হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৫

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৫

ফোর্টি সিক্স ত্রূমোজমে মানুষের ভবিষৎ লেখা থাকে । সে কেমন হবে কী হবে, সব কিন্ত্ত প্রিডিটারমিন্ড । জিন সব নিয়ন্ত্রণ করেছে ।

ফুপা আর নেবেন না ।

আরে এখনি বন্ধ করব কী ? নেশাটা মাত্র ধরেছে । তুমি মানুষ খারাপ না । i like you. তুমি পাগল ঠিকই, তবে ভালো পাগল । তোমার বাবা ছিল খারাপ ধরনের পাগল । বাবা সম্পর্কে কথাবার্তা থাক ।

ফুপা নিচু গলায় বললেন, কাউকে যদি না বল তাহলে তোমার বাবার সম্পর্কে আমার একটি ধারণার কথা বলতে পারি । আমি আর কাউকে বলিনি । শুধু তোমাকেই বলছি ।

বাদ দিন । কিছু বলতে হবে না ।

জাস্ট আমার একটা ধারণা । ভুলও হতে পারে । আমার বেশিরভাগ ধারণাই ভুল প্রমাণিত হয় । হা-হা-হা । আমার বোধহয় আর খাওয়া উচিত হবে না । শুধু লাস্ট ওয়ান হয়ে যাক । ওয়ান ফর দি রোড । হিমু ।

জি ।

তোমার ‍যদি ইচ্ছা করে খানিকটা খেয়ে দেখতে পার । উল্টোদিকে ফিরে খেয়ে ফেল । আমি কিছুই মনে করব না । আমার মধ্যে কোনো প্রিজুডিস নেই । তুমি হচ্ছ বন্ধুর মতো ।

আমি খাব না । আপনিও বন্ধ করুন ।

নটা কি হয়ে গেছে ?

হ্যাঁ ।

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী

দশে শেষ করা যাক । জোড় সংখ্যা- তারপর তোমার বাবা সম্পর্কে কী যেন বলছিলাম ?

কিছু বলছিলেন না ।

বলছিলাম । মনে পড়েছে- আমার কি ধারণা জানো ? আমার ধারণা তোমার বাবা তোমার মাকে খুন করেছিল ।

আমি সহজ গলায় বললাম , এ রকম ধারণা হবার কারণ কী ?

যখন তোমার বাবার সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হলো তখন সে অনেক কথাই বলল, কিন্ত্ত দেখা গেল নিজের স্ত্রীর সম্পর্কে কিছু বলছে না । সে কীভাবে মারা গেল জিজ্ঞেস করেছিলাম । প্রশ্ন শুনে রেগে গিয়ে বলেছিল, অন্য দশটা মানুষ যেভাবে মারা যায় সেইভাবে মারা গিয়েছিল ।

আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললাম, এটা শুনেই আপনি ধরে নিলেন বাবা মাকে খুন করেছেন ?

হ্যাঁ । অবশ্যি আমার অনুমান ভুলও হতে পারে । আমার অধিকাংশ অনুমানই ভুল হয় ।

আমি চুপ করে বসে রইলাম । ফুপার অধিকাংশ অনুমান ভুল হলেও এই অনুমানটি ভুল নয় । এটা সত্যি । আমি এটা জানি । আমি ছাড়াও অন্যকেউ এটা অনুমান করতে পারে, এটা আমার ধারণার বাইরে ছিল ।

ফুপা মদের ঘোরে ঝিম মেরে বসে আছেন । আমি আকাশের তারা দেখছি ।

হিমু !

জি ।

তোমার বন্ধুকে কাল নিয়ে এসো । চাকরি দিয়ে দেব ।

আচ্ছা ।

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী

বড় ঘুম পাচ্ছে । এখানেই শুয়ে পড়ি কেমন ?

শুয়ে পড়ুন ।

ফুপা কুণ্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে পড়লেন । আমি আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে রইলাম । অনেক দিন আগে বাবা আমাকে ছাদে এনে আকাশের তারা দেখিয়ে বলেছিলেন, যখনই সময় পাবি ছাদে এসে আকাশের তারার দিকে তাকাবি, এতে মন  বড় হবে । মনটাকে বড় করতে হবে । ক্ষুদ্র শরীরে আকাশের মতো বিশাল মন ধারণ করতে হবে । বুঝলি ? বুঝে থাকলে বল- হ্যাঁ ।

বাবা হৃষ্টগলায় বললেন, তোর ওপর আমার অনেক আশা । অনেক আশা নিয়ে তোকে বড় করছি । তোর মা বেঁচে না থাকায় খুব সুবিধা হয়েছে । ও বেঁচে থাকলে আদর দিয়ে তোকে নষ্ট করত । আমি যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি তার কিছুই করতে দিত না । পদে পদে বাধা দিত । দিত কিনা বল ? হ্যাঁ দিত । তোর মা না থাকায় তাহলে একদিক দিয়ে ভালোই হয়েছে, তাই না ?

হ্যাঁ ।

বাবা হঠাৎ গলা নিচু করে বললেন, তোর মা যে নেই এর জন্যে আমার ওপর কোনো রাগ নেই তো ?

তোমার ওপর রাগ হবে কেন ?

বাবা অপ্রস্ত্ততের হাসি হাসলেন । সেই হাসি আমার বুকে বিঁধল । চট করে মনে পড়ল, অনেক অনেক কাল আগে সুন্দর একটা টিয়া পাখিকে বাবা গলা টিপে মেরে ফেলেছিলেন ।

 

হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২৬

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *