আফসার সাহেব বললেন, সরি। এই নিন। বলেই হেসে ফেললেন।মীরা লক্ষ করলেন, আফসার সাহেব অনেকটা সহজ হয়ে এসেছেন। মুখের কাঠিন্য কমে গেছে। মীরা মিসির আলি নামের লোকটির প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করলেন। এই লোক আর কিছু পারুন না-পরুিন, তাঁর স্বামীর প্রাথমিক কাঠিন্য ভেঙে দিয়েছেন। এটি কম কথা নয়।
তা ছাড়া লোকটির কথা বলার ভঙ্গিও তাঁর ভালো লাগল। কথাবার্তায় কোনো সবজান্তা ভঙ্গি নেই। পা উঠিয়ে ছেলেমানুষের মতো বসে আছেন। কথা বলার সময় হাত নাড়ছেন। তাঁর সামনে রাখা চায়ের কাপে এক ফোঁট চাও নেই। অনেক আগেই চায়ের শেষ বিন্দুটিও তিনি শেষ করেছেন। অথচ বেচারার সেটা খেয়াল নেই। খালি চায়ের কাপেই ক্রমাগত চুমুক দিচ্ছেন।
মাঝে-মাঝে চুমুক দেবার আগে চায়ের কাপে ফুঁ দিচ্ছেন। ভাবটা এমন যে, গরম চা ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে খেতে হচ্ছে।মিসির আলি খাট থেকে নামতে-নামতে বললেন, আফসার সাহেব, আমি ছোট একটা ক্যাসেট প্লেয়ার জোগাড় করেছি। সেখানে বিড়ালের কথা টেপ করা আছে। আপনাকে তা শোনাব এবং আপনি বলবেন-বিড়াল কী বলছে। পারবেন না?
অবশ্যই পারব।আজ শুধু এই পরীক্ষাটাই করব, তারপর অন্য পরীক্ষা অন্য সময়ে করা হবে। আফসার সাহেব বললেন, আমি টেপ শুনে যদি বলি বিড়াল এই কথা বলছে তাহলে তা আপনার বোঝার উপায় নেই। আমি ভুল বলছি না। সত্যি বলছি।বোঝার উপায় আছে।কী উপায়? আপনি নিশ্চয়ই বিড়ালের কথা বোঝেন না! তা বুঝি না। তার পরেও উপায় আছে- আচ্ছা এখন মন দিয়ে শুনু—
টেপ খানিকক্ষণ বাজানো হল। একটা বিড়ালের ম্যায়াও মর্য্যায়াও শোনা যাচ্ছে। আফসার সাহেব তাঁর সমস্ত ইন্দ্ৰিয় তীক্ষ্ণ করে শুনলেন। টেপ বাজান শেষ হল। মিসির আলি বললেন, বলুন, বিড়ালটা কী বলল।বুঝতে পারিনি।কিছুই বুঝতে পারেন নি? জ্বি-না।ভালো কথা।—এখন অন্য একটা শুনুন। খুব মন দিয়ে শুনুন। একই বিড়ালের কথা।–ভিন্ন সময়ে ভিন্ন পরিস্থিতিতে।
আফসার সাহেব শুনলেন। তাঁর মুখে হতাশার ভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কারণ এবারও তিনি কিছু বুঝতে পারছেন না। কিছুই না। বিড়ালের সাধারণ ম্যাঁয়াও।কিছু বুঝলেন? জ্বি-না।কিছুই না? না।আরো একটি অংশ শোনাচ্ছি। দেখুন, এটা বুঝতে পারেন কি না। এবার অন্য বিড়াল, আগেরটা না।আফসার সাহেব হতাশ গলায় বললেন, আমার মনে হয়না কিছু বুঝতে পারব। এ— রকম হচ্ছে কোন কে জানে! খুব মন দিয়ে শুনুন।মন দিয়েই শুনছি।আরো মন দিন। চোখ বন্ধ করে শুনুন।
তিনি শুনলেন। কিছুই বুঝলেন না। মিসির আলি বললেন, তিনটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিড়ালের কথা টেপ করা হয়েছে। প্রথম বার বিড়ালকে দুধ খেতে দিয়ে গায়ে-মাথায় হাত বোলান হয়েছে। সে যখন শব্দ করেছে তখন তা টেপ করা হল। দ্বিতীয় বার তাকে একটা সূচালো কাঠি দিয়ে খোঁচা দেওয়া হচ্ছিল। তৃতীয় বারে অন্য একটা বিড়ালকে ভয় দেখানো হচ্ছিল।আফসার সাহেব বিষণ্ণ গলায় বললেন, আপনি নিশ্চয়ই আমার কথা পুরোপুরি অবিশ্বাস করছেন। ধরেই নিয়েছেন আমি মিথ্যা করে বলেছি-বিড়ালের কথা বুঝতে পারি।
আমি এত দ্রুত এবং এত সহজে কোনো সিদ্ধান্তে আসি না। আমি এখনো ধরে নিচ্ছি। আপনি বিড়ালের সব কথা বুঝতে পারেন। এই হয়তো পারছেন না। আপনাকে আমি যা করতে বলব তা হচ্ছে, সহজ- জীবন-যাপনের চেষ্টা করবেন! বিড়াল নিয়ে খুব বেশি ভাববেন না, আবার খুব কমও ভাববেন না। খাওয়াদাওয়া করবেন! নিয়মিত অফিসে যাবেন। অফিসের সমস্যা মেটাতে চেষ্টা করবেন। যদি না-মেটে তাতেও ক্ষতি নেই। সব পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে চলার চেষ্টা আপনাকে করতে হবে।
মীরা বললেন, ওকে নিয়ে বাইরে কোথাও বেড়াতে গেলে কেমন হয়? যেমন ধরুন, কক্সবাজারে কিছুদিন কাটিয়ে এলাম।মিসির আলি বললেন, আমি তার প্রয়োজন দেখছি না। সমস্যা থেকে দূরে সরে যাওয়া সমস্যা সমাধানের কোনো পথ নয়। সমস্যাকে মোকাবেলা করতে হয়। সমস্যার ভেতরে থেকে।আফসার সাহেব বললেন, আমরা কি এখন উঠব?
জ্বি, নিশ্চয়ই উঠবেন। আর শুনুন আফসার সাহেব, আপনি এখন এক ধরনের ঘোরের মধ্যে আছেন। এই ঘোর-ঘোর ব্যাপারটা আমার ভালো লাগছে না।আমি ঘোরের মধ্যে আছি, এটা কেন বলছেন? এটা বলছি, কারণ আপনার চারপাশে কী ঘটছে তা আপনি দেখছেন না। তাকিয়ে আছেন, কিন্তু কিছুই আপনার চোখে পড়ছে না। আমি দীর্ঘ সময় ধরে একটা খালি কাপে চুমুক দিচ্ছি। মাঝে-মাঝে এমন ভাব করছি যে গরম চা ফুঁ দিয়ে ঠাণ্ডা করে নিচ্ছি।ব্যাপারটা আপনার চোখেও পড়ে নি। অথচ আপনার স্ত্রী ঠিকই ধরেছেন।
খালি কাপে চুমুক দেওয়ার ব্যাপারটা ছিল ইচ্ছাকৃত। আপনার বর্তমান মানসিক অবস্থা বোঝার জন্যে এটা করতে হয়েছে।এই প্রথম বারের মতো অফিসার সাহেবের মনে হল- তাঁর সামনে বসে থাকা রোগা এবং মোটামুটি কুদর্শন মানুষটি অসম্ভব বুদ্ধিমান। এই মানুষটা খুব ঠাণ্ডা মাথায় পুরো পরিস্থিতি হাতের মুঠোয় নিয়ে নিতে পারে। এ-জাতীয় মানুষের সঙ্গে এর আগে তাঁর পরিচয় হয় নি। তিনি বললেন, উঠি মিসির আলি সাহেব?
মিসির আলি বললেন, চলুন, আমিও আপনাদের সঙ্গে যাই-এগিয়ে দিয়ে আসি।এগিয়ে দিতে হবে না।আমি এমনিতেও বেরুব। বিসমিল্লাহ্ হোটেল বলে একটা রেস্টুরেন্ট আছে–আমি রাত নটায় সেখানে ভাত খেতে যাই।মীরা বললেন, আপনি কি একা থাকেন? হ্যাঁ।আপনাকে কি কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?
মিসির আলি সহজ গলায় বললেন, না। বিখ্যাত মানুষদের লোকজন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে বিরক্ত করে। আমি বিখ্যাত কেউ নই। আমার ব্যক্তিগত জীবন এতই সাধারণ যে প্রশ্ন করার কিছুই নেই।আফসার সাহেব হঠাৎ করে প্রায় সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন,–আমাকে একটু সাহায্য করুন। প্লীজ। আমি জানি আপনি পারবেন।আফসার সাহেব তিন দিন পর অফিসে এসেছেন। এই তিন দিনে অনেক কাগজপত্র তাঁর টেবিলে জমা থাকার কথা।
তিনি টেবিলে কোনো কাগজপত্র দেখলেন না। এটাকে মোটামুটি অস্বাভাবিক ব্যাপার বলা যেতে পারে। তাঁর মনে একটা ক্ষীণ সন্দেহ হল! সেই সন্দেহ নিজের মনেই চেপে রাখলেন।অফিসে তাঁর চেয়ারে বসার পরপর তিনি দুধ ছাড়া এককাপ চা খান। এই চা তাঁর বেয়ারা নাজিম বানিয়ে দেয়। পানি গরম কান্নাই থাকে। তিনি অফিসে ঢোকামাত্র কাপে টী-ব্যাগ দিয়ে তাঁর কাছে নিয়ে আসা হয়।অপ্রয়োজনীয় কোনো কথা তিনি নাজিমের সঙ্গে বলেন না।
শুধু নাজিম কেন, কারো সঙ্গেই বলেন না। তাঁর মতে অফিস হচ্ছে কাজকর্মের জায়গা, গল্পগুজবের আখড়া না। আজ আফসার সাহেব নিয়মের ব্যতিক্রম করলেন। নাজিম চায়ের কাপ নামিয়ে রাখামাত্ৰ হাসিমুখে বললেন, কেমন আছ নাজিম? নাজিম বিস্মিত হয়ে বলল, ভালো আছি, স্যার।ভালো থাকলেই ভালো। তুমি থাক কোথায়? পুরানা পল্টন! বাসায় কে কে আছে? স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে আর আমার মা।তোমাদের বাসায় কোনো বিড়াল আছে নাকি?
নাজিম এই প্রশ্নের কোনো মানে বুঝতে পারল না। তাঁর বাসায় বিড়াল আছে কি না এটা স্যার কেন জিজ্ঞেস করলেন? আফসার সাহেব দ্বিতীয় বার প্রশ্নটি করলেন, কী, আছে বিড়াল? জ্বি স্যার, একটা আছে। কত বড়? নাজিম এই প্রশ্নেরও কোনো মানে বুঝল না। বিড়াল কত বড়-তার মানে আবার কী? বিড়াল তো বিড়ালের মতো বড়ই হবে। একটা বিড়াল তো আর বাঘের মতো বড় হবে না, কিংবা ইঁদুরের মতো ছোটও হবে না। নাজিম ক্ষীণ স্বরে বলল, বিড়ালের কথা জিজ্ঞাস করতেছেন কেন স্যার?
আফসার সাহেব অপ্ৰস্তুত হয়ে বললেন, এমনি জিজ্ঞেস করছি-বিড়াল সম্পর্কে একটা বই পড়ছিলাম তো! পড়তে-পড়তে হঠাৎ,… আচ্ছা এখন যাও।বিড়াল সম্পর্কে তিনি যে বই পড়ছেন, এই ঘটনা সত্যি। তিনি ভেবে রেখেছিলেন। বিড়াল বিষয়ে যেখানে যত বই পাবেন, পড়বেন। সমস্ত নিউ মার্কেট ঘেটে একটামাত্র বই পেয়েছেন। উইলিয়াম বেলফোর্ডের ক্যাট ফ্যামিলি?
বিহেভিয়ারেলস্টাডিজ। সেবইয়ে বিড়াল সম্পর্কে বলতে গেলে কিছুই নেই। বাঘ, চিতাবাঘের কথায় পাতা ভর্তি। সুন্দর-সুন্দর রঙিন ছবি-আসল ব্যাপার কিছু নেই।এসে ঢুকল। ক্ষীণ গলায় বলল, স্যার।বই থেকে মুখ তুলে আফসার সাহেব বললেন, কি ব্যাপার? বড় সাহেব আপনেরে সালাম দিছেন।বই বন্ধ করে আফসার সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
ডেল্টা শিপিং করপোরেশনের বড়সাহেবের নাম ইসহাক জোয়ারদার। ছোটখাটো মানুষ। মেজাজ অত্যন্ত খারাপ। আফসার সাহেবকে তিনি দু চোখে দেখতে পারেন না। অবশ্যি কথায়-বার্তায় তা কখনো বুঝতে দেন না।স্যার, ডেকেছেন?ইসহাক সাহেব হাসিমুখে বললেন, গল্পগুজব করার জন্যে ডেকেছি। কেমন আছেন বলুন। শরীর ঠিক আছে?
জ্বি।তিন দিন অফিসে আসেন নি, তাই ভাবলাম কোনো সমস্যা কি-না।জ্বি-না স্যার, কোনো সমস্যা নেই।আপনার এক আত্মীয়ের সঙ্গে পার্টিতে দেখা। তাঁকে আপনার ব্যাপারে খুব উদ্বিগ্ন মনে হল।কেন? বলছিল–আপনার মাথায় কোনো সমস্যা হয়েছে। আপনি নাকি বলে বেড়াচ্ছেন বিড়ালের কথা বুঝতে পারেন?আফসার সাহেব চুপ করে রইলেন। ভেবে পেলেন না ঘটনা এত দ্রুত ছড়াচ্ছে কীভাবে?
মনে হচ্ছে সপ্তাহখানেকের ভেতর ঢাকা শহরের সব লোক জেনে যাবে। পত্রিকার লোক আসবে ইন্টারড়ু নেওয়ার জন্যে। বলা যায় না, টিভির কোনো ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানেও তাঁর ডাক পড়তে পারে। টিভি উপস্থাপক একটা বিড়াল নিয়ে স্টুডিওতে উপস্থিত হবেন। চিকুন গলায় বলবেন–সুপ্রিয় দর্শকমণ্ডলী, এবার আপনাদের জন্যে রয়েছে এক বিশেষ ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা।
আজ আমরা স্টুডিওতে এমন এক ব্যক্তিত্বকে এনেছি যিনি বিড়ালের কথা বুঝতে পারেন বলে দাবি করেন। সেই বিশেষ ব্যক্তিত্বকে হাততালি দিয়ে অভ্যর্থনা করবার জন্যে আপনাদের অনুরোধ করছি। তালি পড়ছে। হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে…. আফসার সাহেবের চিন্তার সুতো ছিঁড়ে গেল। ইসহাক সাহেব বললেনবিড়ালের কথা বুঝতে পারেন বলে যা শুনছি তা কি সত্যি?
জ্বি স্যার, সত্যি! আই সি, ভেরি ইন্টারেষ্টিং। শুধু কি বিড়ালের কথাই বুঝতে পারেন, না কুকুর, গরু, গাধা, ভেড়া, ছাগল-সবার কথাই বুঝতে পারেন?বিড়ালের ব্যাপারটা জানি। অন্যগুলি পরীক্ষা করে দেখি নি।আপনি একটা কাজ করুন না কেন? খাতা এবং পেনসিল নিয়ে চিড়িয়াখানায় চলে যান। যে-সব প্রাণীর কথা। আপনি বুঝতে পারেন তাদের নামের বিপরীতে একটা করে টিক চিহ্ন দিন।
আমার ধারণা, বিড়ালের কথা যখন বুঝতে পারছেন অন্যদেরটাও ইনশাআল্লাহ্ পারবেন।আফসার সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, স্যার, আপনি কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন? সরি-তা একটু ঠাট্টা অবশ্যি করেছি। ক্ষমা করবেন। আমি যদি বলতাম বিড়ালের কথা বুঝতে পারছি, তাহলে আপনিও আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করতেন।না, আমি করতাম না।
হয়তো-বা করতেন না। যাই হোক, আমি করে ফেলেছি। তার জন্যে ক্ষমা চাচ্ছি। আপনি এক কাজ করুন-অফিস থেকে দিন দশেকের ছুটি নিন।আমার ছুটির প্রয়োজন নেই।আমার মনে হয় প্রয়োজন আছে। আপনি ছুটি নিন। সাইকিয়াটিস্টকে দিয়ে ভালোমতো চিকিৎসা করান, নয়তো কিছুদিন পর বলা শুরু করবেন-আপনি পিঁপড়ার কথাও বুঝতে পারছেন। আমি ছুটির ব্যবস্থা করে রেখেছি। যদি চান আমি কয়েক জন সাইকিয়াটিক্টের ঠিকানাও আপনাকে দিতে পারি।
আমি স্যার তার কোনো প্রয়োজন বোধ করছি না।আপনি হয়তো করছেন না, আমি করছি! আমি এমন কাউকে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিতে পারি না, যে পশুদের কথা বুঝতে পারে। আমার এমন অফিসার দরকার, যে মানুষের কথা বুঝতে পারবে। আমি লক্ষ করেছি, আমাদের মধ্যে বেশির ভাগই মানুষের কথা বুঝতে পারি না।আফসার সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।ইসহাক সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, চলে যাচ্ছেন নাকি?
জ্বি, চলে যাচ্ছি। আপনার অত্যন্ত অপমানসূচক কথা শুনতে ইচ্ছা করছে না।কি করবেন বলুন, আমি তো আর বিড়াল না। বিড়াল হলে হয়তো আমার কথাগুলি খুব অপমানসূচক মনে হত না।আফসার সাহেব নিজের ঘরে ঢুকলেন। অসহ্য রাগে শরীর কাঁপছে। রাগ সামলাতে কষ্ট হচ্ছে। রীতিমতো বমি এসে যাচ্ছে। এই মানুষটি তাঁকে এ-জাতীয় অপমান আগেও করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। এত অপমানের ভেতর চাকরি করার কোনো মানে হয় না। কোনো মানে হয় না।
তাঁর কিছু সঞ্চয় আছে। মিরপুরে জায়গা কিনে রেখেছেন। প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে লাখ তিনেক টাকা পাওয়ার কথা। বয়স এমন কিছু হয় নি। চেষ্টাচরিত্র করলে আরেকটা চাকরি কি জোগাড় করতে পারবেন না? তিনি কাজ জানেন জাহাজ চলাচল জাতীয় যে-কোনো প্রতিষ্ঠানে ভালো চাকরি পাওয়ার কথা।
তিনি পি. এ.-কে ডেকে রেজিগনেশন লেটার ডিকটেট করলেন। ড্রাফট দেখে দুটা বানান ঠিক করলেন। চিঠি টাইপ করে আনতে পাঠালেন। পি. এ.ব সাধারণত কোনো কাজই দ্রুত করে না। এই কাজটা সে অত্যন্ত দ্রুত করল। তিনি চিঠিতে সই করলেন। সই করার পর তাঁর গায়ের জ্বালা খানিকটা কমল। মন শান্ত হল। নাজিমকে চা বানাতে বললেন। নাজিম চা বানিয়ে আনল।
জ্বি স্যার।চাকরি ছেড়ে দিয়েছি নাজিম।স্যার, শুনেছি।কার কাছে শুনলে? পি. এ. স্যার চিঠি টাইপ করছিলেন। সবাইকে বলেছেন।ও, সবাই তাহলে জানে। ভালো, জানলেই ভালো।আফসার সাহেব বিস্মিত হলেন। সবাই জানে, অথচ কেউ এসে তাঁকে বলল না। রেজিগলেশ্বন লেটার না-দেবার জন্যে। এরা কেউ কি তাঁকে পছন্দ করে না? মানুষ হিসেবে তিনি কি এই সামান্য সহানুভূতিটুকুও পেতে পারেন না? দীর্ঘ পনের বছর তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন।
কাজে ফাঁকি দেন নি। দশটায় অফিসে আসার কথা, দশটায় এসেছেন। পাঁচটা পর্যন্ত অফিস। কোনো দিন পাঁচটা বাজার দশ মিনিট আগে অফিস ছেড়ে যান নি।নাজিম।জ্বি স্যার।চা ভালো হয়েছে, তুমি এখন যাও।আফসার সাহেব রেজিগনেশন লেটার পি. এ.-র হাতে জমা দিয়ে অফিস ছেড়ে বের হলেন। তখনো দুপুরে-ল্যাঞ্চের সময় হয় নি। তাঁর মনে ক্ষীণ আশা ছিল শেষ মুহূর্তে হয়তো সবাই এসে ভিড় করবে। তা-ও কেউ করল না।
তিনি দুপুরে কিছু খেলেন না। বাসায়ও ফিরে গেলেন না। দীর্ঘ সময় রাস্তায়রাস্তায় হাঁটলেন। একসময় ক্লান্ত হয়ে পার্কে ঢুকলেন বিশ্রামের জন্যে। দীর্ঘ আট বছর পর পার্কে এলেন। ঢাকা শহরের পার্কগুলি যে এখনো এত সুন্দর আছে তা তিনি ভাবেন নি। পর্কে বসে থাকতে তাঁর ভালোই লাগল। কিছুক্ষণ আগে ভালো একটা চাকরি ছেড়ে এসেছেন-এই নিয়ে তাঁর মনে কোনো অনুশোচনা বোধ হল না। বরং একধরনের শান্তি অনুভব করলেন।
পার্কে বসেই ঠিক করলেন, আজ অন্য দিনের মতো সাড়ে পাঁচটায় বাসায় উপস্থিত হবেন না। নিয়মের ব্যতিক্রম করবেন। একটা ছবি দেখলে কেমন হয়? ছাত্রজীবনে প্রচুর সিনেমা দেখতেন। গত দশ বছরে একটাও দেখেন নি। সিনেমা হলে ঢুকে ছবি দেখতে কেমন লাগে কে জানে! তিনি বাড়ি ফিরলেন রাত এগারটায়। শীতের দিনে রাত এগারটা মানে অনেক রাত। মীরা উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তায় এতটুকু হয়ে গেছেন। চারদিকে খোঁজখবর করছেন।
কেউ কিছু বলতে পারছে না। মীরা ভেবে রেখেছেন, সাড়ে এগারটা পর্যন্ত দেখবেন। তারপর হাসপাতালে-হাসপাতালে খোঁজ নেয়া শুরু করবেন।আফসার সাহেবকে দেখে আনন্দে তাঁর চোখে প্রায় পানি এসে গেল। সুমী রুমী ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল বাবাকে! সুমী কাঁদো-কাদো গলায় বলল, কোথায় ছিলে বাবা?আফসার সাহেব হাসিমুখে বললেন, একটা ছবি দেখলাম।কী দেখলে?
কুকসিনেমা হলে একটা সিনেমা দেখলাম।হ্যাঁ, সত্যি।কী নাম ছবির? ড়াবির সংসার কী আছে। ছবিতো? মারামুরি-কাটাকাটি, গান-বাজনা, নাচ-সবই আছে। কিছুই বাদ নেই।মীরা দীর্ঘ সময় স্বামীর দিকে তাকিয়ে থেকে নরম গলায় বললেন, হাত-মুখ ধুয়ে খেতে এস। তোমার জন্যে আমরা সবাই না-খেয়ে বসে আছি।খাবার টেবিলে বসেই আফসার সাহেব বললেন, বিড়ালকে খেতে দিয়েছ?
মীরা শীতল গলায় বললেন, ঐ-সব নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।বিড়ালকে কি খাবার দিয়েছ? হ্যাঁ।ভালোমতো দিয়েছ? হ্যাঁ, ভালোমতোই দেওয়া হয়েছে। তুমি ভাত খাও তো! কেন জানি খেতে ইচ্ছা করছে না। এক গ্লাস দুধ দাও। দুধ খেয়ে শুয়ে পড়ি।ভাত সত্যি খাবে না?
না।মীরা গ্লাসে করে দুধ নিয়ে এলেন। দুধের গ্লাস রাখতে।-রাখতে ইংরেজিতে বললেন, শুনলাম তুমি নাকি চাকরি ছেড়ে দিয়েছ?হ্যাঁ। কার কাছে শুনলে? অফিস থেকে টেলিফোন করে জানিয়েছে।এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমাকে জিজ্ঞেস করারও প্রয়োজন মনে করলে না? জিজ্ঞেস করা তো অর্থহীন। সিদ্ধান্ত নেব আমি। এই সিদ্ধান্ত তুমি তো নিতে পারবে না।সংসার চলবে কীভাবে?
অসুবিধা হবে না, চলবে।এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে! এখন তো আর আট হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া পাবে না-দু-কামরার একটা ঘূপটি ঘর নিতে হবে।নেবা মানুষের দিন তো সব সময় সমান যায় না। এখন আমার দিন খারাপ যাচ্ছে।আফসার সাহেব দুধের গ্লাস হাতে উঠে দাঁড়ালেন। মীরা বললেন, কোথায় যাচ্ছ?
তোমরা খাওয়া শেষ করে। আমি বারান্দায় বসি।আমাদের সঙ্গে বাস না।এখন বসতে ইচ্ছা করছে না। একটু এক-একা থাকি।বারান্দায় বসার কিছুক্ষণের মধ্যেই বিড়ালটাকে তার বাচ্চা দুটি নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখা গেলঃ আফসার সাহেব কান পেতে রইলেন। হ্যাঁ, বুঝতে পারছেন। কথা বুঝতে তাঁর কোনোই অসুবিধা হচ্ছে না।
বাচ্চা বিড়াল : মা, স্যার আজ এত দেরি করে বাসায় এসেছেন কেন?
মা :বুঝতে পারছি না। ভদ্রলোকের কোনো- একটা সমস্যা হয়েছে।
বাচ্চা : কী সমস্যা?
মা : তাঁর স্ত্রী টেলিফোনে কথাবার্তা যা বলছিলেন তাতে মনে হচ্ছে চাকরি নিয়ে সমস্যা। উনি বোধহয় চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। আমাদের সামনে ভয়াবহ বিপদ।
বাচ্চা: বিপদ কেন?
মা : চাকরি ছেড়ে দিলে তাঁদের টাকা পয়সার সমস্যা হবে। রাতদিন ঝগড়াঝাঁটি হবে! এখন তা-ও মাঝে-মাঝে খাবারটাবার দেয়-তখন তা-ও দেবে না।
বাচ্চা : মা, আজ তো এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো খাবার দিল না।
মা : রাতের খাবার শেষ হোক, তখন দিলে দিতেও পারে।
বাচ্চা : মা, তোমার কি মনে হয় দেবো?
মা : বুঝতে পারছি না-দিতেও পারে। বাচ্চা। খুব খিদে লেগেছে মা।
মা : একটা ইঁদুর মেরে খাওয়াতে পারি-খাবি?
বাচ্চা : না, রান্না-করা খাবার খাব। মা, ওরা আজ কী রান্না করেছে?
মা :সিম দিয়ে কৈ মাছ। মাছের সঙ্গে একটু সিম দিলে ভালো হয়-ভেজিটেবল একেবারেই খাওয়া হচ্ছে না।
বাচ্চা : সিম দিলেও কিন্তু আমি খাব না মা।
মা : এমনিতেই খাওয়া পাওয়া যাচ্ছে না। তার ওপর যদি এই যন্ত্রণা তোমরা কর, তাহলে তো মুশকিল! সিম যদি দেয় তাহলে খেতে হবে। সিমে অনেক ভিটামিন।
বাচ্চা : ভিটামিন কী মা?
মা : এইসব তোমরা বুঝবে না। ভিটামিন খুব প্রয়োজনীয় একটা জিনিস।
আফসার সাহেব উঠে পড়লেন। খাবার ঘরে উঁকি দিলেন। বাচ্চাদের খাওয়া হয়ে গেছে। তারা হাত ধুচ্ছে। মীরার খাওয়া এখনো শেষ হয় নি। আফসার সাহেব বললেন, মীরা, তুমি তো আমাকে মিথ্যা কথা বলেছ।মীরা বললেন, কী, মিথ্যা বললাম?
