আশ্চর্যের ব্যাপার, এক জায়গায় বসে তিনি সারা বাড়িতে কোথায় কি খাবার আছে তার গন্ধ পাচ্ছেন। তিনি হাই তুললেন। কোন কোন খাবার খাবেন তা মনে-মনে গুছিয়ে নিলেন। এইবার ইঁদুরের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। একটা মা-ইন্দুর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বের হয়েছে। শুধু গন্ধ দিয়ে তিনি প্রতিটি ইঁদুরকে আলাদা-আলাদা করে চিনতে পারছেন। মাটা ভয়ংকর বদ।
একে মারার চেষ্টা করবেন না, থাক ছোট-ছোট বাচ্চা আছে। কী দরকার? খিদেও চলে গেছে। ঘুম পাচ্ছে। তিনি আবার বেতের সুটকেসে ঢুকে পড়লেন। স্বপ্নের মধ্যেই আবার ঘুম এসে গেল। ঘুম ভাঙল রাত তিনটায়। আফসার সাহেব বিছানায় উঠে বসলেন। বিস্মিত হয়ে দেখলেন, মহসিন চেয়ারের হাতলে মাথা রেখে অকাতরে ঘুমুচ্ছে। তার নাকও ডাকছে।
আফসার সাহেব সাবধানে বিছানা থেকে নামলেন। বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, বারান্দার শেষ প্রান্তে বিড়াল একটা মাত্র বাচ্চা নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। আফসার সাহেব ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন। আর ঠিক তখন বিড়ালের কথা শুনতে পেলেন।
বাচ্চা : মা, দেখ-দেখ, উনি বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন।
মা : দেখছি।
বাচ্চা : আমরা যে বাসা খুঁজে-খুঁজে এখানে চলে এসেছি তা দেখে উনি কি খুশি হয়েছেন?
মা : না।
বাচ্চা : আমার ভাইটা যে মারা গেছে তা কি উনি বুঝতে পারছেন মা?
মা : মানুষ অসম্ভব বুদ্ধিমান, আমরা দু জন মাত্র এসেছি। তাই দেখে তো বোঝা উচিত।
বাচ্চা : আমাদের মনে যে খুব কষ্ট তা কি উনি বুঝবেন মা?
মা :না। পশুদের কষ্ট মানুষ কখনো বোঝে না।
বাচ্চা : এখন তাঁরা কি আমাদের আবার বস্তায় ভরে ফেলে দেবেন?
মা : দিতে পারে। আবার না-ও দিতে পারে। যখন দেখবে আমরা এত কষ্ট করে। পুরনো বাসায় গিয়েছি, সেখানে তাঁদের না-পেয়ে গন্ধ শুঁকে-শুঁকে এই জায়গায় এসেছি।–তখন অবাক হয়ে আমাদের রাখতেও পারে।
বাচ্চা : খিদে পেয়েছে মা।
মা : ঘুমিয়ে পড়া ঘুমিয়ে পড়লে খিদে লাগবে না।
বাচ্চা : মা।
মা : কি?
বাচ্চা : ভাইটির জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে মা। কাঁদতে ইচ্ছা করছে।
মা : কাঁদতে ইচ্ছা করলে কাঁদ।
আফসার সাহেব শুনলেন বিড়ালের বাচ্চাটা কাঁদছে। এই কান্না অবিকল মানবশিশুর কান্নার মতো। অফিসার সাহেবের চোখে পানি এসে গেল।মিসির আলি বড় একটা খাতায় বিড়ালের ব্যাপারটা লিখেছেন। খাতাটা নিয়ে আফসার সাহেবের বাসায় যাবেন। যাবার আগে লেখাটা আরেক বার দেখে নিচ্ছেন। মিসির আলি লিখছেন :
১. আফসার সাহেব একজন বুদ্ধিমান মানুষ, তবে গম্ভীর প্রকৃতির। ঠাট্টা-তামাশা পছন্দ করেন না। সবকিছু খুব সিরিয়াসভাবে নেন। কাজেই তিনি যখন বলেন বিড়ালের কথা বুঝতে পারছেন, তখন ধরে নেওয়া স্বাভাবিক যে, তিনি ঠাট্টা-তামাশা করছেন না। একজন বুদ্ধিমান মানুষ কোনো কারণ ছাড়া হঠাৎ বলা শুরু করবেন না যে, তিনি বিড়ালের কথা বুঝতে পারছেন। এটা বলায় তাঁর কোনো লাভ হচ্ছে না বরং সামাজিকভাবে তিনি হাসির পাত্রে পরিণত হচ্ছেন। আমিও ধরেই নিচ্ছি। তিনি বিড়ালের কথা বুঝতে পারছেন। এটা ধরে নিয়ে অন্য যুক্তিগুলি পরীক্ষা করছি।
২ ক্যাসেট প্লেয়ারে বিড়ালের কথা টেপ করা ছিল। তাঁকে শোনানো হল। তিনি কিছু বুঝতে পারলেন না। এতে দুটি জিনিস প্রমাণিত হচ্ছে—ক) তিনি সত্যি কথা বলছেন। মিথ্যা করে বলতে পারতেন যে, কথা বুঝতে পারছেন। মিথ্যা বললেও আমাদের তা ধরার ক্ষমতা ছিল না।
খ) বিড়াল হয়তো টেলিপ্যাথিক নিয়মে কথা বলে! যদি তার কথা হয় টেলিপ্যাথিক, তবে ক্যাসেট প্লেয়ারে ধরে রাখা বিড়ালের কথা হবে অর্থহীন। টেলিপ্যাথিক কথা বলার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ বিড়ালের ভোকাল কর্ড মিয়াও ছাড়া অন্য কোনো শব্দ করতে পারে না। একটিমাত্র শব্দে দীর্ঘ বাক্য তৈরি করা বা কথোপকথন চালানো অসম্ভব।
৩. আফসার সাহেব রাস্তায় হাঁটার সময় কিছু বিড়ালের দেখা পেতেন। তিনি তাদের কোনো কথা বুঝতে পারেন নি। বিড়ালের কথা যদি টেলিপ্যাথিক হয়, তাহলে তাদের কথাও বোঝা উচিত ছিল। আফসার সাহেবকে আমি একটি বাসায় নিয়ে গিয়েছিলাম। তাদেরও দুটি বিড়াল ছিল। আফসার সাহেব সেই দুটি বিড়ালের কথাও বুঝতে পারেন নি।
তাহলে ব্যাপার এই দাঁড়াচ্ছে—আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম আবার সেখানেই ফিরে গিয়েছি। এককথায়, আমরা এখন সহজ সিদ্ধান্তে চলে আসছে পারি।
৪. আফসার সাহেব বিড়ালের কথা বুঝতে পারেন না। তিনি মনগড়া কথা বলছেন।
কিন্তু ইচ্ছা করলে এই সহজ সিদ্ধান্তে আমরা না-ও যেতে পারি। আমার সিদ্ধান্ত এ-রকম–আফসার সাহেব বিড়ালের কথা বুঝতে পারেন তবে সেই বিড়ালকে হতে হবে মা-বিড়াল এবং তার কিছু বাচ্চা থাকতে হবে। মা- বিড়াল বাচ্চাদের ট্রেনিং দেবার জন্যে ক্রমাগত তাদের নানান জিনিস শেখাবে। এই শেখানোর ব্যাপারটা সে করবে-টেলিপ্যাথিকেলি। বাচ্চারাও একইভাবে মার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। শিক্ষার প্রাথমিক অংশ শেষ হবার পরপর বিড়ালদের এই ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবে।
আফসার সাহেবের মস্তিষ্কের একটি অংশ কোনো এক বিচিত্র কারণে বিড়ালের টেলিপ্যাথিক কথোপকথন ধরতে পারছে। আমার ধারণা, ছোট-ছোট শিশু আছে এমন যে-কোনো বিড়ালের কথাই তিনি বুঝতে পারবেন।এই অস্বাভাবিক ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের পরিচয় নেই বলেই মানুষ এই ক্ষমতা দেখবে ভয়ে এবং বিস্ময়ে। মানুষ এটা সহজে গ্রহণ করতে পারবে না। শেষটায় এই ক্ষমতা আফসার সাহেবকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। মানুষ কখনোই অস্বাভাবিক কিছু সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না।
কোনো মানুষ যদি কপালে তৃতীয় একটি চোখ নিয়ে জন্মায়, তাহলে আমাদের সমাজ তাকে ডাস্ট্রবিনে ছুঁড়ে দেবে। তৃতীয় চোখের জন্যে সেই মানুষটিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে, যদিও সেই তৃতীয় চোখের কারণে মানুষটির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বেড়েছে। তার লাভই হয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাজ ব্যাপারটা সেভাবে দেখবে না। মানুষকে উদার ভাবা হলেও মানুষ মোটেই উদার নয়। সে সব সময় দেখে তার গোষ্ঠীস্বর্থ। কাজেই আফসার সাহেবের সামনে খুব খারাপ দিন।
মিসির আলি অনেক খুঁজে-খুঁজে আফসার সাহেবের বাসায় এসেছেন। বাসা থমথম করছে। কোনো সাড়াশব্দ নেই। বাড়িতে পা দিয়েই তাঁর মনে হল অশুভ কিছু যেন এই বাড়িতে ছায়া ফেলে আছে। ভয়াবহ কিছু ঘটে গেছে। কলিং বেল টিপতেই মীরা এসে দরজা খুললেন। তিনি এমনভাবে তাকালেন যেন মিসির আলিকে চিনতে পারছেন না। মীরার চোখ লাল, হয়তো কাঁদছিলেন।
মিসির আলি বললেন, কেমন আছেন? মীরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ভালো নেই।ভেতরে আসব? আসুন।আফসার সাহেব কোথায়? মীরা চুপ করে রইলেন। মিসির আলি বললেন, আমি বুঝতে পারছি বড় রকমের কোনো ঘটনা ঘটেছে। আপনি কি আমাকে দয়া করে বলবেন, কী ব্যাপার?
মীরা চাপা গলায় বললেন, আমাদের ঐ বিড়ালটা একটা বাচ্চা নিয়ে খুঁজে-খুঁজে এই বাড়িতে চলে এসেছিল। কী করে গেণ্ডারিয়ার এই বাড়ি খুঁজে পেল আমি জানি না। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি বিড়ালটা তার বাচ্চা নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। সুমীর আব্বা একগাদা খাবার খেতে দিয়েছে। আমার প্রচণ্ড রাগ হল। রাগে প্রায় অন্ধ হয়ে গেলাম-আমাদের সমস্ত যন্ত্রণার মূলে এই বিড়াল। আমার মনে হল এদের শেষ না করতে পারলে আমাদের মুক্তি নেই। তখন আমি খুব একটা খারাপ কাজ করলাম।কি করলেন?
খুব নোংরা, খুব কুৎসিত একটা কাজ–বলতে গিয়েও আমি লজ্জায় মরে যাচ্ছি। আমি রান্নাঘরে ঢুকলাম। রান্নাঘরের চুলায় চায়ের পানি ফুটছিল। আমি সেই ফুটন্ত পানি এনে এদের গায়ে ঢেলে দিলাম। এত বড় অন্যায় যে আমি করতে পারি, তা কখনো কল্পনা করি নি। কিন্তু করেছি, নিজের হাতে ফুটন্ত পানি ঢেলে দিয়েছি।তারপর? পানি ঢালার পরই মনে হল আমি এ কী করলাম, আমি এ কী করলাম! তখন আমি নিজেই এদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটে গেছি। হাসপাতালে নিয়ে যাবার পরপরই দুটা বিড়ালই মারা যায়।আফসার সাহেব কোথায়? উনি ঘটনাটা কীভাবে নিয়েছেন?
আমার মনে হয় সহজভাবেই নিয়েছেন। বাসায় ফিরে আমি খুব কান্নাকাটি করছিলাম। উনি আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। আমার মাথায় হাত বোলাতে-বোলাতে বলছিলেন-মানুষ মাত্রই ভুল করে তুমিও করেছ।ঘটনাটা কবে ঘটেছে? গতকাল।মীরার চোখ দিয়ে ক্রমাগত পানি পড়ছে। তিনি নিজেকে সামলাতে পারছেন না। রুমী সুমী দরজার পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে আছে।মিসির আলি বললেন, আফসার সাহেব কোথায়?
মীরা বললেন, ও গিয়েছে ট্রেনের টিকিট কাটতে। সবাইকে নিয়ে সে ঢাকার বাইরে কোথাও বেড়াতে যেতে চায়।সেটা ভালো হবে। যান, ঘুরে আসুন।মিসির আলি উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কাছে মনে হচ্ছে এই পরিবারটি এখন সামলে উঠতে পারবে। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এখন এদের কাছাকাছি নিয়ে আসবে। তা ছাড়া যেহেতু বিড়াল দুটিও এখন নেই। এটাও একধরনের মুক্তি।মিসির আলি বললেন, আমি আজ যাই। আপনারা বাইরে থেকে ঘুরে আসুন। তারপর একদিন এসে চা খেয়ে যাব।
মীরা চোখ মুছতে-মুছতে নিচু গলায় বললেন, আপনাকে একটা ব্যাপার বলতে চাচ্ছি-আমি যখন বিড়াল দুটাকে নিয়ে রিকশা করে হাসপাতালে যাচ্ছি, তখন হঠাৎ স্পষ্ট শুনলাম, মা-বিড়ালটা বলছে— আমি আপনার পায়ে পড়ছি, আপনি আমার বাচ্চাটাকে বাঁচান। এই বেচারা সুন্দর পৃথিবীর কিছুই দেখল না। আমি কথাগুলি স্পষ্ট শুনলাম-যেন বিড়ালটা আমার মাথার ভেতর ঢুকে আমাকে কথাগুলি বলল। এই রকম কেন শুনলাম বলুন তো?
মিসির আলি কখনো মিথ্যা বলেন না-আজ বললেন। কোমল গলায় বললেন- এটা আপনার কল্পনা। অপরাধবোধে কাতর হয়ে ছিলেন বলেই কল্পনায় শুনেছেন। বিড়াল কি আর কথা বলতে পারে? মীরা বললেন, আমারও তাই ধারণা।বলতে-বলতে মীরা আবার চোখ মুছলেন।মিসির আলি বাসার দিকে ফিরে চলছেন। শীতের সন্ধ্যা।
আকাশ লাল হয়ে আছে। আকাশের লাল আলোয় কী অপূর্বই না দেখাচ্ছে শহরটাকে! হাঁটতে— হাঁটতে তাঁর মনে ফুল—প্রকৃতি এত সুন্দর করে নিজেকে শুধু মানুষের জন্যেই সাজায় না, তার সমস্ত জীব-জগতের জন্যেই সাজায়। মানুষ মনে করে শুধু তার জন্যেই বুঝি সাজিয়েছে, পাখি মনে করে তার জন্যে। বারান্দায় বসে-থাকা মা- বিড়াল মনে করে তাদের জন্যে। সে হয়তো তার শিশুটিকে ডেকে বলে—মা, দেখ-দেখ কী সুন্দর! কী সুন্দর!
( সমাপ্ত )
