আর গিয়েই দেখলাম যে-দিক দিয়ে পাথর এসেছে, সেই দিকে বেশ খানিক দূরে, একটা লাল ফেজটুপি আর কালাে কোট পরা দাড়িওয়ালা লােক দৌড়ে পালাচ্ছে।
ফেলুদা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সােজা লােকটার দিকে ছুটল।
আমি ফেলুদার পিছনে পিছনে যাৰ বর্মে পা বাড়িয়েছিলাম, কিন্তু বনবিহারীবাবু আমার জামার আস্তিনটা ধরে বললেন, তুমি এখনও স্কুলবয় তপেশ ; তােমার এ সব গােলমালের মধ্যে না যাওয়াই ভাল কিছুক্ষণ পরে ফেলুদা ফিরে এল। ববিহারীবাৰ বললেন, ‘ধরতে পারলে ?
ফেলুদা বলল, না। অনেকটা ডিসট্যান্স । একটা কালাে স্ট্যান্ডার্ড গাড়িতে উঠে ভেগেছে লােকটা।’
বনবিহারীবাবু চাপা গলায় বললেন, স্কাউড্রেল ! তারপর আমাদের দুজনের পিঠে হাত দিয়ে বললেন, ‘চলাে—আর এখানে থাকা ঠিক হবে না।’
একটু এগিয়ে গিয়ে বাবা আর ধীরুকাকার সঙ্গে দেখা হল । বাবা বললেন, ‘ফেলু এত হাঁপাচ্ছ কেন ?”
বনবিহারীবাবু বললেন, ‘ওর বােধহয় গােয়েন্দাগিরিটা বেশি না করাই ভাল । মনে হচ্ছে ওর পেছনে গুণ্ডা লেগেছে।’ বাবা আর ধীরুকাকা দুজনেই ঘটনাটা শুনে বেশ ঘাবড়ে গেলেন।
তখন বনবিহারীবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘চিন্তা করবেন না। আমি রসিকতা করছিলাম। আসলে পাথরগুলাে আমাকেই লক্ষ্য করে মারা হয়েছিল। এই যে ছােকরাগুলােকে তখন ধমক দিলুম এ হচ্ছে তারই প্রতিশােধ।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৪)
তারপর ফেলুদার দিকে ঘুরে বললেন, “তবে তাও বলছি ফেলুবাবু, তােমারও বয়সটা কাঁচাই। বিদেশ-বিভুয়ে একটা গােলমালে জড়িয়ে পড়বে সেটা কি খুব ভাল হবে ? এবার থেকে একটু খেয়াল করে চলাে{‘।
কথাটা শুনে ফেলুদা চুপ করে রইল।
গাড়ির দিকে হাঁটার সময় দুজনে একটু পেছিয়ে পড়েছিলাম সেই সুযােগে ফেলুদাকে ফিস ফিস করে বললাম, ‘পাথরটা তােমাকে মারছিল, না ওঁকে ?”
ফেলুদা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ওঁকে মারলে কি উনি চুপ করে থাকতেন নাকি ? হল্লাটলা করে রেসিডেন্সির বাকি ইট কটা খসিয়ে দিতেন না?
‘আমারও তাই মনে হয় ?
তবে একটা জিনিস পেয়েছি। লােকটা পালানাের সময় ফেলে গিয়েছিল।’ ‘কী জিনিস ? ফেলুদা পকেট থেকে একটা কালাে জিনিস বার করে দেখাল । ভাল করে দেখে বুঝলাম সেটা একটা নকল গোঁফ, আর তাতে এখনও শুকনাে আঠা লেগে রয়েছে।
গোঁফটা আবার পকেটে রেখে ফেলুদা বলল, ‘পাথরগুলাে যে আমাকেই মারা হয়েছে, সেটা ভদ্রলােক খুব ভাল ভাবেই জানেন।’
‘তা হলে বললেন না কেন ?
হয় আমাদের নাভার্স করতে চান না, আর না হয়…’ না হয় কী ? {ফেলুদা উত্তরের বদলে মাথা বাঁকিয়ে একটা তুড়ি মেরে বলল, ‘কেসটা জমে আসছে রে তােপসে। তুই এখন থেকে আর আমাকে একদম ডিসটার্ব করবি না।’
বাকি দিনটা ও আর একটাও কথা বলেনি আমার সঙ্গে। বেশির ভাগ সময় বাগানে পায়চারি করেছে, আর বাকি সময়টা ওর নীল নােটবইটাতে হিজিবিজি কী সব লিখেছে । ও যখন বাগানে ঘুরছিল, তখন আমি একবার লুকিয়ে লুকিয়ে বইটা খুলে দেখেছিলাম, কিন্তু
একটা অক্ষরও পড়তে পারিনি, কারণ সেরকম আক্ষর এর আগে আমি কখনও দেখিনি।
টাঙ্গায় উঠে ফেলুদা গাড়ােয়ানকে বলল, ‘হজরতগঞ্জ।
আমি বললাম, সেটা আবার কোন জায়গা ?
এখানকার চৌরঙ্গি । শুধু নবাবি আমলের জিনিস ছাড়াও তাে শহরে দেখবার জিনিস আছে। আজ একটু দোকান-টোকান ঘুরে দেখব।’
গতকাল রেসিডেন্সি থেকে আমরা বনবিহারীবাবুর বাড়িতে কফি খেতে গিয়েছিলাম। সেই সুযােগে ওঁর চিড়িয়াখানাটাও আরেকবার দেখে নিয়েছিলাম। সেই হাইনা, সেই র্যাটল মেক, সেই মাকড়সা, সেই বনবেড়াল, সেই কাঁকড়া বিছে।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৪)
বৈঠকখানায় বসে কফি খেতে খেতে ফেলুদা একটা দরজার দিকে দেখিয়ে বলল, এ
দরজাটায় সেদিনও তালা দেখলাম, আজও তালা ।
বনবিহারীবাবু বললেন, হ্যাঁ-~-ওটা একটা একা ঘর। এসে অবধি তালা লাগিয়ে রেখেছি। খােলা রাখলেই ঝাড়পোঁছের হাঙ্গামা এসে যায়, বুঝলে না !
ফেলুদা বলল, তা হলে তালাটা নিশ্চয়ই বদল করা হয়েছে, কারণ এটায় তাে মরচে ধরেনি।’
বনবিহারীবাবু ফেলুদার দিকে একটু হাসি-হাসি অথচ তীক্ষ দৃষ্টি দিয়ে বললেন, হ্যাঁ-~~~-এর আগেরটায় এত বেশি মরচে ধরেছিল যে ওটা বদলাতে বাধ্য হলাম।
বাবা বললেন, আমরা ভাবছিলাম হরিদ্বার লছমনালাটা এই ফাঁকে সেৱে আসব।’ বনবিহারীবাবু পাইপ ধরিয়ে একটা লম্বা টান দিয়ে কড়া গন্ধওয়ালা ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, কবে যাবেন ? পরশু যদি যান তো আমিও আসতে পারি আপনাদের সঙ্গে। আমার এমনিতেই সেই বারাে ফুট অজগর সাপটা দেখার জন্য একবার যাওয়া দরকার। আর ফেলুবাবুও যেভাবে গােয়েন্দাগিরি শুরু করেছেন, কয়েকদিনের জন্য শহর ছেড়ে কোথাও যেতে পারলে বােধহয় সকলেরই মঙ্গল।
ধীরুকাকা বললেন, আমার তাে শহর ছেড়ে যাওয়ার উপায় নেই। তােমরা কজন ঘুরে এসাে না! ফেলু তাপেশ দুজনেরই লছমনকুলা না-দেখে ফিরে যাওয়া উচিত হবে না।’
বনবিহারীবাবু বললেন, আমার সঙ্গে গেলে আপনাদের একটা সুবিধে হবে–আমার চেনা ধরমশালা আছে, এমন কী হরিদ্বার থেকে লছমনঝুলা যাবার গাড়ির ব্যবস্থাও আমি চেনাশুনার মধ্যে থেকে করে দিতে পারব। এখন আপনারা ব্যাপারটা ডিসাইড করুন ।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৪)
ঠিক হল পরশু শুক্রবারই আমরা রওনা দে । দুদিন আগে যদি বনবিহারীবাবু বলতেন আমাদের সঙ্গে যাবেন, তা হলে আমার খুব ভালই লাগত। কিন্তু আজ বিকেলে রেসিডেন্সির ঘটনার পর থেকে আমার লােকটা সম্বন্ধে মনে একটা কীরকম খটকা লেগে গেছে। তবুও যখন দেখলাম ফেলুদার খুব একটা আপত্তি নেই, তখন আমিও মনটাকে যাবার জন্য তৈরি করে নিলাম।
আজ সকালে উঠে ফেলুদা বলল, দাড়ি কামাবার ব্লেড ফুরিয়ে গেছে—-ওখানে গিয়ে মুশকিলে পড়ে যাব ? চল ব্লেড কিনে আনিগে।’
তাই দুজলে টাঙ্গা করে বেরিয়েছি। হজরতগঞ্জে নাকি সব কিছুই পাওয়া যায় ।
কাল থেকেই দেখছি ফেলুদা আংটি নিয়ে আর কিছুই বলছে না। আজ সকালে ও যখন স্নান করতে গিয়েছিল, তখন আমি আরেকবার ওর নােটবইটা খুলে, দেখেছিলাম, কিন্তু পড়তে পারিনি। অক্ষর গুলাের এক একটা ইংরিজি মনে হয়, কিন্তু বেশির ভাগই অচেনা।
গাড়িতে যেতে যেতে আর কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে ফেলুদাকে জিজ্ঞেস করে ফেললাম।
Read More