ফেলুদা চোখটা ঢুলুঢুলু করে ঘাড়টা দুবার নাড়িয়ে চুপ করে গেল। বুঝলাম ও আর কথা বলবে না। এখন ও শহরের পথঘাট বাড়িঘর লােকজন এক্কা টাঙ্গা সৰ খুব মন দিয়ে লক্ষ করছে ।
ধীরুকাকা কুড়ি বছর আগে লখনৌতে প্রথম আসেন উকিল হয়ে। সেই থেকে এখানেই আছেন, এবং এখন নাকি ওঁর বেশ নামডাক।
কাকিমা তিনবছর হল মারা গেছেন, আর ধীরুকাকার ছেলে জার্মানির ফ্রাংকফার্ট শহরে চাকরি নিয়ে চলে গেছেন।ওঁর বাড়িতে এখন উনি থাকেন, ওঁর বেয়ারা জগমােহন থাকে, আর রান্না করার বাবুর্চি আর একটা মালী। ওঁর বাড়িটা যেখানে সে জায়গাটার নাম সেকেন্দার বাগ, স্টেশন থেকে প্রায় সাড়ে তিন মাইল দূরে। বাড়ির সামনে গেটের উপর লেখা ‘ডি. কে, সান্ন্যাল এম. এ., বি.এল. বি.,
অ্যাডভােকেট গেট দিয়ে ঢুকে খানিকটা নুড়ি পাথর ঢালা রাস্তার পর একতলা বাড়ি, আর রাস্তার দুদিকে বাগান। আমরা যখন পৌছলাম তখন মালী লিন মােয়ার’ দিয়ে বাগানের ঘাস কাটছে।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর বাবা বললেন, ‘ট্রেন জার্নি করে এসেছ, আজ আর বেরিয়ো না। কাল থেকে শহর দেখা শুরু করা যাবে। তাই সারা দুপুর বাড়িতে বসে ফেলুদার কাছে তাসের ম্যাজিক শিখেছি। ফেলুদা বলে-“ইন্ডিয়ানদের আঙুল ইউরােপিয়ানদের চেয়ে অনেক বেশি ফ্লেক্সিবল। তাই হাত সাফাইয়ের খেলাগুলাে আমাদের পক্ষে রপ্ত করা অনেক সহজ।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১২)
বিকেলে যখন ধীরুকাকার বাগানে ইউক্যালিপটাস গাছটার পাশে বেতের চেয়ারে বসে চা খাচ্ছি, তখন গেটের বাইরে একটা গাড়ি থামার আওয়াজ পেলাম। ফেলুদা না দেখেই বলল ‘ফিয়াট । তারপর রাস্তার পাথরের উপর দিয়ে খচমচ খচমচ করতে করতে ছাই রঙের সুট পরা একজন ভদ্রলােক এলেন।
চোখে চশমা, রং ফরসা আর মাথার চুলগুলাে বেশির ভাগই সাদা। কিন্তু তাও দেখে বােঝা যায় যে বয়স বাবাদের চেয়ে খুব বেশি নয়। | ধীরুকাকা হেসে নমস্কার করে উঠে দাঁড়িয়ে প্রথমে বললেন, “জগমােহন, আউর এক কুরসি লাও, তারপর বাবার দিকে ফিরে বললেন, ‘আলাপ করিয়ে দিই-ইনি ডক্টর শ্রীবাস্তব, আমার বিশিষ্ট বন্ধু।
আমি আর ফেলুদা দুজনেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। ফেলুদা ফিসফিস করে বলল, নাভাস হয়ে আছে। তার বাবাকে নমস্কার করতে ভুলে গেল ।
ধীরুকাকা বললেন, ‘শ্রীবাস্তব হচ্ছেন অস্টিওপ্যাথ, আর একেবারে খাস লখনৌইয়া। ফেলুদা চাপা গলায় বলল, “অস্টিওপাথ মানে বুঝলি ?
আমি বললাম, না ! ‘হাড়ের ব্যারামের ডাক্তার । অস্টিও আর অস্থি-মিলটা লক্ষ করিস। অস্থি মানে হাড় সেটা জানিস তাে ?
‘তা জানি। | আরেকটা বেতের চেয়ার এসে পড়াতে আমরা সকলেই বসে পড়লাম। ডক্টর শ্রীবাস্তব হঠাৎ ভুল করে বাবার চায়ের পেয়ালাটা তুলে আরেকটু হলেই চুমুক দিয়ে ফেলতেন, এমন সময় বাবা একটু খুক খুক করে কাশাতে ‘আই অ্যাম সাে সরি’ বলে রেখে দিলেন।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১২)
ধীরুকাকা বললেন, “আজ যেন তােমায় একটু ইয়ে বলে মনে হচ্ছে। কোনও কঠিন কেসটস দেখে এলে নাকি ?
বাবা বললেন, ‘ধীরু, তুমি বাংলায় বলছ—-উনি বাংলা বােঝেন বুঝি ?
ধীরুকাকা হেসে বললেন, ‘ওরে বাবা, বােঝেন বলে বােঝেন ! তােমার বাংলা আবৃত্তি একটু শুনিয়ে দাও না।’
শ্রীবাস্তব যেন একটু অপ্রস্তুত হয়েই বললেন, আমি বাংলা মােটামুটি জানি। ট্যাগােরও পড়েছি কিছু কিছু।’
‘বট ?” ‘ইয়েস। গ্রেট পােয়েট।’
আমি মনে মনে ভাবছি। এই বুঝি কবিতার আলােচনা শুরু হয়, এমন সময় কাঁপা হাতে তারই জন্যে ঢালা চায়ের পেয়ালাটা তুলে নিয়ে শ্রীবাস্তব বললেন, ‘কাল রাতে আমার বাড়িতে ডাক আসিয়াছিল । | ডাকু ? ডাকু আবার কে ? আমাদের ক্লাসে দক্ষিণ বলে একটা ছেলে আছে যার ডাকনাম ডাকু ।
কিন্তু ধীরুকাকার কথাতেই ডাকু ব্যাপারটা বুঝে নিলাম ।
‘সেকী-ডাকাত তাে মধ্য প্রদেশেই আছে বলে জানতাম। লখনৌ শহরে আবার ডাকাত এল কোত্থেকে ?
‘ডাকু বলুন, কি চোর বলুন। আমার অঙ্গুরীর কথা তাে আপনি জানেন মিস্টার সানিয়াল ?
সেই পিয়ারিলালের দেওয়া আংটি ? সেটা কি চুরি গেল নাকি ? ‘না, না। লেকিন আমার বিশ্বাস কি, ওই আংটি নিতেই চোর আসিল।’ বাবা বললেন, ‘কী আংটি ?
শ্রীবাস্তব ধীরুকাকাকে বললেন, আপনি বােলেন। উর্দুভাষা এঁরা বুঝবেন না আর অত কথা আমার বাংলায় হবে না।’
ধীরুকাকা বললেন, ‘পিয়ারিলাল শেঠ ছিলেন লখনৌ-এর নামকরা ধনী ব্যবসায়ী ? জাতে গুজরাটি এককালে কলকাতায় ছিলেন। তাই বাংলও অল্প অল্প জানতেন। ওর ছেলে মহাবীরের যখন বারাে কি তেরাে বছর বয়স, তখন তার একটা কঠিন হাড়ের ব্যায়াম হয়। শ্রীবাস্তব তাকে ভাল করে দেন। পিয়ারিলালের স্ত্রী নেই, দুই ছেলের বড়টি টাইফয়েড়ে মারা যায়। তাই বুঝতেই পারছ, সবেধন নীলমণিটিকে মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য শ্রীবাস্তবের উপর পিয়ারিলারে মনে একটা গভীর কৃতজ্ঞতাবােধ ছিল। তাই মারা যাবার আগে তিনি তাঁর একটা বহুমূল্য আংটি শ্রীবাস্তবকে দিয়ে যান।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১২)
বাবা বললেন, কবে মারা গেছেন ভদ্রলােক ?
শ্রীবাস্তব বললেন, ‘লাস্ট জুলাই। তিনমাস হল। মে মাসে ফাস্ট হার্ট অ্যাটাক হল। তাতেই প্রায় চলে গিয়েছিলেন। সেই টাইমে আংটি দিয়েছিলেন আমায় দেবার পরে ভাল হয়ে উঠলেন। তারপর জুলাই মাসে সেকেন্ড অ্যাটাক হল। তখনও আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিন দিনে চলে গেলেন। …এই দেখুন–—
শ্রীবাস্তব তাঁর কোটের পকেট থেকে একটা দেশলাই-এর বাক্সর চেয়ে একটু বড় নীল রঙের ভেলভেটের কৌটো বার করে ঢাকনাটা খুলতেই তার ভেতরটায় রােদ পড়ে রামধনুর সাতটা রঙের একটা চোখ ঝলসানাে ঝিলিক খেলে গেল।
তারপর শ্রীবাস্তব এদিক ওদিক দেখে সামনে ঝুঁকে পড়ে খুব সাবধানে ডানহাতের বুড়াে আঙুল আর তার পাশের আঙুল দিয়ে আলতাে করে ধরে আংটিটা বার করলেন।
Read More