আহসান উঠে দাঁড়িয়ে আবার বসে পড়ল। হাত বাড়িয়ে ক্যাসেটটা বন্ধ করে সহজ গলায় বলল, ভালো করে চা বানিয়ে আন। অনেক রকম ঝামেলা আছে।জাহানারা প্রায় দৌড়ে গেল রান্নাঘরে। কিছুক্ষণ পর শোনা গেল সে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বডড বিরক্ত লেগেছিল কান্না শুনে। ইচ্ছে করছিল উঠে গিয়ে কড়া একটা ধমক দিতে। ধমক দেওয়া হয় নি। কিছুক্ষণ পর জাহানারা চা নিয়ে এল। সেই চা-ও মুখে দেওয়া যায় নি।
আগের বারের মতো চিনি দিয়ে সরবত। গরম করেছে। আগুনের মত। মুখে দিতেই জিব পুড়ে গেল।আজ এ-বাড়িতেও হয়ত তাই হয়েছে। অবশ্যি কান্নার কোনো শব্দ আসছে না। ভদ্রলোকের পাঁচ মেয়ে। কিছু একটা হলে এরা কেঁদে বাড়ি মাথায় তুলবে। ঘন-ঘন ফিট-টিট হবে। আত্মীয়-স্বজনে বাড়ি গিজগিজ করবে। হৈ-চৈ চেঁচামেচি। মৃত্যু যেমন কুৎসিত, তার পরবর্তী ব্যাপারগুলো তার চেয়েও কুৎসিত।
এ-বাড়িতে কুৎসিত অংশগুলো এখনো শুরু হচ্ছে না। তবে শুরু হতে কতক্ষণ। যেকোনো সময় শুরু হয়ে যাবে। তার আগে একবার গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসা দরকার। এটা হচ্ছে সামাজিকতা। করুণ মুখে খোঁজ-খবর করতে হবে। একবার হাসপাতালে যেতেও হতে পারে।বসার ঘরের কলিংবেল টিপতেই অপরিচিত একজন মাঝবয়েসী মহিলা বের হয়ে এলেন। বিরক্ত মুখে বললেন, কারে চান? করিম সাহেবের মেয়েরা কেউ আছে? কোন মেয়েরে চান? বড় মেয়ে কিংবা অন্য কেউ।আপনে কে?
আমি তিনতলায় থাকি। ইনাদের ভাড়াটে। আমার নাম আহসান।আচ্ছা। বুঝেছি। বসেন।আহসান বসতে-বসতে বলল, করিম সাহেবের খবর নিতে এসেছি। উনার খবর কি? কেমন আছেন এখন? ভালো না। অবস্থা খুবই খারাপ। আপনে বসেন, বেগমেরে ডাক দেই। ও বেগম, বেগম।এই যুগে মেয়েদের নাম কেউ বেগম রাখে? কি অদ্ভুত নাম এ-বাড়ির মেয়েদের বেগম, শাহাজাদী, মহল।
মহল হচ্ছে তিন নম্বর মেয়েটি। এই মেয়েটি বড় দুবোনের মতোনয়। একটু অন্যরকম। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে-নামতে দেখা হয়ে গেলে বড় দুববানের মতো শক্ত হয়ে যায় না। বরং হাসি-হাসি মুখে তাকায়। মাঝে-মধ্যে দু- একটা কথা-কথাও হয়। যেমন, আহসান যদি বলে, কি ভালো? সে লাজুক স্বরে বলে, দ্ধি।যাওয়া হচ্ছে কোথায়? ছাদে?
জ্বি। আচার শুকাতে।ভালো। বেশি করে আচার শুকাও। আচার ভালো জিনিস।সন্ধ্যাবেলা ওদের কাজের মেয়ে বাটি ভর্তি আচার নিয়ে উপস্থিত। আহসান চমকে উঠে বলেছে, আচার কী জন্যে? মহল আপা পাঠাইছে।আমি তো আচার খাই না।ও আল্লা, মহল আপা কইছে আপনে চাইছেন।আরে না। খাই না যে জিনিস সেটা শুধু-শুধু চাইব কেন?
কাজের মেয়েটি বাটি ফিরিয়ে নিয়ে গেল। আহসান খানিকটা বিরক্তই হল। মহল মেয়েটির বুদ্ধি-শুদ্ধি সেরকম নেই। বুদ্ধি যে কম তার আরেকটি প্রমাণ আছে। একবার নিউমার্কেটে দেখা। সে তার অন্য দুই বোনের সঙ্গে গিয়েছে। বোরা নেই। তিন বোন হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। দৃশ্যটি অদ্ভুত। এত বড় বড় তিনটি মেয়ে হাত ধরাধরি করে হাঁটবে কেন? আহসানকে দেখে তিনজন ভূত দেখার মত চমকে উঠল। এটিও অস্বাভাবিক। মহল নিজেকে সামলে নিয়ে এগিয়ে এসে বলল, আমরা শাড়ি কিনতে এসেছি।
বেশ।তিনজন একরকম শাড়ি কিনব।ভালো।আপনি একটু আসবেন আমাদের সঙ্গে? কেন? আমাকে দরকার কেন? আপনি যেটা বলবেন সেটা কিনব।তোমরা তোমাদের পছন্দ মতো কিনবে। আমি বলব কেন? আপনি আসলে বেগম আপা কিছু বলবে না।আরে না তোমরা তোমাদের মার্কেটিং কর। আমি অন্য কাজে এসেছি।মহল ফিরে গিয়ে আবার দুবোনের হাত ধরল।
এদের তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে ওদের মধ্যে মিলের অংশটুকু। তিনজন দেখতে একরকম। একই রকম লম্বা। গলার স্বরও একধরনের। যতবার একসঙ্গে বাইরে যায় হাত ধরাধরি করে হাঁটে। মাঝখানে মহল দু পাশে দু বোন।বাবা মারা গেলে এরা বোধ হয় একই রকম ভঙ্গিতে জড়াজড়ি করে কাঁদবে। এই চিন্তা মাথায় আসায় আহসানের একটু খারাপ লাগছে। একটি পরিবারের এত বড় দুঃসময়ে এমন কথা কী করে সে ভাবল?
আহসানকে বেশ খানিকক্ষণ বসতে হল। আগের সেই মহিলা এক পেয়ালা চা এবং পিরিচ করে দুধেভর্তি এক পিরিচ সেমাই দিয়ে গেলেন। সেমাইয়ের পিরিচে চামচ নেই। খেতে হলে বিড়ালের মত চুক-চুক করে খেতে হবে।একটু বসেন। বেগম আসছে।ঠিক আছে বসছি।আমি বেগমের দূর সম্পর্কের ফুপু। বেগমের আরা আমার মামাতো ভাই।ও আচ্ছা।
ভদ্রমহিলা বসলেন সামনের সোফায়। কৌতূহলী চোখে তাকে দেখতে লাগলেন। আহসান অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। রেবা মেয়েটিকে এরা কি যেতে দেখেছে? দেখাই স্বাভাবিক।
আপনের কথা মহলের কাছে শুনেছি।কি শুনেছেন? আপনের স্ত্রী মারা গেছে।ঠিকই শুনেছেন।একটা ছেলে আছে আপনের? হ্যাঁ আছে।কার সাথে থাকে? ওর মামার বাড়িতে থাকে। ধানমণ্ডি।মহল বলছে আপনি কোনোদিন ছেলেকে এই বাড়িতে আনেন নাই।ছোট ছেলে। মাত্র চার বছর বয়স।চার বছর ছোট হবে কেন? চার বছরের বাচ্চাতো অনেক বড়। তার নাম কি?মারুফ।সেমাইটা খান। সেমাই ভালো হইছে।
সেমাই খেতে ইচ্ছে করছে না।আপনে খাওয়া-দাওয়া হোটেলে করেন? একবেলা হোটেলে করি। একবেলা এখানে খাই।মহল বলেছে আমাকে।মহল দেখি অনেক খবর রাখে।এই কথাটিতে ভদ্রমহিলা খানিকটা হকচকিয়ে গেলেন। আহসান বলল, আমার একটু বাইরে যেতে হবে। আমি পরে এসে খোঁজ নেব। ডাক্তাররা কী বলেছেন?
আর ডাক্তার। ডাক্তারের হাতে এখন নাই। এখন আল্লাহর হাতে।বেগম এসে ঢুকল। তার দেরির কারণ বোঝা যাচ্ছে। সে গোসল করেছে। রাত জাগার ক্লান্তি তাতে দূর হয় নি। চোখ লাল হয়ে আছে। বেগমের হাতে একটি চামচ। চামচ নিয়েই সে নিশ্চয়ই আসে নি। পর্দার ফাঁক দিয়ে প্রথমে দেখে গিয়ে চামচ নিয়ে এসেছে।
বেগম বসল না।আহসান বলল, করিম সাহেবের অবস্থা এখন কেমন? আগের চেয়ে ভালো। শেষরাতে জ্ঞান হয়েছে। কথাটথা বলেছেন।তাই নাকি।জ্বি।আহসান বড়ই অবাক হল। ভদ্রমহিলার কথার সঙ্গে এই মেয়ের কথার কোনো মিল নেই।তোমার অন্য বোনেরা কি হাসপাতালে? জ্বি। আমি গেলে ওরা আসবে। ভাত খাওয়ার জন্যে আসবে।তোমার মা? উনি কোথায়?
উনি হাসপাতালে।আচ্ছা আমি তাহলে উঠি এখন।সেমাইটা খান।সেমাই খেতে ইচ্ছা হচ্ছে না।একটু খান। ঘরে আর কিছু নাই।আহসান বিস্মিত হয়ে তাকাল। মেয়েটির মধ্যে আগের সেই লজ্জা, সংকোচ, কিছুই নেই। অত্যন্ত সহজ ভঙ্গিতে কথা বলছে। বাবার অনুপস্থিতি নিশ্চয়ই এর একমাত্র কারণ নয়।আহসান উঠতে-উঠতে বলল, আমি যাব একবার করিম সাহেবকে দেখতে।আপনি গেলে বাবা খুব খুশি হবেন।আহসান অবাক হয়ে বলল, তাই নাকি?
জ্বি খুব খুশি হবেন। বাবা আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন।আমার কথা কী জিজ্ঞেস করলেন? জিজ্ঞেস করছিলেন আপনি এ্যাকসিডেন্টের খবর পেয়েছেন কি-না। মহলকে জিজ্ঞেস করছিলেন।আচ্ছা।আব্বা আপনাকে খুব ভালেমানুষ জানেন।আহসানের দৃষ্টি তীক্ষ হল। মেয়েটি কি কিছু বোঝাতে চাচ্ছে? বলতে চাচ্ছেভালোমানুষ হিসেবে জানলেও আপনি ভালোমানুষ নন। আপনার ঘর থেকে সুন্দর মতো, রোগা ফর্সা একটি মেয়ে বের হয়েছে। সে রাত কাটিয়েছে আপনার সঙ্গে।
বেগমও তার দিকে তাকিয়ে আছে। সরল ও ক্লান্ত চোখ। না এই মেয়ে কিছু দেখে নি। দেখলে চোখে তার ছায়া পড়ত। আহসান বলল, আমি যাব একবার।আজ যাবেন? হ্যাঁ আজই। বিকেলে। ভিজিটিং আওয়ার্সে।আহসান চলে যাবার জন্য পা বাড়াল। বেগম ঠাণ্ডা গলায় বলল, আৰ্ব কোথায় আছেন তা তো আপনি জানেন না।আহসানকে থমকে দাঁড়াতে হল।
এই কাগজে ঠিকানাটা লেখা আছে।বেগমের হাতে এক টুকরো কাগজ। সে তৈরি হয়েই এসেছে। মেয়েটি বুদ্ধিমতি। করিম সাহেব কি এই তথ্যটি জানেন? বোধ হয় জানেন না। আহসান হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিল। মেয়েটি এতক্ষণ কাগজটি লুকিয়ে রেখেছিল। হয়ত ভেবেছে আহসান নিজেই চাইবে।আচ্ছা এখন যাই?
বেগম জবাব দিল না।বাড়ির সামনে ট্রাক দাঁড়িয়ে। জলিল মিয়া বারান্দায় বসে আছে। তার হেল্লার বালতি-বালতি পানি এনে ট্রাকের চাকায় ঢালছে। এই হেল্পারটিকেই বোধ হয় কুকুর কামড়েছে। বাঁ পায়ে পট্রি বাঁধা। সে কিছুক্ষণ পর-পর থুথু ফেলছে। আগেও ফেলত-নাকি কুকুর কামড়ানোর পর ফেলছে কে জানে। জলিল বলল, স্লামালিকুম প্ৰবেসর সাহেব।
ওয়ালাইকুম সালাম।ঝামেলা দেখেন না, এই বিপদের মধ্যে ট্রিপে যাওয়া লাগবে। বগুড়া। পার্টির সাথে কথাবার্তা বলা। না গেলে হবে না।ও।হেল্পার হারামজাদার শরীরটাও ভালো না। ইনজেকশন দেওয়া লাগবে। আপনি যান কোথায়? নিউমার্কেটের দিকে যাব।একটু বসেন ট্রাক নিয়া বার হব। নামায়ে দিব আপনারে।না লাগবে না।আমাদের দেরি হইত না।কোনো দরকার নেই। শ্যামলীতে আমার একটা কাজ আছে।ও আচ্ছা। যান তাহলে। স্লামালিকুম।
আহসানরাস্তায় নেমে পড়ল। রাস্তায় প্যাচপেচেকাদা। ইট বিছানোরাস্তা। জায়গায়জায়গায় ইট উঠে গিয়ে গর্ত হয়েছে। পানি জমে আছে। সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি মানোযোগ দিয়ে সে রাস্তা দেখছে। মনে-মনে সে কিছু একটা খুজছে। যা খুঁজছে তা সে পেয়ে গেল।রাস্তার একপাশে ঘাসের ওপর এক পাটি স্যান্ডেল। রেবা কিংবা পারুল নামের মেয়েটির স্যান্ডেল। যাবার সময় বোধ হয় বোরির চোখে পড়ে নি।
লাল ফিতার নতুন স্যান্ডেল, হয়ত অল্প কিছুদিন হল কিনেছে। আহসান লক্ষ করল তার মন খারাপ লাগছে। অথচ মন খারাপ হবার মতো কিছুই হয় নি। এই মেয়েটিকে এক রাতের জন্যে সে আশ্রয় দিয়েছিল। রাত কেটে গেছে সে চলে গেছে, ব্যস ফুরিয়ে গেল কিন্তু এখন এমন লাগছে কেন? শুধু যে এখন এমন লাগছে তাই না, ভোরবেলা ঘুম ভেঙে যখন দেখেছে মেয়েটি চলে গিয়েছে তখনি বুকে আচমকা একটা ধাক্কা লেগেছিল।
যা সে প্ৰাণপণে অস্বীকার করেছে। কিন্তু কেন? এরকম হচ্ছে কেন? আহসান একটি সিগারেট ধরাল। কার্যকারণ ছাড়া এই পৃথিবীতে কিছুই হয় না। সে কি কার্যকারণ ছাড়াই একটি স্যান্ডেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে? নিশ্চয়ই না। কারণ একটি আছে যা স্বীকার করতে তার ইচ্ছে করছে না। রেবা বা পারুল নামের মেয়েটির সঙ্গে তারিনের চেহারার খুব মিল।
প্রথম দিকে চোখে পড়ে নি কিন্তু মেয়েটি যখন তারিনের শাড়ি পরে বেরুল তখন আহসানের গা কাঁপছিল। কী অদ্ভুত মিল। কী অসম্ভব ব্যাপার? তখন তা সে স্বীকার করে নি। রূঢ় ব্যবহারই করেছে মেয়েটির সঙ্গে। খেতে বলেছে অবশ্যি। সেই বলায় মমতা বা করুণা ছিল না। কিংবা থাকলেও তার প্ৰকাশ হয় নি। প্রকাশ হলে ক্ষতি ছিল না কিছু।
Read more
