আমি অবাক হয়ে ফেলুদার দিকে চাইলাম। ওর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। তিনকড়িবাবু বললেন, কী কারণ?
ফেলুদা গলাটা নামিয়ে নিয়ে বলল, “যে দোকান থেকে ওঁরা জিনিস কেনেন, সেখানে কিছু ভাল নতুন মাল আজ বিকেলে আসছে।‘

এবার তিনকড়িবাবুর চোখও জ্বলজ্বল করে উঠল । ‘বুঝেছি। হুমকি চিঠি পেয়ে রাজেন মজুমদার ঘরে বন্দি হয়ে রইলেন, আর সেই ফাঁকতালে অবনী ঘােষাল দোকানে গিয়ে সব লুটেপুটে নিলেন। | ‘এগজ্যাকলি।
তিনকড়িবাবু চকোলেটের পয়সা দিয়ে উঠে পড়লেন। আমরা দুজনেও উঠলাম।
উৎসাহে আর উত্তেজনায় আমার বুকটা টিপ টিপ করছিল।
অবনী ঘােষাল, প্রবীর মজুমদার আর ফণী মিত্তির–তিনজনকেই তাহলে সন্দেহ করার কারণ আছে !
পনেরাে মিনিটের মধ্যেই মাউন্ট এভারেস্ট হােটেলে গিয়ে ফেলুদা সেই খবরটা জেনে নিল। প্রবীর মজুমদার বলে একজন ভদ্রলােক সেই হােটেলের যােল নম্বর ঘরে পাঁচ দিন হল এসে রয়েছেন।
বিকেলের দিকে রাজেনবাবুর বাড়িতে যাবার কথা ফেলুদা বলেছিল, কিন্তু দুপুর থেকে (মেঘলা করে চারটে নাগাত তেড়ে বৃষ্টি নামল। আকাশের চেহারা দেখে মনে হল বৃষ্টি সহজে থামবে না । ফেলুদা সারাটা সন্ধে খাতা-পেনসিল নিয়ে কী সব যেন হিসেব করল। আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছিল কী লিখছে, কিন্তু জিজ্ঞেস করতে সাহস হল না। শেষটায় আমি তিনকড়িবাবুর বইটা নিয়ে পড়তে আরম্ভ করলাম। দারুণ থ্রিলিং গল্প । পড়তে পড়তে রাজেনবাবুর চিঠির ব্যাপারটা মন থেকে প্রায় মুছেই গেল ।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৮)
আটটা নাগাত বৃষ্টি থামল । কিন্তু তখন এত শীত যে, বাবা আমাদের বেরােতে দিলেন
পরদিন ভােরবেলা ফেলুদার ধাক্কার চোটে ঘুম ভাঙল। ওঠ, ওঠ—এই তােপসে-ওঠ!
আমি ধড়মড়িয়ে উঠে পড়লাম। ফেলুদা কানের কাছে মুখ এনে দাঁতে দাঁত চেপে এক নিশ্বাসে বলে গেল, “রাজেনবাবুর নেপালি চাকরটা এসেছিল । বলল, বাবু এখুনি যেতে বলেছেন-“বিশেষ দরকার ? তুই যদি যেতে চাস তাে—
সে আর বলতে ! পনেরাে মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে রাজেনবাবুর বাড়িতে পৌঁছে দেখি, তিনি ফ্যাকাশে মুখ করে খাটে শুয়ে আছেন। ফণী ডাক্তার তাঁর নাড়ি টিপে খাটের পাশটায় বসে, আর তিনকড়িবাবু এই শীতের মধ্যেও একটা হাতপাখা নিয়ে মাথার পিছনটায় দাঁড়িয়ে হাওয়া করছেন।
ফণীবাবুর নাড়ি দেখা হলে পর রাজেনবাবু যেন বেশ কষ্ট করেই জোরে নিশ্বাস নিতে নিতে বললেন, ‘কাল রাত্রে-বারােটার কিছু পরে ঘুমটা ভাঙতে বিদ্যুতের আলােয় আমার মুখের ঠিক সামনে আই স এ মাড় ফেস্!
মাস্কড ফেস্ ! মুখােশ পরা মুখ ! রাজেনবাবু দম নিলেন। ফণী মিত্তির দেখলাম একটা প্রেসক্রিপশন লিখছেন। রাজেনবাবু বললেন, ‘দেখে এমন হল যে চিৎকারও বেরােল না গলা দিয়ে রাতটা যে কীভাবে কেটেছে–তা বলতে পারি না ।
ফেলুদা বলল, “আপনার জিনিসত্তর কিছু চুরি যায়নি তাে ? রাজেনবাবু বললেন, নাঃ, তবে আমার বিশ্বাস, আমার বালিশের তলা থেকে আমার চাবির গােছাটা নিতেই সে আমার উপর ঝুঁকেছিল। ঘুম ভেঙে যাওয়াতে জানালা দিয়ে লাফিয়ে..ওহরি, হরি!
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৮)
ফণী ডাক্তার বললেন, “আপনি উত্তেজিত হবেন না। আপনাকে একটা ঘুমের ওষুধ
দিচ্ছি। আপনার কমপ্লিট রেস্টের দরকার ।
ফণী বাবু উঠে পড়লেন।
ফেলুদা হঠাৎ বলল, ‘ফণীবাৰু কাল রাত্রে রুগি দেখতে গেলেন বুঝি ? কোটের পিছনে কাদার ছিটে লাগল কী করে ? | ফণীবাবু তেমন কিছু না ঘাবড়িয়ে বললেন, ‘ডাক্তারের লাইফ তাে জানেনই—আর্তের সেবায় যখন জীবনটাই উৎসর্গ করিচি, তখন ডাক যখনই আসুক না কেন, বেরােতেই হবে! সে ঝড়ই হােক, আর বৃষ্টিই হােক, আর বরফই পড়ক।’
ফণীবাৰ তার পাওনা টাকা নিয়ে চলে গেলেন। রাজেনবাব এবার সােজা হয়ে উঠে বসে বললেন, তােমরা আসাতে অনেকটা সুস্থ বােধ করছি। বেশ খানিকটা ঘাবড়ে গেলুম, জানাে। এখন বােধহয় বৈঠকখানায় গিয়ে একটু বসা চলতে পারে।’
ফেলুদা আর তিনকড়িবাবু হাত ধরাধরি করে রাজেনবাবুকে বৈঠকখানায় এনে বসালেন। তিনকড়িবাবু বললেন, স্টেশনে ফোন করেছিলুম যদি যাওয়াটা দু দিন পেছােনাে যায়। রহস্যের সমাধান না করে যেতে মন চাইছে না। কিন্তু ওরা বললে এ-টিকিট ক্যানসেল করলে দশ দিনের আগে বুকিং পাওয়া যাবে না।’
এটা শুনে আমার ভালই লাগল। আমি চাইছিলাম ফেলুদা একাই ডিটেকটিভের কাজটা করুক। তিনকড়িবাবু যেন ফেলুদার অনেকটা কাজ আগে-আগেই করে দিচ্ছিলেন।
Read More