প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৩)

মনসুর চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ফাইন চা। 

 চা তেমন কিছু ফাইন নয়। কিন্তু মনসুর আজ সবকিছুতেই ফাইন বলবে। আলগী একটা ফুর্তির ভাব মুখের উপর ঝুলিয়ে রাখবে। খুব সম্ভব ওর ধারণা হয়েছে, হাসপাতাল থেকে আমি আর ফিরব না। ডাক্তাররা ওকে কিছু হয়তাে বলেছে।প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

মনসুর আবার বলল, ফাসক্লাস চা হয়েছে রে। আরেক কাপ খাবি ? না।

আমি সিগারেট ধরালাম। অন্য সময় হলে মনসুর ছোঁ মেরে সিগারেট নিয়ে ফেলে দিত। আজ কিছুই করল না। এসব ভালাে লক্ষণ নয়। তা হলে কি ফেরার লক্ষণ একেবারেই নেই ? ওয়ান ওয়ে জার্নি ? 

পিজি-র যে ডাক্তার আমার অপারেশন করবেন, তার কথাবার্তায় অবশ্যি -েরকম মনে হয় না। আমার ধারণা ছিল, বুড়াে হলে প্রফেসর হওয়া যায় 

কিন্তু এ ভদ্রলােকের বয়স মনে হয় চল্লিশও হয় নি। কানের কাছের কয়েকটি চুল শুধু পাকা । চমৎকার চেহারা । দেখে মনে হয় এই লােকটি রাগ করতে জানে না। চেঁচিয়ে কথা বলতে জানেমিথ্যা কথা বলতে পারে না। এ শুধু সবার সঙ্গে মজার মজার গল্প করে এবং ছুটিছাটা পেলেই ছেলেমেয়েদের হাত ধরে পার্কে-টার্কে বেড়াতে যায়, বাদাম কেনে, কিন্তু বাদামের খােসাগুলাে যেখানে সেখানে ফেলে না, আধ মাইল হেঁটে ডাস্টবিনে ফেলে আসে। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

ভদ্রলােক কথাবার্তায়ও খুব চমক্কার। শুরু করলেন এইভাবে— তারপর ফরিদ সাহেব, পেট কাটবার জন্যে তৈরি তাে? হুঁ, চর্বি-টর্বি বিশেষ নেই। আরাম করে চামড়া কাটা যাবে। সার্জন হয়ে কী মুসিবত হয়েছে জানেন ? কাউকে দেখলেই কেটে ফেলতে ইচ্ছা করে। হা-হা-হা ।। 

ডাক্তারদের নিয়ে একটা ভালাে রসিকতাও করলেন। এক রােগীর অপারেশন হবে। তাকে অপারেশন টেবিলে শােয়ানাে হয়েছে। সে কাঁপা গলায় সার্জনকে বলল, স্যার, এটা আমার প্রথম অপারেশন। বড় ভয় লাগছে। সার্জন ভদ্রলােক তখন নার্ভাস গলায় বললেন, আমারও প্রথম অপারেশন। আমারও ভয় লাগছে 

ভাই। রােগীকে এনেসথেশিয়া করা হচ্ছে। জ্ঞান হারাবার আগ মুহূর্তে রােগী শুনল, সার্জন সাহেব একমনে দোয়া ইউনুস পড়ছেন। 

গল্প শেষ করে তিনি শব্দ করে হাসলেন। বড় ডাক্তাররা এত শব্দ করে হাসে এবং গল্পগুজবও করে না। বােধহয় ইনি বড় ডাক্তার নন। আমি বললাম, আশা করি আমার পেট কাটার আগেও আপনি কিছু কাটাকাটি করেছেন ? ডাক্তার সাহেব আবার ঘর কাঁপিয়ে হাসলেন এবং তাঁর জীবনের প্রথম অপারেশনের গল্প করতে লাগলেন। বেশ জমাট গল্প । ইনি আমার সঙ্গেই এমন গল্পগুজব করলেন, না সবার সঙ্গেই করেন ? শুধু আমার সঙ্গে করে থাকলে তার অর্থ অন্যরকম হয়। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

মনসুর উঠে দাঁড়াল। সহজ স্বরে বলল, অফিসের সময় হয়ে গেল, যাই । বিকেলে আসব। 

চল, এগিয়ে দিয়ে আসি। এগিয়ে দিতে হবে না। শুয়ে থাক্। ঘুম দে। সসামবার থেকে শুয়েই থাকব, এখন একটু হাঁটাহাঁটি করি। 

আমি মনসুরকে রাস্তার মােড় পর্যন্ত এগিয়ে দিলাম। চেনা পানের দোকান থেকে দশটা ফাইভ ফাইভ কিনলাম। মনসুর দেখল। কিছুই বলল না। ভালাে লক্ষণ নয়। তার নিষেধ করা উচিত ছিল। | বিকেলে ঘরে থাকিস, আমি আসব। 

কাজ থাকলে আসার দরকার নেই 

 কাজ কিছু না। আর শোন রাতে আমার এখানে খাবি। আমি বৌকে বলে এসেছি। ঠিক আছে। সিগট খাবি নাকি একটা ? মনসুর একটা সিগারেট ধরিয়ে চিন্তিত মুখে টানতে লাগল। আমার মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। মানুষের উপর আমার মায়া পড়ে । কিন্তু জড়বস্তুর উপর সহজেই মায়া পড়ে যায় । আমার সবসময় মনে হয়, জড়বস্তুরও যেন একটা আলাদা জীবন আছে। এবং তারাও যেন মানুষের মতাে ভালােবাসতে পারে। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষায় অ্যালাউ হবার জন্য ছােট মামা আমাকে একটা রাইটার কলম কিনে দিয়েছিলেন। রােজ এটাকে বালিশের নিচে নিয়ে ঘুমাতাম এবং ঘুমাবার আগে তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলতাম, যেমন- কী ভাই, ঘুম পেয়েছে ? আচ্ছা ঠিক আছে, ঘুমাও। ব্যাপারটা প্রকাশ হয়ে পড়ে এবং বাবা আমাকে প্রচণ্ড চড় দিয়ে মেঝেতে উল্টে ফেলে দেন। সেই সঙ্গে হুঙ্কার দিতে  থাকেন, মানুষের সাথে কথা নাই, কলমের সঙ্গে কথা । পাগল-ছাগলের ঝাড়। পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে ফেলব, আর যদি কোনােদিন শুনি। 

এই ঘরটির উপর আমার মায়া পড়ে গেছে, দীর্ঘদিন থাকলাম এখানে। প্রায় দু বছর। বত্রিশ বছর যদি আয়ু হয়, তা হলে জীবনের ষােলভাগের একভাগ। বড় দীর্ঘ পরিচয়। দশ ফুট বাই আট ফুট এই কামরায় আর কি কোনােদিন ফিরে আসব ? কত পরিচিত জিনিস চারিদিকে! কত কিছুই-না আছে! লেজ নেই একটি বুড়াে টিকটিকি। এর কোনাে সঙ্গী বা সঙ্গিনী নেই, এর পাশে অন্য কোনাে টিকটিকি কোনােদিন দেখি নি। আরাে দুটি আছে, তারা প্রেমিক-প্রেমিকার মতাে 

একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। এই বুড়ােটির সাথীরা একে ছেড়ে গেছে। 

বাথরুমে কুৎসিত একটা মাকড়সা আছে। সে শুধু কুৎসিত নয় ভয়াবহ। তার পেটে চকচকে রূপালি একটা ডিমের থলি। এই থলি নিয়ে বেশির ভাগ সময়ই বেসিনের নিচে কোনাে-এক অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকে। রাতদুপুরে হঠাৎ করে বেরিয়ে এসে আমাকে দারুণ চমকে দেয়। 

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ

আমার এ ঘরে একটি মাত্র জানালা। বেশ বড়সড় জানালা। তবে তেমন কিছু জানালা দিয়ে দেখা যায় না। শুধু পাশের ফ্লাটের অনেকখানি চোখে পড়ে। একটি বালিকাকে প্রায়ই দেখি বারান্দায় বসে আচার খাচ্ছে কিংবা পা ছড়িয়ে বই পড়ছে। সুন্দর দৃশ্য। এই মেয়েটির উপরও মায়া পড়ে গেছে। সােমবারের পর এই চমৎকার দৃশ্যটিও হয়তাে আর দেখা যাবে না । 

জীবনের ষােলভাগের একভাগ যেখানে কাটল তার উপর মায়া তাে পড়বেই। পড়াই স্বাভাবিক। টাঙ্গাইলের এক হােটেলে একবার সাত দিন ছিলাম। এমন মায়া পড়ে গেল! ছেড়ে চলে আসবার সময় বুক হু-হু করতে লাগল। চোখ ভিজে ওঠার উপক্রম। ৩১ | আমি পায়ের কাছ থেকে কথাটা টেনে নিলাম। একটু যেন শীত-শীত করছে। তলপেটে ব্যথা শুরু হয়েছে। সূক্ষ্ম একটা ব্যথা। মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিচ্ছে– আমি আছি। তােমার ভিতরে বাস করছি। আমাকে ভুলে যাওয়া ঠিক না। 

বাইরের রােদ নরম হয়ে আসছে। মেঘ জমতে শুরু করেছে। বর্ষা আসি আসি করছে। এবার খুব জাঁকিয়ে বর্ষা আসবে। তার সাজসজ্জা টের পাওয়া যাচ্ছে। আমার ঘর থেকে আকাশ দেখা যায় না। কেন যেন মেঘ দেখতে ইচ্ছা করছে। আমি উঠে জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলাম। আচার-খাওয়া সেই বালিকাটি রেলিং-এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কৈশােরে এরকম একটা মেয়ের সঙ্গে 

আমার পরিচয় ছিল। মেয়েটির নাম নীলিমা। তার বাবা নেত্রকোনা কোর্টের পেশকার ছিলেন। 

সেই নীলিমাও খুব আচার খেত। ক্লাস নাইনে ওঠামাত্র নীলিমার বিয়ে হয়ে গেল। আমি তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্য রাত জেগে পড়ছি। বাবা রােজ একবার করে বলছেন— ডিভিশন না পেলে জুতাে দিয়ে পিটিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেব।  নীলিমার বিয়ে আমাকে অভিভূত করে দিল। বেঁচে থাকা অর্থহীন মনে হলাে। রাতে বালিশে মুখ গুঁজে ভেউভেউ করে কাঁদলাম। বড় আপা অবাক হয়ে বললেন, এই তাের কী হয়েছে রে? 

পেট ব্যথা। কোন জায়গায় ব্যথা, দেখি ? 

আমি আরাে শব্দ করে কাদতে লাগলাম।

 

Read more

প্রথম প্রহর-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *