তখন রাত্রি বোধ করি এগারটা। বেণীর চণ্ডীমন্ডপ হইতে অনেকগুলি লোকের চাপাগলার আওয়াজ আসিতেছিল। আকাশে মেঘ কতকটা কাটিয়া গিয়া ত্রয়োদশীর অস্বচ্ছ জ্যোৎস্না বারান্দার উপরে আসিয়া পড়িয়াছিল। সেইখানে খুঁটিতে ঠেস দিয়া একজন ভীষণাকৃতি প্রৌঢ় মুসলমান চোখ বুজিয়া বসিয়া ছিল। তাহার সমস্ত মুখের উপর কাঁচা রক্ত জমাট বাঁধিয়াগিয়াছে—পরণের বস্ত্র রক্তে রাঙা; কিন্তু, সে চুপ করিয়া আছে। বেণী চাপা-গলায় অনুনয় করিতেছে,—“কথা শোন্ আক্বর, থানায় চল্।
সাত বচ্ছর যদি না তাকে দিতে পারি, ত ঘোষালবংশের ছেলে নই আমি।” পিছনে চাহিয়া কহিল,—“রমা, তুমি একবার বল না, চুপ ক’রে রইলে কেন?” কিন্তু, রমা তেমনি কাঠের কত বসিয়া রহিল।আক্বর আলি এবার চোখ খুলিয়া সোজা হইয়া বসিয়া বলিল,—“সাবাস! হাঁ,—মায়ের দুধ খায়েছিল বটে ছোটবাবু! লাঠি ধর্লে বটে!” বেণী ব্যস্ত এবং ক্রুদ্ধ হইয়া কহিল,—“সেই কথা বল্তেই ত বল্চি আক্বর! কার লাঠিতে তুই জখম হলি?
সেই ছোঁড়ার, না তার সেই হিন্দুস্থানী চাকরটার?” আক্বরের ওষ্ঠপ্রান্তে ঈষৎ হাসি প্রকাশ পাইল। কহিল,—“সেই বেঁটে হিন্দুস্থানীটার? সে ব্যাটা লাঠির জানে কি বড়বাবু? কি বলিস্ রে গহর, তোর পয়লা চোটেই সে বসেছিল না রে?” আক্বরের দুই ছেলেই অদূরে জড়সড় হইয়া বসিয়াছিল। তাহারাও অনাহত ছিল না। গহর মাথা নাড়িয়া সায় দিল, কথা কহিল না।
আক্বর কহিতে লাগিল,—“আমার হাতের চোট পেলে সে ব্যাটা বাঁচত না। গহরের লাঠিতেই ‘বাপ-করে’ বসে পড়্ল, বড়বাবু!” রমা উঠিয়া আসিয়া অনতিদূরে দাঁড়াইল। আক্বর তাহাদের পিরপুরের প্রজা। সাবেক দিনে লাঠির জোরে অনেক বিষয় হস্তগত করিয়া দিয়াছে। তাই আজসন্ধ্যার পরে ক্রোধে ও অভিমানে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া রমা তাহাকে ডাকাইয়া আনিয়া, বাঁধ পাহারা দিবার জন্য পাঠাইয়া দিয়াছিল, এবং ভাল করিয়া একবার দেখিতে চাহিয়াছিল, রমেশ শুধু সেই হিন্দুস্থানীটার গায়ের জোরে কেমন করিয়া কি করে! সে নিজেই যে কত বড় লাঠিয়াল, এ কথা রমা স্বপ্নেও কল্পনা করে নাই।
আক্বর রমার মুখের প্রতি চাহিয়া কহিল,—“তখন ছোট বাবু সেই ব্যাটার লাঠি তুলে নিয়ে বাঁধ আটক ক’রে দাঁড়াল দিদিঠাক্রাণ, তিন ব্যাপ-ব্যাটায় মোরা হটাতে নার্লাম। আঁধারে বাঘের মত তেনার চোখ জ্বল্তি লাগ্ল। কইলেন, আক্বর, বুড়োমানুষ তুই, সরে যা। বাঁধ কেটে না দিলে সারাগাঁয়ের লোক মারা পড়্বে, তাই কেট্তেই হবে। তোর আপনার গাঁয়েও ত জমিজমা আছে, সম্ঝে দেখ রে, সব বরবাদ হ’য়ে গেলে তোর ক্যামন লাগে?
” মুই সেলাম ক’রে কইলাম, “আল্লার কিরে ছোটবাবু, তুমি একটিবার পথ ছাড়। তোমার আড়ালে দেঁড়িয়ে ঐ যে ক’ সম্মুন্দি মুয়ে কাপড় জড়ায়ে ঝপাঝপ্ কোদাল মার্চে, ওদের মুণ্ডু ক’টা ফাঁক ক’রে দিয়ে যাই!” বেণী রাগ সাম্লাইতে না পারিয়া কথার মাঝ্খানেই চেঁচাইয়া কহিল,—“বেইমান ব্যাটারা—তাকে সেলাম বাজিয়ে এসে এখানে চালাকি মারা হ’চ্চে—”
তাহারা তিন বাপবেটাই একেবারে একসঙ্গে হাত তুলিয়া উঠিল। আক্বর কর্কশকন্ঠে কহিল,—“খবরদার বড়বাবু, বেইমান কোয়ো না; মোরা মোছলমানের ছ্যালে, সব সইতে পারি,—ও পারি না।” কপালে হাত দিয়া খানিকটা রক্ত মুছিয়া ফেলিয়া রমাকে উদ্দেশ করিয়া কহিল,—“অ্যারে বেইমান কয় দিদি? ঘরের মধ্যি বসে বেইমান কইচ, বড়বাবু, চোখে দেখ্লে জান্তি পার্তে ছোটবাবু কি!” বেণী মুখ বিকৃত করিয়া কহিল,—“ছোটবাবু কি!
তাই থানায় গিয়ে জানিয়ে আয় না! বল্বি, তুই বাঁধ পাহারা দিচ্ছিলি, ছোটবাবু চড়াও হ’য়ে তোরে মেরেচে।” আক্বর জিভ্ কাটিয়া বলিল,—“তোবা তোবা, দিনকে রাত কর্তি বল বড়বাবু?” বেণী কহিল, “না হয় আর কিছু বল্বি। আজ গিয়ে জখম দেখিয়ে আয় না—কাল ওয়ারেন্ট বা’র ক’রে একেবারে হাজতে পুর্ব। রমা, তুমি ভাল ক’রে আর একবার বুঝিয়ে বল না।
—এমন সুবিধে যে আর কখনো পাওয়া যাবে না।” রমা কথা কহিল না, শুধু আক্বরের মুখের প্রতি একবার চাহিল। আক্বর ঘাড় নাড়িয়া বলিল,—“না দিদি ঠাক্রাণ, ও পার্ব না।” বেণী ধমক্ দিয়া কহিল,—“পার্বিনে কেন? ” এবার আক্বরও চেঁচাইয়া কহিল,—“কি কও বড়বাবু, সরম নেই মোর? পাঁচখানা গাঁয়ের লোক মোরে সর্দ্দার কয় না?
দিদিঠাক্রাণ, তুমি হুকুম কর্লে আসামী হ’য়ে জ্যাল খাট্তি পারি, ফৈরিদি হব কোন্ কালামুয়ে?” রমা মৃদুকন্ঠে একবারমাত্র কহিল,—“পার্বে না আক্বর?” আক্বর সবেগে মাথা নাড়িয়ে বলিল,—“না দিদিঠাক্রাণ, আর সব পারি, সদরে গিয়ে গায়ের চোট দেখাতে না পারি।—ওঠ্রে গহর, এইবারে ঘরকে যাই। মোরা নালিশ কর্তি পার্ব না।” বলিয়া তাহারা উঠিবার উপক্রম করিল।বেণী ক্রুদ্ধ নিরাশায় তাহাদের দিকে চাহিয়া দুই চোখে অগ্নিবর্ষণ করিয়া মনে মনে অকথ্য গালিগালাজ করিতে লাগিল এবং রমার একান্ত নিরুদ্যম স্তব্ধতার কোন অর্থ বুঝিতে না পারিয়া তূঁষের আগুণে পুড়িতে লাগিল।
সর্ব্বপ্রকার অনুনয় বিনয়, ভর্ৎসনা, ক্রোধ উপেক্ষা করিয়া আক্বর আলি ছেলেদের লইয়া যখন বিদায় হইয়া গেল, তখন রমার বুক চিরিয়া একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বাহির হইয়া, অকারণে তাহার দুইচক্ষু অশ্রু প্লাবিত হইয়া উঠিল, এবং আজিকার এতবড় অপমান তাহার সম্পূর্ণ পরাজিত ও নিষ্ফল হওয়া সত্ত্বেও কেন যে, কেবলি মনে হইতে লাগিল, তাহার বুকের উপর হইতে একটা অতি গুরুভার পাষাণ নামিয়া গেল, তাহার কোন হেতুই সে খুঁজিয়া পাইল না।
সারারত্রি তাহার ঘুম হইল না, সেই যে তারকেশ্বরে সুমুখে বসিয়া খাওয়াইয়াছিল, নিরস্তর তাহাই চোখের উপর ভাসিয়া বেড়াইতে লাগিল; এবং, যতই মনে হইতে লাগিল, সেই সুন্দর সুকুমার দেহের মধ্যে এত মায়া এবং এত তেজ কি করিয়া এমন স্বছন্দে শান্ত হইয়াছিল, ততই তাহার চোখের জলে সমস্ত মুখ ভাসিয়া যাইতে লাগিল।ছেলেবেলায় একদিন রমেশ রমাকে ভালবাসিয়াছিল। নিতান্ত ছেলেমানুষি ভালবাসা, তাহাতে সন্দেহ নাই; কিন্তু সে যে কত গভীর, তাহা তারকেশ্বরে সে প্রথম অনুভব করিতে পারিয়াছিল।
এবং আরও কত গভীর, সেইদিন সব চেয়ে বেশী টের পাইয়াছিল, যে দিন সন্ধ্যার অন্ধকারে রমার সমস্ত সম্বন্ধ সে একেবারে ভূমিসাৎ করিয়া দিয়া চলিয়া আসিয়াছিল। তৎপরে সেই নিদারুণ রাত্রির ঘটনার পর হইতে রমার দিক্টাই একেবারে রমেশের কাছে মহামরুর ন্যায় শূন্য ধূ ধূ করিতেছিল। কিন্তু, সে যে তাহার সমস্ত কাজ-কর্ম্ম, শোয়া-বসা, এমন কি চিন্তা, অধ্যয়ন পর্য্যন্ত এমন বিস্বাদ করিয়া দিবে, তাহা রমেশ কল্পনাও করে নাই। তাহাতে গৃহ-বিচ্ছেদ এবং সর্ব্বব্যাপী অনাত্মীয়তায় প্রাণ যখন তাহার এক মূহুর্ত্তও আর গ্রামের মধ্যে তিষ্ঠিতে চাহিতেছিল না, তখন নিম্নলিখিত ঘটনায় সে আর একবার সোজা হইয়া বসিল।
খালের ওপারে পিরপুর গ্রামেই তাহাদেরই জমিদারী। এখানে মুসলমানের সংখ্যাই অধিক। একদিন তাহারা দল বাঁধিয়া, রমেশের কাছে উপস্থিত হইল; এই বলিয়া নালিশ জানাইল যে, যদিচ তাহারা তাঁহাদেরই প্রজা, অথচ তাহাদের ছেলেপিলেকে মুসলমান বলিয়া গ্রামের স্কুলে ভর্ত্তি হইতে দেওয়া হয় না। কয়েকবার চেষ্টা করিয়া তাহারা বিফলমনোরথ হইয়াছে, মাষ্টার মহাশয়রা কোন মতেই তাহাদের ছেলেদের গ্রহণ করেন না। রমেশ বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হইয়া কহিল,—“এমন অন্যায় অত্যাচার ত কখনও শুনি নাই?
তোমাদের ছেলেদের আজই লইয়া আইস; আমি নিজে দাঁড়াইয়া থাকিয়া ভর্ত্তি করিয়া দিব।” তাহারা কহিল,—“যদিচ, তাহারা প্রজা বটে, কিন্তু, খাজনা দিয়াই জমি ভোগ করে। সে জন্য হিঁদুর মত জমিদারকে তাহারা ভয় করে না; কিন্তু, এ ক্ষেত্রে বিবাদ করিয়াও লাভ নাই। কারণ ইহাতে বিবাদই হইবে, যথার্থ উপকার কিছুই হইবে না। বরঞ্চ, তাহারা নিজেদের মধ্যে একটা ছোট রকমের ইস্কুল করিতে ইচ্ছা করে, এবং ছোটবাবু একটু সাহায্য করিলেই হয়।
কলহ বিবাদে রমেশ নিজেও ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল, সুতরাং ইহাকে আর বাড়াইয়া না তুলিয়া, ইহাদের পরামর্শ সুযুক্তি বিবেচনা করিয়া, সায় দিল এবং তখন হইতে এই নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করিতেই ব্যাপৃত হইল। ইহাদের সম্পর্কে আসিয়া রমেশ শুধু যে নিজেকে সুস্থ বোধ করিল, তাহা নহে, এই একটা বৎসর ধরিয়া তাহার যত বলক্ষয় হইয়াছিল, তাহা ধীরে ধীরে যেন ভরিয়া আসিতে লাগিল। রমেশ দেখিল, কুঁয়াপুরের হিন্দু প্রতিবেশীর মত ইহারা প্রতিকথায় বিবাদ করে না; করিলেও তাহারা প্রতিহাত এক নম্বর রুজু করিয়া দিবার জন্য সদরে ছুটিয়া যায় না।
বরঞ্চ মুরুব্বিদের বিচারফলই, সন্তষ্ট অসন্তষ্ট যে ভাবেই হোক্, গ্রহণ করিতে চেষ্টা করে। বিশেষতঃ বিপদের দিনে পরস্পরের সাহায্যার্থে এরূপ সর্ব্বান্তঃকরণে অগ্রহর হইয়া আসিতে, রমেশ ভদ্র, অভদ্র, কোন হিন্দু গ্রামবাসীকেই দেখে নাই।একে ত জাতিভেদের উপর রমেশের কোনদিনই আস্থা ছিল না, তাহাতে এই দুই গ্রামের অবস্থা পাশাপাশি তুলনা করিয়া তাহার অশ্রদ্ধা শতগুণে বাড়িয়া গেল। সে স্থির করিল, হিন্দুদিগের মধ্যে ধর্ম্ম ও সামাজিক অসমতাই এই হিংসাদ্বেষের কারণ। অথচ, মুসলমানমাত্রই ধর্ম্মসম্বন্ধে পরস্পর সমান, তাই একতার বন্ধন ইহাদের মত হিন্দুদের নাই এবং হইতেও পারে না।
আর জাতিভেদ নিবারণ করিবার কোন উপায় যখন নাই, এমন কি, ইহার প্রসঙ্গ উত্থাপন করাও যখন পল্লীগ্রামে একরূপ অসম্ভব, তখন কলহবিবাদের লাঘব করিয়া সখ্য ও প্রীতি সংস্থাপনে প্রয়াস করাই পণ্ডশ্রম। সুতরাং এই কয়টা বৎসর ধরিয়া সে নিজের গ্রামের জন্য যে বৃথা চেষ্টা করিয়া মরিয়াছিল, সে জন্য তাহার অত্যন্ত অনুশোচনা বোধ হইতে লাগিল। তাহার নিশ্চয় প্রতীতি হইল, ইহারা এম্নি খাওয়া-খায়ি করিয়াই চিরদিন কাটাইয়াছে, এবং, এমনি করিয়াই চিরদিন কাটাইতে বাধ্য।
ইহাদের ভালো কোন দিন কোনমতেই হইতে পারে না! কিন্তু, কথাটা পাকা করিয়া লওয়া ত চাই। নানা কারণে অনেক দিন হইতে তাহার জ্যাঠাইমার সঙ্গে দেখা হয় নাই। সেই মারামারির পর হইতে কতকটা ইচ্ছা করিয়াই সে সেদিকে যায় নাই। আজ ভোরে উঠিয়া সে একেবারে তাঁর ঘরের দোরগোড়ায় আসিয়া দাঁড়াইল। জ্যাঠাইমার বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার উপর তাহার এমনি বিশ্বাস ছিল যে, সে কথা তিনি নিজেও জানিতেন না। রমেশ একটুখানি আশ্চর্য্য হইয়াই দেখিল, জ্যাঠাইমা এত প্রত্যূষেই স্নান করিয়া প্রস্তুত হইয়া সেই অস্পষ্ট আলোকে ঘরের মেঝের বসিয়া, চোখে চস্মা আঁটিয়া, একখানি বই পড়িতেছেন।
তিনিও বিস্মিত কম হইলেন না।বইখানি বন্ধ করিয়া তাঁহাকে আদর করিয়া ঘরে ডাকিয়া বসাইলেন এবং মুখ পানে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,—“এত সকালেই যে রে?” রমেশ কহিল,—“অনেক দিন তোমাকে দেখ্তে পাইনি জ্যাঠাইমা। আমি পিরপুরে একটা ইস্কুল কর্চি।” বিশ্বেশ্বরী বলিলেন,—“শুনেচি। কিন্তু, আমাদের ইস্কুলে আর পড়াতে যাস্নে কেন বল্ত?” রমেশ কহিল,—“সেই কথাই বল্তে এসেচি জ্যাঠাইমা! এদের মঙ্গলের চেষ্টা করা শুধু পণ্ডশ্রম।
যারা কেউ কারো ভাল দেখ্তে পারে না, অভিমান অহঙ্কার যাদের এত বেশী, তাদের মধ্যে খেটে মরায় লাভ কিছুই নেই, শুধু, মাঝ্থেকে নিজেরই শত্রু বেড়ে ওঠে। বরং, যাদের মঙ্গলের চেষ্টায় সত্যকার মঙ্গল হবে, আমি সেখানেই পরিশ্রম করব!” জ্যাঠাইমা কহিলেন—“একথা ত নতুন নয় রমেশ! পৃথিবীতে ভাল করবার ভার যে কেউ নিজের ওপর নিয়েচে, চিরদিনই তাঁর শত্রু সংখ্যা বেড়ে উঠেচে।
সেই ভয়ে যারা পেছিয়ে দাঁড়ায়, তুইও তাহাদের দলে গিয়ে যদি মিশিস্, তা হ’লে ত চল্বে না বাবা! এ গুরুভার ভগবান্ তোকেই বইতে দিয়েচেন, তোকেই ব’য়ে বেড়াতে হবে। কিন্তু, হাঁরে, রমেশ, তুই নাকি ওদের হাতে জল খাস?” রমেশ হাসিয়া কহিল,—“এই দ্যাখ জ্যাঠাইমা, এর মধ্যেই তোমার কাণে উঠেচে। এখনো খাইনি বটে, কিন্তু, খেতে ত আমি কোন দোষ দেখিনে। আমি তোমাদের জাতিভেদ মানিনে।” জ্যাঠাইমা আশ্চর্য্য হইয়া প্রশ্ন করিলেন,—“মানিস্নে কিরে?
এ কি মিছে কথা, না, জাতিভেদ নেই যে, তুই মান্বিনে?” রমেশ কহিল,—“ঠিক ওই কথাটাই জিজ্ঞাসা কর্তে আজ তোমার কাছে এসেছিলাম জ্যাঠাইমা! জাতিভেদ আছে, তা’ মানি, কিন্তু, একে ভাল ব’লে মানিনে?” “কেন?” রমেশ হঠাৎ উত্তেজিত হইয়া কহিল,—“কেন, সে কি তোমাকে বল্তে হবে? এর থেকেই যত মনমালিন্য, যত বাদাবাদি, এ কি তোমার জানা নেই? সমাজে যাকে ছোটজাত ক’রে রাখা হয়েচে, সে যে বড়কে হিংসা কর্বে, এই ছোট হয়ে থাকার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ক’রে এর থেকে মুক্ত হ’তে চাইবে, সে ত খুব স্বাভাবিক।
হিন্দুরা সংগ্রহ করতে চায় না, জানে না—জানে শুধু অপচয় কর্তে। নিজেকে এবং নিজের জাতকে রক্ষা কর্বার এবং বাড়িয়ে তোল্বার যে একটা সংসারিক নিয়ম আছে, আমরা তাকে স্বীকার করি না বলেই প্রতিদিন ক্ষয় পেয়ে যাচ্চি। এই যে মানুষ-গণনা করার একটা নিয়ম আছে, তার ফলাফলটা যদি পড়ে দেখ্তে জ্যাঠাইমা, তা হ’লে ভয় পেয়ে যেতে।
মানুষকে ছোট ক’রে অপমান কর্বার ফল হাতে হাতে টের পেতে! দেখ্তে পেতে, কেমন ক’রে হিন্দুরা প্রতিদিন কমে আস্চে, এবং মুসলমানেরা সংখ্যায় বেড়ে উঠ্চে। তবুত হিন্দুর হুঁস হয় না!” বিশ্বেশ্বরী হাসিয়া বলিলেন,—“তোর এত কথা শুনে এখনো ত আমার হুঁস হ’চ্চে না রমেশ! যারা তোদের মানুষ গুণে বেড়ায়, তারা যদি গুণে বল্তে পারে, এতগুলো ছোটজাত শুদ্ধমাত্র ছোট থাক্বার ভয়েই জাত দিয়েচে, তা হ’লে হয়ত আমার হুঁস হ’তেও পারে। হিন্দু যে কমে আস্চে, সে কথা মানি;—কিন্তু, তাঁর অন্য কারণ আছে।
সেটাও সমাজের ত্রুটি নিশ্চয়; কিন্তু, ছোটজাতের জাত দেওয়াদেওয়ি তার কারণ নয়। শুধু ছোট ব’লে কোন হিন্দুই কোন দিন জাত দেয় না।” রমেশ সন্দিগ্ধকন্ঠে কহিল,—“কিন্তু, পণ্ডিতেরা তাহা ত অনুমান করেন জ্যাঠাইমা!” জ্যাঠাইমা বলিলেন,—“অনুমানের বিরুদ্ধে ত তর্ক চলে না বাবা! কেউ যদি এমন খবর দিতে পারেন, অমুক গাঁয়ের এতগুলো ছোটজাত এই জন্যেই এ বৎসর জাত দিয়েচে, তা হ’লেও না হয় পণ্ডিতদের কথায় কাণ দিতে পারি।
কিন্তু, আমি নিশ্চয় জানি, এ সংবাদ কেউ দিতে পার্বে না।° রমেশ তথাপি তর্ক করিয়া কহিল—“কিন্তু, যারা ছোটজাত, তারা যে অন্যায় বড়জাতকে হিংসা ক’রে চল্বে, এতো আমার কাছে ঠিক কথা ব’লেই মনে হয় জ্যাঠাইমা!” রমেশের তীব্র উত্তেজিত কথায় বিশ্বেশ্বরী আবার হাসিয়া উঠিলেন। বলিলেন,—“ঠিক কথা নয়, বাবা, একটুও ঠিক কথা নয়।
এ তোদের সহর নয়। পাড়াগাঁয়ে জাত ছোট কি বড়, সে জন্যে কারো এতটুকুও মাথাব্যথা নেই। ছোট ভাই যখন ছোট ব’লে বড়ভাইকে হিংসে করে না, দুএক বছর পরে জন্মাবার জন্যে যেমন তাঁর মনে এতটুকুও ক্ষোভ নেই, পাড়াগাঁয়েও ঠিক তেমনি। এখানে কায়েত, বামুন হয়নি ব’লে একটুও দুঃখ করে না, কৈবর্ত্তও কায়েতের সমান হবার জন্যে একটুও চেষ্টা করে না।
বড় ভাইকে একটা প্রণাম করতে ছোটভায়ের যেমন লজ্জায় মাথা কাটা যায় না, তেমনি কায়েতেও, বামুনের একটুখানি পায়ের ধুলো নিতে এতটুকু কুন্ঠিত হয় না। সে নয় বাবা, জাতিভেদ-টেদ হিংসেদ্বেষের হেতুই নয়। অন্ততঃ বাঙালীর যা’ মেরুদণ্ড—সেই পল্লীগ্রামে নয়।” রমেশ মনে মনে আশ্চর্য্য হইয়া কহিল,—“তবে কেন এমন হয় জ্যাঠাইমা?
ওগাঁয়ে ত এত ঘর মুসলমান আছে, তাদের মধ্যে ত এমন বিবাদ নেই। একজন আর একজনকে বিপদের দিনে এমন ক’রে ত চেপে ধরে না। সেদিন অর্থাভাবে দ্বারিক ঠাকুরের প্রায়শ্চিত্ত হয়নি ব’লে, কেউ তার মৃতদেহটাকে ছুঁতে পর্য্যন্ত চায়নি, সে ত তুমি জান।” বিশ্বেশ্বরী কহিলেন,—“জানি বাবা, সব জানি। কিন্তু, জাতিভেদ তার কারণ নয়। কারণ এই যে, মুসলমানদের মধ্যে এখনো সত্যকার একটা ধর্ম্ম আছে, কিন্তু, আমাদের মধ্যে তা’ নেই। যাকে যথার্থ ধর্ম্ম বলে, পল্লীগ্রাম থেকে সে একেবারে লোপ পেয়েচে।
আছে শুধু কতকগুলো আচার-বিচারের কুসংস্কার, আর তার থেকে নিরর্থক দলাদলি।” রমেশ হতাশভাবে একটা নিশ্বাস ফেলিয়া কহিল,—“এর কি প্রতীকারের কোন উপায় নেই জ্যাঠাইমা?” বিশ্বেশ্বরী বলিলেন,—“আছে বই কি বাবা। প্রতীকার আছে শুধু জ্ঞানে। যে পথে তুই পা দিয়েছিস, শুধু সেই পথে। তাই ত তোকে কেবলি বলি তুই তোর এই জন্মভূমিকে কিছুতে ছেড়ে যাসনে।
” প্রত্যুত্তরে রমেশ কি একটা বলিতে যাইতেছিল, বিশ্বেশ্বরী বাধা দিয়া বলিলেন,—“তুই বলবি, মুসলমানদের মধ্যেও ও অজ্ঞান অত্যন্ত বেশি। কিন্তু, তাদের সজীব ধর্ম্মই তাদের সব দিকে শুধ্রে রেছেচে। একটা কথা বলি রমেশ, পীরগাঁয়ে খবর নিলে শুন্তে পাবি, জাফর ব’লে একটা বড়লোককে তারা সবাই ‘একঘরে’ ক’রে রেখেছে, সে, তাঁর বিধবা সৎমাকে খেতে দেয় না ব’লে।
কিন্তু, আমাদের এই গোবিন্দ গাঙুলী সে দিন তাঁর বিধবা বড়ভাজকে নিজের হাতে মেরে আধমরা ক’রে দিলে, কিন্তু, সমাজ থেকে তাঁর শাস্তি হওয়া চুলোয় যাক্, সে নিজেই একটা সমাজের মাথা হ’য়ে ব’সে আছে। এ সব অপরাধ আমাদের মধ্যে শুধু ব্যক্তিগত পাপপুণ্য; এর সাজা ভগবান্ ইচ্ছা হয় দেবেন, না হয় না দেবেন, কিন্তু, পল্লী-সমাজ তাতে ভ্রূক্ষেপ করে না।”
এই নূতন তথ্য শুনিয়া একদিকে রমেশ যেমন অবাক্ হইয়া গেল, অন্যদিকে তাঁহার মন ইহাকেই স্থির-সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে দ্বিধা করিতে লাগিল। বিশ্বেশ্বরী তাহা যেন বুঝিয়াই বলিলেন,—“ফলটাকেই উপায় ব’লে ভুল করিস্নে বাবা! যে জন্যে তোর মন থেকে সংশয় ঘুচ্তে চাইচে না,—সেই জাতের ছোটবড় নিয়ে মারামারি করাটা উন্নতির একটা লক্ষণ,——কারণ নয় রমেশ।
সেটা সকলের আগে না হ’লেই নয়, মনে ক’রে যদি তাকে নিয়েই নাড়াচাড়া কর্তে যাস্, এদিক্-ওদিক্ দু’দিক্ নষ্ট হয়ে যাবে। কথাটা সত্যি কি না, যাচাই কর্তে চাস্, রমেশ, সহরের কাছাকাছি দু’চারখানা গ্রাম ঘুরে এসে, তাদের সঙ্গে তোর এই কুঁয়াপুরকে মিলিয়ে দেখিস্। আপনি টের পাবি।” কলিকাতার অতি নিকটবর্ত্তী একখানা গ্রামের সহিত রমেশের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল।
তাহারই মোটামুটি চেহারাটা সে মনে মনে দেখিয়া লইবার চেষ্টা করিতেই, অকস্মাৎ তাঁহার চোখের উপর হইতে যেন একটা কালো পর্দ্দা উঠিয়া গেল; এবং গভীর সম্ভ্রম ও বিস্ময়ে চুপ করিয়া সে বিশ্বেশ্বরীর মুখের পানে চাহিয়া রহিল। তিনি কিন্তু, সেদিকে কিছুমাত্র লক্ষ্য না করিয়া নিজের পূর্ব্বানুবৃত্তিস্বরূপে ধীরে ধীরে বলিতে লাগিলেন,—“তাই ত তোকে বার বার বলি, বাবা, তুই যেন তোর জন্মভূমি ত্যাগ ক’রে যাস্নে।
তোর মত বাইরে থেকে যারা বড় হ’তে পেরেচে, তারা যদি তোর মতোই গ্রামে ফিরে আস্ত, সমস্ত সম্বন্ধ বিছিন্ন ক’রে চ’লে না যেত, পল্লীগ্রামের এমন দুরবস্থা হ’তে পার্ত না। তারা কখনই গোবিন্দ গাঙুলীকে মাথায় তুলে নিয়ে তোকে দূরে সরিয়ে দিতে পার্ত না।” রমেশের রমার কথা মনে পড়িল। তাই আবার অভিমানের সুরে কহিল,—“দূরে স’রে যেতে আমারও আর দুঃখ নেই জ্যাঠাইমা।” বিশ্বেশ্বরী এই সুরটা লক্ষ্য করিলেন, কিন্তু, হেতু বুঝিলেন না।
কহিলেন,—“না রমেশ, সে কিছুতেই হ’তে পার্বে না! যদি এসেচিস্, যদি কাজ সুরু করেচিস, মাঝ্পথে ছেড়ে দিলে তোর জন্মভূমি তোকে ক্ষমা কর্বে না।” “কেন জ্যাঠাইমা, জন্মভূমি শুধু ত আমার একার নয়?” জ্যাঠাইমা উদ্দীপ্ত হইয়া বলিলেন,—“তোর একার বই কি বাবা, শুধু তোরই মা। দেখ্তে পাস্নে, মা মুখ ফুটে সন্তানের কাছে কোনদিনই কিছু দাবি করেন না। তাই এত লোক থাক্তে কারো কানেই তাঁর কান্না গিয়ে পৌঁছতে পারে নি, কিন্তু তুই, আস্বামাত্রই শুন্তে পেয়েছিলি।
” রমেশ আর তর্ক করিল না। কিছুক্ষণ স্থিরভাবে বসিয়া থাকিয়া, নিঃশব্দে প্রগাঢ় শ্রদ্ধাভরে, বিশ্বেশ্বরীর পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল।ভক্তি, করুণা ও কর্ত্তব্যের একান্ত-নিষ্ঠায় হৃদয় পরিপূর্ণ করিয়া লইয়া রমেশ বাড়ী ফিরিয়া আসিল। তখন সবেমাত্র সূর্য্যোদয় হইয়াছে।
তাহার ঘরের পূর্ব্বদিকে মুক্ত জানালার সম্মুখে দাঁড়াইয়া সে স্তব্ধ আকাশের পানে চাহিয়াছিল, সহসা শিশুকণ্ঠের আহ্বানে সে চমকিয়া মুখ ফিরাইতে দেখিল, রমার ছোটভাই যতীন দ্বারের বাহিরে দাঁড়াইয়া লজ্জায় আরক্তভাবে ডাকিতেছে,—“ছোড়দা’!—” রমেশ কাছে গিয়া হাত ধরিয়া তাহাকে ভিতরে আনিয়া জিজ্ঞাসা করিল,—“কাকে ডাক্চ যতীন্?” “আপনাকে।”“আমাকে? আমাকে ছোড়দা’ বল্তে তোমাকে কে ব’লে দিলে?” “দিদি।”
“দিদি? তিনি কি কিছু বল্তে তোমাকে পাঠিয়েছেন?” যতীন মাথা নাড়িয়া কহিল,—“কিছু না। দিদি বল্লেন, ‘আমাকে সঙ্গে ক’রে তোর ছোড়দা’র বাড়ীতে নিয়ে চল্’—ঐ যে ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন”—বলিয়া সে দরজার দিকে চাহিল। রমেশ বিস্মিত ও ব্যস্ত হইয়া আসিয়া দেখিল, রমা একটা থামের আড়ালে দাঁড়াইয়া আছে। সরিয়া আসিয়া সবিনয়ে কহিল, —“আজ আমার এ কি সৌভাগ্য! কিন্তু আমাকে ডেকে না পাঠিয়ে, নিজে কষ্ট করে এলে কেন? এস, ঘরে এস।
” রমা একবার ইতস্ততঃ করিল, তারপর যতীনের হাত ধরিয়া রমেশের অনুসরণ করিয়া তাহার ঘরের চৌকাঠের কাছে আসিয়া বসিয়া পড়িল। কহিল,—“আজ একটা জিনিষ ভিক্ষে চাইতে আপনার বাড়ীতেই এসেচি,—বলুন, দেবেন?” বলিয়া সে রমেশের মুখের পানে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল।সেই চাহনিতে রমেশের পরিপূর্ণ হৃদয়ের সপ্তস্বরা অকস্মাৎ যেন উন্মাদ-শব্দে বাজিয়া উঠিয়া একেবারে ভাঙ্গিয়া ঝরিয়া পড়িল।
কিছুক্ষণ পূর্ব্বেই তাহার মনের মধ্যে যে সকল সঙ্কল্প, আশা ও আকাঙ্ক্ষা অপরূপ দীপ্তিতে নাচিয়া ফিরিতেছিল, সমস্তই একেবারে নিবিয়া অন্ধকার হইয়া গেল। তথাপি প্রশ্ন করিল,—“কি চাই বল?” তাহার অস্বাভাবিক শুষ্কতা রমার দৃষ্টি এড়াইল না। সে তেমনি মুখের প্রতি চোখ রাখিয়া কহিল,—“আগে কথা দিন।” রমেশ ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়া, মাথা নাড়িয়া কহিল,—“তা’ পারিনে। তোমাকে কিছুমাত্র প্রশ্ন না কোরেই আমার কথা দেবার শক্তি তুমি নিজের হাতেই যে ভেঙে দিয়েছ রমা!”
Read more
