ঢাকা শহরে ঘুঘুর ডাক শোনার কথা না।কেউ কোনোদিন শুনেছে বলেও শুনি নি।ঘুঘু শহর পছন্দ করে না, লোকজন পছন্দ করে না।তাদের পছন্দ গ্রামের শান্ত দুপুর।তারপরেও কী যে হয়েছে—আমি ঘুঘুর ডাক শুনছি।বাংলাবাজার যাচ্ছিলাম, গুলিস্তানে ট্রাফিক জ্যামে পড়লাম।রিকশা, টেম্পো, বাস, ঠেলাগাড়ি সবকিছু মিলিয়ে দেখতে দেখতে জট পাকিয়ে গেলে।এক্কেবারে কঠিন গিট্টু।
হতাশ হয়ে রিকশায় বসে আছি আর ভাবছি—আধুনিক মানুষের একজোড়া পাখা থাকলে ভালো হতো।জটিল ট্রাফিক জ্যামের সময় তারা উড়ে যেতে পারত।ঠিক এই রকম হতাশা-জর্জরিত সময়ে ঘুঘু পাখির ডাক শুনলাম। সেই অতি পরিচিত শান্ত বিলম্বিত টানা-টানা সুর, যা শুনলে মুহূর্তের মধ্যে বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে।মানুষের শরীরের ভেতরে যে আরেকটি শরীর আছে তার মধ্যে কাঁপন ধরে।
আমি হতচকিত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকালাম।এমন কি হতে পারে যে কেউ খাঁচায় করে পাখি নিয়ে যাচ্ছে, সেই পাখি ডেকে উঠল? ইদানিং ঢাকার লোকদের পাখি-পোষা অভ্যাসে ধরেছে।নীলক্ষতে বিরাট পাখি বাজার।ট্রাফিক জট কমছে না।জট কমানোর চেষ্টাও কেউ করছে না।রোগা ধরনের এক ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়িয়ে বাদামওয়ালার সঙ্গে কথাবার্তা বলছে।এখানে যে কঠিন অবস্থা তা সে জানে বলেও মনে হচ্ছে না।এই তো দেখি সে বাদাম কিনছে।এক ঠোঙা বাদাম, একটু ঝাল লবণ।
যতই সময় যাচ্ছে অবস্থা জটিল হয়ে আসছে।সবাই কিন্তু নির্বিকার –‘যা হবার হোক’ এমন এক ভঙ্গি। কারো মধ্যেই কোনো অস্থিরতা নেই। আমার রিকশা ঘেঁসে একটা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে।মাইক্রোবাসের পর্দা টেনে দেয়া।ভেতরের যাত্রীদের কাউকে দেখা যাচ্ছে না।মাইক্রোবাসের ড্রাইভারকে শুধু দেখছি।মনে হলো সে খুব মজা পাচ্ছে।একবার সে উঁচু গলায় বলল, লাগছে গিট্টু।
চড়চড় করে রোদ বাড়ছে। আশ্বিন মাসে খুব ঝাঁজালো রোদ ওঠে।বাতাস থাকে মধুর।আজ বাতাস নেই, শুধুই রোদ।রোদের সঙ্গে ঘামের গন্ধ সঙ্গে পেট্রোলের গন্ধ, পেট্রোলের গন্ধের সঙ্গে ঘুঘুর ডাক ঘু-ঘু-ঘু। মিলছে না একেবারেই মিলছে না।Something is wrong. আমি রিকশাওয়ালাকে বললাম, পাখি ডাকছে নাকি?
আমার রিকশাওয়ালা বিরক্তমুখে আমার দিকে তাকাল।অর্থাৎ ঘুঘু ডাকছে করে আমাকে দেখছেন।ভদ্রমহিলার সিঁথির চুল পাকা।এছাড়া তাঁর মুখে বয়সের কোনো চিহ্ন নেই।চুল পাকা না থাকলে অনায়াসে তাঁকে ৩০/৩২ বছরের তরুণী বলে চালানো যেত।তিনি জানালার পর্দা সরিয়েছেন পানের পিক ফেলার জন্যে।অনেকখানি মাথা বের করে একগাদা পানের পিক ফেলে হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুই হিমু না?
আমি জবাব দিলাম না, কারণ ভদ্রমহিলাকে আমি চিনতে পারছি না।আমার অতি দূরের কোনো আত্মীয় হবেন।মেয়েরা অতি দূরের আত্মীয়কে কাছের মানুষ প্রমাণ করার জন্যে চট করে তুই বলে।কী রে, কথা বলছিস না কেন? তুই কি হিমু?
হ্যাঁ।আমাকে চিনতে পারছিস? না।আমি আলেয়া খালা।এখন চিনেছিস? আলেয়া নামে কাউকে চিনি বলে মনে পড়ল না।একজন আলেয়াকেই চিনতাম, সে সিরাজউদ্দৌলা নাটকের নর্তকী।সিরাজউদ্দৌলা পলাশীর আম্রকাননে তাঁর বিখ্যাত যু্দ্ধ যাত্রার আগে আলোয়ার কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলেন, আলেয়া তখন গান ধরল—‘পথহার পাখি, কেঁদে ফিরে একা’।হিমু,তুই এখানে কী করছিস?
রিকশার উপরে বসে আছি ।সে তো দেখতে পাচ্ছি । যাচ্ছিস কোথায় ? যখন রিকশায় উঠেছিলাম, তখন একটা গন্তব্য ছিল ।এখন নিজেও ভুলে গেছি ।আমার সঙ্গে ফাজলামি করছিস না।আমি তোর খালা না ? আয়, উঠে আয় ।কোথায় উঠে আসবো? বাসে উঠে আয়। গরমে সিদ্ধ হবি না কি? তুই যেখানে যাবি, নামিয়ে দেব।রিকশা ভাড়া মিটিয়ে উঠে আয়।
আমি কথা বাড়ালাম না।রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে মাইক্রোবাসে উঠে পড়লাম।রিকশাওয়ালাকে দেখে মনে হলো, সে অত্যন্ত অপমানিত বোধ করছে।অপমানিত বোধ করারই কথা,তার রিকশাকে ছোট করা হয়েছে।মাইক্রোবাসে ঢুকে মনে হলো—ছোটখাটো একটা চলন্ত বেহেশতে ঢুকে পড়েছি।এয়ারকন্ডিশান্ড গাড়ি, এয়ারকন্ডিশন চালু আছে।শীত-শীত ভাব।
মাইক্রোবাসটার ছাদে একটা অংশ কাচের।ভেতরে বসে আকাশ দেখা যাচ্ছে।ছয়জনের বসার জায়গা। প্রতিটি সিট আলাদা।সিটগুলো ঘূর্ণায়মান।যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে ঘুরানো যায়।ভদ্রমহিলা একা যাচ্ছে না, গাঢ় সানগ্লাসে মুখের পুরোটাই প্রায় ঢাকা। মেয়েটির কোলের উপর একটা বই।সানগ্লাস পরে এর আগে আমি কাউকে পড়তে দেখি নি।ভদ্রমহিলা তাঁর মেয়ের দিকে তাকিয়ে আগ্রহ নিয়ে বললেন, ও খুকি, এ হচ্ছে হিমু।খুব ভালো হাত দেখতে পারে।হাত দেখাবি ?
খুকি কোনোরকম উৎসাহ দেখানো দূরে থাকুক, বই থেকে চোখ পর্যন্ত তুলল না।এটা বড় ধরনের অভদ্রতা।তবে রূপবতীদের সব অভদ্রতা ক্ষমা করা যায়।এরা অভদ্র হবে এটাই স্বাভাবিক। এরা ভদ্র হলে অস্বস্তি লাগে।কী রে খুকি, হাত দেখাবি? বসেই তো আছিস। দেখা না। হিমু চট করে দেখে ফেলবে।খুকি বরফশীতল গলায় বলল, কেন বিরক্ত করছ?
আলেয়া খালা নিজের হাত বাড়িয়ে বললেন, হিমু, আমার হাতটা দেখে দে তো।মনে দিয়ে দেখবি।খুকি চোখ তুলে এক পলকের জন্যে মার মুখ দেখে আবার বই পড়তে শুরু করল।এই এক পলকের দৃষ্টিতেই তার মার ভম্ম হয়ে যাবার কথা।কালো চশমার কারণে হয়তো ভস্ম হলেন না।আমি বললাম, খালা, আমি হাত দেখা ছেড়ে দিয়েছি।সে কী! মিথ্যা বানিয়ে বলতাম।মিথ্যা বলতে বলতে এক সময় নিজের উপর ঘেন্না ধরে গেল।তারপর ঠিক করলাম, আর না, যথেষ্ট হয়েছে।
বাজে কথা রেখে হাতটা দেখ তো।আমি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দুই হাতের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললাম, আপনার সামনে একটা ভয়াবহ দুর্যোগ।পারিবারিক সমস্যা।অসম বিবাহঘটিত সমস্যা।ভদ্রমহিলা তাঁর মেয়ের দিকে তাকালেন।ভদ্রমহিলার চোখের দৃষ্টি বলে দিচ্ছে, এই তো হয়েছে।মেয়ের দিকে তাকানোর অর্থ হচ্ছে, মেয়েকে ইশারায় বলা—কী, বলেছিলাম না ভালো হাত দেখে। দেখলি তো? হাতেনাতে প্রমাণ।আমি বললাম, দুর্যোগ হঠাৎ উপস্থিত হয়েছে।ভদ্রমহিলা বললেন, হঠাৎ মানে কবে?
ধরুন এক মাস।তবে দুর্যোগ আপনারা সামলাতে পারছেন না।আরো জটিল করে ফেলছেন।ভদ্রমহিলা আবারো মেয়ের দিকের তাকালেন।চোখের ইশারায় আবারো বললেন, দেখলি কত বড় পামিস্ট? মেয়েটি হাতের বেই মুড়ে রাখল।চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলে পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল ।আমি নিঃসন্দেহে হলাম,এই মেয়ে, মানুষ না।এ হলো হুর।এদের শুধু বেহেশতেই পাওয়া যায়।এরা বেহেশতের সঙ্গিনী।
And there will companios
With beautiful, big
And lustrous eyes.
এই মেয়েটির চোখ- big, beautiful And lustrous. আমি ভাবলাম, মেয়েটা কিছু বলবে বোধহয়—ভঙ্গিটা সে রকম। সে শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল।আবার কালো চশমা পরল, বই পড়তে শুরু করল।এটা কি বিশেষ কোনো বই যা সানগ্লাস ছাড়া পড়া যায় না? আলেয়া খালা বললেন, এই সমস্যাটা কখন মিটাবে?
মিটবে না।তিনি হাহাকার করে উঠলেন, কী বলছিস তুই! মিটবে না মানে? আমি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললাম, এই সমস্যা মেটার নয়।সমস্যা বাড়তে বাড়তে এক্সপ্লেশান লিমিটে চলে আসবে।এই সমস্যায় একটি বাচ্চা মেয়ে জড়িত।মেয়েটির মৃত্যুযোগ আছে।সে মারা গেলে হয়তোবা সমস্যা মিটে যাবে।
আলেয়া খালা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন।সানগ্লাস পরা বেহেশতের পরী এতক্ষণে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এইসব তথ্য আপনি আমার মার হাতে লেখা দেখতে পেলেন? জি না।আমি বলেছি ইনটুশন থেকে।আমার ইনটুশন প্রবল।যে মেয়েটির কথা বললাম সে বোধহয় আপনার মেয়ে?
খুকি জবাব দিল না।মাইক্রোবাস নড়ে উঠল।জ্যাম কমেছে।গাড়ি চলতে শুরু করেছে।গাড়ির সামনে একটা ঠেলাগাড়ি আছে বলে গাড়িটাকে শম্বুক গতিতে এগুতে হচ্ছে।আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, যাই।ভদ্রমহিলা তখনো নিজেকে সামলাতে পারেন নি।আমি যে চলে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছি তাও বোধহয় বুঝতে পারেন নি।মাইক্রোবাসের স্লাইডিং দরজা খোলার পর তিনি সংবিতে ফিরে পেলেন।তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, না না, তুমি যেতে পারবে না।
এতক্ষণ আমাকে তুই বলছিলেন, শেষ সময়ে তুমি।ততক্ষণে আমি নেমে গেছি।মাইক্রোবাসের জানালার কাচ সরিয়ে ভদ্রমহিলা ব্যাকুল হয়ে ডাকছেন, এই হিমু! এই , এই! এই ছেলে! আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে অভয়দানের হাসি হাসলাম—অর্থাৎ আসব।আবার দেখা হবে।ভদ্রমহিলাকে আমি চিনতে পারছি না।এই সমস্যাটা আমার ইদানীংকালে হচ্ছে।মানুষ না-চেনা রোগ।
মস্তিষ্কের যে অংশে স্মৃতি জমা থাকে সেই অংশে কিছু বোধহয় হয়েছে।স্মৃতির ফাইল গায়েব হয়ে গেছে।এক সময়কার চেনা লোকজনদের সঙ্গে দেখা হয়। যেহেতু ব্রেইন সেলে জমা রাখা তাদের ফাইল গায়েব হয়ে গেছে, সেহেতু তাদের চিনতে পারি না।একজন নিওরোলজিস্টের সঙ্গে দেখা করা দরকার।রোগ আরো বাড়বার আগেই চিকিৎসা দরকার,নয়তো দেখা যাবে কাউকেই চিনতে পারছি না।সবাই অপরিচিত।
অবশ্যি আমার ধারণা, সেই অভিজ্ঞতাও মজার অভিজ্ঞতা হবে।৬০০ কোটি মানুষের বিশাল পৃথিবী, আমি কাউকেই চিনতে পারছি না।মাইক্রোবাস থেকে বেকায়দা জায়গায় নেমেছি।সামনে পেছনে কোনো দিকেই যেতে পারছি না।দুদিকেই গাড়ির স্রোত।পথচারীকে রাস্তা পার হবার সুযোগ করে দেবার জন্যে এদের কোনো মাথাব্যথা নেই।নিজে পৌঁছতে পারলেই হলো। আমাকে অপেক্ষা করতে হবে আরেকটা ট্রাফিক জ্যামের জন্যে।দেখা যাচ্ছে, ট্রাফিক জ্যামেরও একটা ভালো দিক আছে।এই সময়ে রাস্তা পারপার করতে পারা যায়।
To every cloud there is a silver lining.
আমি অপেক্ষা করছি।অপেক্ষা করতে খুব যে খারাপ লাগছে তা না।কারণ তেমন কোনো পরিকল্পনা নিয়ে বের হই নি।যাচ্ছি গেণ্ডারিয়ার দিকে।মোহাম্মদ ইয়াকুব আলি নামের এক ভদ্রলোক জরুরি তলব পাঠিয়েছেন।ভদ্রলোককে আমি চিনি না।তিনিও সম্ভবত আমাকে চেনেন না।তবে শুনেছি হুলস্থুল ধরনের বড় লোক।এমন ব্যবসা নেই যা তাঁর নেই।ইন্ডাস্ট্রি ফিন্ডাস্ট্রি দিয়ে যাকে বলে—‘ছেড়াবেড়া’।
এমন একজন আমাকে জরুরি তলব পাঠাবেন কেন তাও বুঝতে পারছি না।জরুরি তলব পাঠালে ধীরে-সুস্থে যাবার নিয়ম।আমিও তাই করেছি।দু ঘণ্টা দেরি করেছি।আবার ট্রাফিক জ্যাম লেগে গেছে।দুটা রিকশার পেছনের চাকা একটার সঙ্গে আরেকটা লেগে গেছে।দুজন রিকশাওয়ালাই দোষ করা তা নিয়ে তর্ক করছে, চাকা ছাড়াবার চেষ্টা করছে।জনতাও দুই ভাগ হয়ে গেছে।
একদল খালি গা রিকশাওয়ালার পক্ষে অন্যদল দাড়িওয়ালা রিকশাওয়ালার পক্ষে।কাজেই জ্যাম।গাড়ি-টাড়ি বন্ধ করে ড্রাইভাররা সব গালে হাত দিয়ে বসে আছে।আশ্বিন মাসের ঝাঁজালো রোদ ক্রমেই বাড়ছে।ঘুঘু পাখির ডাক আর শুনছি না।আজকের দিনটা রহস্য দিয়ে শুরু হলো।পাখি রহস্য।এ দেশের বিত্তবান সম্প্রদায় বাস করেন গুলশান, বনানী এবং বারিধারায়।
এই প্রচলিত ধারণা ঠিক নয়।পুরনো ঢাকার গলি তস্য-গলি করতে করতে যেখানে এসে দাঁড়ালাম সেখানে দু-তিন বিঘার মতো জায়গা নিয়ে এক দুর্গ দাঁড়িয়ে আছে।চারদিকে জেলখানার মতো উঁচু এবং ভারি দেয়াল।দেয়ালের মাথায় কাঁটাতার।নিরেট লোহার গেট।সেই গেটে অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কি করেও লাভ হলো না।শব্দ ভেতরে যাচ্ছে না বলেই আমার ধারণা।
কিংবা এ-ও হতে পারে যে, এ বাড়ির নিয়ম হচ্ছে ভেতর থেকে লোকজন বেরুতে পারে, বাইরের কেউ ঢুকতে পারে না।ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক।আমি চলে যাবার জন্যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে নেবার পরই ঘটাং ঘটাং শব্দ হতে লাগল।যেন কয়লার ইঞ্জিনের শান্টিং হচ্ছে।তারপরেই ঘরঘর শব্দ।গেট খুলে গেল—সুতার মতো সরু একজন লুঙ্গিপরা, খালি গায়ের লোকের মাথা বের হয়ে এলো।কাহারে চান?
এ রকম দুর্বল স্বাস্থের একজন লোককে দারোয়ানের চাকরি কেন দেয়া হলো তাই ভাবছি।আমি কাকে চাই সেটা বলার এখন তেমন জরুরি বলে মনে হচ্ছে না।তাছাড়া আমি কাউকেই চাই না।এ বাড়ির প্রধান ব্যক্তিটি আমাকে চান।লোকটা কারে চান না বলে কাহারে চান বলছে কেন? আফনে কাহারে চান?
আমি হাসিমুখে বললাম, আমি কাহারেও চাই না।ইয়াকুব আলি সাহেব আমাকে চান।আপনের নাম হিমু? হুঁ।আপনি আসতে দেরি করছেন।আপনের আসার কথা দশটার সময়।চলে যাব?
আহেন,ভিতরে আহেন।আমি ভেতরে ঢুকলাম।সঙ্গে সঙ্গে গেট বন্ধ হয়ে গেল। ঘটঘট শব্দে ভেতর থেকে দুটা তালা মেরে দেয়া হল।তালার চাবি দারোয়ানের কোমরে বাঁধা।মানে হল এই গেট আর খুলবে না। দারোয়ান বলল,ভিতরে চলে যান—বলেই সে খুপরিতে ঢুকে গেল।সেখানে একটা দড়ির ক্যাম্পাখাটে তার বিছানা।সে অতি দ্রুত দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে পড়ল।এত দুর থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না কিন্তু আমি নিশ্চিত সে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আমি বিস্ময় নিয়ে দুর্গ প্রাচীরের ভেতর-বাড়ির দিকে তাকালাম। ইংল্যান্ড হলে এই বাড়িকে অনায়াসে ক্যাসেল বলে চালিয়ে দেয়া যেত। হুলস্থুল ব্যাপার।গ্রিক স্থাপত্যের বড় বড় কলামওয়ালা বাড়ি।টানা বারান্দায় পুরোটাই মার্বেলের।বাড়ির সামনে ফোয়ারা আছে।ফোয়ারায় অবশ্যি পানি ঝরছে না তবে দেখে মনে হচ্ছে সচল ফোয়ারা। সময়ে সময়ে চালু করা হয়।গাড়ি-বারান্দায় চার-পাঁচজন মানুষ।
এঁরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছেন।সবাইকে চিন্তিত মনে হচ্ছে।আমি খানিকটা এগুতেই ঝকঝকে চেহারার এক যুবক আমার দিকে আসতে শুরু করল।আমি থমকে দাঁড়ালাম।যুবকটির চেহারা সুন্দর,হাঁটার ভঙ্গি সুন্দর, হালকা ছাই-রঙা প্যান্টের উপর সে পরেছে আসমানি রঙের হাফ শার্ট।শার্টেও তাকে সুন্দর মানিয়েছে।মনে হচ্ছে অন্য কোনো রঙের শার্ট পরলে তাকে মানাত না।
যার সব সুন্দর তার কথাবার্তা সাধারণত র্ককশ হয়।দেখা গেল, তার কথাবার্তাও সুন্দর।রেডিওতে অডিশন দিলে প্রথম সুযোগেই খবর পাঠের কাজ পেয়ে যেত।আপনি কি হিমু সাহেব? জি।আপনার না দশটার দিকে আসার কথা?গাড়ির জ্যামে আটকা পড়েছিলাম।ও আচ্ছা।আপনি স্যারের কাছে চলে যান।উনি আপনার জন্যে অস্থির হয়েছেন।ব্যাপারটা কী বলুন তো? ভদ্রলোক বিস্মিত হয়ে বললেন, ব্যাপার আপনি জানেন না?
জি না।বলেন কী! আমার ধারণা ছিল জানেন।যাই হোক, স্যারই আপনাকে বলবেন।দয়া করে স্যারের সঙ্গে কোনোরকম তর্ক বা আর্গুমেন্টে যাবেন না। উনি যা বলবেন, তাতেই হুঁ হুঁ বলে মাথা নাড়বেন।Be a yes-man.আসুন আপনাকে দেখিয়ে দি।যাঁরা অপেক্ষা করছেন তাঁরা সবাই তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।বুঝতে পারছি, এখানে আমি একজন গুরুত্বর্পর্ণ ব্যক্তি।শুধু ইয়াকুব আলি সাহেব একা না,এরা সবাই অপেক্ষা করছে আমার জন্যে।
ইয়াকুব আলি সাহেব অসুস্থ—এ খবরও জানা ছিল না।যে ভদ্রলোক আমাকে খবর দিয়েছেন তিনি ইয়াকুব আলি সাহেবের অসুস্থতার খবর আমাকে দেননি।অসুখ তেমন গুরুতর বলেও মনে হচ্ছে না।বিত্তবানরা গুরুত্বর অসুস্থ অবস্থায় দেশে থাকেন না।সিঙ্গাপুর, ব্যাংককে থাকেন।তাঁদের কপালে দেশের মাটিতে মৃত্যু লেখা থাকে না।তাঁদের মৃত্যু অবধারিতভাবে হবে দেশের বাইরে।
হিমু সাহেব! জ্বি।আপনি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে যান।সিঁড়ির সামনের প্রথম ঘরটাই স্যারের।দরজায় নক করলেই নার্স দরজা খুলে দেবে।আরেকটা কথা, কাঠের সিঁড়ি তো, আস্তে পা ফেলবেন।শব্দ হয় না যেন।সিঁড়িতে শব্দ হলে স্যার খুব বিরক্ত হন।
আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললাম, আপনি এক কাজ করুন ভাই।আমাকে বরং কোলে করে দোতলায় দিয়ে আসুন।শব্দটব্দ একেবারেই যেন না হয় সেদিকে আপনি আমার চেয়ে ভালো লক্ষ রাখতে পারবেন।ভদ্রলোক আমার কথায় আহত হলেন কি না বুঝতে পারলাম না। তাঁর মুখভঙ্গিতে কোনোরকম পরিবর্ত এলো না।আগে যেমন ছিল, এখনো সে রকম আছে।আমি তাঁর নির্বিকার ভঙ্গিতে মুগ্ধ হয়ে বললাম, ব্রাদার,আপনার নাম?
আমার নাম মইন।মইন খান।আমাকে ব্রাদার বলবেন না।যান, আপনি দোতলায় যান।শব্দ করেই যান।কাঠের সিঁড়ি হলেও সিঁড়িতে কার্পেট দেয়া।চেষ্টা করেও শব্দ করা গেল না।দরাজায় টোকা দেবার আগেই নার্স দরজা খুলে দিয়ে বলল, আসুন।স্যার জেগেই আছেন।সোজা চলে যান।জুতা খুলে এখানে রেখে যান।আপনার পা দেখি ধুলোভর্তি।এক কাজ করুন, বাথরুমে ঢুকে পা ধুয়ে ফেলুন।শুধু পা ধোব, না ওযু করে ফেলব?
নার্স কঠিন চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছে। এ বোধহয় মইন খানের মতো রসিকতায় স্থির থাকতে পারে না।তবে নার্সের চেহারা সুন্দর।কঠির চোখে তাকালেও তাকে খারাপ লাগছে না।বরং মনে হচ্ছে কঠিন চোখে না তাকালেই তাকে খারাপ লাগত।আমি উৎসাহের সঙ্গে বললাম, সিস্টার, আপনার নাম জানতে পারি? আমার নাম দিয়ে কি আপনার প্রয়োজন আছে? জি আছে।আমি যখন অসুস্থ হব তখন সেবা করার জন্যে আপনাকে রাখব।কল দিলে আসবেন না?
যান, বাথরুমে যান, কার্বলিক সাবান আছে।ভালোমতো হাতমুখ ধোবেন।আমি বাথরুমে ঢুকে পড়লাম।অনেকদিন আগে একটা ছবি দেখেছিলাম।২০০১ স্পেস অডিসি। ছবির একটি দৃশ্যে বিশাল খাটে একজন বুড়ো মানুষ শুয়ে আছেন।বুড়োর চেহারা অনেকটা সম্রাট শাহজাহানের মতো।ঘরটা প্রকাণ্ড।প্রকাণ্ড ঘরের প্রকাণ্ড খাটে একজন রুগ্ন কৃশকায় মানুষ—দৃশ্যটা দেখামাত্র মনে চাপ সৃষ্টি হয়।
ইয়াকুব আলি সাহেবের ঘরে ঢুকে স্পেস অডিসি ছবির কথা মনে পড়ল।ইয়াকুব আলি সাহেব শুয়ে ছিলেন।আমাকে দেখে উঠে বসলেন।হাত ইশারায় কাছে ডাকলেন।তারপর দীর্ঘ সময় দুইজন চুপচাপ।উনি কিছু বলছেন না।আমিও না।আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘরের সাজসজ্জা দেখছি।খাটের পাশে বুক সেলফ।বুক সেলফের বইগুলোর নাম পড়ার চেষ্টা করছি।এত দূর থেকে পড়া যাচ্ছে না।
ন্যাপথেলিন এবং অডিকোলনের মিশ্র গন্ধ নাকে আসছে।মোটেই ভালো লাগছে না।তাছাড়া বুড়ো ইয়াকুব সাহেবের চোখ দুটিতে পাখি পাখি ভাব।মানুষের পাখির মতো চোখ এই প্রথম দেখলাম।হিমু! জ্বি।বোস।বসার জন্যে একটি মাত্র চেয়ার, সেটা ঘরের শেষপ্রান্তে।আমি কি সেখানে বসব না চেয়ার টেনে কাছে নিয়ে আসব তা বুঝতে পারছি না।
চেয়ার টেনে কাছে নিয়ে এসো।শব্দ হয় না যেন।ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ সহ্য হয় না।এমন কি নিঃশ্বাস ফেলার শব্দও না।চেয়ার পর্বতের মতো ভারি, আনতে গিয়ে আমার ঘাম বের হয়ে গেল।এরচে’ মেঝেতে বসে পড়া ভালো ছিল।
হিমু! জি স্যার।তোমার সঙ্গে আমার আগে পরিচয় হয় নি।তবে তোমার কথা অনেক শুনেছি।তুমি নাকি সাধু-সন্যাসী টাইপের মানুষ।তোমার পেশা রাস্তায় ঘোরা।তোমার কিছু সাহায্য আমার দরকার।স্যার বলুন কী করতে পারি।ইয়াকুব আলি সাহেব খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে রইলেন।নার্স ঢুকল।মনে হয় কোনো একটা ওষুধ খাওয়াবার সময় হয়েছে।ইয়াকুব সাহেব চোখ না তুলেই হাতের ইশারায় নার্সকে চলে যেতে বললেন।
হিমু! জি স্যার! আমি কী চাই সেটা বললে তুমি আমাকে পাগল-টাগল ভাবতে পারো।আপনি বলুন।আমি সহজে কাউকে পাগল ভাবি না।তুমি সহজে পাগল ভাবো আর না ভাবো—আমাকে সাবধান হয়েই কথা বলতে হবে।আমি তোমার কাছে কী চাই সেটা বলার আগে তুমি আমার স্ত্রীর কথা শুনে নাও।আমার স্ত্রীর কথা শুনলে আমাকে আর পাগল ভাববে না।বলুন।মন দিয়ে শুনবে।জি স্যার, মন দিয়ে শুনব।
ইয়াকুব আলি সাহেব আমার দিকে ঝুঁকে এলেন।তাঁর চোখের মণি জ্বলজ্বল করছে।মণির সাইজও ছোট।ভদ্রলোকের অসুখটা কী? যক্ষ্মা? যক্ষ্মা রোগীর চোখ জ্বলজ্বল করে বলে শুনেছি।যক্ষ্মা হলে ঘনঘন কাশার কথা।তিনি এখনো কাশছেন না।
আমার প্রথম স্ত্রী বিয়ের দু’বছরের মাথায় মারা যান।পরে আমি আবার বিবাহ করি।আমার প্রথম স্ত্রী গর্ভে সন্তানদি হয় নি।আমার দ্বিতীয় স্ত্রীও প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান।আমি আবারো বিবাহ করি।সেই স্ত্রী জীবিত আছেন।আমার সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না বলে তিনি এখন আলাদা থাকেন।তুমি কি আমার কথা মন দিয়ে শুনছ?
জি স্যার,শুনছি।বলো দেখি, আমার প্রথম স্ত্রী বিয়ের কতদিন পর মারা যান? বিয়ের দু’বছরের মাথায়।বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন।ইয়াকুব আলি সাহেব পাখির মতো চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।তাঁর মুখ হাঁ হয়ে গেছে।বিষ খাওয়ার ব্যাপারটি তিনি বলেন নি।এটা বানিয়ে বললাম।মনে হচ্ছে লেগে গেছে।আমার দু-একটা বানানো কথা খুব লেগে যায়।
ইয়াকুব আলি সাহেব গলা পরিষ্কার করতে করতে বললেন, আমার স্ত্রী আত্মহত্যা করেন এই কথা তোমাকে বলি নি।তোমার জানার কথা না।কোত্থেকে জানলে?অনুমান করে বললাম। আমার অনুমান খুব ভালো।তাই দেখছি।তোমার সম্পর্কে যা শুনেছি তা তাহলে মিথ্যা না।যাই হোক, আমার স্ত্রী কথা বলি—তার নাম জয়নব।সে আমার উপর মিথ্যা সন্দেহ করে আত্মহত্যা করে।
মৃত্যুর পর সে তার ভুল বুঝতে পারে বলে আমার ধারণা।কারণ তারপরই সে নানানভাবে আমাকে নানানভাবে সাহায্য করতে থাকে।আমি বললাম, কীভাবে সাহায্য করেন? বিপদ-আপদে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন কী করতে হবে বা না করতে হবে? হ্যাঁ।ঠিক ধরেছ।ব্যবসার আয়-উন্নতিও তার জন্যেই হয়েছে।তার উপদেশেই আমি ব্যবসা শুরু করি।ব্যাপারটা অন্য ব্যাখ্যাও তো থাকতে পারে…
তুমি কী বলতে চাচ্ছ আমি বুঝতে পারছি।অন্য ব্যাখ্যাও আমি জানি।অন্য ব্যাখ্যা হলো—আমার অবচেতন মন আমাকে সাহায্য করছে।আমার মৃতা স্ত্রী আমার অবচেতন মনের কল্পনা।আপনি এই ব্যাখ্যা বিশ্বাস করেন না? না।
