ধীরুকাকা আমাদের দেখে বললেন, “এসাে আলাপ করিয়ে দিই। ইনিই বনবিহারীবাবু-—যাঁর চিড়িয়াখানা আছে।
আমি অবাক হয়ে নমস্কার করলাম। ইনিই সেই লােক ! প্রায় ছ ফুট লম্বা, ফরসা রং, সরু গোঁফ, ছুঁচলাে দাড়ি, চোখে সােনার চশমা। সব মিলিয়ে চেহারাটা বেশ চোখে পড়ার মতাে।
আমার পিঠে একটা চাপড় মেরে ভদ্রলােক বললেন, ‘লক্ষ্মণের রাজধানী কেমন লাগছে খােকা ? জানাে তো, রামায়ণের যুগে লখনৌ ছিল লক্ষ্মণাবতী।’
ভদ্রলােকের গলার আওয়াজও দেখলাম বেশ মানানসই। ধীরুকাকা বললেন, ‘বনবিহারীবাবু চৌকবাজারে যাচ্ছিলেন, আমাদের গাড়ি দেখে চলে এলেন।’
ভদ্রলােক বললেন, হ্যাঁ। দুপুরবেলাটা আমি বাইরে কাজ সারতে বেরােই । সকালসন্ধে আমার জানােয়ারগুলাের পেছনে অনেকটা সময় চলে যায়।
ধীরুকাকা বললেন, আমরা ভাবছিলাম দলেবলে একবার আপনার ওখানে ধাওয়া করব। এদের খুব শখ একবার আপনার চিড়িয়াখানাটা দেখার।’ ‘বেশ তাে। এনি ড়ে। আজই আসুন না । আমি তাে কেউ এলে খুশিই হই । তবে অনেকেই দেখেছি ভয়েই আসতে চায় না। তাদের ধারণা আমার খাঁচা বুঝি জু গার্ডেনের খাঁচার মতো এত মজবুত নয়। তাই যদি হবে তো আমি আছি কী করে ?
এ কথায় ফেলুদা ছাড়া আমরা সকলেই হাসলাম। ফেলুদা আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে পড়ে চাপা গলায় বলল, “জানােয়ারের গন্ধ ঢাকার জন্য কষে আতর মেখেছে।’
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৬)
স্ট্যান্ডার্ড গাড়িটা দেখলাম বনবিহারীবাবুর নয়, কারণ তিনি তার পাশের একটা নীল অ্যাম্বাসাডর গাড়ি থেকে তাঁর ড্রাইভারকে ডেকে তার হাতে দুটো চিঠি দিয়ে বললেন। ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে আসতে, তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, “আপনারা ইমামবড়া দেখবেন তো ? তারপরই না হয় সােজা চলে যাব আমার ওখানে।’
ধীরুকাকা বললেন, তা হলে আপনিও ভেতরে আসছেন আমাদের সঙ্গে? ‘চলুন না। নবাবের কীর্তিটা দেখে নেওয়া যাবে। সেই সিক্সটিথ্রিতে গিয়েছিলাম লখনৌতে আসার দুদিন বাদেই । তারপর আর যাওয়া হয়নি।’
গেট দিয়ে ঢুকে একটা বিরাট চত্বরের উপর দিয়ে প্রাসাদের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বনবিহারী বললেন, ‘দুশাে বছর আগে নবাব আসাফ-উদ-দৌল্লা তৈরি করেছিলেন এই প্রাসাদ। ভেবেছিলেন আগ্রা দিল্লিকে টেক্কা দেবেন। ভারতবর্ষের সেরা প্রাসাদ-করলে-ওয়ালাদের নিয়ে একটা কম্পিটিশন করলেন। তারা সব নকশা পাঠাল। তার মধ্যে বেস্ট নকশা বেছে নিয়ে হল এই ইমামবড়া। বাহারের দিক দিয়ে মােগল প্রাসাদের সঙ্গে কোনও তুলনা হয় না, তবে সাইজের দিক থেকে একেবারে নাম্বার ওয়ান। এত বড় দরবার-ঘর পৃথিবীর কোনও প্রাসাদে নেই।’
দরবার-ঘরটা দেখে মনে হল তার মধ্যে অনায়াসে একটা ফুটবল গ্রাউন্ড ঢুকে যায়। আর একটা কুয়াে দেখলাম, অত বড় কুয়াে আমি কখনও দেখিনি। গাইড বলল অপরাধীদের ধরে ধরে ওই কুয়াের মধ্যে ফেলে দিয়ে নাকি তাদের শাস্তি দেওয়া হত।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৬)
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল ভুলভুলাইয়া । এদিক ওদিক এঁকেবেঁকে সুড়ঙ্গ চলে গেছে সেগুলাে এমন কায়দায় তৈরি যে, যতবারই এক একটা মােড় ঘুরছি, ততবারই মনে হচ্ছে যেন যেখানে ছিলাম সেইখানেই আবার ফিরে এলাম। একটা গলির সঙ্গে আরেকটা গলির কোনও তফাত নেই—-দুদিকে দেয়াল, মাথার ওপরে নিচু ছাত, আর দেওয়ালের ঠিক মাঝখানটায় একটা করে খুপরি। গাইড বলল, নবাব যখন বেগমদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতেন, তখন ওই খুপরিগুলােতে পিদিম জ্বলত?
রাত্তিরবেলা যে কী ভুতুড়ে ব্যাপার হবে সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম । ফেলুদা যে কেন বারবার পেছিয়ে পড়ছিল, আর দেওয়ালের এত কাছ দিয়ে হাঁটছিল সেটা বুঝতেই পারছিলাম না। আমিও গােলােকধাঁধাটা দেখতে দেখতে, আর তার মধ্যে লুকোচুরি খেলার কথা ভাবতে ভাবতে এত মশগুল হয়ে গিয়েছিলাম যে ওর বিষয় খেয়ালই ছিল না। এর মধ্যে হঠাৎ বাবা বলে উঠলেন, আরে ফেলু কোথায় গেল?
সত্যিই তাে! পেছন ফিরে দেখি ফেলুদা নেই। আমার বুকের ভিতরটা টিপ করে উঠল। তারপর ‘ফেলু, ফেলু বলে বাবা দুবার ডাক দিতেই ও আমাদের পিছন দিকের একটা গলি দিয়ে বেরিয়ে এল। বলল, “অত তাড়াতাড়ি হাঁটলে গােলকধাঁধার প্ল্যানটা ঠিক মাথায় তুলে নিতে পারব না।’
গােলকধাঁধার শেষ গলিটার শেষে যে দরজা আছে, সেটা দিয়ে বেরােলেই ইমামবড়ার বিরাট ছাতে গিয়ে পড়তে হয় । গিয়ে দেখি সেখান থেকে প্রায় সমস্ত লখনৌ শহরটাকে দেখা যায়। আমরা ছাড়াও ছাতে কয়েকজন লােক ছিল। তাদের মধ্যে একজন অল্পবয়সী ভদ্রলােক ধীরুকাকাকে দেখে হেসে এগিয়ে এল।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৬)
ধীককাকা বললেন, ‘মহাবীর যে—কবে এলে ?
ভদ্রলােককে দেখলে যদিও বাঙালি মনে হয় না, তবু তিনি বেশ পরিষ্কার বাংলায় বললেন, ‘তিন দিন হল। এই সময়টাতে আমি প্রতি বছরই আসি। দেওয়ালিটা সেরে ফিরে যাই। এবারে দুজন বন্ধু আছেন, তাদের লখনৌ শহর দেখাচ্ছি।’
ধীরুকাকা বললেন, ‘ইনি পিয়ারিলালের ছেলে–বােম্বাইতে অভিনয় করছেন। মহাবীর দেখলাম বনবিহারীবাবুর দিকে কী রকম যেন অবাক হয়ে দেখছেন—যেন ওকে আগে দেখেছেন, কিন্তু কোথায় সেটা মনে করতে পারছেন না।
বনবিহারীবাবু বললেন, ‘চেনা চেনা মনে হচ্ছে কি ?’ মহাবীর বলল, “হ্যাঁ—কিন্তু কোথায় দেখেছি বলুন তাে ?
বনবিহারীবাবু বললেন, তােমার স্বৰ্গত পিতার সঙ্গে একবার আলাপ হয়েছিল বটে, তুমি তাে তখন এখানে ছিলে না।’ মহাবীর যেন একটু অপ্রস্তুত হয়েই বলল, “ও। তা হলে বোধহয় ভুল করছি। আচ্ছা,
আসি তা হলে। মহাবীর নমস্কার করে চলে গেল। ভদ্রলােকের বয়স হয়তাে ফেলুদার চেয়েও কিছুটা কম—আর চেহারা বেশ সুন্দর আর শক্ত । মনে হল নিশ্চয়ই এক্সারসাইজ করেন, কিংবা খেলাধূলা করেন।
বনবিহারীবাবু বললেন, আমার মনে হয় এবার আমার ওখানে গিয়ে পড়তে পারলে ভালই হয়। জানােয়ার গুলাে যদি দেখতেই হয়, তা হলে আলাে থাকতে থাকতে দেখাই ভাল।
Read More