বিপদ পর্ব – ৪ হুমায়ূন আহমেদ

বিপদ পর্ব – ৪

তুমি বলেছ–বিড়ালদের খাবার দিয়েছ। আসলে দাও নি।এটা এমন কোনো মিথ্যা না, যার জন্যে তুমি এমন কঠিনভাবে বাচ্চাদের সামনে আমার কাছে কৈফিয়ত তলব করবে।আমাকে মিথ্যা কথা কেন বললে? কেন বললে, বিড়ালদের খাবার দেওয়া হয়েছে?

তুমি হঠাৎ করে যাতে আপসেট না-হও সে-জন্যেই সামান্য মিথ্যাটা বললাম। তোমার দুশ্চিন্তার কারণ নেই-এক্ষুণি খাবার দিচ্ছি। যদি চাও চেয়ার- টেবিলে দেব। কাঁটা চামচ দেব। সালাদও দেব।আফসার সাহেব কঠিন কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। মীরা বললেন, তুমি যে অসুস্থ হয়ে পড়ছি, তা কি তুমি বুঝতে পারছি? জীবনে কোনোদিন তুমি নিজের মেয়েদের খাবারের ব্যাপারে কোনো খোঁজ নাও নি-আজ ব্যস্ত হয়ে পড়েছ বিড়াল নিয়ে অকারণে হৈচৈ করছি।

তোমার স্বভাব্যচরিত্র বদলে যাচ্ছে। এক-একা সিনেমা দেখে ফুলে। আমরা দুশ্চিন্তা করতে পারি—এটা একবারও তোমার মনে এল না।সরি।থাক, সরি বলতে হবে না।মীরার রাগ বেশিক্ষণ থাকল না। কিছুক্ষণ পরই নরম গলায় বললেন, কিছু মনে করো না। অনেক কড়া কথা বলে ফেলেছি। আমি দেখতে পাচ্ছি। তুমি একধরনের সমস্যার ভেতর দিয়ে যােচ্ছ।

তোমার সঙ্গে আরো শান্ত ব্যবহার করা উচিত ছিল, তা করিনি। আমি লজ্জিত। এস, ঘুমুতে এস। ভয় নেই, তোমার বিড়ালকে খেতে দিয়েছি। দুটো আস্ত কৈ মাছ দিয়েছি।আফসার সাহেব বললেন, সঙ্গে সিম দিয়েছ তো? সিম? হ্যাঁ, সিম। বিড়ালের বাচ্চা দুটো গ্ৰীন ভেজিটেবল একেবারেই খেতে চায় না। অথচ ওদের দরকার।মীরা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে রইলেন। খানিকক্ষণ পর স্বামীর হাত ধরে বললেন, এস, ঘুমুতে এস।

সেই রাতে আফসার সাহেব ভয়ংকর একটা দুঃস্বপ্ন দেখলেন। ঘুমের মধ্যেই বিকট চিৎকার করতে লাগলেন। মীরা তাঁর গা ঝাঁকাতে-কাকাতে ব্যাকুল হয়ে ডাকতে লাগলেন, কী হয়েছে? এ্যাই, এ্যাই, কী হয়েছে? রুমী সুমীও ঘুম ভেঙে বাবার ঘরে ছুটে এল।আফসার সাহেব চোখ মেলতেই মীরা কীদো-কাদো গলায় বললেন, কী স্বপ্ন দেখেছ? কী স্বপ্ন?

আফসার সাহেব হতচকিত চোখে তাকাচ্ছেন। কিছু বলতে পারছেন না। তাঁর সারা গা ঘামে ভিজে গেছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে।মীরা বললেন, কী স্বপ্ন দেখলে? আফসার সাহেব বসে ক্ষীণ গলায় বললেন, পানি খাব। এক গ্লাস খুব ঠাণ্ডা পানি দিতে বল।সুমী পানি আনতে ছুটে গেল।আফসার সাহেব তৃষ্ণার্তের মতো পানি পান করলেন। পানির গ্লাস এত উঁচু করে ধরলেন যে কিছু পানি গলা বেয়ে নেমে শার্ট ভিজে গেল।

কুদ্দুস, যে থাকে ঘরের অন্য প্রান্তে, সেও উঠে এসেছে। ঘুমের মধ্যে আফসার সাহেব যে ভয়ংকর চিৎকার দিয়েছেন তা ঘরের শেষ পর্যন্ত গিয়েছে।মীরা স্বামীর গায়ে হাত রেখে কোমল গলায় বললেন, কী স্বপ্ন দেখেছ? আফসার সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন, স্বপ্নে দেখেছি, আমি একটা বিড়াল হয়ে গেছি। বিড়াল হয়ে মাঠে ছোটাছুটি করছি। জ্যোৎস্না রাত-আবছাভাবে সবকিছু দেখা যাচ্ছে।

আমি অসম্ভব ক্ষুধার্তা আমি বসে আছি ইঁদুরের গর্তের কাছে। একসময় একটা ইঁদুর বের হল-আমি লাফ দিয়ে ইঁদুরের ওপর পড়লাম। ইঁদুরটাকে ছিঁড়ে টুকরাটুকরা করলাম। আমার সমস্ত মুখে ইঁদুরের রক্ত লেগে গেল।মীরা নরম গলায় বললেন, স্বপ্ন হচ্ছে স্বপ্নল স্বপ্ন নিয়ে মাথা ঘামোনর কোনোই কারণ নেই। ভোর হোক, আমরা মিসির আলি সাহেবের কাছে যাব! ওঁকে সব বলব! আমি কোথাও যাব না।

আচ্ছা বেশ, যেতে না-চাইলে যাবে না।আমাকে আর এক গ্লাস পানি দাও।মীরা পানি নিয়ে এলেন। আফসার সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন, মীরা, দেখ আমার হাত দুটায় ইঁদুরের গন্ধ। বিশ্ৰী পচা গন্ধ।কী বলছি তুমি।হ্যাঁ, সত্যি তাই। এই হাতে আমি ইঁদুর ধরেছি। গন্ধ তো হবেই-তুমি শুঁকে দেখ।পাগলামি করো না তো। ঘুমুতে যাও। ভূমি বলছি মনগড়া কথা।

তুমি কি ইঁদুর কখনো শুঁকে দেখেছ যে, ইঁদুরের গন্ধ কেমন তা জোন? আরাম করে ঘুমাও তো।আফসার সাহেব ঘুমুতে গেলেন না। বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ সাবান দিয়ে হাত ধুলেন। তাতেও তাঁর মন শান্ত হল না। শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে দীর্ঘ সময় গোসল করলেন। যখন বেরিয়ে এলেন, তখন তাঁর চোখ লাল হয়ে আছে। গা ঈষৎ গরম সম্ভবত জ্বর আসছে।

তোয়ালে হাতে মীরা দাঁড়িয়ে আছেন। রুমী সুমীও আছে। তারা যথেষ্ট পরিমাণে ভয় পেয়েছে। তবে চুপ হয়ে আছে, কিছু বলছে না। আফসার সাহেব লক্ষ করলেন-খাবার টেবিলের নিচে দুটো বাচ্চানিয়ে মা-বিড়ালটা বসে আছে। তারা কথা বলছে ফিসফিস করে। তবে তাদের ফিসফিসানি বুঝতে আফসার সাহেবের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।

বাচ্চা বিড়াল : মা, উনার কী হয়েছে?

মা-বিড়াল : বুঝতে পারছি না।

বাচ্চা : শীতের সময়, এত ভোরে কেউ গোসল করলে ঠাণ্ডা লাগবে না?

মা-বিড়াল : তা তো লাগবেই। দেখছিস না, শীতে কেমন কাপছেন! ভদ্রলোকের কিছু-একটা সমস্যা হয়েছে। সমস্যাটা আমি বুঝতে পারছি না।

বাচ্চা : বোঝার চেষ্টা কর না কেন মা? তোমার তো কত বুদ্ধি!

মা-বিড়াল : বুঝে লাভ কিছু নেই। উনাকে সাহায্য করতে পারব না। আমরা হচ্ছি। পশু। পশু কখনও মানুষকে সাহায্য করতে পারে না।

বাচ্চা : ভদ্রলোক এত কষ্ট পাচ্ছেন, আমরা কিছুই করব না?

মা-বিড়াল : প্রার্থনা করতে পারি।

বাচ্চা : প্রার্থনা কী?

মা-বিড়াল : প্রার্থনা হচ্ছে সৃস্টিকর্তার কাছে কিছু চাওয়া!

বাচ্চা : সৃষ্টি কর্তা কে মা?

মা : যিনি আমাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছেন।

বাচ্চা : আমাদের সবাইকে কে সৃষ্টি করেছেন?

মা :আহ্, চুপ কর তো! দিন-রাত এত প্রশ্নের জবাব দিতে ভালো লাগে না।

আফসার সাহেব তোয়ালে দিয়ে গা জড়িয়ে শোবার ঘরে ঢুকলেন। মীরা বললেন, গরম এককাপ চা এনে দি? দাও।মীরা চা বানিয়ে এনে দেখলেন, আফসার সাহেব। আবার সাবান দিয়ে হাত ধুচ্ছেন। মীরাকে দেখে ফ্যাকসেভাবে তাকালেন। ক্লান্ত গলায় বললেন, মীরা, আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি।

মিসির আলিকে আজ অনেক ভদ্র দেখাচ্ছে। আগের দিন খোঁচা-খোঁচা দাড়ি ছিল, আজ ক্লিন শেভূড়। ঘরও বেশ গোছানো। বিছানায় খবরের কাগজ ছড়ানো নেই। চেয়ারে বই গাদা করে রাখা হয় নি। কেরোসিন কুকারটিও অদৃশ্য। টেবিলে সুন্দর টেবিল-ল্যাম্প জ্বলছে। মিসির আলি চেয়ারে বসে টেবিল-ল্যাম্পের আলোয় গভীর মনযোগে পড়ছেন সরীসৃপ-বিষয়ক একটি বই। গত কিছুদিন ধরেই তিনি ক্রমাগত জীবজন্তু সম্পর্কিত বই পড়ে যাচ্ছেন।

শুরু করেছিলেন বিড়াল দিয়ে, এখন চলে এসেছেন সরীসৃপে। পড়তে অদ্ভুত লাগছে। আগে তাঁর ধারণা ছিল সাপ ডিম দেয়। সেই ডিম থেকে বাচ্চা ফুটে বের হয়। এখন দেখা যাচ্ছে কিছু-কিছু সাপডিম দেয় না, সরাসরি বাচ্চা দেয়। চন্দ্রবোড়া এ— রকম একটা সাপ।দরজায় শব্দ হচ্ছে। ভিক্ষার জন্যে ভিখিরি এসেছে। মিসির আলিকে দরজা খুলতে হল না।

ষোল-সতের বছরের এক ছেলে ভেতর থেকে বের হয়ে দরজা খুলে দিল এবং কাট-কটা গলায় বলল-কাম কইরা ভাত খান। বিনা কমে ভাত নাই! এই ছেলেটির নাম মজনু। তাকে ঘরের কাজকর্মের জন্যে মাসে দেড় শ টাকা বেতনে রাখা হয়েছে। এই বাড়িতে মজনুর আজ সপ্তম দিন। সপ্তম দিনে সে দেখিয়ে দিয়েছে যে সে কোজ জানে। শুধু যে জানে তা নয়-খুব ভালো জানে। মিসির আলিকে এখন আর বিসমিল্লাহ্ হোটেলে ভাত খেতে যেতে হয় না। ঘরেই রান্না হয়। সেই রান্নাও অসাধারণ।

খাওয়ার ব্যাপারটায় যে আনন্দ আছে তা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। আজ দুপুরে মজনু পাবদা মাছের ঝোল রান্না করেছে। টমেটো এবং মটরশুটি দিয়ে। সেই রান্না খেয়ে মিসির আলি মজনুর বেতন দেড় শ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক শ পঁচাত্তর করে দিয়েছেন! মজনু।জ্বি স্যার! চা বানাও তো দেখি– মজনু গম্ভীর গলায় বলল, দুধ, লেবু, না আদা? যা ইচ্ছা বানাও।আপনার ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা লাগছে। আদা চা খান, শরীরের জন্যে ভালো।দাও, আদা-চা দাও

মজনুর আদা-চা খেয়ে মিসির আলির মন ভালো হয়ে গেল। অসাধারণ ব্যাপার! চা যতটুকু গরম হওয়া দরকার ততটুকুই গরম। ঠাণ্ডাও না, বেশি গরমও না। আদার পরিমাণও যেন মাপা! বীজ আছে, আবার চায়ের স্বাদও নষ্ট হয় নি।মজনু। জ্বি স্যার।আগে কি কোনো হোটেলে কাজটাজ করতে? জ্বে-না– এত চমৎকার রান্নাবানা শিখলে কীভাবে?

মজনু জবাব না-দিয়ে ভেতরে চলে গেল। সে রাতের রান্না বসিয়েছে। দুপুরের খাবার সে রাতে দেয় না। রাতে আলাদা রান্না হয়। চায়ে চুমুক দিতে-দিতে মিসির আলি ভাবতে লাগলেন—মজনুর বেতন এক শ পঁচাত্তর না করে পুরোপুরি দু, শ করে দেওয়াই ভালো। যে-কোনোভাবেই হোক, এই ছেলেকে আটকে রাখতে হবে। তাঁর নিজের অর্থনৈতিক সমস্যার কিছুটা সমাধান হয়েছে।

বিলেতে থাকাকালীন তিনি প্রফেসর রেইজেনবার্গের সঙ্গে যুগ্ম-সম্পাদনায় অ্যাবনর্ম্যাল বিহেভিয়ের ইন ফেজ ট্রানজিশন বইটি লিখেছিলেন। সেই বই। এ-বৎসর কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যতালিকাভূক্ত হয়েছে। প্রকাশক ভালো টাকা দিচ্ছে। প্রথম দফায় তিনি পাঁচ হাজার ডলারের একটি চেক পেয়েছেন। সেই চেক ভাঙানো হয়েছে। মার্কেল ষ্টোনের অসম্ভব।

সুন্দর টেবিল-ল্যাম্প এবং একটি ড়েকসেট ঐ টাকায় কেনা। মিসির আলি এখন রোজই কিছু-না-কিছু কিনছেন। জিনিসপত্র কেনার ভেতরে যে আনন্দ আছে, তাও তিনি জানতেন না।আবার দরজার কড়া নড়ছে।মিসির আলির মনে পড়ল সাড়ে চার শ টাকায় তিনি একটা কলিং বেল কিনেছেন। বেলটা এখনো লাগানো হয় নি। মজনুকে পাঠিয়ে একজন ইলেকটিক মিস্ত্রি নিয়ে আসতে হবে। রান্না শেষ হলে ওকে পাঠাবেন।

মিসির আলি নিজেই দরজা খুললেন। মীরা এবং আফসার সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন! আফসার সাহেবের দৃষ্টি উদভ্ৰান্ত। মনে হয়। গত তিন-চার দিন দাড়ি কাটেন নি।মুখভর্তি খোঁচা-খোচা দাড়ি। শরীরও মনে হয় ভেঙে পড়েছে।আসুন, ভেতরে আসুন! দুজন ঘরে ঢুকলেন। মীরা ক্ষীণ স্বরে বললেন, আপনাকে আবার বিরক্ত করতে এলাম।মিসির আলি বললেন, আপনাদের আরো আগেই আসা উচিত ছিল—আপনারা দেরি করে ফেলেছেন বলে মনে হচ্ছে। আফসার সাহেব, বসুন।

আফসার সাহেব বসলেন! মিসির আলি বললেন, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে-আপনার সমস্যা মোটেই কমেনি-বরং বেড়েছে। আমি কি ঠিক বলছি? আফসার সাহেব কিছু বললেন না। মীরা বললেন, জ্বি, ঠিক বলছেন।প্রাথমিকভাবে আপনার যা বলার আছে বলুন। তারপর আমি কিছু প্রশ্ন করব।আফসার সাহেব কিছুই বললেন না। পাথরের মতো মুখ করে বসে রইলেন। মীরা বললেন, গত দু রাত ধরে সে ভয়ংকর স্বপ্ন দেখছে। ভয়াবহ স্বপ্ন।কী রকম স্বপ্ন?

সে বিড়াল হয়ে গেছে। ধরে- ধরে ইঁদুর খাচ্ছে–এইসব স্বপ্ন। মিসির আলি হাসতে-হাসতে বললেন, আমার কাছে স্বপ্নটা খুব ভয়াবহ মনে হচ্ছে না। যদি উল্টোটা স্বপ্নে দেখতেন। অর্থাৎ আপনি ইঁদুর এবং বিড়াল আপনাকে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খাচ্ছে-তাহলে ত ভয়াবহ হত।আফসার সাহেব কঠিন গলায় বললেন, আমি যা দেখছি তা যথেষ্টই ভয়াবহ। আমার পরিস্থিতিতে আপনি নন বলেই বুঝতে পারছেন না।আমি খুব ভালো বুঝতে পারছি।

পরিবেশ হালকা করার জন্যেই হাসতে-হাসতে কথাগুলি বলেছি। সমস্যা যত বড় হবে, তাকে তাত সহজভাবে গ্রহণ করা উচিত।আপনি কি তা করেন? হ্যাঁ, করি। একবার ভয়ংকর জটিল একটা সমস্যাকে হাসিমুখে গ্ৰহণ করেছিলাম—সেই গল্প অন্য এক সময় বলব।-আজ। আপনার সঙ্গে কথা বলি। আমি প্রশ্ন করছি, প্রশ্নগুলির জবাব দিন।তারাও আগে আমি আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি কেন আমি এ-রকম ভয়ংকর স্বপ্ন দেখছি?

মস্তিষ্ক নানান কারণে উত্তেজিত হয়ে আছে। একটা বিষয় নিয়ে ক্রমাগত ভাবছেন।–তাই স্বপ্নে দেখছেন। জেলেদের স্ত্রীরা সব সময় স্বপ্নে দেখে তাদের স্বামীরা নৌকাড়ুবিতে মারা গেছে, কখনো স্বপ্নে দেখে না তারা মারা গেছে রোড অ্যাক্সিডেন্টে। আপনার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটছে। ভালো কথা-ফ্রানৎস কাফকার মেটামরফোসিস গল্প কি আপনি পড়েছেন? গল্পে একটা মানুষ আস্তে—আস্তে কুৎসিত একটি পোকা হয়ে যায়।না, আমি পড়ি নি। গল্প-উপন্যাস আমি খুব কম পড়ি।

আচ্ছা, এখন প্রশ্ন-উত্তর পর্বে চলে আসছি। আমি প্রশ্ন করার সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর দেবেন। ভাবার জন্যে সময় নেবেন না। তেবে উত্তর দেবেন। এমন প্রশ্নও আমি করব না। বিড়ালের কথা এখনো বুঝতে পারছেন? পারছি।আপনি কি এদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন? না।যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন? হ্যাঁ। আমি একবার কথা বলার চেষ্টা করেছি।বিড়াল বুঝতে পারে নি?

না।কিন্তু বিড়াল তো আপনাদের কথা বুঝতে পারে। অন্তত তাদের কথাবার্তা থেকে নিশ্চয়ই তা বোঝা যায়।হ্যাঁ, বোঝা যায়। তাহলে আপনার কথা সে বুঝল না কেন? জানি না।আপনি নিজে কি বিশ্বাস করেন যে আপনি বিড়ালের কথা বুঝতে পারেন? হ্যাঁ, বিশ্বাস করি। মিসির আলি সিগারেট ধরাতে-ধরাতে বললেন, না, আপনি বিশ্বাস করেন না।

অন্য প্রশ্নগুলির জবাব আপনি সঙ্গে-সঙ্গে দিয়েছেন। এই প্রশ্নটির জবাব দিতে বেশ দেরি করেছেন। আপনি যদি পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন যে বিড়ালের কথা। আপনি বুঝতে পারেন, তাহলে আজ যে- সমস্যা আপনার হচ্ছে সেই সমস্য হত না। আপনি একই সঙ্গে ব্যাপারটা বিশ্বাস করছেন এবং করছেন না। আমি কি ঠিক বলছি? হ্যাঁ, ঠিক বলছেন। আমি বিড়ালের কথা বুঝি। তার পরেও আমার মনে সন্দেহ আছে।কেন আছে?

বিড়াল এমন সব কথা বলে যা একটি বিড়াল বলবে বলে মনে হয় না।উদাহরণ দিন।যেমন ধরুন।–মা-বিড়াল তার বাচ্চাদের জেলি খেতে নিষেধ করছে, কারণ জেলি খেলে দাঁত নষ্ট হবে। কিংবা সে বাচ্চাদের শ্ৰীন ভেজিটেবল খাওয়াতে চাচ্ছে-কারণ তাতে ভিটামিন আছে– এ ছাড়াও অন্য কোনো কারণ কি ঘটেছে, যার জন্যে আপনার মনে সন্দেহ হচ্ছে-বিড়ালের কথা আসলে বোঝা যায় না?

হ্যাঁ, এ-রকম ব্যাপারও ঘটেছে। আমি ইদানীং রাস্তায় প্রচুর হাঁটাহাঁটি করি। বেশ কয়েক বার বিড়ালের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ওরা ম্যাও ম্যাও করেছে, কিন্তু ওদের কোনো কথা আমি বুঝতে পারিনি।মিসির আলি বললেন, আপনাদের যদি সময় থাকে আমার সঙ্গে একটা বাড়িতে চলুন। ওদের গোটা তিনেক বিড়াল আছে। আমি দেখতে চাই ওদের কথা। আপনি বুঝতে পারেন। কি না।

মীরা বললেন, সেটা কি ঠিক হবে? তাঁরা কী না কী মনে করবেন— তাঁরা কিছুই মনে করবেন না। আমরা কী জন্যে যাচ্ছি তাও তাঁদের বলা হবে না।আফসার সাহেব বললেন, আমার বাসায় চলুন। সেখানে তো বিড়াল আছে।সেই বিড়ালের কথা যে আপনি বুঝতে পারেন তা তো বলেছেন, আমি নতুন বিড়াল নিয়ে পরীক্ষা করতে চাই। অবশ্যি অস্বস্তি বোধ করলে থাক।

না, অস্বস্তি বোধ করছি না। চলুন।মিসির আলি মজনুর কাছে বাড়ি বুঝিয়ে দিয়ে রওনা হলেন। মজনু ব্যাপারটা ঠিক পছন্দ করল না। বিরক্ত মুখে বলল, ফিরতে কি দেরি হইব? হাঁটা, একটু দেরি হবে।রান্না হইছে। ভাত খাইয়া যান।না-ভাত এখন খাব না। তুমি একটা ইলেকট্ৰিক মিস্ত্রি ডেকে কলিং বেল লাগিয়ে নিও।মিসির আলি তাঁর পরিচিত ঐ ভদ্রলোকের বাসায় এক ঘন্টা কাটালেন।

তাঁদের বিড়াল তিনটা না, দুটা। একটি অতি বৃদ্ধ। নড়াচড়ার শক্তি নেই। অন্যটি টম ক্যাট। বেশ উগ্র স্বভাবের। এরা অনেক বারই মিয়্যাও মিয়্যাও করল। আফসার সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিড়াল দুটিকে দেখলেন। ওদের কথা শুনলেন, কিন্তু ওরা কি বলছে কিছুই বুঝলেন না।বাড়ি থেকে বের হয়ে মিসির আলি বললেন, আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে বিড়ালগুলির কথা কিছুই বুঝতে পারেন নি। তাই না?

হ্যাঁ। আমি কিছুই বুঝি নি কিন্তু আপনি বিশ্বাস করুন-আমি আমাদের বাসার বিড়ালটার কথা বুঝি খুব ভালো বুঝি।মিসির আলি বুললেন, আপনি নিজে কি ধরতে পারছেন—আপনার কথায় যুক্তি নেই? আপনি একটিমাত্র বিড়ালের কথা বুঝতে পারছেন, অন্য কোনো বিড়ালের কথা বুঝতে পারছেন না। তা কী করে হয়?

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *