নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

পছন্দ হবে না, কি বলিস তুই? নিজে যা ভাল মনে করেন তাই করেনকাল রাতের কথা চিন্তা কর অন্য কেউ হলে কি করত? শরীর যত খারাপই হােক দুমুঠ ভাত খেতআমাদের খুশী করার জন্য করতউনি তা করলেন নাকে খুশী হল কে হল না তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। 

নীল অপরাজিতাপুষ্প হাসতে হাসতে বলল, উনি যদি খারাপ কিছু করেন, তুমি তারও একটা ভাল ব্যাখ্যা বের করবেতাতাে করবইকারণ খারাপ কিছু করার ক্ষমতাই এঁদের নেইসৃষ্টিশীল মানুষ হচ্ছে ঈশ্বরের মতঈশ্বর যেমন মন্দ কিছু করতে পারে না, এঁরাও পারেন। 

উনাকে দেবতা ডাকলে কেমন হয় বাবা

ডাকতে পারিস কোন অসুবিধা নেই, তবে মনে মনে ডাকাই ভালরেগে যেতে পারেনএই জাতীয় মানুষদের রাগ বেশী থাকে। 

বাবা নামাজ শেষ করে আসতােমার ভাত হয়ে গেছেশুকনাে মরিচ ভেজে দেব

দে। 

ভাত খেতে খেতে তিনি পুষ্পকে একগাদা উপদেশ দিয়ে গেলেনবার বার খোঁজ নিয়ে আসবি উনার ঘুম ভাঙ্গল কি নাঘুম ভাঙ্গতেই চা দিবি, তারপর বলবি আমার কথা । 

তােমার কথা কি বলব?” 

যে স্কুলে গেলাম, সন্ধ্যার পর ফিরবউনি দুপুরে কি খেতে চানজিজ্ঞেস করবিমতির মার খোঁজ নিবিআমি জেলে পাড়ায় বলে যাব ওরা মাছ দিয়ে যাবে। 

বাবা উনি যদি বলেন, তােমাদের এখানে খাব নাবাবুর্চির ব্যবস্থা করতে বলেছিলাম সেই ব্যবস্থা করে দাও। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

তাহলে বলবি, বাবা এসে ব্যবস্থা করবেনবুঝিয়েসুঝিয়ে শান্ত করবিবুঝিয়েসুঝিয়ে কি ভাবে শান্ত করব? উনিতাে ছেলেমানুষ না। 

এই ধরনের মানুষের স্বভাবচরিত্রে ছেলেমানুষ থাকেকোথেকে যে তুমি এইসব ধারণা পেয়েছ কে জানেউনি তো ঘরে আছেনইআমার কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে নেআচ্ছা মিলিয়ে নেবআর শােন মা, উনি যদি ঘুরতেটুরতে যেতে চাননিয়ে যাবি। 

কাদার মধ্যে কোথায় ঘুরবেন

কাদা পানি এই সব নিয়ে এঁদের কোন মাথা ব্যথা নেইআমরা সাধারণ মানুষরা এইসব নিয়ে মাথা ঘামাইএই বুঝি পায়ে কাদা লেগে গেল, এই বুঝি হাত নােংরা হলযাঁদের মন পরিস্কার তারা শরীরের নােংরা নিয়ে মাথা ঘামান নামন যাদের নােংরা, শরীর পরিষ্কারের জন্যে তাদের চেষ্টার শেষ নাই আমি তাে এই দলে পড়ে যাচ্ছি বাবানােংরা আমি সহ্যই করতে পারি নাআমার মন কি নােংরা ?” 

করিম সাহেব থতমত খেয়ে গেলেনহাত ধুতে ধুতে বললেন, এইটা একটা কথার কথা বললামআমি রওনা হয়ে যাচ্ছিগাে মামতির মাকে খবর দিতে 

ভুলবি না। 

পিরিচ দিয়ে ঢাকা চায়ের কাপ হাতে দরজার ওপাশে পুষ্প বেশ কিছুক্ষণ হল দাড়িয়ে আছেকেন জানি তার অসম্ভব ভয় করছেসে প্রায় অস্পষ্ট গলায় বলল, আপনার চাভেতরে আসব

শওকত সাহেব কিছু বললেন নানিজে উঠে দরজা খুলে দিলেন। পুষ্প ঢুকলতিনি বললেন, কেমন আছ পুষ্প? তাঁর গলার স্বর এত আন্তরিক যে পুষ্প হকচকিয়ে গেলশওকত সাহেব চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে বললেন, কাল রাতে আমি তােমাকে একটা ভুল কথা বলেছিলামআমি বলেছিলাম ধুতরা ফুল বিষাক্তএটা ভুলধুতরা ফুল বিষাক্ত নাশাদা এবং নীল মেশানাে ফুলখুব সুন্দরধুতরার ফল বিষাক্তফুল নয়। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

পুষ্প নীচু গলায় বলল, আমি জানিজান তাহলে রাতে বললে না কেন?পুষ্প আগের চেয়েও মৃদু গলায় বলল, বলেছিমনে মনে বলেছিমনে মনে বলেছ মানে

পুষ্প মুখ নীচু করে বলল, কেউ যখন ভুল কথা বলে তখন আমি মনে মনে বলি, কথাটা ভুলমুখে কিছু বলি না। 

কাউকেই বল না?খুব যারা প্রিয় তাদের বলি। 

এরকম খুব প্রিয় মানুষ তােমার জন আছে?পুষ্প জবাব দিল নাতিনি আবার বললেন, প্রশ্নটার জবাব দাওমনে মনে 

বলতে হয় না সরাসরি বলা যায় এমন প্রিয় মানুষ তােমার জন আছে

নেইতােমার বাবাতিনিতাে আছেন। 

পুষ্প চুপ করে রইলতিনি শান্ত গলায় বললেন, বাবা কি তােমার খুব প্রিয় নন

প্রিয়, খুবই প্রিয়তবু ঠিক সে রকম প্রিয় নয়? তাই কি?” 

স্যার আমি আপনার জন্যে নাশতা নিয়ে আসিরাতে খান নি, আপনার নিশ্চয়ই খুব ক্ষিধে পেয়েছে। 

এত ব্যস্ত হবার কিছু নেইতুমি বসতােতােমার সঙ্গে খানিকক্ষণ গল্প করিদাঁড়িয়ে আছ কেন? বসআরাম করে বস। 

পুষ্প তবু দাঁড়িয়েই রইলসে এখনাে চোখ তুলে তাকাচ্ছে নাতিনি মেয়েটাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছেনএমন কিছু কি তিনি করেছেন যাতে সে এতটা ভয় পেয়েছেতিনি আবারাে বললেন পুষ্প বস। 

পুষ্প বসল। 

তার বসা দেখে তিনি চমকে উঠলেনস্বপ্নে পুস্প ঠিক এই ভাবেই বসেছিলএমন ভঙ্গিতেই মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল। 

মেয়েটার ভয় ভাঙ্গিয়ে দেয়া দরকারমজার কিছু কথা বলে তাকে জানিয়ে দেয়া দরকার যে তিনি ভয়াবহ কোন মানুষ নাএই মেয়ে একবারও হাসে নিহাসলে তাকে কেমন দেখায়

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

গত রাতে তােমাদের বাড়ির বারান্দায় বসে একটা ব্যাপার নিয়ে ভাবছিলামব্যাপারটা তােমাকে বুলিগত রাতে বারান্দায় বসে বসে আমি কত বিচিত্র শব্দ শুনলাম কিন্তু ব্যাঙ ডাকতে শুনলাম নাখুবই অবাক হলামতারপর ভেবে ভেবে এর একটা কারণও বের করলামকারণটা সত্যি কি না তুমি বলতােদেখি তােমার কেমন বুদ্ধি। 

পুষ্প খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেমেয়েটাকে আজ এত সুন্দর লাগছে কেন? অসহ্য সুন্দরএক রাতে সে নিশ্চয়ই বদলে যায় নিতাহলে কি তাঁর দেখার চোখ বদলে গেছেস্বপ্নটার কারণে এটা হচ্ছে নাতাে

তিনি পুষ্পের চোখে চোখ রেখে বললেন, কাল পূর্ণিমা ছিল বলে আমার 

ধারণাফকা ফকা জোৎস্নাব্যাঙ ডাকে ডাঙ্গায় উঠেচাদের আলাের তাদের দেখা যায়ব্যাঙগুলি ডাকছিল না, কারণ তারা ভাবছিল ডাকলেই, শব্দ শুনে শেয়ালের পাল এসে উপস্থিত হবে

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *