নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

চাঁদের আলোয় তারা বুঝে ফেলবে কোথায় ব্যাঙরা আছে। শেয়াল এসে এদের কপাকপ খাবে। এই ভয়ে ব্যাঙের দল চুপ করে ছিল।

নীল অপরাজিতাতােমার কি ধারণা আমার যুক্তি ঠিক আছে? পূষ্প কথা বলল না। তাকিয়ে রইল। তিনি বললেন, আমার যুক্তি ঠিক নেই? ‘মনে হয় ঠিক। 

‘মােটেই ঠিক নেই। আমি তােমাকে ভুল যুক্তি দিয়েছি শিয়াল দেখে ব্যাঙরা ভয় পাবে কেন? লাফ দিয়ে পানিতে নেমে যাবে। 

পুষ্প বলল, তাহলে তারা ডাকছিল না কেন?” 

‘আকাশে মেঘ হলে কিংবা মেঘ হবার সম্ভাবনা থাকলেই ব্যাঙ ডাকে। চাদের আলাে থাকা মানে – মেঘ নেই। কাজেই ওরা চুপ করে ছিল। বুঝতে পারছ?” 

‘দ্ধি পারছি। পুষ্প এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে খুব অবাক হয়েছে। তিনি বললেন, তােমার বাবা কোথায়? ‘উনি স্কুলে গেছেন। সন্ধ্যার পর ফিরবেন। ‘আচ্ছা পুষ্প তােমাদের এই জায়গায় দেখার মত কি আছে?” ‘কিছুই নেই। একেবারে কিছু নেই তা কি হয়। কিছু নিশ্চয়ই আছে। ‘নদীর ঐ পাড়ে পুরানাে মঠ আছে। ‘মঠ কি জিনিস ? 

‘আমি নিজেও জানি না — বজলুর রহমান চাচা দেখে এসে বলেছিলেন – এই জিনিস পৃথিবীর অন্য কোন দেশে থাকলে তারা এটাকে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বানিয়ে ফেলত। জিনিসটা বাংলাদেশের মত গরীব দেশে আছে বলে কেউ খবরও রাখে না। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

মেয়েটার ভয় সম্ভবত কেটে গেছে সহজ ভাবেই কথা বলছে। 

শওকত সাহেব বললেন, বজলুর রহমানের কথার উপর কোন রকম গুরুত্ব দেয়া ঠিক না পুষ্প। পুষ্প বলল, তা আমি জানি। কিন্তু উনি এত ভাল মানুষ যে কথা শুনলেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। ‘ভালমানুষ কি করে বুঝলে?” পুষ্প জবাব দিল না। কিন্তু তার মুখে এই প্রথম হাসি দেখা গেল। মেয়েটা খুব সুন্দর করে হাসে। 

‘শােন পুষ্প, উনি ভাল মানুষ কি–না তা কিন্তু তুমি জান না। উনার আচার ব্যবহার কাণ্ডকারখানা তােমার পছন্দ হয়েছে – তাই তঁাকে ভাল মানুষ ভাবছ? “উনি কি ভাল মানুষ না?” 

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে শওকত সাহেব বললেন, যে সব সৎগুণ থাকলে আমরা মানুষকে ভাল মানুষ বলি তা তার নেই। তবে তার চরিত্রে কিছু মজার ব্যাপার আছে। যে কারণে আমিও তাকে পছন্দ করি। তার বিস্মিত এবং মুগ্ধ হবার ক্ষমতা অসাধারণ। এইটিই তার একমাত্র গুণ। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১০)

পুষ্প উঠে দাড়াল। ‘আপনার নাশতা নিয়ে আসি। ‘এক মিনিট দাড়াও। আমার ধারণা তুমি মনে মনে বলেছ – “আপনার কথাটা ভুল” তাই না?” 

“জ্বি – আমি বলেছি।” ‘আচ্ছা যাও নাশতা নিয়ে আস। পুষ্প থেমে থেমে বলল, আমি কি আপনার সঙ্গে যাব? মঠ দেখানাের জন্যে? না। কাউকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে আমার ভাল লাগে না। ‘আপনিতাে জানেন না কোথায়। 

‘খুঁজে বের করে নেব। তাছাড়া মঠ দেখতেই হবে এমনতাে কোন কথা নেই। আমি কিছু দেখার জন্যে আসিনি। যাও নাশতা নিয়ে এসাে।‘ 

নাশতা খেয়ে তিনি খাতা খুলে বসলেন। বেরুতে ইচ্ছা করছে না। জানালার পাশেই টেবিল। দৃষ্টি বাইরে চলে যাচ্ছে। কি সুন্দর আকাশ। আকাশে আবার মেঘ জমতে শুরু করেছে। বর্ষা দেখার জন্যে আসলে গ্রামেই আসা উচিত। জানালার পাশে, বিরাট একটা আতা গাছ। তিনি গাছগাছালি বিশেষ চেনেন না। কিন্তু আতা গাছ চেনেন। ছেলেবেলায় যে বাড়িতে ছিলেন, সে বাড়িতে দুটি আতা গাছ ছিল।

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি অনেকক্ষণ আতা গাছের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ছেলেবেলার বন্ধুকে যেন অনেকদিন পর দেখলেন। আতা গাছের ডালে কাকের বাসা। সেই বাসায় 

কাকের ছানা দেখা যাচ্ছে। তাতাে হওয়ার কথা না। আষাঢ় মাস ঝড় বৃষ্টির মাস। পাখিদের এই সময় বাচ্চা ফুটানাের কথা না। প্রকৃতি এই ভুল করবে না। তিনি কি চোখে ভুল দেখছেন? 

কে বলেছিল কথাটা – কোন লেখকের লেখার টেবিল জানালার পাশে থাকা উচিত না। জানালার পাশে টেবিল থাকলে তারা কখনাে লিখতে পারেন না। 

আসলেই বােধ হয় তাই। লেখকের লেখা উচিত চার দেয়ালের ভেতরে আবদ্ধ থেকে। তখনি তার মনের জানালা খুলে দিতে পারেন। তিনি প্রথম লাইনটি লিখলেন। তিনি তার পাণ্ডুলিপি অসংখ্যবার কাটবেন – কিন্তু প্রথম লাইনটি বদলাবেন। 

প্রথম লাইনটি হচ্ছে – “পাখি হিসেবে কাক বেশ অদ্ভুত।” 

লাইনটি তার পছন্দ হচ্ছে না। পছন্দ না হলেও উপায় নেই। এই পাণ্ডুলিপির প্রথম লাইনটি – গ্রহণ করা ছাড়া গতি নেই। 

কি লিখবেন সব ঠিক করা আছে। ঘটনা সাজানাে আছে। এই লেখায় কি বলতে চান তাও তিনি জানেন। দিনের পর দিন এই লেখাটি নিয়ে তিনি ভেবেছেন। চরিত্রগুলি এখন আর চরিত্র নেই – রক্ত মাংসের জীবন্ত মানুষ। বলতে গেলে গত ছ‘মাসে এই চরিত্রগুলির কারাে না কারাে সঙ্গে তাঁর রােজই দেখা হয়েছে।

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

শুরুতে লেখার গতি মন্থর ছিল, কিছুক্ষণের ভেতর গতি বেড়ে গেল। অতি দ্রুত কলম চলতে লাগল। এক বৈঠকে যে করেই হােক পঁচিশ পৃষ্ঠার মত লিখে ফেলতে হবে। চরিত্রগুলিকে বেঁধে ফেলতে হবে। যেন এরা কিছুতেই বেরিয়ে। যেতে না পারে। 

বিকেল পাঁচটায় লেখার টেবিল থেকে উঠলেন। বৃষ্টি এখনাে নামেনি। আকাশ অন্ধকার হয়ে আছে। তিনি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত বােধ করছেন। দুপুরে কিছু খান নি। 

পুষ্প ঠিক দু‘টার সস খাবার নিয়ে এসেছিল। তিনি রূঢ় গলায় বলেছেন, আমি লিখতে বসেছি! – Tার আমাকে বিরক্ত করবে না। পুষ্প কঁদো কাঁদো গলায় বলল, আপনি দুপুরে খাবেন না? 

‘লেখার টেবিল ছেড়ে উঠলেই খাব। তােমাকে আসতে হবে না। আমি তােমাকে ডেকে আনব। কিন্তু তুমি আর আসবে না। লেখার সময় বিরক্ত করলে আমি খুব রাগ করি। পুষ্প আর বিরক্ত করেনি। কিন্তু বেশ কয়েকবার এসে উঁকি দিয়ে গিয়েছে। একজনকে অভুক্ত রেখে সে নিজেও খাবার নিয়ে বসতে পারে নি। 

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *