কোন এক প্রখর রোদেলা দ্বিপ্রহরে এক মহামূল্যবান বটবৃক্ষের সাথে পরিচয় হয়েছিল পথিকের। বন থেকে দূরে এক ছোট্ট কুটিরে বাস করতো পথিক। সে ছিলো খুব গরীব। দিন আনে দিন খায় এমন। একদিন বাড়িতে খাবার কিছু ছিলো না বলে তার স্ত্রী ঝগড়া করে তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিলো। তাই সে মনের দুঃখে বনে গেল। অনেকদূর হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে শেষে সেই বটবৃক্ষের তলে গিয়ে বসলো সে। তারপর মনের দুঃখে কাঁদতে আরম্ভ করলো। এমন সময় হঠাৎ কে যেন ভারি গলায় বলে উঠলো- কী হে পথিক কাঁদছ কেন?
একথা শুনে পথিক মাথা তুলে দেখলো কোথাও কেউ নেই। পথিক ভয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল- কে কে? কে কথা বলে?
বটবৃক্ষ অভয় দিয়ে বলল- ভয় পেওনা। আমি বটবৃক্ষ।
পথিক আগের মতই ভয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল- ব ব বটবৃক্ষ! বটবৃক্ষ আবার কথা বলে নাকি?
বটবৃক্ষ জ্ঞানী ভঙ্গিতে বলল- এই পৃথিবীতে সবাই কথা বলে। তোমরা মানুষরা বুঝতে পারো না। আমি তোমাদের ভাষায় কথা বলছি তাই বুঝতে পারছ। এবার বলো তুৃমি কাঁদছিলে কেন?
পথিক মায়া মায়া মুখ করে বলল- আমার খুব দুঃখ। জানো আমার খুব অভাব। আজ বাড়িতে খাবার কিছু নেই বলে আমার স্ত্রী ঝগড়া করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
পথিক এমনভাবে কথাগুলো বলল যেন বটবৃক্ষের সাথে তার খুব পরিচয়। বটবৃক্ষ স্বান্তনা দিয়ে বলল- চিন্তা করো না। বাড়ি ফিরে যাও। আজ থেকে তোমার সব অভাব দূর হয়ে যাবে। তবে মনে রেখো লোভ করো না। লোভ করলে কিন্তু সব হারাবে।
পথিক বাড়ি ফিরে গেল। বাড়ি ফিরে সে দেখে কত রকম খাবার। কি রেখে কি খাবে দিশা পেল না। সে তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলো- এত খাবার কোথায় পেলে?
তার স্ত্রী বলল- দরজার সামনে দুটো স্বর্ণমুদ্রা কুড়িয়ে পেয়েছি।
খেতে খেতে সে তার স্ত্রীকে সব ঘটনা খুলে বলল। সব কথা শুনে তার স্ত্রী বুঝতে পারলো এটা সেই বটবৃক্ষেরই দান।
এরপর রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে তারা দুটো করে স্বর্ণমুদ্রা কুড়িয়ে পেতে লাগলো। এমনি করে তাদের দিন বেশ ভালোই কাটছিলো।
এদিকে হলো কি শোনো। পথিক যেই রাজ্যে বাস করে সেই রাজ্যের রাজা ছিলো খুবই অত্যাচারী। সে তার প্রজাদের উপর নানাভাবে অত্যাচার করতো। সেইসব প্রজাদের অভিশাপে একদিন রাজার খুব কঠিন অসুখ করলো। সেই অসুখ তো কিছুতেই ভালো হয় না। এমন কোন চিকিৎসা নেই যা রাজাকে দেয়া হলো না। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। শেষমেশ ভিনদেশ থেকে এক বদ্যি ডেকে আনা হলো। সে তো রাজাকে দেখেই তার অসুখ ভালো হবার উপায় বলে দিলো। বললো এই রাজ্যে এমনি এক বটবৃক্ষ আছে যে নাকি কথা বলতে পারে। সেই বটবৃক্ষকে তার গোড়া থেকে কেটে ফেললেই রাজার অসুখ ভালো হয়ে যাবে। একথা শুনেই রাজা রাজ্যে ঘোষণা দিলো- যে এমন বটবৃক্ষের সন্ধান দিতে পারবে তাকে অর্ধেক রাজ্য পুরস্কার হিসেবে দেয়া হবে।
সেই বটবৃক্ষের সন্ধান কিন্তু পথিক ছাড়া কেউ জানতো না। এমনকি তার স্ত্রীও না। সে শুধু পথিকের কাছে শুনেছে অমুক বনে কথাবলা এক বটবৃক্ষ আছে। কিন্তু বনতো আর কম বড় নয়। তাই সেই বটবৃক্ষটি ঠিক কোথায় আছে তা সে জানতো না।
এদিকে রাজার কথা শুনে তার মনে লোভের একটা রেখা টেনে গেল। সে পথিককে বলল- এই শুনেছ রাজা কী বললেন?
পথিক বলল- হ্যাঁ শুনেছি।
তার স্ত্রী বলল- তাহলে কী ভাবছ? রাজাকে সেই বটবৃক্ষের সন্ধান দিয়ে দাও। তাতে রাজারও অসুখ ভালো হবে। আর আমরাও রাজা রাণী হয়ে সুখে থাকবো।
পথিক বলল- এমন কথা বলো না। বটবৃক্ষ আমাদের কত উপকার করছে!
তার স্ত্রী বলল- উপকার না ছাঁই? এমন দুটো করে স্বর্ণমুদ্রা জমিয়ে আমরা কখনো রাজা রাণী হতে পারবো না। তুমি বরং রাজাকে সেই বটবৃক্ষের সন্ধান দিয়ে দাও।
পথিককে এমনি করে নানা ভুলভাল বুঝিয়ে তার স্ত্রী রাজাকে সেই বটবৃক্ষের সন্ধান দেয়ার জন্য রাজি করালো। তারপর কী? যা হবার তাই হলো। পথিক গিয়ে রাজাকে কুর্নিশ করে বলল- রাজা মশাই আমি সেই কথাবলা বটবৃক্ষের সন্ধান জানি।
রাজা বলল- সত্যিই জানো।
পথিক বলল- জি রাজা মশাই সত্যিই জানি।
রাজা বলল- একথা তুমি আর কাকে কাকে বলেছো?
পথিক বলল- আমি শুধু আমার স্ত্রীকে বলেছি।
রাজা বলল- ঠিক আছে। তুমি সেই বটবৃক্ষের সন্ধান দিতে পারলে তোমাকে অর্ধেক রাজ্য পুরস্কার হিসেবে দেয়া হবে। আর না দিতে পারলে তোমাকে আর তোমার স্ত্রীকে শুলে চড়ানো হবে।
একথায় পথিক সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। তারপর রাজাকে কুর্নিশ করে তার লোকজন সঙ্গে নিয়ে পথিক চলল সেই বটবৃক্ষের কাছে। অনেকদূর পথ অতিক্রম করে শেষে তারা সেই বটবৃক্ষের কাছে পৌঁছাল। তারপর কী? রাজার লোকজন দেরি না বটবৃক্ষকে তার গোড়া থেকে কেটে ফেলল। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রাজার অসুখ ভালো হয়ে গেল। এরপর পথিক গেল রাজার কাছে তার পুরস্কার বুঝে নিতে। আগেই বলেছি রাজা ছিলো খুবই অত্যাচারী। সে তো পথিককে দেখেই বলল- কে তুমি? তোমাকে তো চিনলাম না।
পথিক বলল- রাজা মশাই আমাকে চিনতে পারছেন না। আমি সেই লোক যে আপনাকে কথাবলা বটবৃক্ষের সন্ধান দিয়েছে।
রাজা জানতো পথিক আর তার স্ত্রী বেঁচে থাকলে সেই বটবৃক্ষের কথা সবাইকে বলে বেড়াবে৷ তাই সে তার লোকজনকে হুকুম দিলো এই মিথ্যেবাদীকে আর তার স্ত্রীকে ধরে এনে এক্ষুনি শুলে চড়াও।
পথিক রাজার মতলব বুঝতে পারলো। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার সেই বটবৃক্ষের কথা মনে পড়লো, “লোভ করো না। লোভ করলে কিন্তু সব হারাবে।”
পথিক ও বটবৃক্ষ- এম এম হোসেন