ফিহা কমুনিকেটরের সুইচ বন্ধ করে দিলেন। তিনি অনির্দিষ্ট ভঙ্গিতে এগুচ্ছেন। পা ফেলছেন অতি দ্রুত। তবে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন না। বাড়ি ফিরতে কেন জানি ইচ্ছা করছে না। তাঁর মাথায় সিনথেটিক ফারের টুপি, টুপিতে চেহারা ঢাকা পড়েছে।
অন্তত তাঁর তাই ধারণা। কফির প্যাকেটটা ফেলে দিতে হবে। কোন ডাস্টবিন পাচ্ছেন না। এই জিনিস ডাস্টবিন ছাড়া কোথাও ফেলা যাবে না। ফিহা কফির প্যাকেটটা ছুঁড়ে ফেললেন। তাঁর লক্ষ্য ভালই। প্যাকেটটা ডাস্টবিনে পড়ল।
ফিহা আকাশের দিকে তাকালেন।
সূর্য দেখা যাচ্ছে না। মেঘে ঢাকা পড়েছে। আকাশের দিকে তাকানাে যাচ্ছে। প্রাচীন মানুষ সূর্যকে পূজা করত। চন্দ্রকে পূজা করত। গ্রহ-নক্ষত্রকেও পূজা দেয় হত। আকাশকে করত না কেন? পূজা পাওয়ার যােগ্যতা আকাশের চেয়ে বেশি আর কার আছে? ঈশ্বরকে সীমার ভেতর কল্পনা করা অনুচিত। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ নক্ষত্র সবই সীমায় আবদ্ধ। একমাত্র আকাশই সীমাহীন।
‘স্যার! ফিহা চমকে তাকালেন।
দীর্ঘদেহী সবুজ পােশাক পরা যুবকটি বলল, আপনাকে কি সাহায্য করতে পারি ?
‘আমাকে একমাত্র আমিই সাহায্য করি। অন্য কেউ আমাকে সাহায্য করতে পারে না। আপনি কে?
‘আমি স্যার টহল পুলিশ।
ও আচ্ছা, টহল পুলিশ। আপনার গায়ের সবুজ পােশাক দেখেই আমার অনুমান করা উচিত ছিল।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘আপনি কি কোন ঠিকানা খুঁজে বেড়াচ্ছেন?
‘আমি আকাশের দিকে তাকিয়েছিলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে কি কেউ ঠিকানা খুঁজে ?
‘আপনি আকাশের দিকে তাকিয়েছেন কিছুক্ষণ আগে। আমি অনেকক্ষণ ধরেই আপনাকে অনুসরণ করছি। লক্ষ্য করছি আপনি রাস্তার নাম্বার পড়তে পড়তে এগুচ্ছেন।
‘অনেকক্ষণ ধরেই আমাকে অনুসরণ করছেন কেন?”
‘আমাদের উপর নির্দেশ আছে যে কেউ উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হাঁটলেই তাকে অনুসরণ করতে হবে। আপনাকেও সেই কারণে অনুসরণ করছি। আপনি যে
মহামতি ফিহা তা মাত্র কিছুক্ষণ আগে বুঝতে পেরেছি।
‘অটোগ্রাফ চাইলে অটোগ্রাফ নিতে পারেন। ‘স্যার, আপনি কি আমার উপর বিরক্ত হয়েছেন? ‘না, বিরক্ত হইনি। ‘আমার সঙ্গে গাড়ি আছে, আপনি যেখানে যেতে চান নিয়ে যাব।
এই মুহূর্তে আমার ইচ্ছা করছে আকাশের দিকে যেতে, আপনার গাড়িতে চড়ে সেই ইচ্ছা মেটানাে সম্ভব নয়। আমরা এখন আছি কোথায় ?
‘আপনি স্যার শহরের শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন। আর মাত্র দু’শ গজ গেলেই নিষিদ্ধ এলাকায় চলে যাবেন।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘মেন্টালিস্টদের এলাকা ?” ‘জি স্যার। ‘মেন্টালিস্টদের এলাকা কতটুকু? ‘আমার পক্ষে বলা সম্ভব নয় স্যার। ঐ এলাকা আমার জন্যেও নিষিদ্ধ। ‘কতজন মেন্টালিস্ট এ শহরে আছে তা জানেন ?
‘তাও জানি না। তাদের সংখ্যা কখনাে প্রকাশ করা হয় না। তবে এ শহরে সাধারণ মানুষ এই মুহূর্তে আছে নব্দুই হাজার সাতশ
‘গত বৎসরেও জনসংখ্যা ছিল এক লাখ কুড়ি হাজারের মত। কমে গেল কেন? ‘আমার জানা নেই স্যার। ‘আপনার সঙ্গে আমার যে কথাবার্তা হচ্ছে তা মেন্টালিস্টরা বুঝতে পারছে ?” ‘পারছে স্যার। পুলিশের উপর এদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ আছে।
‘মেন্টালিস্টদের আবাসিক এলাকা কি একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ না সারা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে?”
‘এরা বাস করে ভূগর্ভস্থ শহরে। সেই শহর কত বড়, কতটুকু ছড়ানাে তা আমরা জানি না স্যার। আগে কেউ কেউ বাইরে থাকত, এখন নেই বললেই চলে।
‘আপনার নাম কি? ‘এরিন।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘এরিন, আপনি কি কখনাে ভেবেছেন যে আমরা মানুষ হিসেবে দুটা ভাগে ভাগ হয়ে গেছি? একদল থাকছে মাটির উপরে, একদল চলে গিয়েছে মাটির নিচে।
‘এইসব নিয়ে আমি ভাবি না স্যার? “কেউই ভাবে না। কেন ভাবে না বলুন তাে?”
‘জানি না স্যার।
ফিহা ক্লান্ত গলায় বললেন, আমাদের ভাবতে দেয়া হয় না। আমাদের ভাবনা, আমাদের কল্পনা নিয়ন্ত্রিত। আমরা কি ভাবব মেন্টালিস্টরা তা ঠিক করে দেয়। যখন তারা সিদ্ধান্ত নেয় আমাদের সুখী হওয়া উচিত, আমরা সুখী হই। যখন ভাবে আমাদের অসুখী হওয়া উচিত, আমরা অসুখী হই।
‘কিছু মনে করবেন না স্যার, আপনি কিন্তু স্বাধীন ভাবেই চিন্তা করছেন।
‘হ্যা তা করছি এবং অবাক হচ্ছি। আপনি আপনার গাড়ি নিয়ে আসুন, আমি একটা জায়গায় যাব। সাধারণ আবাসিক প্রকল্প। ১১৮ নম্বর কক্ষ। একটি অল্পবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে কথা বলব বলে ভাবছি, মেয়েটির নাম নুহাশ ।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
এরিন লম্বা লম্বা পা ফেলে গাড়ি আনতে রওনা হল। ফিহা দাঁড়িয়ে আছেন প্রশস্ত রাস্তার এক পাশের ফুটপাতে। পনেরাে মিনিট পর পর স্বয়ংক্রিয় ট্রাম যাচ্ছে, এ ছাড়া রাস্তায় যানবাহন বা লােক চলাচল নেই। প্রাণহীন একটি শহর। সারাদিন হেঁটেও তিনি কোন শিশুর দেখা পান নি। শিশুসদনগুলি শহরের বাইরে। বাবা-মা’র সঙ্গে শিশুদের রাখা হয় না। তারা বড় হয় শিশুসদনে। বছরে একবার অল্পকিছু সময়ের জন্যে বাবা-মা’রা শিশুদের দেখতে যেতে পারেন।
আচ্ছা, মেন্টালিস্টদের শিশুরা কোথায় বড় হয়? তাদের শিশুসদনগুলি কোথায়? তিনি জানেন না। ফিহা ক্লান্ত বােধ করছেন। শীত লাগছে। আজ কত তারিখ, কি বার তিনি কিছুই জানেন না। তিনি ছুটি ভােগ করছেন। ছুটির সময় কিছুই মনে রাখতে চান না। ছুটি কাটান শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে। বাইরে কোথাও যেতে ইচ্ছা করে না। সমুদ্র, পাহাড়-পর্বত, অরণ্য কিছুই দেখতে ইচ্ছা করে না।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
তাঁর বয়স পঞ্চাশ। অনেকখানি সময়ই তিনি পার করে দিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে একবারও কেন মনে হল না বাইরে যেতে ? মেন্টালিস্টরা সেই ইচ্ছা জাগতে দেয় নি। তিনি বিয়ে করেন নি। কখনো কোন তরুণীর প্রতি আকর্ষণ বােধ করেন নি। নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেছেন। কেন করেছেন? মেন্টালিস্টরা কি তাকে প্রভাবিত করেছে? শুধু তিনি একা নন গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় নিয়ােজিত প্রতিটি বিজ্ঞানীই চিরকুমার। তিনি একা হলে ব্যাখ্যা হয়ত অন্য রকম হত। তিনি তাে একা নন।
মেন্টালিস্টরা বিজ্ঞানীদের ব্যবহার করছে। কারণ বিজ্ঞানীদের কাজ তাদের প্রয়ােজন।