মহা বিপদগ্রস্ত হলুম। বাড়ির বড় ছেলে আমার সঙ্গে মন কষাকষি করে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়, আর-সবাই সে সম্বন্ধে সচেতন, অষ্টপ্রহর অস্বস্তিভাব, বুড়োবুড়ি আমার দিকে সব সময় কী রকম যেন মাপ-চাই ভাবে তাকান-মরুক গে, কী হবে এখানে থেকে!বুড়োবুড়ি তো কেঁদেই ফেললেন। মারিয়া আমার কাছে ইংরিজি পড়ত।
সে দেখি জিনিসপত্র প্যাক করছে। বলল, চললুম কিছুদিনের জন্য মাসির বাড়ি। দুসরা ছেলে হুবের্টও কথা কইত কম। আমাকে মুনিকে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নেবার সময় বলল, আশ্চর্য, অস্কারের মতো সহৃদয় লোক নাৎসিদের পাল্লায় পড়ে কী রকম অদ্ভুত হয়ে গেল দেখলেন? আমি আর কী বলব।’চাচা বললেন, তারপর ছমাস কেটে গিয়েছে।
বান্ধব বর্জন সব সময়ই পীড়াদায়ক সে বর্জন ইচ্ছায় করো আর অনিচ্ছায়ই ঘটুক। তার উপর বড় শহরে মানুষ যে রকম নিঃসঙ্গ অনুভব করে তার সঙ্গে গ্রামের নির্জনতার তুলনা হয় না। গ্রামের নিত্যিকার ডালভাত অরুচি এনে দেয় সত্যি, তবু সেটা শহরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আর পাঁচজনের শেরিশ্যাম্পেন খাওয়া দেখার চেয়ে অনেক ভালো।
দিনের ভিতর তাই অদ্ভুত পঞ্চাশবার ‘দুত্তোর ছাই’ বলতুম, আর বুড়োবুড়ির কাছে ফিরে যাওয়া যায় কি না ভাবতুম। কিন্তু জানো তো, বড় শহরে স্থান যোগাড় করা যেমন কঠিন, সেখান থেকে বেরনো তার চেয়েও কঠিন।করে করে প্রায় এক বৎসর কেটে গিয়েছে। একদিন বাসায় ফিরে দেখি বুড়োবুড়ি আর মারিয়া আমার বসার ঘরে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।
কী ব্যাপার? রোনডরে সাৎসরিক মেলা। আমাদের যেমন ঈদ-দুর্গোৎসবের সময় আত্মীয়স্বজন দেশের বাড়িতে জড়ো হয় এদের বাৎসরিক মেলার সময়ও ঐ রেওয়াজ। বুড়োবুড়ি, মারিয়া তাই আমাকে নেমন্তন্ন করতে এসেছেন।আমার মনের ভিতর কী খেলে গেল সেইটে যেন বুঝতে পেরেই মারিয়া বলল,’অস্কারের সঙ্গে এ কদিন আপনার দেখা হবার সম্ভাবনা নেই বললেও চলে।
ছুটি নিয়ে এ কদিন সে অষ্টপ্রহর বিয়ার খায়। আপনাকে দেখলে ও চিনতে পারবে না।’বুড়ি বললেন, ‘অস্কারকে একটা সুযোগ দিন আপনার কাছে ক্ষমা চাইবার। মেলার সময় তাই তো আত্মীয়স্বজন জড়ো হয়।মেলার পরব সব দেশে একই রকম।তিন মিনিট নাগরদোলায় চকর খেয়ে নিলে, ঝপ করে দুটো পানের খিলি মুখে পুরলে (দেশভেদে চকলেট), দুটো সস্তা পুতুল কিনলে, গণৎকারের সামনে হাত পাতলে, না হয় ইয়ারদের সঙ্গে গোট পাকিয়ে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মিটমিটিয়ে হাসলে (দেশভেদে ফষ্টিনষ্টি করলে)।
অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে যে ঘন ঘন পট পরিবর্তন সম্ভব হয় না সেইটে মেলার সময় সুদে-আসলে তুলে নেওয়া। যে মেলা যত বেশি মনের ভোল ফেরাবার পাঁচমেশালি দিতে পারে সে মেলার জৌলুশ তত বেশি। তাই বুঝতে পারছ, বড় শহরে কেন মেলা জমে না। যেখানে মানুষ বারো মাস মুখোস পরে থাকে সেখানে বহুরূপী কল্কে পাবে কেন? তবে দেশের মেলার সঙ্গে এদেশের মেলার একটা বড় তফাত রয়েছে।
রাত ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মেলা যখন ঝিমিয়ে আসে তখন দেশে শুরু হয় যাত্রা-গান কিম্বা কবির লড়াই। এদেশে শুরু হয় মদ আর নাচ। ছোটখাটো গ্রামে তো প্রায় অলঙ্ঘ্য রেওয়াজ প্রত্যেক মদের আড্ডায় অন্তত একবার ঢুকে এক গেলাশ বিয়ার খাওয়ার। কারো দোকান কট করা চলবে না, তা ততক্ষণে তুমি টং হয়ে গিয়ে থাকো আর নাই থাকো।
আমরা যেরকম উচ্ছৃঙ্খলতায় সুখ পাই, জর্মনরা তেমনি আইন মেনে সুখ পায়। মুদি-মুদিবউ তাই আমাকে নিয়ে এই নিয়ম প্রতিপালন করে করে শেষটায় ঢুকলেন তাদেরই বাড়ির পাশের গ্রামের সব চেয়ে বড় শরাবখানায়। রাত তখন এগারোটা হবে। ডান্স হলের যা সাইজ তাতে দু-পাঁচখানা চণ্ডীমণ্ডপ সেখানে অনায়াসে লুকোচুরি খেলতে পারে।
আশপাশের দশখানা গ্রামের ছোড়াছুড়ি বুড়োবুড়ি ধেইধেই করে নাচছে, আর শ্যাম্পেন-ওয়াইন যা বইছে তাতে সমস্ত গ্রামখানাকে সম্বৎসর মজিয়ে রেখে আচার বানানো যায়। দেশলাই ঠুকতে ভয় হয় পাছে হাওয়ার অ্যালকহলে আগুন ধরে যায়, সিগার-সিগারেটের ধুয়ো দেখে মনে হয়, দেশের গোয়ালঘরের মশা তাড়ানো হচ্ছে।
বুড়োবুড়ি পাড়ার মুরুব্বি। কাজেই তাদের জন্য টেবিল রিজার্ভ করা ছিল। বুড়োবুড়ি আইন মেনে একচকর নেচে নিলেন। বয়স হয়েছে, অল্পেই হাঁপিয়ে পড়েন। বু পায়ের চিকণ কাজ থেকে অনায়াসে বুঝতে পারলুম, এঁদের যৌবনে এঁরা আজকের দিনের ছোড়াছুড়ির চেয়ে ঢের ভালো নেচেছেন। আর মারিয়ার তো পো’ বারো। সুন্দরী মেয়ে।
তাকে নিয়ে যে লোফালুফি লেগে যাবে, সেকথা নাচের মজলিসে না এসেই বলা যায়।ঘন্টাখানেক কেটে গিয়েছে। মজলিস গুলজার। সবাই মৌজে। তখনো লোকজন আসছে—এত লোকের যে কোথায় জায়গা হচ্ছে খোদায় মালুম, আল্লাই জানেন। এমন সময় একজোড়া কপোত-কপোতী আমাদেরই টেবিলের পাশে এসে জায়গার সন্ধানে চারদিকে তাকাতে লাগল।
কিন্তু তখন আর সত্যিই একখানা চেয়ারও খালি নেই। বুড়োবুড়ি তাদের ডেকে বললেন, আমরা বাড়ি যাচ্ছি। আপনারা আমাদের জায়গায় বসতে পারেন। আমি উঠে দাঁড়ালুম। বুড়ি বললেন, ‘সে কি কথা? আপনি থাকবেন।হলে মারিয়াকে বাড়ি নিয়ে আসবে কে? আমার বাড়ি যাবার ইচ্ছে করছিল, কিন্তু এরপর তো আর আপত্তি জানানো যায় না।
জর্মনি মধ্যযুগের প্রায় সব বর্বরতা ঝেড়ে ফেলে দিয়েছে, কিন্তু শক্তসমর্থ মেয়ের রাত্রে রাস্তায় একা বেরতে নেই এ বর্বরতাটা কেন ছাড়তে পারে না বুঝে ওঠা ভার।কপোত-কপোতী চেয়ার দুটো পেয়ে বেঁচে গেল। কপোতীটি দেখতে ভালোই, মারিয়ার সঙ্গে বেশ যেন খাপ খেয়ে গেল। আমি তাদের মধ্যিখানে বসেছিলুম—আহা, যেন দুটি গোলাপের মাঝখানে কাটাটি।
চাচার কথায় বাধা দিয়ে গোঁসাই বললেন, ‘চাচা, আত্মনিন্দা করবেন না। বরঞ্চ বলুন, দুটো কাটার মাঝখানের গোলাপটি। আর কিছু না হোক, সেই অজপাড়াগাঁয়ে ইভার হিসেবে নিশ্চয়ই আপনাকে মাইডিয়ার-মাইডিয়ার দেখাচ্ছিল।চাচা বললেন, ঠিক ধরেছিস। ঐ বিদেশী চেহারার যে চটক থাকে তাই নিয়ে বাঁধল ফ্যাসাদ।
নাচের মজলিসে, বিশেষ করে একই টেবিলে তো আর ব্যাকরণসম্মত পদ্ধতিতে ইনট্রডাকশন করে দেবার রেওয়াজ নেই। কপোতীটি বিনা আড়ম্বরে শুধালো, আপনি কোন দেশের লোক? উত্তর দিলুম। তারপর এটা ওটা সেটা এমনকি ফষ্টিটা-নষ্টিটা, অবশ্যি সন্তর্পণে, যেন ফুলদানির ফুলের ভিতর দিয়ে থু দ্য ফ্লাওয়ার্স।ওদিকে দেখি কপোতটি এ জিনিসটা আদপেই পছন্দ করছে না।
আমি ভাবলুম, কাজ কী হাঙ্গামা বাড়িয়ে। দু-একটা প্রশ্নের উত্তর দিলুম না, যেন শুনতে পাইনি। কিন্তু মারিয়াটা ঘড়েল মেয়ে। ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে চট করে, আর নষ্টামির ভূত চেপেছে তার ঘাড়ে, হয়তো শ্যাম্পেনও তার জন্য খানিকটা দায়ী। সে আরম্ভ করল মেয়েটাকে ওসকাতে। বলল, জানেন, ইনি আমার দাদা হন।
মেয়েটি বলল, তা কী করে হয়! ওঁর রঙ বাদামী, চুল কালো, উনি তো ইন্ডার।মারিয়া গম্ভীর মুখে বলল, ঐ তো! উনি যখন জন্মান, মা-বাবা তখন কলকাতার জর্মন কনসুলেটে কর্ম করতেন। কলকাতার তোক বাঙলা ভাষায় কথা কয়। দাদাকে জিজ্ঞেস করুন উনি বাঙলা জানেন কি না।মেয়েটি হেসে কুটিকুটি।
বলল, হ্যাঁ, ওর জর্মন বলাতে কেমন যেন একটু বিদেশী গোলাপের খুশবাই রয়েছে। মেরেছে। বিদেশী ওঁচা এ্যাকসেন্ট হয়ে দাঁড়ালো গোলাপী খুশবাই’!চাচা বললেন, আমি মারিয়াকে দিলুম ধমক দিয়ে করলুম ভুল। বোঝা উচিত ছিল মারিয়ার স্কন্ধে তখন শ্যাম্পেনের ভূত ড্যাংড্যাং করে নাচছে। শ্যাম্পেনকে ঝাঁকুনি দিলে তার বজবজ বাড়ে বই কমে না।
মারিয়া মরমিয়া সুরে কপোতর কাছে মাথা নিয়ে গিয়ে বলল, ‘আর উনি এ্যাসা খাসা নাচতে পারেন। আমাদেরই ওয়ালটু নাচ—আর তার উপর থাকে ভারতীয় জরির কাজ। আইন, ৎসুয়াই, দ্রাই—আইন, ৎসুয়াই, ড্রাই—তার সঙ্গে ধা, ধিন, না; ধা, তিন না; ডাডরা-না?’চাচা বললেন, ‘পাঁচপীরের কসম, আমার বাপ-ঠাকুর্দা চতুর্দশ পুরুষের কেউ কখনো নাচেনি।
মুখে গরম আলু পড়াতে হয়তো নেচেছে, কিন্তু সে তো ওয়ালট নয়। মেয়েটাও বেহায়ার একশেষ। মারিয়াকে বলল, তা উনি যে নাচতে পারবেন তাতে আর বিচিত্র কী? কী রকম যেন সাপের মতো শরীর। বলে চোখ দিয়ে যেন আমার গায়ে এক দফা হাত বুলিয়ে নিল।চাচা বললেন, ওঃ! এখনো ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। ওদিকে ছেলেটাও চটে উঠেছে।
আর চটবে নাই বা কেন? বান্ধবীকে নিয়ে এসেছে নাচের মজলিসে ফুর্তি করতে। সে যদি আরেকটা মদ্দার সঙ্গে জমে যায় তবে কার না রাগ হয়? কপোত দেখি বাজপাখির মূর্তি ধরতে আরম্ভ করছে। তখন তাকিয়ে দেখি তার কোটে লাগানো রয়েছে নাৎসি পার্টির মেম্বারশিপের নিশান। ভারি অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলুম।
মারিয়া তখন তার-সপ্তকের পঞ্চমে। শেষ বাণ হানলো, ‘একটু নাচুন না, হের ডক্টর।’আমাদের দেশে যেমন বাচ্চা মেয়ের নাম ‘পেঁচির মা, ‘ঘেঁচির মা’ হয়, আপন বাচ্চা জন্মাবার বহু পূর্বে, মনিক অঞ্চলে তেমনি ডক্টরেট প্রসব করার পূর্বেই পোয়াতী অবস্থাতেই আত্মীয়স্বজন ডাকতে আরম্ভ করে, ‘হের ডক্টর।
আমার তখনো ডক্টরেট পাওয়ার ঢের বাকি, কিন্তু আত্মজনের নেকনজরে আমি য়ুনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হার্ড-বয়লড ‘হের ডক্টর’ হয়ে গিয়েছিলুম। মারিয়ার অবিশ্যি এই বোেকায় ‘হের ডক্টর’ বলার উদ্দেশ্য ছিল মেয়েটিকে ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়া যে অজ পাড়াগাঁয়ের মেলাতে বসে থাকলেই মানুষ কিছু কামার-চামার হতে বাধ্য নয়—আমি রীতিমত খানদানী মনিষ্যি, ‘হের ডক্টর’—বাঙলা কথা।
মেয়েটি তখন কাতর হয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে বলল, হে-র-ড-ক্–ট্–র!’চাচা বললেন, আমি মনে মনে বললুম দুত্তোর ‘হের ডক্টর’, আর দুত্তোর এই মারিয়াটা! মুখে বললুম, মারিয়া, আমি এখখুনি আসছি। বলে, দিলুম চম্পট।চাচা বললেন, ‘তোরা তো মুনিকে যাসনি, কাজেই জানিসনে মানুষ সেখানে কী পরিমাণ বিয়ার খায়। তাই সবাইকে যেতে হয় ঘনঘন বিশেষ স্থলে।
আমি এসব জিনিস খাইনে, কিন্তু তাই নিয়ে তো মারিয়া আর তর্কাতর্কি জুড়তে পারে না।চাচা বললেন, ঠিক ধরেছিস। ঐ বিদেশী চেহারার যে চটক থাকে তাই নিয়ে বাঁধল ফ্যাসাদ।নাচের মজলিসে, বিশেষ করে একই টেবিলে তো আর ব্যাকরণসম্মত পদ্ধতিতে ইনট্রডাকশন করে দেবার রেওয়াজ নেই। কপোতীটি বিনা আড়ম্বরে শুধালো, আপনি কোন দেশের লোক? উত্তর দিলুম।
তারপর এটা ওটা সেটা এমনকি ফষ্টিটা-নষ্টিটা, অবশ্যি সন্তর্পণে, যেন ফুলদানির ফুলের ভিতর দিয়ে থু দ্য ফ্লাওয়ার্স।ওদিকে দেখি কপোতটি এ জিনিসটা আদপেই পছন্দ করছে না।আমি ভাবলুম, কাজ কী হাঙ্গামা বাড়িয়ে। দু-একটা প্রশ্নের উত্তর দিলুম না, যেন শুনতে পাইনি। কিন্তু মারিয়াটা ঘড়েল মেয়ে।
ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে চট করে, আর নষ্টামির ভূত চেপেছে তার ঘাড়ে, হয়তো শ্যাম্পেনও তার জন্য খানিকটা দায়ী। সে আরম্ভ করল মেয়েটাকে ওসকাতে। বলল, জানেন, ইনি আমার দাদা হন।মেয়েটি বলল, তা কী করে হয়! ওঁর রঙ বাদামী, চুল কালো, উনি তো ইন্ডার।মারিয়া গম্ভীর মুখে বলল, ঐ তো! উনি যখন জন্মান, মা-বাবা তখন কলকাতার জর্মন কনসুলেটে কর্ম করতেন।
কলকাতার তোক বাঙলা ভাষায় কথা কয়। দাদাকে জিজ্ঞেস করুন উনি বাঙলা জানেন কি না।মেয়েটি হেসে কুটিকুটি। বলল, হ্যাঁ, ওর জর্মন বলাতে কেমন যেন একটু বিদেশী গোলাপের খুশবাই রয়েছে। মেরেছে। বিদেশী ওঁচা এ্যাকসেন্ট হয়ে দাঁড়ালো গোলাপী খুশবাই’!চাচা বললেন, আমি মারিয়াকে দিলুম ধমক দিয়ে করলুম ভুল।
বোঝা উচিত ছিল মারিয়ার স্কন্ধে তখন শ্যাম্পেনের ভূত ড্যাংড্যাং করে নাচছে। শ্যাম্পেনকে ঝাঁকুনি দিলে তার বজবজ বাড়ে বই কমে না। মারিয়া মরমিয়া সুরে কপোতর কাছে মাথা নিয়ে গিয়ে বলল, ‘আর উনি এ্যাসা খাসা নাচতে পারেন। আমাদেরই ওয়ালটু নাচ—আর তার উপর থাকে ভারতীয় জরির কাজ।
আইন, ৎসুয়াই, দ্রাই—আইন, ৎসুয়াই, ড্রাই—তার সঙ্গে ধা, ধিন, না; ধা, তিন না; ডাডরা-না?’ চাচা বললেন, ‘পাঁচপীরের কসম, আমার বাপ-ঠাকুর্দা চতুর্দশ পুরুষের কেউ কখনো নাচেনি। মুখে গরম আলু পড়াতে হয়তো নেচেছে, কিন্তু সে তো ওয়ালট নয়। মেয়েটাও বেহায়ার একশেষ।
মারিয়াকে বলল, তা উনি যে নাচতে পারবেন তাতে আর বিচিত্র কী? কী রকম যেন সাপের মতো শরীর। বলে চোখ দিয়ে যেন আমার গায়ে এক দফা হাত বুলিয়ে নিল।চাচা বললেন, ওঃ! এখনো ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। ওদিকে ছেলেটাও চটে উঠেছে। আর চটবে নাই বা কেন? বান্ধবীকে নিয়ে এসেছে নাচের মজলিসে ফুর্তি করতে।
সে যদি আরেকটা মদ্দার সঙ্গে জমে যায় তবে কার না রাগ হয়? কপোত দেখি বাজপাখির মূর্তি ধরতে আরম্ভ করছে। তখন তাকিয়ে দেখি তার কোটে লাগানো রয়েছে নাৎসি পার্টির মেম্বারশিপের নিশান। ভারি অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলুম।মারিয়া তখন তার-সপ্তকের পঞ্চমে। শেষ বাণ হানলো, ‘একটু নাচুন না, হের ডক্টর।’
Read more
বেলতলাতে দু-দুবার (৩য় পর্ব) – সৈয়দ মুজতবা আলী
