মারলা লি পা বাড়াতে গিয়েও বাড়ালেন না, থমকে দাড়ালেন। আগের চেয়েও শান্ত গলায় বললেন, আমি কিন্তু ইচ্ছা করলেই আমার কথা শুনতে আপনাকে বাধ্য করতে পারতাম। আমি একজন মেন্টালিস্ট। আমি চাইলে আপনার না বলার ক্ষমতা নেই। আমি আপনাকে বাধ্য করতে পারতাম, তা কিন্তু করিনি। মেন্টালিস্টরা কখনোই কাউকে বাধ্য করে না।
তারপরেও সাধারণ মানুষদের ভেতর ভয়াবহ ভুল ধারণা যে মেন্টালিস্টরা তাদের ইচ্ছা অন্যের উপর চাপিয়ে দেয়।
‘সেনাবাহিনী কি পুরোপুরি আপনার নিয়ন্ত্রণ করেন না ?
‘অবশ্যই করি। প্রয়ােজনেই করি। নিয়ন্ত্রণ না করলে সেনাবাহিনী দু ভাগ হয়ে যেত। একটি সাধারণ মানুষদের বাহিনী অন্যটি মেন্টালিস্টদের বাহিনী। তার ফলাফল নিশ্চয়ই আপনাকে ব্যাখ্যা করতে হবে না।’ | ফিহা বললেন, পদার্থ বিদ্যা গবেষণাগারে একটি বিশেষ ধরণের গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। আপনারা সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছেন। গবেষণা এগুতে দিচ্ছেন না।
‘সঠিক তথ্য কিন্তু ভূল ব্যাখ্যা। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে কারণ ঝড় আসছে। শক্তিশালী টর্নেডাে। ঝড় শেষ হলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হবে। আমাদের প্রতি আপনার যত বিদ্বেষই থাকুক আপনাকে স্বীকার করতে হবে যে আমরা কোন রকম গবেষণায় বাধা দেই না। আমাদের দুভার্গ্য আমাদের মধ্যে কোন বিজ্ঞানী নেই।
মেন্টালিস্টরা সৃষ্টিশীল কাজ পারে না। যারা এই কাজটি পারে তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার সীমা নেই। আপনি নিজের কথা ভেবে দেখুন মহামতি ফিহা । কি পরিমান সম্মান আপনি ভােগ করেন ? ফিহা বললেন, এই সম্মান আপনারা আপনাদের নিজেদের স্বার্থেই করেন। জ্ঞান বিজ্ঞান, আধুনিক প্রযুক্তির জন্যে বিজ্ঞানীদের উপর নির্ভর করা ছাড়া আপনাদের উপায় নেই।
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
‘আরেকটি সঠিক তথ্য ভুল ভাবে আপনি উপস্থিত করলেন। আপনাদের ছাড়া জ্ঞান বিজ্ঞানে আমরা অগ্রসর হতে পারছি না এটা ঠিক। কিন্তু যতটুকু অগ্রসর হয়েছি আমাদের জন্যে তাই যথেষ্ট। এর বেশি আমাদের প্রয়ােজন নেই। মেন্টালিস্টদের প্রয়ােজন সামান্য। তারা অল্পতেই সুখি। সমস্ত বিশ্ব স্মাণ্ড জয়ের স্বপ্ন তারা দেখে না।
‘যারা দেখে তাদের বাধা দেয়।
না তাও আমরা দেই না। দীর্ঘদিন বিজ্ঞান কাউন্সিলের প্রধান হিসেবে আপনি জানেন যে আমরা কোন গবেষণাতেই কখনাে বাধা দেই না। আপনারা যখন টেলিপ্যাথিক যােগাযােগের কৌশল উদ্ভাবনের গবেষণা করতে চাইলেন আমরা কিন্তু
অর্থ বরাদ্ধ করলাম। বিপুল অর্থই বরাদ্ধ করা হল। সেই গবেষণা কাজে এল না। আবার আমরা যখন বিশেষ কোন গবেষণা আপনাদের করবার জন্যে অনুরােধ করলাম আপনারা তা করতে রাজী হলেন না। মেন্টালিস্টদের কিছু শারিরীক সমস্যা ত্রিশ বছরের পর থেকে শুরু হয়। পিটুইটারী গ্রাণ্ড থেকে বিশেষ এক ধরণের এনজাইম বের হয়। তার উপর গবেষণা কোন বিজ্ঞানী করতে রাজি হন নি।
‘আমি জীব বিজ্ঞানী নই কাজেই এই বিষয় জানি না।
‘মহামতি ফিহা আপনি অনেক বিষয়ই জানেন না। আমরা যখন অসুস্থ হই তখন চিকিৎসার জন্যের রােবট ডাক্তারদের উপর নির্ভর করি। মানুষ ডাক্তাররা যখন আমাদের চিকিৎসা করতে আসেন তখন প্রচণ্ড ঘৃণা নিয়ে আসেন। আমরা মেন্টালিস্ট, আমরা তা বুঝতে পারি।
ফিহা বললেন, আপনাদের মধ্যে ডাক্তার নেই? ‘না। আমাদের মধ্যে ডাক্তার নেই। ‘আমার জানা ছিল না।
মারলা লি বললেন, আপনার অনেক সময় নিলাম। আমার কথা ধৈর্য ধরে শুনেছেন তার জন্যে ধন্যবাদ।
ফিহা বললেন, আপনি কি একটা সত্যি কথা আমাকে বলবেন ? ‘অবশ্যই বলব।।
‘এই যে এতক্ষণ আপনি কথা বললেন, আপনি কি কথা শোনাবার ক্ষেত্র সাবধানে প্রস্তুত করেন নি? আপনি কি আপনার মানসিক ক্ষমতা ব্যাবহার করেন নি?”
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
মারলা লি বললেন, না করিনি। জানি না আপনি আমার কথা বিশ্বাস করলেন কি-না। আমি সত্যি কথাই বলেছি। শুভরাত্রি ।। | রাত্রি খুব শুভ হল না। প্রচণ্ড ঝড় হল। বিজ্ঞান পল্লী লণ্ডভণ্ড করে টর্নেডাে বয়ে গেল। যাবতীয় সাবধানতা সত্বেও তেইশ জন মানুষ মারা গেল, তারা > তাদের ডিউটি ছিল রাস্তায়। ঝড়ের সময় আশ্রয় কেন্দ্রে যাবার অনুমতি তাদের ছিল
ও ফিহা বইটি শেষ করেছেন। বিদ্যুৎ ছিল না। বিদ্যুৎ সেলের সঞ্চিত বিদ্যুৎ ব্যবহার। করে বাতি জ্বালাতে হল। বাইরে হাওয়া শো শাে শব্দ করছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তিনি একমনে পড়ছেন।
চল্লিশ পৃষ্ঠার বই। পুরানাে ধরনের ভাষা, জটিল অলংকার ভর্তি বাক্য। মাঝে মাঝে অর্থহীন পদের পুনরাবৃত্তি। অনেকটা ধর্মগ্রন্থের আকারে লেখা।
তিনি মানুষ নন। মানুষের ছায়া, তিনি খাদ্য গ্রহণ করেন না। তিনি কাহাকে জন্মও দেন না। তাঁহার আগমন আছে ; নির্গমন নাই। তিনি আসিয়াছেন ভবিষ্যৎ হইতে। তিনি ভবিষ্যৎ জানেন। যে বিদ্যা তিনি ভবিষ্যৎ হইতে আনেন সেই বিদ্যা ভবিষ্যতে ফিরিয়া যায়। চক্র পূর্ণ হয়। বিশ্ব ভ্ৰমাণ্ড একটি চক্রের অধীন।
তিনি শুধু একটি ক্ষুদ্র চক্র সম্পন্ন করেন। ইহার অধিক তাঁহার কোন কর্ম নাই। নতুন মানব। সমাজের খবর তিনি ভবিষ্যৎ হইতে নিয়া আসেন। বীজ বপন করেন অতীতে। এইভাবেই চক্র সম্পন্ন হয়। বিশ্ব ভ্ৰমাণ্ড একটি চক্রের অধীন। তিনি তাঁহার চক্ষু দিয়া নতুন মানব সমাজের বীজ বপন করেন। এইভাবেই চক্র সম্পন্ন হয়। বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড একটি চক্রের অধিন। তিনি শুধু একটি ক্ষুদ্র চক্র সম্পন্ন করেন।”
ফিহা সমীকরণ-হুমায়ূন আহমেদ
যতই আগানাে যায় বই ততই জটিল হতে থাকে। বইয়ের মাঝামাঝি জায়গায় আছে –
“প্রত্যেকের জন্যে কর্ম নির্দিষ্ট। সবাই তাহার নিজ নিজ কর্ম সম্পন্ন করিবে। অতঃপর তাহার প্রয়ােজন নাই। অসংখ্য ক্ষুদ্র চক্র একটি বৃহৎ চক্র তৈরি করে। বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড চক্রের অধীন। শূন্য ধাবিত হয় অসীমের দিকে। আবার অসীম যায় শূন্যের দিকে। এমতে চক্র সম্পন্ন হয়। এই বিশ্ব ভ্ৰমাণ্ড চক্রের অধীন।. | ফিহা বইটি দ্বিতীয়বার পড়লেন। প্রতিটি বাক্য পড়ার পর খানিকক্ষণ ভাবলেন। যদি তাতে কোন লাভ হয়।
তিনি মানুষ নন। মানুষের ছায়া। এর মানে কি? মানুষের ছবি? মানুষের ছবিও তাে ছায়া।
তিনি খাদ্য গ্রহণ করেন না। ছবি খাদ্য গ্রহণ করে না।
তিনি কাহাকে জন্মও দেন না। ছবি কাউকে জন্ম দেবে না। তবে একটি ছবি থেকে অনেক ছবি করা যায় । মেলানাে যাচ্ছে না।
Read More