বিরাট পণ্ডিত। চার–পাঁচটা ন্যায়রত্ব রামনিধি পানিতে গুলে খেয়ে ফেলতে পারে। তােমার শরীর শুদ্ধির ব্যবস্থা কি করব ? যাক আরাে কিছু দিন। তাছাড়া আপনি শরীর শুদ্ধি করলে তাে হবে না। কেউ মানবে না। কাশির পণ্ডিতদের লাগবে।
তাও কথা। একটা কাজ করি, কোনাে শুভদিন দেখে দু’জনে কাশি চলে যাই। তােমার তাে অর্থের অভাব নাই। আমারে খরচ দিয়া নিয়া গেলা । পুণ্যধাম কাশি কোনােদিন দেখি নাই। দেখার শখ আছে। ………….নিয়ে যাব আপনাকে। কথা দিলাম। আমি উদ্ধার পাই বা না পাই আপনার শখ মেটাব।
অম্বিকাচরণ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলেন, হরিচরণের জন্যে তার সত্যি খারাপ লাগে। ….হরিচরণের জন্যে আরেকজন মানুষের খুবই খারাপ লাগে, তার নাম ধনু শেখ। সে লঞ্চঘাটের টিকেট বাবু। মাঝে মাঝে টুকটাক ব্যবসা করে। কোলকাতা থেকে এক ড্রাম লাল কেরােসিন নিয়ে এসে বান্ধবপুরে বিক্রি করে। লঞ্চে পাঠিয়ে দেয় শুকনা মরিচ। এতে বাড়তি আয় যা হয় তা সে ব্যয় করে নতুন বিয়ে করা স্ত্রীর পেছনে।
পাউডার, স্নাে, শাড়ি, রুপার গয়না। লঞ্চঘাটের কাছেই টিনের এক চালায় তার সংসার। স্ত্রীর নাম কমলা। ধনু শেখ স্ত্রীর খুবই ভক্ত। তার একমাত্র স্বপ্ন একদিন সে একটা লঞ্চ কিনবে । সেই লঞ্চ নারায়ণগঞ্জ সােহাগগঞ্জ চলাচল করবে। লঞ্চের নাম এমএল কমলা। এমএল হলাে মােটর লঞ্চ। সেই লঞ্চে কমলা নামের যে–কোনাে যাত্রী যদি উঠে সে যাবে ফ্রি। তার টিকেট লাগবে না।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ লঞ্চের টিকেট কাটতে এলেই ধনু শেখ কোনাে না কোনাে প্রসঙ্গ তুলে হরিচরণের জাত নষ্টের কথা তুলবে ।।
বাবু, আপনে বলেন— মনে করেন সুন্দর একটা কুত্তার বাচ্চা রাস্তায় হাঁটতেছে। আপনে ‘আয় তু তু’ বললেন, সে লাফ দিয়া আপনের কোলে উঠল। আপনের জাইত কিন্তু গেল না। মুসলমানের এক বাচ্চা কোলে নিছেন— জাইত গেল। এখন মীমাংসা দেন— মুসলমানের বাচ্চা কি কুত্তার চাইতে অধম ?
যে সব বাবুদের এ ধরনের প্রশ্ন করা হয় তারা বিব্রত হন না। বিরক্ত হন। কেউ কেউ বলেন, তুমি টিকেট বাবু। তুমি টিকেট বেচবা। এত কথা কী ? | জাইত জিনিসটা কী বুঝায়া বলেন। শরীরের কোন জায়গায় এই জিনিস থাকে, ক্যামনে যায় ? জিনিসটা কি ধুয়াশা ?
তুমি বড়ই বেয়াদব। তােমার মালিকের কাছে বিচার দিব। চাকরি চইল্যা। যাবে। না খায়া মরবা। …..মরলে মরব। তয় জাইতের মীমাংসা কইরা দিয়া মরব। তুমি জাইতের মীমাংসা করার কে? জাইতের তুমি কী বুঝ ? আমি না বুঝলেও আপনেরা তাে বােঝেন। আপনেরা মীমাংসা দেন।
বেয়াদবির কারণেই ধনু শেখের টিকেট বাবুর চাকরি চলে গেল। লঞ্চ কোম্পানির মালিক নিবারণ চক্রবর্তী তাকে ধর্মপাশা অফিসে ডেকে পাঠালেন। বিরক্ত গলায় বললেন, ধনু, উইপােকা চেন ? …..ধনু শেখ ভীত গলায় বলল, চিনি। উঁইপােকার পাখা কেন উঠে জানাে ? উড়াল দিবার জন্যে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
উইপােকার পাখা উঠে মরিবার তরে। তুমি উঁইপােকা ছাড়া কিছু না। তােমার পাখা উঠেছে। তুমি সবেরে জাইত পাইত শিখাইতেছ ? …..ধনু শেখ বলল, কর্তা ভুল হইছে। ভুল স্বীকার পাইলে কানে ধর। কানে ধইরা একশ’বার উঠবােস কর ।
ধনু দেরি করল না। কানে ধরে উঠবােস শুরু করল। সে ধরেই নিয়েছিল চাকরি চলে যাবে। কানে ধরে উঠবােসের মতাে অল্প শাস্তিতে পার পেয়ে যাচ্ছে দেখে সে আনন্দ। তার হাঁটুতে ব্যথা, উঠবােস করতে কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্ট কোনাে কষ্টই না।
নিবারণ চক্রবর্তী খাতা দেখছিলেন। খাতা থেকে মাথা তুলে বললেন, একশ’বার কি হইছে ? ..জে কর্তা হইছে। এখন বিদায় হও। তােমার চাকরি শেষ। লঞ্চঘাটায় নতুন টিকেট বাবু যাবে।……আইজ দিনের মধ্যে বাড়ি ছাড়বা। নতুন টিকেট বাবু পরিবার নিয়া উঠবে।
আমার চাকরি শেষ ? এতক্ষণ কী বললাম ? …..ধনু শেখ বলল, চাকরি যদি শেষই করবেন কান ধইরা উঠবােস করাইলে। কী জন্যে? ……..নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, আগেই যদি বলতাম চাকরি শেষ তাহলে কি কানে ধরে উঠবােস করতা? এই জন্যে আগে বলি নাই।
ধনু শেখ বলল, এইটা আপনের ভালাে বিবেচনা । | তােমার ছয়দিনের বেতন পাওনা আছে। নতুন টিকেট বাবুর কাছে থাইকা নিয়া নিবা। তার নাম পরিমল। যাও, এখন বিদায়। জটিল হিসাবের মধ্যে আছি।
ধনু শেখ অতি দ্রুত গভীর জলে পড়ে গেল। স্ত্রীকে নিয়ে উঠার কোনাে জায়গা নেই। নিজের খরুচে স্বভাবের কারণে সঞ্চয়ও নেই।। | সে কিছুদিন বাজে মালের দোকান চালাবার চেষ্টা করল। স্ত্রীর জায়গা হলাে নৌকায় । ছইওয়ালা নৌকার দু‘পাশ শাড়ি দিয়ে ঘিরে তার ভেতরে সংসার।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
ধনু শেখের দোকান চলল না। হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ তার দোকান থেকে কিছু কেনে না। আশ্চর্যের ব্যাপার, মুসলমানওরাও না। রাতে নৌকায় ঘুমাতে গিয়ে ধনু শেখ হতাশ গলায় বলে, বউ কী করি বলাে তাে। নতুন কোনাে ব্যবসা দেখবেন ? কী ব্যবসা ? ঘােড়াতে কইরা ধর্মপাশা থাইকা মাল আনবেন।
এই ব্যবসা করব না বউ। যারা ঘােড়ার মাল টানাটানি করে তারার স্বভাব হয় ঘােড়ার মতাে। ঘােড়া হওয়ার ইচ্ছা নাই । ……নিবারণ চক্রবর্তীর কাছে গিয়া তার পায়ে উপুড় হইয়া পইড়া দেখবেন। পুরান চাকরি যদি ফেরত পান। | ধনু শেখ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, লাভ নাই। উনার নতুন টিকেট বাবু কাজ ভালাে জানে। তার জায়গায় আমারে দিবে না।
এখন উপায়? তাই ভাবতেছি। ……অতিদ্রুত অবস্থা এমন পর্যায়ে গেল যে চাল ডাল কেনার টাকায় টান পড়ল। এর মধ্যে আরেক বিপদ কমলা গর্ভবতী। তার সারাক্ষণ ভুখ লাগে। এটা সেটা খেতে ইচ্ছা করে। একদিন অর্ধেকটা মিষ্টি কুমড়া কাচা খেয়ে ফেলল।
ধনু শেখ বলল, বৌ, তােমারে তােমার মায়ের কাছে পাঠায়া দেই ? …..কমলা বলল, আপনেরে এতবড় বিপদে ফেইলা আমি বেহেশতেও যাব না। তাছাড়া আমার মার নিজেরই খাওন জুটে না। আমার কাছে স্বর্ণের একটা চেইন আছে। এইটা বিক্রি করেন। ……….ধনু শেখ স্বর্ণের চেইন বিক্রি করতে পারল না।
