পল্লী সমাজ পর্ব:৪ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

পল্লী সমাজ পর্ব:৪

পল্লীগ্রামে সহরের কড়াপর্দ্দা নাই। তত্রাচ বিশ্বেশ্বরী বড়বাড়ীর বধূ বলিয়াই হৌক্‌, কিংবা অন্য যে-কোন কারণেই হৌক, যথেষ্ট বয়ঃপ্রাপ্তিসত্ত্বেও সাধারণতঃ কাহারো সাক্ষাতে বাহির হইতেন না। সুতরাং, সকলেই বড় বিস্মিত হইল। যাহারা শুধু শুনিয়াছিল, কিন্তু ইতিপূর্ব্বে কখনো চোখে দেখে নাই, তাহারা তাঁহার আশ্চর্য্য চোখ দুইটির পানে চাহিয়া একেবারে অবাক্‌ হইয়া গেল। বোধ করি, তিনি হঠাৎ ক্রোধবশেই বাহির হইয়া পড়িয়াছিলেন।

সকলে মুখ তুলিবামাত্রই তিনি তৎক্ষণাৎ থামের পার্শ্বে সরিয়া গেলেন। সুস্পষ্ট, তীব্র আহ্বানে রমেশের বিহ্বলতা ঘুচিয়া গেল। সে সম্মুখে অগ্রসর হইয়া আসিল। জ্যাঠাইমা আড়াল হইতে তেম্‌নি সুস্পষ্ট, উচ্চকণ্ঠে বলিলেন, “গাঙুলী মশায়কে ভয় দেখাতে মানা ক’রে দে, রমেশ! আর হালদার মশায়কে আমার নাম ক’রে বল্‌ যে, আমি সবাইকে আদর ক’রে বাড়ীতে ডেকে এনেচি—সুকুমারীকে অপমান কর্‌বার তাঁর কোন প্রয়োজন ছিল না।

আমার কাজকর্ম্মের বাড়ীতে হাঁকাহাঁকি, চেঁচাচেঁচি, গালিগালাজ কর্‌তে আমি নিষেধ কর্‌চি। যাঁর অসুবিধে হবে, তিনি আর কোথায় গিয়ে বসুন।” বড়গিন্নীর কড়া হুকুম সকলে নিজের কানেই শুনিতে পাইল। রমেশের মুখ ফুটিয়া বলিতে হইল না—হইলে সে পারিত না।ইহার ফল কি হইল, তাহা সে দাঁড়াইয়া দেখিতেও পারিল না। জ্যাঠাইমাকে সমস্ত দায়িত্ব নিজের মাথায় লইতে দেখিয়া, সে কোনমতে চোখের জল চাপিয়া দ্রুতপদে একটা ঘরে গিয়া ঢুকিল; তৎক্ষণাৎ তাহার দুই চোখ ছাপাইয়া দর-দর করিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।

আজ সারাদিন সে নিজের কাজে বড় ব্যস্ত ছিল, কে আসিল না আসিল, তাহার খোঁজ লইতে পারে নাই। কিন্তু আর যেই আসুক, জ্যাঠাইমা যে আসিতে পারেন, ইহা তাহার সুদূর কল্পনারও অতীত ছিল। যাহারা উঠিয়া দাঁড়াইয়াছিল, তাহারা আস্তে আস্তে বসিয়া পড়িল। শুধু গোবিন্দ গাঙুলী ও পরাণ হালদার আড়ষ্ট হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। কে একজন তাহাদিগকে উদ্দেশ করিয়া ভিড়ের ভিতর হইতে অস্ফুটে কহিল, “বসে পড় না খুড়ো! ষোলখানা লুচি, চারজোড়া সন্দেশ কে কোথায় খাইয়ে দাইয়ে সঙ্গে দেয়, বাবা!”

পরাণ হালদার ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল। কিন্তু আশ্চর্য, গোবিন্দ গাঙুলী সত্যই বসিয়া পড়িল।তবে মুখখানা সে বরাবর ভারী করিয়া রাখিল এবং আহারের জন্য পাতা পড়িলে তত্ত্বাবধানের ছুতা করিয়া সকলের সঙ্গে পংক্তিভোজনে উপবেশন করিল না। যাহারা তাহার এই ব্যবহার লক্ষ্য করিল, তাহারা সকলেই মনে মনে বুঝিল, গোবিন্দ সহজে কাহাকেও নিষ্কৃতি দিবে না। অতঃপর আর কোন গোলযোগ ঘটিল না।

ব্রাহ্মণেরা যাহা ভোজন করিলেন, তাহা চোখে না দেখিলে প্রত্যয় করা শক্ত; এবং প্রত্যেকেই খুদি, পটল, ন্যাড়া, বুড়ী প্রভৃতি বাটীর অনুপস্থিত বালক–বালিকার নাম করিয়া যাহা বাঁধিয়া লইলেন, তাহাও যৎকিঞ্চিৎ নহে। সন্ধ্যার পর কাজকর্ম্ম প্রায় সারা হইয়া গেছে, রমেশ সদর-দরজার বাহিরে একটা পেয়ারাগাছের তলায় অন্যমনস্কের মত দাঁড়াইয়াছিল, মনটা তাহার ভাল ছিল না।দেখিল দীনু ভট্টাচার্য্য ছেলেদের লইয়া, লুচি-মণ্ডার গুরুভারে ঝুঁকিয়া পড়িয়া, একরূপ অলক্ষ্যে বাহির হইয়া যাইতেছে।

সর্ব্বপ্রথমে খেঁদির নজর পড়ায় সে অপরাধীর মত থতমত খাইয়া দাঁড়াইয়া পড়িয়া শুষ্ককণ্ঠে কহিল,“বাবা, বাবু দাঁড়িয়ে—” সবাই যেন একটু জড়সড় হইয়া পড়িল। ছোট মেয়েটির এই একটি কথা হইতেই রমেশ সমস্ত ইতিহাসটা বুঝিতে পারিল; পলাইবার পথ থাকিলে সে নিজেই পলাইত। কিন্তু সে উপায় ছিল না বলিয়া, আগাইয়া আসিয়া সহাস্যে কহিল, “খেঁদি, এ সব কার জন্যে নিয়ে যাচ্ছিস্‌ রে?”

তাহাদের ছোট বড় পুঁটুলিগুলির ঠিক সদুত্তর খেঁদি দিতে পারিবে না আশঙ্কা করিয়া দীনু নিজেই একটুখানি শুষ্কভাবে হাসিয়া বলিলেন, “পাড়ার ছোটলোকদের ছেলেপিলেরা আছে ত বাবা, এঁটোকাঁটাগুলো নিয়ে গেলে তাদের দু’খানা চারখানা দিতে পার্‌ব। সে যাই হোক্‌, বাবা, কেন যে দেশসুদ্ধ লোক ওকে গিন্নী-মা ব’লে ডাকে, তা’ আজ বুঝ্‌লুম।” রমেশ তাহার কোন উত্তর না করিয়া সঙ্গে সঙ্গে ফটকের ধার পর্য্যন্ত আসিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করিল, “আচ্ছা ভট্‌চায্যি মশাই, আপনি ত এদিকের সমস্তই জানেন, এ গাঁয়ে এত রেষারেষি কেন বল্‌তে পারেন?

” দীনু মুখে একটা আওয়াজ করিয়া বার দুই ঘাড় নাড়িয়া বলিল, “হায় রে বাবাজী, আমাদের কুঁয়াপুর ত পদে আছে। যে কাণ্ড এ ক’দিন ধরে খেঁদির মামার বাড়ীতে দেখে এলুম! বিশঘর বামুন-কায়েতের বাস নেই, গাঁয়ের মধ্যে কিন্ত চারটে দল! হরনাথ বিশ্বেস, দুটো বিলিতি আমড়া পেড়েছিল বলে তার আপনার ভাগ্নেকে জেলে দিয়ে তবে ছাড়লে।

সমস্ত গ্রামই, বাবা, এই রকম—তা’ ছাড়া মাম্‌লায় মাম্‌লায় একেবারে শতচ্ছিদ্র! খেঁদি, হরিধনের হাতটা একবার বদলে নে, মা।” রমেশ আবার জিজ্ঞাসা করিল, “এর কি কোন প্রতীকার নেই’ ভট্‌চায্যিমশাই?” “প্রতীকার আর কি ক’রে হবে, বাবা—এ যে ঘোর কলি!” ভট্টাচার্য্য একটা নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল, “তবে একটা কথা ব’ল্‌তে পারি বাবাজী।

আমি ভিক্ষেসিক্ষে ক’র্‌তে অনেক জায়গাতেই ত যাই—অনেকে অনুগ্রহও করেন। আমি বেশ দেখেচি, তোমাদের ছেলেছোকরাদের দয়াধর্ম্ম আছে—নেই কেবল বুড়ো ব্যাটাদের। এরা একটু বাগে পেলে আর একজনের গলায় পা দিয়ে জিভ বার না ক’রে আর ছেড়ে দেয় না।” বলিয়া দীনু যেমন ভঙ্গী করিয়া জিভ বাহির করিয়া দেখাইল, তাহাতে রমেশ হাসিয়া ফেলিল।

দীনু কিন্তু হাসিতে যোগ দিল না—কহিল, “হাসির কথা নয় বাবাজী, অতি সত্য কথা। আমি নিজেও প্রাচীন হয়েচি—কিন্ত—তুমি যে অন্ধকারে অনেকদূর এগিয়ে এলে, বাবাজী।” “তা’ হোক্‌ ভট্‌চায্যিমশাই, আপনি বলুন।” “কি আর বল্‌ব বাবা, পাড়াগাঁ মাত্রই এই রকম। এই গোবিন্দ গাঙুলী—এ ব্যাটার বাপের কথা মুখে আন্‌লে প্রায়শ্চিত্ত কর্‌তে হয়।

ক্ষান্তবাম্‌নি ত আর মিথ্যে বলেনি—কিন্তু সবাই ওকে ভয় করে! জাল করতে, মিথ্যেসাক্ষী, মিথ্যে মোকদ্দমা সাজাতে ওর জুড়ি নেই। বেণীবাবু হাতধরা—কাজেই কেউ একটি কথা কইতে সাহস করে না, বরঞ্চ ওই-ই পাঁচজনের জাত-মেরে বেড়াচ্চে!” রমেশ অনেকক্ষণ পর্য্যন্ত আর কোন প্রশ্ন না করিয়া, চুপ করিয়া সঙ্গে সঙ্গে চলিতে লাগিল। রাগে তাহার সর্ব্বাঙ্গ জ্বালা করিতেছিল।

দীনু নিজেই বলিতে লাগিল—“এই আমার কথা তুমি দেখে নিয়ো বাবা, ক্ষেন্তিবাম্‌নি সহজে নিস্তার পাবে না। গোবিন্দ গাঙুলী, পরাণ হালদার দু-দুটো ভীমরুলের চাকে খোঁচা দেওয়া কি সহজ কথা! কিন্তু যাই বল বাবা, মাগীর সাহস আছে। আর সাহস থাক্‌বে নাই বা কেন? মুড়ী বেচে খায়, সব ঘরে যাতায়াত করে, সকলের সব কথা টের পায়।

ওকে ঘাঁটালে কেলেঙ্কারির সীমা-পরিসীমা থাক্‌বে না, তা ব’লে দিচ্চি। অনাচার আর কোন্ ঘরে নেই বল? বেণীবাবুকেও—” রমেশ সভয়ে বাধা দিয়া বলিল, “থাক্‌, বড়দার কথার আর কাজ নেই”—দীনু অপ্রতিভ হইয়া উঠিল। কহিল, “থাক্‌, বাবা, আমি দুঃখী মানুষ, কারো কথায় আমার কাজ নেই। কেউ যদি বেণীবাবুর কানে তুলে দেয় ত আমার ঘরে আগুন”- রমেশ আবার বাধা দিয়া কহিল, “ভট্‌চায্যি মশায়, আপনার বাড়ী কি আরো দূরে?”

“না, বাবা, বেশী দূর নয়, এই বাঁধের পাশেই আমার কুঁড়ে—কোন দিন যদি—” “আস্‌ব বই কি, নিশ্চয় আসব”- বলিয়া রমেশ ফিরিতে উদ্যত হইয়া কহিল, “আবার কাল সকালেই ত দেখা হবে—কিন্তু তাঁর পরেও মাঝে মাঝে পায়ের ধুলো দেবেন।” বলিয়া রমেশ ফিরিয়া গেল। “দীর্ঘজীবী হও—বাপের মত হও!” বলিয়া দীনু ভট্‌চায অন্তরের ভিতর হইতে আশীর্ব্বচন বাহির করিয়া ছেলেপুলে লইয়া চলিয়া গেল।

এ পাড়ায় একমাত্র মধু পালের মুদির দোকান নদীর পথে হাটের একধারে। দশ বার দিন হইয়া গেল, অথচ সে বাকী দশ টাকা লইয়া যায় নাই বলিয়া, রমেশ কি মনে করিয়া নিজেই একদিন সকালবেলা দোকানের উদ্দেশে বাহির হইয়া পড়িল। মধু পাল মহাসমাদর করিয়া ছোটবাবুকে বারান্দার উপর মোড়া পাতিয়া বসাইল এবং ছোট বাবুর আসিবার হেতু শুনিয়া গভীর আশ্চর্য্যে অবাক হইয়া গেল।

যে ধারে, সে উপযাচক হইয়া ঘর বহিয়া ঋণশোধ করিতে আসে, তাহা মধু পাল এতটা বয়সে কখন চোখে ত দেখেই নাই, কানেও শোনে নাই। কথায় কথায় অনেক কথা হইল। মধু কহিল, “দোকান কেমন ক’রে চল্‌বে, বাবু? দু’ আনা চার আনা একটাকা পাঁচসিকে ক’রে প্রায় পঞ্চাশ ষাট টাকা বাকী পড়ে গেছে। এই দিয়ে যাচ্চি ব’লে দু মাসেও আদায় হবার যো’ নেই। এ কি-বাঁডুয্যে মশাই যে! কবে এলেন? প্রাতঃ পেন্নাম হই।”

বাঁডুয্যে মশায়ের বা হাতে একটা গাড়ু, পায়ের নখে, গোড়ালিতে কাদার দাগ, কানে পৈতা জড়ানো, ডানহাতে কচুপাতায় মোড়া চারিটি কুচোচিংড়ি। তিনি ফোঁস করিয়া একটা নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, “কাল রাত্তিরে এলুম; তামাক থা’ দিকি মধু!” বলিয়া গাড়ু রাখিয়া হাতের চিংড়ি মেলিয়া ধরিয়া বলিলেন, “সৈরুবি জেলেনীর আক্কেল দেখলি, মধু—খপ্‌ ক’রে হাতটা আমার ধ’রে ফেল্‌লে? কালেকালে কি হ’ল বল্‌ দেখি রে, এই কি এক পয়সার চিংড়ি? বামুনকে ঠকিয়ে ক’কাল খাবি মাগী, উচ্ছন্ন যেতে হবে না?” মধু বিস্ময় প্রকাশ করিয়া কহিল’ “হাত ধরে ফেল্‌লে আপনার?

” ক্রুদ্ধ বাঁডুয্যে মশাই একবার চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া উত্তেজিত হইয়া কহিলেন—“আড়াইটি পয়সা শুধু বাকী, তাই ব’লে খামকা হাটশুদ্ধ লোকের সাম্‌নে হাত ধর্‌বে আমার? কে না দেখ্‌লে বল্‌। মাঠ থেকে ব’সে এসে, গাড়ুটি মেজে নদীতে হাত-পা ধুয়ে মনে কর্‌লুম, হাটটা একবার ঘুরে যাই, মাগী এক চুবড়ি মাছ নিয়ে ব’সে,—আমাকে স্বছন্দে বল্‌লে কি না, কিছুই নেই ঠাকুর, যা’ ছিল, সব উঠে গেছে। আরে, আমার চোখে ধুলো দিতে পারিস্‌? ডালাটা ফস্‌ ক’রে তুলে ফেলতেই হাতটা চেপে ধ’রে ফেল্‌লে! তোর এই আড়াইটা—আর আজকার একটা—এই সাড়ে তিনটে পয়সা নিয়ে আমি গাঁ ছেড়ে পালাব?

কি বলিস, মধু?” মধু সায় দিয়া কহিল, “তাও কি হয়!” “তবে, তাই বল্‌ না! গাঁয়ে কি শাসন আছে? নইলে ষষ্ঠে জেলের খোপা-নাপ্‌তে বন্ধ ক’রে, চাল কেটে তুলে দেওয়া যায় না!” হঠাৎ রমেশের প্রতি চাহিয়া প্রশ্ন করিলেন, “বাবুটি কে, মধু?” মধু সগর্ব্বে কহিল, “আমাদের ছোটবাবুর ছেলে যে! সেদিনের দশ টাকা বাকী ছিল ব’লে, নিজে বাড়ী বয়ে দিতে এসেচেন।

” বাঁডুয্যে মশাই কুচোচিংড়ির অভিযোগ ভুলিয়া, দুই চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া কহিলেন,—“হ্যাঁ, রমেশ বাবাজী? বেঁচে থাক, বাবা—হাঁ, এসে শুনলুম, একটা কাজের মত কাজ করেচ বটে! এমন খাওয়া-দাওয়া এ অঞ্চলে কখনও হয় নি। কিন্তু বড় দুঃখ রইল, চোখে দেখ্‌তে পেলুম না। পাঁচ শালার ধাপ্পায় প’ড়ে কল্‌কাতায় চাকুরি কর্‌তে গিয়ে হাড়ীর হাল। আরে ছি, সেখানে মানুষ থাক্‌তে পারে!” রমেশ এই লোকটার মুখের দিকে চুপ করিয়া চাহিয়া রহিল।

কিন্তু দোকান-শুদ্ধ সকলে তাঁহার কলিকাতা প্রবাসের ইতিহাস শুনিবার জন্য মহাকৌতূহলী হইয়া উঠিল। তামাক সাজিয়া মধু-দোকানি বাঁড়ুয্যের হাতে হুঁকাটা তুলিয়া দিয়া, প্রশ্ন করিল, “তার পরে? একটু চাক্‌রি-বাক্‌রি হয়েছিল ত?” “হবে না? এ কি ধান দিয়ে লেখাপড়া শেখা আমার?—হ’লে হবে কি,—সেখানে কে থাক্‌তে পারে বল! যেমন ধুঁয়া—তেমনি কাদা। বাইরে বেরিয়ে গাড়ীঘোড়া চাপা না প’ড়ে যদি ঘরে ফির্‌তে পারিস্‌, ত জান্‌বি, তোর বাপের পুণ্যি!

” মধু কখনও কলিকাতায় যায় নাই। মেদিনীপুর সহরটা, একবার সাক্ষ্য দিতে গিয়া, দেখিয়া আসিয়াছিল মাত্র। সে ভারি আশ্চর্য্য হইয়া কহিল, “বলেন কি!” বাঁড়ুয্যে ঈষৎ হাসিয়া কহিল-“তোর রমেশ বাবুকে জিজ্ঞাসা কর না, সত্যি না মিথ্যে। না মধু, খেতে না পাই, বুকে হাত দিয়ে ঘরে প’ড়ে ম’রে থাকব, সে ভাল, কিন্তু বিদেশ যাবার নামটি যেন কেউ আমার কাছে আর না করে।

বল্‌লে বিশ্বেস করবিনে, সেখানে শুষ্‌ণি-কলমি শাক, চালতা, আমড়া, খোড়-মোচা পর্য্যন্ত কিনে খেতে হয়! পার্‌বি খেতে? এই একটি মাস না খেয়ে-খেয়ে যেন রোগা ইঁদুরটি হয়ে গেচি! দিবারাত্রি পেট ফুট-ফাট করে, বুকজ্বালা করে, প্রাণ আইঢাই করে, পালিয়ে এসে তবে হাঁফ-ছেড়ে বাঁচি।

না বাবা, নিজের গাঁয়ে ব’সে জোটে একবেলা, একসন্ধ্যে খাবো; না জোটে, ছেলেমেয়ের হাত ধ’রে ভিক্ষে করব; বামুনের ছেলের তাতে কিছু আর লজ্জার কথা নেই, কিন্তু, মা লক্ষী মাথায় থাকুন—বিদেশ কেউ যেন না যায়!” তাঁহার কাহিনী শুনিয়া সকলে যখন সভয়ে নির্ব্বাক হইয়া গেছে, তখন বাঁড়ুয্যে উঠিয়া আসিয়া মধুর তেলের ভাঁড়ের ভিতর উখড়ি ডুবাইয়া একছটাকে তেল বাঁ হাতের তেলোয় লইয়া অর্দ্ধেকটা দুই নাক ও দুই কানের গর্ত্তে ঢালিয়া দিয়া, বাকীটা মাথায় মাখিয়া ফেলিলেন ও কহিলেন, “বেলা হয়ে গেল, অম্‌নি ডুবটা দিয়ে একেবারে ঘরে যাই! এক পরসার নুন দে দেখি, মধু, পয়সাটা বিকেলবেলা দিয়ে যাবো।

” “আবার বিকেলবেলা!”বলিয়া মধু অপ্রসন্নমুখে নুণ দিতে তাঁহার দোকানে উঠিল। বাঁড়ুয্যে গলা বাড়াইয়া দেখিয়া, বিস্ময়-বিরক্তির স্বরে কহিয়া উঠিল, “তোরা সব হলি কি, মধু? এ যে গালে চড় মেরে পয়সা নিস্‌, দেখি?” বলিয়া আগাইয়া আসিয়া নিজেই এক খামচা নুন তুলিয়া ঠোঙায় দিয়া সেটা টানিয়া লইলেন। গাড়ু হাতে করিয়া রমেশের প্রতি চাহিয়া মৃদু হাসিয়া বলিলেন,—“ঐ ত একই পথ—চল না বাবাজী, গল্প ক’রতে ক’রতে যাই।” “চলুন”—বলিয়া রমেশ উঠিয়া দাঁড়াইল। মধু-দোকানি অনতিদূরে দাঁড়াইয়া করুণ-কন্ঠে কহিল, “বাড়ুয্যে মশাই, সেই ময়দার পয়সা পাঁচ আনা কি অমনি—”

বাঁড়ুয্যে রাগিয়া উঠিল—“হাঁ রে, মধু, দুবেলা চোখো-চোখি হবে-তোদের কি চোখের চামড়া পর্য্যন্ত নেই? পাঁচ ব্যাটাবেটীর মতলবে কল্‌কাতায় যাওয়া আসা ক’রতে পাঁচপাঁচটা টাকা আমার জলে গেল—আর এই তোদের তাগাদা করবার সময় হ’ল! কারো সর্ব্বনাশ, কারো পোষ মাস—দেখ্‌লে বাবা রমেশ, এদের ব্যাভারটা একবার দেখ্‌লে?” মধু এতটুকু হইয়া গিয়া অস্ফুট বলিতে গেল, “অনেক দিনের—” “হলই বা অনেক দিনের? এমন ক’রে সবাই মিলে পিছনে লাগ্‌লে ত আর গাঁয়ে বাস করা যায় না।” বলিয়া বাঁড়ুয্যে একরকম রাগ করিয়াই নিজের জিনিসপত্র লইয়া চলিয়া গেলেন।

রমেশ ফিরিয়া আসিয়া বাড়ী ঢুকিতেই এক ভদ্রলোক শশব্যস্তে হাতের হুঁকাটা একপাশে রাখিয়া দিয়া, একবারে পায়ের কাছে আসিয়া তাহাকে প্রণাম করিল। উঠিয়া কহিল, “আমি বনমালী পাড়ুই—আপনাদের ইস্কুলের হেডমাষ্টার। দুদিন এসে সাক্ষাৎ পাইনি; তাই বলি—” রমেশ সমাদর করিয়া পাড়ুইমহাশয়কে চেয়ারে বসাইতে গেল; কিন্তু সে সসম্ভ্রমে দাঁড়াইয়া রহিল। কহিল, “আজ্ঞে, আমি যে আপনার ভৃত্য।” লোকটা বয়সে প্রাচীন এবং আর-যেই-হোক একটা বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাহার এই অতি বিনীত কুণ্ঠিত ব্যবহারে রমেশের মনের মধ্যে একটা অশ্রদ্ধার ভাব জাগিয়া উঠিল।

সে কিছুতেই আসন-গ্রহণে স্বীকৃত হইল না, খাড়া দাঁড়াইয়া নিজের বক্তব্য কহিতে লাগিল। এদিকের মধ্যে এই একটা অতি ছোট রকমের ইস্কুল, মুখুয্যে ও ঘোষালদের যত্নে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। প্রায় ৩০।৪০ জন ছাত্র পড়ে। দুই তিন ক্রোশ দূর হইতেও কেহ কেহ আসে। যৎকিঞ্চিৎ গভর্ণমেন্ট-সাহায্যও আছে। তথাপি ইস্কুল আর চলিতে চাহিতেছে না। ছেলেবয়সে এই বিদ্যালয়ে রমেশও কিছুদিন পড়িয়াছিল, তাহার স্মরণ হইল।

পাড়ুই মহাশয় জানাইল যে, চাল ছাওয়া না হইলে আগামী বর্ষায় বিদ্যালয়ের ভিতর আর কেহ বসিতে পারিবে না। কিন্তু সে না হয় পরে চিন্তা করিলে চলিবে, উপস্থিত প্রধান দুর্ভাবনা হইতেছে যে, তিনমাস হইতে শিক্ষকেরা কেহ মাহিনা পায় নাই—সুতরাং, ঘরের খাইয়া বন্যমহিষ তাড়াইয়া বেড়াইতে আর কেহ পারিতেছে না।

ইস্কুলের কথায় রমেশ একেবারে সজাগ হইয়া উঠিল। হেডমাষ্টার মহাশয়কে বৈঠকখানায় লইয়া গিয়া একটি একটি করিয়া সমস্ত সংবাদ গ্রহণ করিতে লাগিল। মাষ্টারপণ্ডিত চারিজন; এবং তাঁহাদের হাড় ভাঙা খাটুনির ফলে গড়ে দুই জন করিয়া ছাত্র প্রতিবৎসর মাইনার পরীক্ষায় পাস করিয়াছে। তাহাদের নাম-ধাম বিবরণ পাড়ুই মহাশয় মুখস্থর মত আবৃত্তি করিয়া দিল।

ছেলেদের নিকট হইতে যাহা আদায় হয়, তাহাতে নীচের দুজন শিক্ষকের কোন মতে, ও গভর্ণমেন্টের সাহায্যে আর একজনের সঙ্কুলান হয়; শুধু একজনের মাহিনাটাই গ্রামের ভিতরে এবং বাহিরে চাঁদা তুলিয়া সংগ্রহ করিতে হয়। এই চাঁদা সাধিবার ভারও মাষ্টারদের উপরেই—তাঁহারা গত তিন চারি মাস কাল ক্রমাগত ঘুরিয়া ঘুরিয়া প্রত্যেক বাটীতে আট-দশবার করিয়া হাঁটা-হাঁটি করিয়াও সাতটাকা চারি আনার বেশী আদায় করিতে পারেন নাই!

কথা শুনিয়া রমেশ স্তম্ভিত হইয়া রহিল। পাঁচছয়টা গ্রামের মধ্যে এই একটা বিদ্যালয়—এবং এই পাঁচছয়টা গ্রামময় তিনমাসকাল ক্রমাগত ঘুরিয়া মাত্র ৭।০ আদায় হইয়াছে! রমেশ প্রশ্ন করিল, “আপনার মাহিনা কত?” মাষ্টার কহিল, “রসিদ দিতে হয় ছাব্বিশ টাকার, পাই তের টাকা পোনর আনা।” কথাটা রমেশ ঠিক বুঝিতে পারিল না—তাহার মুখপানে চাহিয়া রহিল। মাষ্টার তাহা বুঝাইয়া বলিল,

“আজ্ঞে গভর্ণমেন্টের হুকুম কি না, তাই ছাব্বিশ টাকার রসিদ লিখে দিয়ে সবইন্‌স্পেক্টার বাবুকে দেখাতে হয়—নইলে—সরকারী সাহায্য বন্ধ হ’য়ে যায়। সবাই জানে, আপনি কোন ছাত্রকে জিজ্ঞাসা কর্‌লেই জানতে পার্‌বেন—আমি মিথ্যে বল্‌চিনে।” রমেশ অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “এতে ছাত্রদের কাছে আপনার সম্মানহানি হয় না?” মাষ্টার লজ্জিত হইল। কহিল, কি কর্‌ব, রমেশবাবু! বেণীবাবু এ কয়টি টাকাও দিতে নারাজ।” “তিনিই কর্ত্তা বুঝি?”

মাষ্টার একবার একটুখানি দ্বিধা করিল; কিন্তু তাহার না বলিলেই নয়। তাই সে ধীরে ধীরে জানাইল যে, “তিনিই সেক্রেটারি বটে; তিনি একটি পয়সাও কখনো খরচ করেন না। যদু মুখুয্যে মহাশয়ের কন্যা—সতীলক্ষ্মী তিনি—তাঁর দয়া না থাকিলে ইস্কুল অনেকদিন উঠিয়া যাইত। এ বৎসর নিজের খরচে চাল ছাইয়া দিবেন, আশা দিয়াও হঠাৎ কেন যে সমস্ত সাহায্য বন্ধ করিয়া দিয়াছেন, তাহার কারণ কেহই বলিতে পারে না।

” রমেশ কৌতূহলী হইয়া রমার সম্বন্ধে আরও কয়েকটি প্রশ্ন করিয়া, শেষে জিজ্ঞাসা করিল, “তাঁর একটি ভাই এ ইস্কুলে পড়ে না?” মাষ্টার কহিল, “যতীন ত? পড়ে বৈকি।” রমেশ বলিল, “আপনার ইস্কুলের বেলা হয়ে যাচ্ছে, আজ আপনি যান, কা’ল আমি আপনাদের ওখানে যাব।” “যে আজ্ঞে” বলিয়া হেডমাষ্টার আর একবার রমেশকে প্রণাম করিয়া, জোর করিয়া তাহার পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া, বিদায় হইল।

 

Read more

পল্লী সমাজ পর্ব:৫ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *