সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২২)

অড়ত শখের নমুনা। এই সব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, আর কখন যে আবার ঘুমটা ভেঙে গেছে তা জানি না। জাগতেই মনে হল চারিদিক ভীষণ নিস্তব্ধ। ঢাকের বাজনা থেমে গেছে, কুকুর শেয়াল কিছু ডাকছে না। খালি ফেলুদার জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলার শব্দ, আর মাথার পিছনে টেবিলের উপর রাখা টাইম পিসটার টিক টিক শব্দ। আমার চোখটা পায়ের দিকের জানালায় চলে গেল। 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ডজানালা দিয়ে রােজ রাত্রে দেখেছি আকাশ আর আকাশের তারা দেখা যায়। আজ দেখি আকাশের অনেকখানি চাকা। একটা অন্ধকার মতাে কী যেন জানালার প্রায় সমস্তটা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। 

ঘুমের ঘােরটা পুরাে কেটে যেতেই বুঝতে পারলাম সেটা একটা মানুষ। জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে আমাদেরই ঘরের ভিতর দেখছে। 

যদিও ভয় করছিল সাংঘাতিক, তবু লােকটার দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারলাম না। আকাশে তারা অল্প অল্প থাকলেও ঘরের ভিতর আলাে নেই, তাই লােকটার মুখ দেখা অসম্ভব। কিন্তু এটা বুঝতে পারছিলাম যে তার মুখের নীচের দিকটা—মানে নাক থেকে থুতনি অবধি-~~একটা কালাে কাপড়ে ঢাকা ! | 

 এবার দেখলাম লােকটা ঘরের ভিতর হাত ঢুকিয়েছে, তবে শুধু হাত নয়, হাতে একটা লম্বা ডাল্ডার মতাে জিনিস রয়েছে। 

একটা মিষ্টি অথচ কড়া গন্ধ এইবার আমার নাকে এল। একে ভয়েতেই প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল, এখন হাত-পাও কী রকম যেন অবশ হয়ে আসতে লাগল । 

আমামনে যত জোর আছে, সবটা এক সঙ্গে করে, শরীরটা প্রায় একদম না নাড়িয়ে, আমার বাঁ হাতটা আমার পাশেই ঘুমন্ত ফেলুদার দিকে এগিয়ে দিলাম । 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২২)

আমার চোখ কিন্তু জানালার দিকে। লােকটা এখনও হাতটা বাড়িয়ে রয়েছে, গন্ধটা বেড়ে চলেছে, আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। 

আমার হাতটা ফেলুদার কোমরে ঠেকল। আমি একটা ঠেলা দিলাম। ফেলুদা একটু নড়ে উঠল। নড়তেই ক্যাঁচ করে খাটের একটা শব্দ হল । আর সেই শব্দটা হতেই জানালার লােকটা হাওয়া ! 

ফেলুদা ঘুমাে ঘুমাে গলায় বলল, ‘খোঁচা মারছিস কেন ? আমি শুকনাে গলায় কোনওরকমে ঢােক গিলে বললাম, ‘জানালায়।’ ‘কে জানালায় ? ঈস-গন্ধ কীসের ?’—বলেই ফেলুদা একলাফে উঠে জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর কিছুক্ষণ একদৃষ্টে বাইরের দিকে চেয়ে থেকে ফিরে এসে বলল, “কী 

দেখলি ঠিক করে বল তাে। 

আমি তখনও প্রায় কাঠের মতাে পড়ে আছি। কোনওমতে বললাম, একটা লােক…হাতে ডান্ডা…ঘরের ভেতর 

‘হাত বাড়িয়েছিল ? ‘হ্যাঁ !’ ‘বুঝেছি। লাঠির ডগায় ক্লোরােফর্ম ছিল। আমাদের অজ্ঞান কবার তালে ছিল।’ ‘কেন ? ‘বােধহয় আরেক আংটি-চোর । ভাবছে এখনও আংটি এখানেই আছে। যাগে—তুই এ ব্যাপারটা আর বাবা কাকাকে বলিস না। মিথ্যে নাভাস-টাভাস হয়ে আমার কাজটাই ভেস্তে দেবে।

পরদিন সকালে বাবা আর ধীরুকাকা দুজনেই বললেন যে আর বিশেষ কোনও গােলমাল হবে বলে মনে হচ্ছে না । আংটি উদ্ধারের ভার পুলিশের উপর দিয়ে দেওয়া হয়েছে, ইনস্পেক্টর গগরি কাজ শুরু করে দিয়েছেন। 

পুলিশে আংটি খুঁজে পেলে ফেলুদার উপর টেক্কা দেওয়া হবে, আর তাতে ফেলুদার মনে লাগবে, এই ভেবে আমি মনে মনে প্রার্থনা করলাম পুলিশ যেন কোনওমতেই আহটি খুঁজে না পায়। সে ক্রেডিটটা যেন ফেলুদারই হয়। 

বাবা বললেন, “আজ তােদের আরও কয়েকটা জায়গা দেখিয়ে আনব ভাবছি। 

ঠিক হল দুপুরে খাওয়ার পর বেরােনো হবে। কোথায় যাওয়া হবে সেটা ঠিক করে। দিলেন বনবিহারীবাবু। 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২২)

আমরা সবে খেয়ে উঠেছি, এমন সময় বনবিহারীবাৰু এসে হাজির। বললেন, “আপনাদের বাড়ি দিনে ডাকাতির খবর পেয়ে চলে এলাম। একটা ভাল দেখে হাউন্ড পুষলে এ-কেলেঙ্কারি হত না। সাধুবাবার উদ্দেশ্য সাধু না অসাধু, সেটা বুঝতে একটা ওয়েল-ট্রেনড জেতাে হাউন্ডের লাগত ঠিক পাঁচ সেকেন্ড। যাক চোর পালানাের পর আর বুদ্ধি দিয়ে কী হবে বলুন। 

 বনবিহারীবাবু সঙ্গে কাগজে মােড়া পান নিয়ে এসেছিলেন। বললেন, লখনৌ শহরের বেস্ট পান। খেয়ে দেখুন { এক বেনারস ছাড়া কোথাও পাবেন না এ জিনিস। 

আমি মনে মনে ভাবছি, বনবিহারীবাবু যদি বেশিক্ষণ থাকেন তা হলে আমাদের বাইরে যাওয়া ভেস্তে যাবে, এমন সময় উনি নিজেই বললেন, “বাড়িতে থাকছেন, না বেরােচ্ছেন ? | বাবা বললেন, ‘ভেবেছিলাম এদের নিয়ে একটা কিছু দেখিয়ে আনব। ইমামবড়া ছাড়া 

তাে আর কিছুই দেখা হয়নি এখনও। | ‘রেসিডেন্স দেখােনি এখনও ?’ প্রশ্নটা আমাকেই করলেন ভদ্রলোক। আমি মাথা নেড়ে না বললাম। 

‘চলাে—-আমার মতো গাইড পাবে না। মিউটিনি সম্বন্ধে আমার খরাে নলেজ আছে। 

তারপর ধীরুকাকার দিকে ফিরে বললেন—“আমার কেবল একটা জিনিস জানার কৌতুহল হচ্ছে। আংটিটা কোথেকে গেল। সিন্দুকে রেখেছিলেন কি ? 

ধীরুকাকা বললেন, সিন্দুক আমার নেই। একটা গােদরেজের আলমারি খুলে নিয়ে গেছে। চাবি অবিশ্যি আমার পকেটেই ছিল। বােধহয় ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে খুলেছে।’ 

“শুনলাম বাক্সটা নাকি রেখে গেছে ? 

‘ভেরি স্ট্রেঞ্জ। বাক্স দেরাজে ছিল ? ‘হ্যাঁ।’ ‘দেরাজ ভাল করে খুঁজে দেখেছেন তাে ? ‘তন্ন তন্ন করে।’ ‘কিন্তু একটা জিনিস তাে করতে পারেন। আলমারির হাতলে, বাক্সটার গায়ে ফিঙ্গার প্রিন্ট আছে কি না সেটা তাে…’। 

‘থাকলে সবচেয়ে বেশি থাকবে আমারই আঙুলের ছাপ। ওতে সুবিধে হবে না।’ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২২)

বনবিহারীবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘খাসা লােক ছিলেন বাবা পিয়ারিলাল ! আংটিটা ইনসিওর পর্যন্ত করেননি। আর যাঁকে দিয়ে গেলেন তিনিও অবশ্যি তথৈবচ। যাক—হাড়ের ভাক্তারের এবার হাড়ে হাড়ে শিক্ষা হয়েছে।’ 

এবার আর আমাদের টাঙ্গায় যাওয়া হল না। বনবিহারীবাবুর গাড়িতেই সবাই উঠে পড়লাম। ফেলুদা আর আমি সামনে ড্রাইভারের পাশে বসলাম। 

ক্লাইভ রােড দিয়ে যখন যাচ্ছি, তখন বনবিহারীবাবু আমাদের দুজনকে উদ্দেশ করে বললেন, তােমরা এখানে এসে এমন একটা রহস্যের ব্যাপারে জড়িয়ে পড়বে ভেবেছিলে কি ? 

আমি মাথা নেড়ে না বললামফেলুদা খালি হিঃ হিঃ করে একটু হাসলবাবা বললেন, ফেলুবাবুর অবিশ্যি পােয়া বারাে, কারণ ওর এ সব ব্যাপারে খুব ইন্টারেস্ট ও হল যাকে বলে শখের ডিটেকটিভ‘ 

বটে ? বনবিহারীবাবু যেন খবরটা শুনে খুবই অবাক আর খুশি হলেন। বললেন, ব্রেনের ব্যায়ামের পক্ষে ওটা খুব ভাল জিনিস। তা, রহস্যের, কিছু কিনারা করতে পারলে ফেলুবাবু ? 

ফেলুদা বলল, এ তাে সবে শুরু।অবিশ্যি তুমি কোন রহস্যের কথা ভাবছ জানি না। আমার কাছে অনেক কিছুই রহস্যজনক।‘   

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৩)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *