সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২)

আর সাতাত্তর পা। ‘আর যদি না হয় ? ‘হবেই, ফেলুদা। আমি সেবার গুনেছিলাম। 

না হলে গাঁট্টা তাে ? ‘হ্যাঁ—কিন্তু বেশি জোরে নাজোরে মারলে মাথার ঘিলু এদিকওদিক হয়ে যায়। 

কী আশ্চর্যসাতাত্তরে রাজেনবাবুর বাড়ি পৌছলাম না। আরও তেইশ পা গিয়ে তবে ওর বাড়ির গেটের সামনে পড়লাম।

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড 

ফেলুদা ছােট্ট করে একটা গাঁট্টা মেরে বলল, “আগের বার ফেরার সময় গুনেছিলি, না আসার সময় ? 

‘ফেরার সময়। ‘ইডিয়ট। ফেরার সময় তাে ঢালে নামতে হয়। তুই নিশ্চয়ই ধাঁই ধাঁই করে ইয়া বড়া বড়া স্টেপস ফেলেছিলি ? 

তা হবে । “নিশ্চয়ই তাই। আর তাই স্টেপস্ সেবার কম হয়েছিল, এবার বেশি হয়েছে। জোয়ান বয়সে ঢালে নামতে মানুষ বড় বড় পা ফেলে দৌড়ানাের মতো। আর বুড়াে হলে ঢালুর বেলা ব্রেক কষে কষে ছােট ছােট পা ফেলতে হয়-~-তা না হলে মুখ থুবড়ে পড়ে। 

কাছাকাছি কোনও বাড়ি থেকে রেডিওতে গান শােনা যাচ্ছে। ফেলুদা এগিয়ে কলিং বেল টিপল। 

‘কী বলবে সেটা ঠিক করেছ ফেলুদা ? ‘যা খুশি তাই বলব। তুই কিন্তু স্পিকটি-নট। যতক্ষণ থাকবি এ বাড়িতে, একটি কথা বলবিনে । 

‘কিছু জিজ্ঞেস করলেও না ? ‘শাটাপ। 

একটা নেপালি চাকর এসে দরজা খুলে দিল। ‘অন্দর আইয়ে। 

বৈঠকখানায় ঢুকলাম। বেশ সুন্দর পুরনাে প্যাটার্নের কাঠের বাড়ি। শুনেছি রাজেনবাবু। দশ বছর হল রিটায়ার করে দার্জিলিং-এ আছেন। কলকাতায় বেশ নাম করা উকিল ছিলেন। 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২)

চেয়ার টেবিল যা আছে ঘরে, সব বেতের। যেটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে সেটা হচ্ছে, চারিদিকে দেওয়ালে টাঙানাে সব অদ্ভুত দাঁত-খিচোনো চোখরাঙানাে মুখােশের সারি। আর আছে পুরনাে ঢাল, তলােয়ার, ভােজালি, থালা, ফুলদানি এই সব । কাপড়ের উপর রং করা বুদ্ধের ছবিও আছে—কত পুরনাে কে জানে? কিন্তু তাতে যে সােনালি রংটা আছে সেটা এখনও ঝলমল করছে। 

আমরা দুজনে দুটো বেতের চেয়ারে বসলাম। ফেলুদা দেওয়ালের এদিক-ওদিক দেখে বলল, ‘পেরেকগুলাে সব নতুন, মর্চে ধরেনি। ভদ্রলােকের প্রাচীন জিনিসের শখটা বােধহয় বেশি প্রাচীন নয়।’ 

রাজেনবাবু ঘরে ঢুকলেন। 

আমি অবাক হয়ে দেখলাম ফেলুদা উঠে গিয়ে টিপ করে এক পেন্নাম ঠুকে বলল, ‘চিনতে পারছেন ? আমি জয়কৃষ্ণ মিত্তিরের ছেলে ফেলু 

রাজেনবাবু প্রথমে চোখ কপালে তুললেন, তার পর চোখের দু পাশ কুঁচকিয়ে একগাল হেসে বললেন, বাবা! কত বড় হয়েছ তুমি, অ্যাঁ ? কবে এলে এখানে ? বাড়ির সব ভাল ? বাবা এসেছেন ? 

ফেলুদা জবাব দিচ্ছে, আর আমি মনে মনে বলছি-কী অন্যায়, এত কথা হল, আর ফেলুদা একবারও বলল না সে রাজেনবাবুকে চেনে ? 

এবার ফেলুদা আমার পরিচয়টাও দিয়ে দিল। রাজেনবাবুর মুখ দেখে মনেই হল না যে, এই সাত দিন আগে আমাকে লজেঞ্চস দেবার কথাটা ওঁর মনে আছে। 

ফেলুদা এবার বলল, আপনার খুব প্রাচীন জিনিসের শখ দেখছি।’ রাজেনবাবু বললেন, হ্যাঁ। এখন তাে প্রায় নেশায় দাঁড়িয়েছে।’ ‘ 

“কদ্দিনের ব্যাপার ? ‘এই তাে মাস ছয়েক হবে। কিন্তু এর মধ্যেই অনেক কিছু সংগ্রহ করে ফেলেছি। ‘ 

ফেলুদা এবার একটা গলা-খাঁকরানি দিয়ে, আমার কাছ থেকে শােনা ঘটনাটাই শুনিয়ে বলল, “আপনি আমার বাবার মামলার ব্যাপারে যেভাবে সাহায্য করেছিলেন, তার প্রতিদানে আপনার এই বিপদে যদি কিছু করতে পারি…’ । 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২)

রাজেনবাবুর ভাব দেখে মনে হল তিনি সাহায্য পেলে খুশিই হবেন, কিন্তু তিনি কিছু বলবার আগেই তিনকড়িবাবু ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাঁপানাের বহর দেখে মনে হল বোধহয় বেড়িয়ে ফিরলেন রাজেনবাবু আমাদের সঙ্গে ভদ্রলােকের আলাপ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ামার বিশেষ বন্ধু অ্যাডভােকেট জ্ঞানেশ সেন হচ্ছেন তিনকডিবাবুর প্রতিবেশী । আমি ঘরভাড়া দেব শুনে জ্ঞানেশই ওঁকে সাজেস্ট করে আমার এখানে আসতে। গোড়ায় উনি হােটেলের কথা ভেবেছিলেন।’ 

তিনকড়িবাবু হেসে বললেন, “আমার ভয় ছিল আমার এই চুরুটের বাতিকটা নিয়ে। এমনও হতে পারত যে রাজেনবাবু হয়তাে চুরুটের গন্ধ সহ্য করতে পারেন না । তাই সেটা আমি আমার প্রথম চিঠিতেই লিখে জানিয়ে দিয়েছিলাম।’ 

ফেলুদা বলল, আপনি কি বায়ু পরিবর্তনের জন্য এসেছেন ? 

তা বটে। তবে বায়ুর অভাবটাই যেন লক্ষ করছি বেশি। পাহাড়ে ঠাণ্ডাটা আর একটু বেশি এক্সপেক্ট করে লােকে। 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *