে পায় নি। সে জোর গলায় বলেছে, ‘জরী কিছুতেই রাজি হবে না। ভাইবােনের মতাে মানুষ হয়েছি। ছােটবেলায় সবাই
এক খাটে ঘুমাতাম। | কিন্তু হােসেন সাহেব খুব শান্ত গলায় বলেছেন, খুব রাজি হবে। আনিসের মতাে ছেলে হয় না। তুমি লেখ শ্বশুর সাহেবকে। আমিও লিখব।
আনিসের চিঠি পড়ে হােসেন সাহেবের বুঝতে একটুও অসুবিধে হয় নি যে, চিঠিটা আসলে লিখেছে জরী। আনিস শুধু কপি করেছে। চিঠিতে পাঁচবার ‘আশ্চর্য শব্দটি আছে। ঘন ঘন আশ্চর্য ব্যবহার করা জরীর পুরনাে অভ্যাস। তার সব চিঠি শুরু হয় এইভাবে, আশ্চর্য, বহু দিন আপনাদের চিঠি পাই না।’
নির্বাসন-হুমায়ূন আহমেদ
আনিস খুবই ভালাে ছেলে এতে সন্দেহের কোনাে কারণ নেই। তবু পরী জানত বাবা রাজি হবেন না। তিনি কোনাে একটি বিচিত্র কারণে আনিসকে সহ্য করতে পারতেন না। তাছাড়া আনিসের মা বিধবা হবার পরপরই আরেকটি ছেলেকে বিয়ে করে খুলনা চলে যান। এই নিয়েও অনেক কথা ওঠে। সব জেনেশুনে পরীর বাবা আনিসকে পাত্র হিসেবে পছন্দ করবেন কেন? তাছাড়া এত ঘনিষ্ঠভাবে চেনা একটি ছেলেকে কি বিয়ে করা উচিত? পরী খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল।
Read More