, চা খাই না। গ্যাস্ট্রিকের প্রবলেম আছে। দুলাভাই খুব সাবধানে শার্টের ভেতরের পকেট থেকে একটা মুখবন্ধ খাম বের করে আমার বালিশের নিচে রেখে দিলেন।
কী রাখলেন ? তেমন কিছু না।
এটা দুলাভাইয়ের আজ নতুন কিছু না। আগেও অনেকবার এরকম হয়েছে। হঠাৎ একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবে হয়তাে মেসে এসেছেন। চুপচাপ বসে থেকেছেন কিছুক্ষণ। যাবার সময় লজ্জিত ভঙ্গিতে একটা পঞ্চাশ টাকার নোেট রেখে দিয়েছেন টেবিলের উপর।
টাকা লাগবে না। টাকা কী জন্যে ?
চা-টা খাও বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে, বেশি কিছু তাে না। সেই সামর্থ্যও নাই। | তিনি এসব কি তার মৃত স্ত্রীর স্মরণে করেন? কী জানি! মানুষের কত রকম বিচিত্র স্বভাব থাকে! সব মানুষই অবশ্যি বিচিত্র একজনের সঙ্গে অন্যজনের কিছুমাত্র মিল নেই। সেজন্যেই কি একজনের মধ্যে অন্যজনের ছায়া দেখলে আমরা এমন চমকে উঠি ? অসংখ্যবার বলি, আজ নিউমার্কেটে একটা ছেলের সঙ্গে দেখা— অবিকল সালামের মতো। ঠিক সেইরকম হাঁটার ভঙ্গি।
দুলাভাই খােলা জানালা দিয়ে দূরে তাকিয়ে আছেন। কবি-সাহিত্যিকরা বােধহয় এভাবে তাকায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখের দৃষ্টি কোমল হয়ে ওঠে। দুলাভাইয়ের যেমন হয়েছে। আমি বললাম, দুলাভাই, আপনার বাচ্চারা ভালাে ?
এই প্রশ্নটি কি আমি তাকে দ্বিতীয়বার করলাম? আমার মনে হতে লাগল একটু আগে এই প্রশ্নটি করা হয়েছে। যখন কথা বলার কিছু থাকে না তখনই আমরা ঘুরেফিরে একই প্রশ্ন করি।
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ
দুলাভাই, আপনি কিছু মনে না করলে একটা সিগারেট খাই।
আরে ছি-ছি, খাও। এই বয়সে মুরুব্বি দেখলে চলে ? খাও। কোনাে অসুবিধা নেই।
সিগারেট ধরাতে আমার সঙ্কোচ হতে লাগল। কাজটা অন্যায়। মনে হতে লাগল কাজটা অন্যায়। সাদাসিধা ধরনের যে মানুষটি আমার সামনে বসে আছে তাকে আরাে খানিকটা সম্মান আমার করা উচিত।
আশ্চর্য, এই দীর্ঘদিনে একবারও কেন তাঁর খোঁজখবর করি নি ? কেন একদিনও তাঁর বাসায় উপস্থিত হয়ে বলি নি, আপনাকে দেখতে এলাম দুলাভাই। ভালাে আছেন তাে ? | কেমন করে দুলাভাই তাঁর নতুন সংসার সাজিয়েছেন ? হঠাৎ বড় দেখতে ইচ্ছে করল। দুলাভাই বললেন, যাই, কেমন ? বৃষ্টি কমেছে।
আমি মৃদু স্বরে বললাম, যদি অসুখ সারে তা হলে প্রথমেই যাব আপনার বাসায়। দুলাভাই হাসলেন। হয়তাে আমার কথা বিশ্বাস করলেন না। বিশ্বা: না করারই কথা। কেউ কথা রাখে না, আমিও নিশ্চয়ই রাখব না। তবু তার তাতে মন খারাপ হবে না। আবারও কোনােদিন আমাকে দেখতে আসবেন। সঙ্কুচিতভাবে একটা ময়লা পঞ্চাশ টাকার নােট আমার বালিশের নিচে রেখে দেবেন।
দুলাভাই চলে যাবার পর দীর্ঘ সময় আমার মন–খারাপ থাকল। কেন বলতে পারি না। অত্যন্ত সাধারণ কিছু মানুষ আছে যারা অন্যদের উপর অসাধারণ প্রভাব ফেলে। খুবই ক্ষণস্থায়ী প্রভাব, তবু তার ক্ষমতা অস্বীকার করার কোনাে উপায় নেই।
মনসুর এসে উপস্থিত হলে সন্ধ্যাবেলা । ভিজিটিং আওয়ার শেষ হবার মিনিট পাঁচেক বাকি। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ঝড়–বৃষ্টির মধ্যে আসবার দরকারটা কী ছিল ? ১)
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ
আসতাম না। রীনা বুললু, ঠাণ্ডার মধ্যে চা-টা খেতে ইচ্ছা হবে। ফ্লাস্কটা দিয়ে এসাে। চা দিয়েছে ফ্লাস্কে করে।
ফ্লাস্ক তাে আমার একটা আছে। রহমান দিয়ে গেল না ? সারছে। আমি আবার একটা কিনলাম।
মনসুর চা ঢালল। পাশের ভদ্রলােককে চা সাধল। তিনি শীতল কণ্ঠে বললেন, চা খাব না।
দোকানের চা না, ঘরের চা। খান এক কাপ। ঠাণ্ডার মধ্যে ভালাে লাগবে। তেজপাতা দেয়া আছে।
থ্যাংক য়ু, আমি চা খাব না। আপনার অসুখটা কী ? অসুখ নিয়ে আমি কারো সঙ্গে ডিসকাস করি না। কিছু মনে করবেন না।
না, ঠিক আছে। মনসুর থাকল সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। সে কথা না বলে এক সেকেন্ডও থাকতে পারে না। সাতটা পর্যন্ত সে ক্রমাগত কথা বলে আমার মাথা ধরিয়ে দিল। আমি বললাম, এখন বাড়ি যা মনসুর।।
এত সকাল-সকাল বাড়ি গিয়ে করব কী ? বউয়ের সঙ্গে গল্প করবি। দেখি, যাব। আরেকটু বসি। এমন করছিস কেন ? ভিজিটিং আওয়ার শেষ হয়ে গেছে, এখন যা।
মনসুর তবু বসেই রইল। সম্ভবত তার যেতে ইচ্ছে করছে না। তার স্বভাবই এরকম, কোথাও গেলে কিছুতেই উঠতে চাইবে না। বিয়ের পরও সে স্বভাবের তেমন পরিবর্তন হয় নি।
ফরিদ, উঠি? কাল রীনাকে নিয়ে আসব। আসতে হবে না। হবে না কেন? আজই আসতে চেয়েছিল। বৃষ্টির জন্যে আনি নি।
প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ
আমি মনসুরকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে গেলাম। এই অল্প সময়ের মধ্যেই সে তার শ্বশুরবাড়ির প্রসঙ্গ নিয়ে এলাে। তার এক মামাশ্বশুর নাকি তাকে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেছেন তার ফ্রিজ আছে কি-না। এই কথা ক’টি সে বলল নিচু গলায়। এমন কী রহস্যময় কথা যে ফিসফিস্ করে বলতে হবে ? মনসুর বলল, এটা কেন জিজ্ঞেস করল বুঝতে পারছিস ?
একটা ফ্রিজ কিনে দেবে আরকি। বলিস কী! (২) আরে, ওদের কি আর অভাব আছে ?
সুখী মানুষের মতাে হাসিমুখে নিচে নামতে লাগল মনসুর। তার মনে কি কোনাে দুঃখ নেই ? সে কি সত্যি সত্যি একজন পরিতৃপ্ত সুখী মানুষ।
আমি মনসুরকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ঘরে এসে দেখি একজন বুড়াে ভদ্রলােক এসেছেন আমাদের ঘরে। আমার রুমমেটের বাবা। অবিকল একরকম চেহারা! বাবা ও ছেলের মধ্যে এমন মিল সচরাচর দেখা যায় না। তাঁরা কথা বলছেন নিচু স্বরে। আমি বুড়াে ভদ্রলােককে সালাম-টালাম কিছু দিতাম। কিন্তু তিনি একবারও ভালাে করে তাকালেন না আমার দিকে।
আমি বারান্দায় একটা চেয়ার টেনে বসে রইলাম। একজন প্রফেসর সাহেব সম্ভবত রাউন্ড দিতে বের হয়েছেন। তার সঙ্গে তিনজন ছাত্র, একজন নার্স!
প্রফেসর সাহেবকে খুব মেজাজি মনে হলাে। যাকে দেখছেন তাকেই ধমকাচ্ছেন। আমার সামনে এসে থমকে দাঁড়ালেন।।
আপনি কি রােগী ? জি।। বাইরে বসে আছেন কেন? এমনি বসে আছি। যান, ঘরে যান।
ঘরে গিয়ে ঢুকলাম। প্রফেসর সাহেব বুড়াে দ্রলােকের দিকে আগুন-চোখে তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না। বুড়াে দ্রলােক নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলেন। আমাকে বললেন, আপনার ওপেনিংয়ের ডেট দিয়েছে ?
আমি তার কথা বুঝতে পারলাম না। অপারেশনের ডেট হয়েছে কি-না ? জি-না। প্রিলিমিনারি টেস্ট ?
Read more