ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১)

শহীদুল্লাহ হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

ঘরের দরজা এবং জানালার রঙ গাঢ় বেগুনী।

ফিহা সমীকরণ

বেগুনী রঙ তাকে কখনাে আকর্ষণ করে না। তার ধারণা শুধু তাকে না এই রঙ কাউকেই আকর্ষণ করে না। নয়ম করা হয়েছে সব রেস্টুরেন্টের রঙ হবে বেগুনী। দরজা জানালা বেগুনী, পর্দা বেগুনী, এমন কি মেঝেতে যে কৃত্রিম মার্বেল। বসানাে থাকবে তার রঙও হবে বেগুনী। রঙের গাঢ়ত্ব থেকে বােঝা যাবে কোথায় কি খাবার পাওয়া যায়। খুব হালকা বেগুনীর মানে এখানে পানীয় ছাড়া কিছুই পাওয়া। যাবে না। 

তিনি যে ঘরের সামনে দাড়িয়ে আছেন সে ঘরের রঙ হালকা বেগুনী। তার প্রয়ােজন গরম কফির। সিনথেটিক কফি নয়, আসল কফি। সব রেস্টুরেন্টে আসল কফি পাওয়া যায় না। এখানে কি পাওয়া যাবে? আসল কফি খাবার মানুষ নেই বললেই হয়। এত টাকা দিয়ে কে যাবে আসল কফি খেতে? তাছাড়া এমন না যে কৃত্রিম কফির স্বাদ আসলের মত নয়। খুব কম মানুষই প্রভেদ ধরতে পারে। সব রেস্টুরেন্টে আসল কফি রাখে না এই কারণেই। 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি রেস্টুরেন্টে ঢুকবেন কি ঢুকবেন না তা নিয়ে একটু দ্বিধার মধ্যে পড়লেন। বেশি লােকজন হয় এমন জায়গাগুলি তিনি এড়িয়ে চলেন। লােকজন তাকে চিনে ফেলে। তারা অস্বস্তি বােধ করতে থাকে, তিনিও অস্বস্তি বােধ করেন। আজকের এই রেস্টুরেন্টে তিনি যদি ঢুকেন তাহলে কি হবে তা তিনি আন্দাজ করতে পারেন। তিনি ঢােকামাত্র লােকজনের কথাবার্তা বন্ধ হয়ে যাবে। শতকরা দশ ভাগ লােক এক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকবে। শতকরা বিশ ভাগ লােক আড়চোখে তাকাবে।

বাকিরা এমন এক ভঙ্গি করবে যেন তারা তাকে দেখতে পায়নি। কফির দাম দেবার সময় রেস্টুরেন্টের মালিক বিনয়ে গলে গিয়ে বলবে, আপনি যে এসেছেন এই আমাদের পরম সৌভাগ্য। আমাদের কফি কেমন লাগল তা যদি একটু লিখে দেন বড় আনন্দিত হই। কফি কুৎসিত হলেও তাকে লিখতে হবে – “আপনাদের কফি পান করে তৃপ্তি পেয়েছি।” পরেরবার যদি এই রেস্টুরেন্টে আসেন তাহলে দেখবেন, 

তার লেখা এরা ফ্রেম করে বাধিয়ে রেখেছে। হাস্যকর সব ব্যাপার। দীর্ঘদিন এইসব হাস্যকর ব্যাপার তাকে সহ্য করতে হয়েছে। মানুষ দেবতা বিশ্বাস করে না কিন্তু মানুষের ভেতর থেকে দেবতা খুঁজে বের করতে পছন্দ করে। 

তিনি দরজা ঠেলে ভেতরে পা দিলেন। 

মুহূর্তের মধ্যে রেস্টুরেন্টের স্বাভাবিক গুঞ্জন অনেক নিচে নেমে গেল। সব কটা টেবিলেই লোকজন আছে। কোণার দিকের একটি টেবিল খালি করে দু’জন চলে। গেল পাশের টেবিলে। অর্থাৎ খালি করা এই টেবিলে তাকে বসতে হবে। কফি খেতে হবে একা একা। তিনি এগিয়ে গেলেন খালি টেবিলের দিকে। চেয়ারে বসার আগেই বড় পটে এক পট কফি তঁার সামনে রাখা হল। তিনি কফি খাবার জন্যে মাঝে মাঝে রেস্টুরেন্টে ঢুকেন এই তথ্য সবারই জানা। 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ

রেস্টুরেন্টের মালিক নিজেই চলে এসেছে। বিনয়ে মাথা এমন নিচু করেছে যে থুতনি লেগে গেছে বুকের সঙ্গে। 

‘খুঁটি কফি স্যার। ভূমধ্যসাগর অঞ্চলের কফি। ‘ধন্যবাদ। 

‘কফি কেমন লাগল যদি লিখে দেন বড়ই আনন্দিত হব। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আপনি 

‘দীর্ঘ বক্তৃতার প্রয়ােজন নেই। কফি কেমন লাগল আমি লিখে দেব। ‘আপনার একটা ছবি তুলে রাখার অনুমতি কি স্যার পাব?” ‘না। আমি ছবি তুলতে দেই না। 

তিনি কফিতে চুমুক দিচ্ছেন। কারাে দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারছেন। শতকরা দশজন লােক তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কেউ কেউ চোখের পলকও ফেলছে না। এভাবে তাকিয়ে থাকার কি মনে হয়? এমন তাে না যে সেকেণ্ডে সেকেণ্ডে তার চেহারা বদলাচ্ছে। তিনি গিরগিটি নন, মানুষ। যে গিরগিটি মুহূর্তে মুহূর্তে রঙ বদলায় তার দিকেও মানুষ এভাবে তাকায় না। তিনি ওভারকোটের পকেট থেকে পত্রিকা বের করলেন। নিজেকে যথাসম্ভব আড়াল করে ফেলার একটা চেষ্টা। তাকে খবরের কাগজ সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হয় শুধুমাত্র এই কারণেই। 

‘স্যার, আমি কি আপনার টেবিলে বসতে পারি ? 

তিনি খবরের কাগজ চোখের সামনে থেকে নামালেন। বাইশ তেইশ বছরের একজন তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একগাদা বই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হবে। 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অথচ তাকে চিনতে পারছে না। আশ্চর্য! তিনি অসম্ভব বিরক্ত হলেন। এই এক মজার ব্যাপার! লােকজন তাঁকে চিনতে পারলে তিনি বিরক্ত হন। চিনতে না পারলেও বিরক্ত হন। 

‘স্যার, আমি কি বসব?’ ‘হ্যা, বসতে পার। 

মেয়েটা পরবর্তি বেশ কিছু কাজ করল আনাড়ির মত। চেয়ারটা টানল শব্দ করে। ধপ করে বসল। কিশােরীর কৌতূহল নিয়ে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিকে দেখতে লাগল। 

‘স্যার, ওয়েটার এসে কি অর্ডার নিয়ে যাবে? না আমাকে খাবার আনতে যেতে হবে? এটা কি সেলফ সার্ভিস ? 

 তিনি খবরের কাগজ ভাজ করে পকেটে রাখলেন। তাঁর গলার স্বর এরিনেই বৃক্ষ। সেই রূক্ষ স্বর আরাে খানিকটা কর্কশ করে বললেন, কোন রেস্টুরেন্ট সেলফ সার্ভিস কি-না, তারা কি ধরনের খাবার দেবে তা রঙ দেখেই বােঝা যায়। তুমি বুঝতে পারছ না কেন? | ‘আমি কালার ব্লাইন্ড। বেগুনী এবং গােলাপী এই দুটি রঙ আমি দেখতে পাই 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ

 ‘ও আচ্ছা। এটা সেলফ সার্ভিস রেস্টুরেন্ট। তােমাকে গিয়ে খাবার আনতে 

হবে। | মেয়েটি উঠে চলে গেল। টেবিলের উপর সে কয়েকটি বই রেখে গেছে। সবচে’ উপরে রাখা বইটার নাম পড়ে তার ভুরু কুঁচকে গেল – ‘অতিপ্রাকৃত গল্পগুচ্ছ’, লেখকের নাম আরফব। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী, সে পড়ছে অতিপ্রাকৃত গল্প, এর কোন মানে হয় ? লজিকশূন্য একটি বিষয়ে মানুষের আগ্রহ হয় কি করে কে জানে ! তিনি মনে করেন যারা এ সমস্ত বই লেখে তারা যেমন অসুস্থ আবার যারা পড়ে তারাও অসুস্থ। 

মেয়েটি ফিরে আসছে। মুখ শুকনাে। খানিকটা বিব্রত। সঙ্গে কোন খাবারের ট্রে নেই। মেয়েটি চেয়ারে বসতে বসতে বলল, এখানে জিনিসপত্রের দাম খুব বেশি। সামান্য কফির দাম চাচ্ছে একুশ লী। 

‘তােমার কাছে কি একুশলী নেই ? 

‘আছে। কিন্তু সামান্য কফির জন্যে এতগুলি লী খরচ করব কি-না তাই ভাবছি। 

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, এই যে ভাবনাটা তুমি ভাবছ তার মানে তুমি লজিক ব্যবহার করছ। যে মেয়ে লজিক ব্যবহার করে সে কিভাবে অতিপ্রাকৃত গল্পগুচ্ছ পড়ে তা আমি বুঝতে পারছি না। 

‘এই গল্পগুলির মধ্যেও এক ধরনের লজিক আছে। আপনি যেহেতু কোনদিন এ জাতীয় গল্প পড়েননি আপনি বুঝতে পারছেন না। স্যার, আপনি এই বইটা নিয়ে যান, পড়ে দেখুন। 

এ জাতীয় বই আমি আগে পড়িনি তা তুমি কি করে বললে ?” ‘আপনি হচ্ছেন মহামতি ফিহা।

 

Read More

ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *