সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২০)

এবারেও কিন্তু গাড়ি ছাড়বার পরে আমার মুখ থেকে একটা প্রশ্ন বেরিয়ে পড়ল— ‘সাধুবাবা বাথরুমে গিয়ে ভ্যানিস করে গেল ? 

ফেলুদা দাঁতের ফাঁক দিয়ে ছিক করে খানিকটা পানের পিক রাস্তায় ফেলে দিয়ে বলল, “তা হতে পারে। আগেকার দিনে তাে সাধুসন্ন্যাসীদের ভ্যানিস-ট্যালিস করার ক্ষমতা ছিল বলে শুনেছি।’ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড বুঝলাম ফেলুদা কথাটা সিরিয়াসলি বলছে না, যদিও ওর মুখ দেখে সেটা বোঝার কোনও উপায় নেই। 

সেশনের গেট ছাড়িয়ে বড় রাস্তায় পড়তেই একটা ব্যান্ডের আওয়াজ পেলাম। ভোঁল্পর ভোর ভোঁঙ্গর ভোঁঙ্গর…আওয়াজটা এগিয়ে আসছে। 

তারপর দেখলাম আমাদেরই মতাে একটা টাঙ্গা, কিন্তু সেটার গায়ে কাগজের ফুল, বেলুন, ফ্ল্যাগ—এই সব দিয়ে খুব সাজানাে হয়েছে। বাজনাটা বাজছে একটা লাউডস্পিকারে, আর একটা রঙিন কাগজের গাধার টুপি পরা লােক গাড়ির ভিতর থেকে গােছা গােছা করে কী একটা ছাপানাে কাগজ রাস্তার লােকের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে। 

ফেলুদা বলল, “হিন্দি ফিল্মের বিজ্ঞাপন। ‘ 

সত্যিই তাই। গাড়িটা আরেকটু কাছে আসতেই রংচঙে ছবি আঁকা বিজ্ঞাপনের বাের্ডটা দেখতে পেলাম । ছবির নাম ডাকু মনসুর।’ 

হ্যান্ডবিলের দু–একটা আমাদের গাড়ির ভিতর এসে পড়ল, আর ঠিক সেই সময় একটা দলাপাকানাে সাদা কাগজ বেশ জোরে গাড়ির মধ্যে এসে ফেলুদার বুক পকেটে লেগে গাড়ির মেঝেতে পড়ল। 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২০)

আমি চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, ‘লােকটাকে দেখেছি ফেলুদা ! কাবলিওয়ালার পােশাক, কিন্তু আমার কথা শেষ হল না। ফেলুদা চট করে কাগজটা তুলে নিয়ে একলাফে চলন্ত টাঙ্গা থেকে রাস্তায় নেমে পাঁই পাঁই করে যে দিকে লােকটাকে দেখা গিয়েছিল সেইদিকে ছুটে গেল। ভিড়ের মধ্যে কলিশন বাঁচিয়ে একটা মানুষ কত স্পিডে ছুটতে পারে সেটা এই প্রথম দেখলাম। 

এর মধ্যে অবিশ্যি টাঙ্গাওয়ালা গাড়ি থামিয়েছে। আমি আর কী করব ? অপেক্ষা করে রয়েছি। ব্যান্ডের আওয়াজ ক্রমশ মিলিয়ে আসছে, তবে রাস্তায় কতগুলাে বাচ্চা বাচ্চা ছেলে এখনও হ্যান্ডবিল কুড়ােচ্ছে। এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এসে গাড়ােয়ানকে ইশারা করে চালানাের হুকুম দিয়ে এক লাফে গাড়িতে উঠে ধপ্ করে সিটে বসে পড়ে ফেলুদা বলল, নতুন জায়গাতে অলিগলিগুলাে জানা নেই, তাই বাবাজি রক্ষে পেয়ে গেলেন। 

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি লােকটাকে দেখেছিলে ? তুই দেখলি, আর আমি দেখব না ? আমি আর কিছু বললাম না। ফেলুদা লােকটাকে না দেখে থাকলে আমি ওকে বলতাম যে যদিও লােকটার গায়ে কাবলিওয়ালার পােশাক ছিল, কিন্তু অত কম লম্বা কাবলিওয়ালা আমি কখনও দেখিনি। 

ফেলুদা এবার পকেট থেকে দলাপাকানাে কাগজটা খুলে হাত দিয়ে ঘষে সমান করে, চোখের খুব কাছে নিয়ে তার মধ্যে যে লেখাটা ছিল সেটা পড়ে ফেলল। তারপর সেটাকে তিনভাঁজ করে ওর মানিব্যাগের ভিতর নিয়ে নিল । লেখাটা যে কী ছিল সেটা আর আমার জিজ্ঞেস করার সাহস হল না।। | বাড়ি ফিরে দেখি ধীরুকাকার সঙ্গে শ্রীবাস্তব এসেছেন। শ্রীবাস্তবকে দেখে মনে হল না যে আংটিটা যাওয়াতে তাঁর খুব একটা দুঃখ হয়েছে। তিনি বললেন, ‘উ আংটি ছিল অপয়া।

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২০)

যার কাছে যাবে তারই দুশ্চিন্তা হােবে, বিপদ হােবে, বাড়িতে ডাকু আসবে। আপনি তাে লাকি, ধীরুবাবু। ধরুন যদি ডাকু এসে ঝামেলা করত, গােলাগােলি চালাতাে! | ধীরুকাকা একটু হেসে বললেন, তা হলে তবু একটা মানে হত। এ যে একেবারে ভাঁওতা। দিয়ে বুদ্ধ বানিয়ে জিনিসটা নিয়ে চলে গেল। এটা যেন কিছুতেই হজম করতে পারছি না।’ 

 শ্রীবাস্তব বললেন, আপনি কেন ভাবছেন ধীরুবারু। আংটি আমার কাছে থাকলেও যেত, আপনার কাছে থাকলেও যেত। আর আপনি যে বলেছিলেন পুলিশে খবর দেবেন—তাও করবেন না। এতে আপনার বিপদ আরও বেড়ে যাবে। যারা চুরি করল, তারা খেপে গিয়ে ফির আপনাদের উপর হামলা করবে।‘ | ফেলুদা এতক্ষণ একটা সােফায় বসে একটা লাইফ ম্যাগাজিন দেখছিল, এবার সেটাকে বন্ধ করে টেবিলে রেখে দিয়ে হাত দুটোকে সােফার মাথার পিছনে এলিয়ে দিয়ে বলল, 

মহাবীরবাবু জানেন এ আংটির কথা ? 

‘পিয়ারিলালের ছেলে ? 

‘হ্যাঁ।’ | ‘সে তাে আমি জানি না ঠিক। মহাবীর ডুন স্কুলে পড়ত, ওখানেই থাকত । তারপর মিলিটারি একাডেমিতে জয়েন করেছিল। তারপর সেটা ছেড়ে দিল, বােম্বাই গিয়ে ফিল্মে 

অ্যাকটিং শুরু করল। 

‘উনি ফিল্মে নামার ব্যাপারে পিয়ারিলালের মত ছিল ? ‘সে বিষয়ে আমায় কিছু বলেননি পিয়ারিলাল । তবে জানি উনি ছেলেকে খুব ভালবাসতেন। 

‘পিয়ারিলাল মারা যাবার সময় মহাবীর কাছে ছিলেন ? ‘না। বােম্বাই ছিল। খবর পেয়ে এসে গেলাে। ধীরুকাকা বললেন, ‘ফেলুবাবু যে একেবারে পুলিশের মতাে জেরা করছ।’ বাবা বললেন, ‘ও যে শখের ডিটেকটিভ। ওর ওদিকে বেশ ইয়ে আছে। 

শুনে শ্রীবাস্তব খুব অবাক হয়ে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, বাঃ—ভেরি গুড, ভেরি গুড। 

কেবল ধীরুকাকাই যেন একটু ঠাট্টার সুরে বললেন, ‘খােদ ডিটেটিভের বাড়ি থেকেই মালটা চুরি হল, এইটেই যা আপশােস।’ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২০)

ফেলুদা এ সব কথাবার্তায় কোনও মন্তব্য না করে শ্রীবাস্তবকে আরেকটা প্রশ্ন করল, ‘মহাবীরবাবুর ফিল্মে অ্যাকটিং করে ভাল রােজগার হচ্ছে কি ? 

শ্রীবাস্তব বললেন, সেটা ঠিক জানি না। মাত্র দুবছর তাে হল ? ‘ওঁর এমনিতে টাকার কোনও অভাব আছে ? ‘না। কারণ, পিয়ারিলাল ওকেই সম্পত্তি দিয়ে গেছেন। সিনেমাটা ওর শখের ব্যাপার।’ 

‘ হুবলে ফেলুদা আবার লাইফটা তুলে নিল। 

শ্রীবাস্তব হঠাৎ তাঁর রিস্ট ওয়াচের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই দেখুন, আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার পেশেন্টের কথাই ভুলে গেছি। আমি চলি ! 

শ্রীবাস্তবকে তাঁর গাড়িতে পৌঁছে দিতে বাবা আর ধীরুকাকা বাইরে গেলে পর ফেলুদা ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে একটা বিরাট হাই তুলে বলল, তাের চাঁদে যেতে ইচ্ছে করে, না মঙ্গল গ্রহে ? 

আমি বললাম, আমার এখন শুধু একটা জিনিসই ইচ্ছে করছে।’ ফেলুদা আমার কথায় কান না দিয়ে বলল, লাইফে চাঁদের সারফেসের ছবি দিয়েছে । দেখে জায়গাটাকে খুব ইন্টারেস্টিং বলে মনে হচ্ছে না। মঙ্গল সম্বন্ধে তবু একটা কৌতূহল হয়। 

আমি এবার একেবারে চেয়ার ছেড়ে উঠে বললাম, ‘ফেলুদা আমার কৌতূহল হচ্ছে তােমার ম্যানিব্যাগে যে কাগজটা আছে সেইটি দেখার জন্যে। 

“ওঃ~~ওইটে ! ‘ওটা দেখাবে না বুঝি ? ‘ওটা উর্দুতে লেখা। ‘তবু দেখি না। ‘এই দ্যাখ। 

ফেলুদা ভাঁজ করা কাগজটা বার করে সেটা দু আঙুলের ফাঁকে ধরে ক্যারামের গুটির মতাে করে আমার দিকে ছুঁড়ে দিল। খুলে দেখি সেটায় লেখা আছে—খুব হুঁশিয়ার! 

আমি বললাম, তবে যে বললে উর্দু ? ‘বােকচন্দর খুব আর হুঁশিয়ার—এই দুটো কথাই যে উর্দু সেটাও বুঝি তাের জানা নেই? 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *