জানুয়ারির কুড়ি তারিখ। বুধবার।ভোরবেলা এক পশলা বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়া শীতল। গারোপাহাড় থেকে কনকনে হাওয়া আসছে। ডিসট্রিক্ট জজ আবুল কাশেম এজলাশে বসেছেন। তাঁর গায়ে কোট। গলায় মাফলার। এই মাফলার তার মেয়ে শাহেদা নিজের হাতে বুনেছে। অতিরিক্ত ঠান্ডা পড়েছে বলে কোর্টে রওনা হওয়ার সময় মাফলার গলায় দিয়েছিলেন। কাজটা ভুল হয়েছে। মাফলারটা তার কাছে সাপের মতো লাগছে। যেন রঙিন একটা সাপ তার গলা পেঁচিয়ে আছে।
মাফলারটাকে সাপের মতো মনে হওয়ার কারণ আছে। শাহেদা নামের যে মেয়ে মাফলার বুনেছে, সে রবিবার ভোরে পালিয়ে কুমিল্লায় চলে গেছে। তিনি খবর পেয়েছেন কুমিল্লায় সে বিয়ে করেছে। বিয়ে করেছে তার গানের টিচারকে। হারামজাদার নাম কিসমত।আবুল কাশেম গলা থেকে মাফলার খুলতে খুলতে চাপা গলায় বললেন, বদমাইশ কোথাকার! চাপরাশি বলল, কিছু বললেন স্যার?
আবুল কাশেম বললেন, পানি দাও। পানি খাব। মাফলারটা নিয়ে যাও।আবুল কাশেম ঝিম ধরে বসে আছেন। আদালতও ঝিম ধরে আছে। ফরিদের মামলার আজ রায় হবে। খুনের মামলার রায়। আদালত ঝিম ধরে থাকারই কথা।
আবুল কাশেম অস্ফুট স্বরে বললেন, হারামজাদি! এইবার মেয়েকে উদ্দেশ করে বলা। মেয়ে সবার সামনে তাকে বেইজ্জত করেছে। মেয়ের কারণে তাকে সবার কাছে মিথ্যা বলতে হয়েছে। জটিল মিথ্যা—’বাধ্য হয়ে বিয়ে ভেঙে দিয়ে মেয়েকে কুমিল্লায় তার এক ফুপুর কাছে পাঠিয়েছি। পাত্রের বিষয়ে একটা উড়োচিঠি পেয়েছিলাম। আমি কোনো গুরুত্ব দেই নাই। কিন্তু মেয়ের মা অন্যরকম মহিলা। মেয়ে তার অতি আদরের।
আবুল কাশেম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। তার অতি আদরের মেয়ে বিয়ে উপলক্ষে বানানো চল্লিশ ভরি সোনার গয়না এবং নগদ ত্রিশ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়েছে। এই কাজটা বুদ্ধিমতীর মতো করেছে।দুই পয়সার গানের টিচার বৌকে খাওয়াবে কী? সাত-আটটা টিউশনি করে কয় পয়সা পাবে?
একবার মনে হয়েছিল মেয়ের নামে মামলা করে দেন। চুরির মামলা। ফৌজদারি মামলা, ৪৫৫/৩৮০ ধারা। পুলিশ মেয়েকে ধরে হাজতে কাক। বদ মেয়ে। মানুষ যা ভাবে তা করতে পারে না। সামাজিকতা বাধা হয়ে দাঁড়ায়।কত স্বপ্ন ছিল! ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিবেন। বিয়েতে অতিথি হিসাবে গভর্নর সাহেব উপস্থিত থাকবেন। পুলিশ লাইন থেকে পুলিশের ব্যান্ডপার্টি আনাবেন, তারা ব্যান্ড বাজাবে।
বর রেলস্টেশন থেকে হাতিতে চড়ে আসবে। সুসং দুর্গাপুর থেকে হাতি আসবে। কিছুই হলো না। হারামজাদি চলে গেছে হারামজাদার কাছে। যা বেটি গানবাজনা কর। নাকি সুরে বাকিজীবন রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘খোলা খোলো দ্বার, রাখিও না আর…।’ আবুল কাশেম আদালতের কার্যক্রম শুরু করলেন। রায় পড়ে শোনালেন। দশ পাতা রায়ের মূল বিষয়–
সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু না। আসামির খুন পূর্বপরিকল্পিত। তাকে নগ্ন করে ভাটিপাড়ায় ঘোরানোর অপমানের শোধ নেওয়ার জন্যেই সে খুনের পরিকল্পনা করে। সে নিজেই খুনের উদ্দেশ্যে বুলেট সংগ্রহ করে। খুনের পরিকল্পনার কথাও অতি ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের কাছে প্রকাশ করে। তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো… কোর্টরুম নিস্তব্ধ। ফরিদ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সফুরা হঠাৎ মাথা ঘুরে বেঞ্চে পড়ে গেল।
রায় পড়া হলো দুপুর একটায়। ঠিক একই সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সি গেটের সামনে আসাদুজ্জামানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পিস্তল দিয়ে খুব কাছ থেকে গুলি করে পুলিশের এক ডিএসপি, নাম বাহাউদ্দিন উত্তরের উত্তাল গণআন্দোলনের সেদিনই শুরু। ঢাকা শহরের মানুষ তীব্র রোষে ফেটে পড়ে। শহর হয়ে যায় সমুদ্র, যে সমুদ্রে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ সুনামি।
শহিদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে লাখো মানুষের মিছিল হলো রাজপথে। স্বতঃস্ফুর্ত গণজাগরণ।পরের দিনের দৈনিক আজাদ পত্রিকার হেডলাইনে লেখা হলো—মৃত্যুর জানাজা মোরা কিছুতেই করিব না পাঠ। জীবনের দাবি আজ এতই বিরাট! রক্তমাখা শার্ট নিয়ে কবি শামসুর রাহমান তার বিখ্যাত কবিতা লিখলেন—
আসাদের শার্ট
গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের
জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট
উড়ছে হাওয়ায় নীলিমায়।
বোন তার ভায়ের অম্লান শার্টে দিয়েছে লাগিয়ে
নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম কখনো
হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সূক্ষ্মতায়
বর্ষীয়সী জননী সে শার্ট
উঠোনের রৌদ্রে দিয়েছেন মেলে কতদিন স্নেহের বিন্যাসে।
ডালিম গাছে মৃদু ছায়া আর রোদ্দুর-শোভিত
মায়ের উঠোন ছেড়ে এখন সে শার্ট
শহরে প্রধান সড়কে
কারখানার চিমনি-চুড়োয়
গমগমে এভেনর আনাচে কানাচে
উড়ছে উড়ছে অবিরাম
আমাদের হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে,
চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।
আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।
ঢাকার আন্দোলন ময়মনসিংহ শহরে সেদিন পৌঁছেনি। শহর শান্ত। শহরের কাজকর্ম ঠিকমতো চলছে। চায়ের দোকানে চা বিক্রি হচ্ছে। চিন্তিত পথচারী সিগারেট খেতে খেতে যাচ্ছে। কাধে বাঁদর নিয়ে বাঁদরওয়ালা ঘুরছে।কোর্ট থেকে ফিরে হাবীব খাওয়াদাওয়া শেষ করে দুপুরে ঘুমাতে গেছেন। তার মধ্যে কোনো উদ্বেগ বা উৎকণ্ঠা দেখা যাচ্ছে না। পিয়ন চিঠি দিয়ে গেছে। তিনি চিঠি পড়ছেন। রশিদ তার পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। হাবীব বললেন, সফুরা কি ফিরেছে?
রশিদ বলল, তাকে প্রণব স্যার হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।রায়ের খবর বাড়ির মহিলারা জানে? জি-মা।হাবীব বললেন, আমার পা টিপার প্রয়োজন নাই। সফুরাকে গিয়ে বললো, হতাশ হওয়ার কিছু নাই। আমরা আপিল করব। কাগজপত্র হাইকোর্টে যাবে। তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।রশিদ নিচুগলায় বলল, স্যার, আসলেই কি ঠিক হবে?
হাবীব তাকালেন রশিদের দিকে রশিদ কখনো তাঁরচাখে। চালে তাকায় না। আজ একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে সত্যি কথা বলা প্রয়োজন। রশিদ তার অতি পছন্দের একজন অনেক কাছের। সব মানুষেরই একজন ছায়া লাগে। রশিদ তার ছায়া।
হাবীব বললেন, ঝামেলা হয়ে গেছে হাইকোর্ট সাজা বহাল রাখবে। খুনের মামলায় প্রত্যক্ষ সাক্ষী গুরুত্বপূর্ণ। কঠিন প্রত্যক্ষ সাক্ষী আছে।রশিদ বলল, স্যার, সব তো মিথ্যা! কিছু মিথ্যা আছে যা একসময় আর মিথ্যা থাকে না, সত্য হয়ে যায়।একজন নির্দোষ মানুষ ফাঁসিতে ঝুলবে?
হাবীব বিছানায় উঠে বসতে বসতে বললেন, রশীদ মন দিয়ে শোনো তুমি আল্লাহ বিশ্বাস করো? অবশ্যই করি স্যার।তিনি কী বলেছেন? তিনি বলেছেন, আমার হুকুম ছাড়া গাছের পাতাও নড়বে। তুমি বলো, বলেছেন? জি স্যার।কাজেই যা ঘটছে আল্লাহর হুকুমেই ঘটছে, ঠিক?
রশিদ চুপ করে রইল। হাবীব বললেন, আরও পরিষ্কার করে বলি–পাঁচটা বিষয় আল্লাহপাক নিজের হাতে রেখেছেন। হায়াত, মউত, রিজিক, ধনদৌলত এবং বিবাহ। মউত কার কীভাবে ঘটবে তা উনি নির্ধারণ করেন। মানুষের এখানে কোনো হাত নাই। ফরিদ ফাঁসিতে ঝুলে মরবে নাকি পাতলা পায়খানা করতে করতে মারা যাবে তা পূর্বনির্ধারিত। এখন পরিষ্কার হয়েছে? জি।
তাহলে যাও যা করতে বলেছি করো।রশিদ চলে গেল। হাবীব চিঠি পড়তে বসলেন। একটা চিঠি এসেছে নাদিয়ার শিক্ষক বিদ্যুত কান্তি দে’র কাছ থেকে। হাবীব ভুরু কুঁচকে চিঠি পড়তে শুরু করলেন। এই লোক তাকে কেন চিঠি লিখবে?
জলাব,
আমি বিদ্যুত। আপনার মেয়ে নাদিয়ার শিক্ষক। আপনাকে ধন্যবাদ দেওয়ার জন্যে এই চিঠি।আমি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের এক ছেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভ ভাকেন্সির চাকরি চলে যাওয়ায় বিরাট বিপদে পড়ি। প্রায় অনাহারে থাকার মতো অবস্থা। তখন হঠাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি পাই। আমাকে জরুরি ভিত্তিতে দেখা করতে বলা হয়।শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গিয়ে জানতে পারি আমাকে Ph.D প্রোগ্রামের স্কলারশিপ দেওয়া হয়েছে। গভর্নর মোনায়েম খানের সুপারিশে এই কাজটি হয়েছে।
নাদিয়ার পড়াশোনায় বিরাট বিঘ্ন ঘটেছে। আপনি বিচক্ষণ মানুষ। বিঘ্ন দূর করে নাদিয়ার পড়াশোনা শুরুর ব্যবস্থা করুন। আমার বিনীত অনুরোধ।আমি ফেব্রুয়ারি মাসে যাত্রা করব। এরমধ্যে পাসপোর্ট ভিসার ঝামেলা শেষ করব।আমি ঈশ্বর-ভগবান এইসবে বিশ্বাস করি না। তারপরেও ঈশ্বরের কাছে আপনার এবং আপনার পরিবারের সকল সদস্যের মঙ্গলের জন্যে প্রার্থনা করছি।
ইতি
কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ
বিদ্যুত কান্তি দে
হাবীব সন্ধ্যাবেলা বারান্দায় চা খেতে বসে নাদিয়াকে ডেকে চিঠি পড়তে দিলেন। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করলেন, চিঠি হাতে নিয়ে নাদিয়া অল্প অল্প কাঁপছে। তার চোখ ছলছল করছে। হাবীব বললেন, কাঁদছিস কেন?
নাদিয়া বলল, স্যারের এত ভালো একটা খবর শুনে চোখে পানি এসে গেছে। স্যারকে আমরা কী যে পছন্দ করি! উনার সবচেয়ে বড় গুণ কী জানো বাবা? উনি মানুষের মধ্যে স্বপ্ন ঢুকিয়ে দিতে পারেন।তোর মধ্যে কী স্বপ্ন ঢুকিয়েছেন? নাদিয়া জবাব না দিয়ে চিঠিটা আবার শুরু থেকে পড়তে শুরু করল। এখনো তার হাত কাঁপছে।নাদিয়া।জি বাবা।হোসনা মেয়েটার কী অবস্থা? এখন কি কথা বলে?
না বেশির ভাগ সময় ছাদের চিলেকোঠায় বসে থাকে। তাকে কোনোদিন কাঁদতে দেখি নাই। কঁদলে মনে হয় তার ভালো লাগত। বিদ্যুত স্যার যদি কিছুক্ষণ মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতেন মেয়েটা ভালো হয়ে যেত।উনি কি তোর কাছে মহাপুরুষ পর্যায়ের কেউ? প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নাদিয়া বলল, বাবা, উনাকে চিঠি লিখে আসতে বলি? উনি পদ্মকে ঠিক করে দিয়ে যাক।পদ্ম কে?
হোসনার নাম আমি পদ্ম রেখেছি।হাবীব হাই তুলতে তুলতে বললেন, আমি তোর বিয়ের ব্যবস্থা করব। তোের দাদির শরীর এখন খুবই খারাপ, যে-কোনোদিন অঘটন ঘটে যাবে। তুই আপত্তি করিস না।আপত্তি করব না।প্রস্তাব দিয়ে প্রণবকে পাঠাই, দেখি কী হয়। কার কাছে প্রস্তাব পাঠাচ্ছি জানতে চাস না? আমি জানি।ফরিদের মামলার আজ রায় হয়েছে, এই খবর জানিস?
তো! মামলার বিষয়টাই আমি কিছু জানি না। মামলা মোকদ্দমা বিষয়ে কেউ আমার সঙ্গে কিছু বলে না।আমি নিষেধ করে দিয়েছি। আমার মতে পুরুষদের জগৎ আলাদা। মেয়েদের জগৎ আলাদা। মামলা মোকদ্দমা পুরুষদের বিষয়। ভালো কথা, তুই চিঠিটা আবার পড়া শুরু করেছিস কেন? মুখস্থ করবি? এটা তো কোনো পাঠ্যবই না।
নাদিয়া চিঠি নামিয়ে লজ্জিত ভঙ্গিতে তাকাল। হাবীব মেয়েকে চমকে দিয়ে বললেন, তোর স্যারকে আসতে বল। দেখি সে কীভাবে মানুষের মুখে বুলি ফোটায় নাদিয়া তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কাছে মনে হচ্ছে বাবা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন।
নাদিয়া ক্ষীণ গলায় বলল, বাবা! সত্যি আসতে বলব? হ্যাঁ। তোর কাছে আমার একটা উপদেশ আছে।বলো কী উপদেশ? কোনো মানুষকেই মহাপুরুষ ভাববি না। পৃথিবীতে মহাপুরুষ জন্মায় না।নাদিয়া বলল, বাবা, পৃথিবীতেই মহাপুরুষ জন্মায়। অনেকেই জন্মেছে। ভবিষ্যতেও জন্মাবেন। কয়েকজনের নাম বলব বাবা?
হাবীব উঠে দাঁড়ালেন। পিচ্চি মেয়ের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ শুরু করার কিছু নেই।প্রণব শুকনা পাতা জড়ো করে আগুন করেছেন। ঝাটা হাতে ছোটাছুটি করছে ভাদু! সে বাগান থেকে শুকনা পাতা নিয়ে আসছে। তার উৎসাহের সীমা নাই। প্রণব বললেন, আর লাগবে না। তুই তো শুকনা পাতার পাহাড় বানিয়ে ফেলেছিস। কাছে বস, আগুনে শরীর গরম কর।শরীর গরম করব না স্যার।করবি না কেন?
শরীর গরম করতে শরম পাই। প্রণব হেসে ফেললেন। তাঁর মনে হলো ভাদুর মতো বুদ্ধিহীন হয়ে জন্মালে জীবনটা সুখের হতো। জগতের কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করত না। তিনি মাথা থেকে ফরিদের বিস্মিত চোখ সরাতে পারছেন না। তিনি তাকিয়ে আছেন আগুনের দিকে। তাঁর কাছে মনে হচ্ছে বাঁ-পাশে ফরিদ দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তাকালেন বাদিকে, মনে হলো ফরিদ এখন ঠিক তার পেছনে।
‘তদেতৎ কারণং পশ্য যদর্থং তুং ময়া হতঃ।’কেন তোমাকে বধ করেছি তার কারণ শোনো… প্রণবের মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে। যতই সময় যাবে যন্ত্রণা বাড়বে। এই যন্ত্রণা কতদিন থাকবে কে জানে। ভাদু! জে সার।একটা গল্প বল।ভাদু সঙ্গে সঙ্গে গল্প শুরু করল—এক দেশে ছিল এক রাজা। রাজা তিনটা শাদি করেছে কিন্তু পুত্রসন্তান হয় নাই। খালি কন্যাসন্তান হয়। রাজা হইল বেজার। হাঁক দিয়া মন্ত্রী ডকিল। বলল, ও মন্ত্রী। মন্ত্রী বলল, জে। রাজা বলল, আমার মন বেজার হইছে…।
ভাদু গল্প বলে যাচ্ছে। হাত-পা নেড়ে গল্প। গল্পে অভিনয় অংশও আছে। প্রণব তাকিয়ে আছেন। তার কাছে মনে হচ্ছে ভাদু কী সুখেই না আছে।আমানুল্লাহ মোহম্মদ আসাদুজ্জামান।আসাদের মৃত্যুর পর তার এম, এ পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। ইতিহাসে মেধা তালিকায় স্থান করে দ্বিতীয় শ্রেণী লাভ করেন।
বাবা : এম, এ তাহের। শিবপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক।
মা : মতিজাহান খাদিজা খাতুন। প্রধান শিক্ষিকা, নারায়ণগঞ্জ আই. টি. স্কুল।
মহসিন হলে আমার সিঙ্গেল সিটের রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। আমি জানালার দিকে মাথা দিয়ে শুয়ে আছি। জানালা বিশাল। শীতের হাওয়া আসছে। গায়ে চাদর দিয়েছি। চাদরের ওম ওম উষ্ণতা। আমার হাতে টমাস হার্ডির লেখা বই এ পেয়ার অব ব্লু আইজ। মূল ইংরেজি বই না, অনুবাদ। আমি মুগ্ধ হয়ে প্রেমের উপন্যাস পড়ছি।
হল ছাত্রশূন্য। প্রতিদিনই মিটিং মিছিল চলছে। রাস্তায় নামলেই মিছিলে ঢুকে যেতে হয়। দেড় দু’মাইল হাঁটা। মিছিলে হিংস্রভাব চলে এসেছে। পুলিশের পাশাপাশি নেমেছে ইপিআর। পুলিশ রাস্তায় থাকে। ইপিআর ট্রাকের ওপর। পুলিশের চোখে থাকে আতঙ্ক, পাশাপাশি ইপিআরদের দেখায় যমদূতের মতো। কী প্রয়োজন এইসব ঝামেলায় যাবার! আমি দু’টি নীল চোখ নিয়ে ভালোই তো আছি। ‘য পলায়তি স জীবিত’। যে পালিয়ে থাকে সে-ই বেঁচে থাকে। আমি পালিয়ে আছি। তবে খুব যে সুখে আছি তা না। আমার প্রচণ্ড চিন্তা আমার পুলিশ অফিসার বাবাকে নিয়ে। মানুষজন আধাপাগলের মতো হয়ে গেছে। পুলিশ দেখলেই ইট মারছে। ধাওয়া করছে।
একদিন ডাইনিং হলে খেতে বসেছি, আমার ঠিক সামনে বসা এক ছাত্র গল্প করছে—কী করে তারা দৌড়ে এক পুলিশ কনস্টেবলকে ধরে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দেয়। মাথা থেঁতলাবার আগে আগে সে নাকি বলছিল—বাবারা, আস্তে বাড়ি দিয়ো। আস্তে। গল্প শুনে আশেপাশের সবাই হেসে উঠল। আমি স্পষ্ট চোখের সামনে দেখলাম, আমার বাবার মাথা ইট দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হচ্ছে। বাবা বলছেন, আস্তে মারো। আস্তে। আমি খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়লাম।
জনতার আক্রোশ সরকারের দিকে। সরকারকে তারা হাতের কাছে পাচ্ছে। পাচ্ছে ঠোল্লা অর্থাৎ পুলিশকে। তাদের স্লোগানে আছে–একটা দুইটা ঠোন্না ধরো, সকাল বিকাল নাশতা করো।‘৬৯ সনে ছাত্রজনতার ঘৃণা এবং রাগের কেন্দ্রবিন্দুর পুলিশরাই আবার মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকসেনার বিরুদ্ধে প্রথম অস্ত্রধারী। ইতিহাসের কী আশ্চর্য খেলা!
থাক এই প্রসঙ্গ, হলের গল্পে ফিরে যাই। এ পেয়ার অব ব্লু আইজ অনেকক্ষণ পড়া হয়েছে। এখন ব্যক্তিগত মিছিলে অংশ নেওয়া যায়। আমার ব্যক্তিগত মিছিল হলো, করিডরের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যাওয়া। এই হাঁটাহাঁটির সময় অদ্ভুত অদ্ভুত বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে ভালো লাগে। বয়সের কারণেই হয়তো আমার চিন্তায় একজন তরুণী থাকে। যে সারাক্ষণই আমার হাত ধরে থাকে। তরুণীর গা থেকে বালি বকুল ফুলের সৌরভ ভেসে আসে।
কল্পনার বকুলগন্ধা তরুণী পাশে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করছি এমন সময় এক কাও—কানে এল ডিম ভাজার শব্দ। প্রতিটি রুম তালাবন্ধ। বাইরে থেকে তালা ঝুলছে। এর মধ্যে একটা ঘরের ভেতর ডিম ভাজা হচ্ছে, এর অর্থ কী? কানে কি ভুল শুনছি? যে রুম থেকে ডিম ভাজার শব্দ আসছে আমি তার সামনে দাঁড়ালাম। চামচের টুং টাং শব্দ। পায়ে হাঁটার শব্দ। আমি দরজায় টোকা দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সব শব্দের অবসান। কিছু রহস্য অবশ্যই আছে। রহস্যটা কী? আমি নিজের ঘরে ফিরে গেলাম। রহস্যের কিনারা করতে হবে। (পাঠক, মিসির আলির জন্মলগ্ন।) রহস্যের সমাধান করলাম। এখন সমাধানের ধাপগুলি বলি—
১. ওই ঘরে একজন বাস করে। তাকে লুকিয়ে রাখতে হয় বলেই বাইরে থেকে তালা দেওয়া।
২. সে ঘরেই খাওয়াদাওয়া করে। ডিম ভাজার শব্দ তার প্রমাণ।
৩. সে বেশ কিছুদিন ধরেই ওই ঘরে আছে। ঘণ্টা দুয়েকের জন্যে বাস করলে ডিম ভেজে খেত না।
৪. চামচের টুং টাং শব্দ থেকে মনে হয় সে একজন মেয়ে। মেয়েদের চামচের শব্দের ভঙ্গি আলাদা। পুরুষ জোরে শব্দ করে।
৫. তাকে কেউ আটকে রাখেনি। আমি দরজায় টোকা দিয়েছি, সে চুপ করে গেছে। বন্দি কেউ হলে নিজেকে ঘোষণা করত।
সন্ধ্যাবেলায় আমি গেলাম হাউস টিউটর অধ্যাপক ইমরানের কাছে। আমি তাকে ঘটনা খুলে বললাম। অধ্যাপক ইমরান চোখ কপালে তুলে বললেন, তোমার মাথা খারাপ। তুমি মাথার চিকিৎসা করাও।আমি বললাম, জি আচ্ছা স্যার।জি আচ্ছা না। কাল পরশুর মধ্যে ডাক্তার দেখাবে।জি আচ্ছা স্যার।
ইমরান স্যার বললেন, পড়াশোনায় মন দাও। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা। তোমার মাথায় শয়তান কারখানা বানিয়েছে। যাও আমার সামনে থেকে বিদায়।আমি বিদায় হলাম। রাত আটটায় ইমরান স্যার দু’জন অ্যাসিসটেন্ট হাউস টিউটর নিয়ে আমার ঘরে উপস্থিত। হুঙ্কার দিয়ে বললেন, কোন ঘরে মেয়ে আটকে রাখা হয়েছে আমাকে দেখাও? যদি কিছু না পাওয়া যায় তোমাকে আমি ইউনিভার্সিটি থেকে তাড়াব।
রুমটা স্ট্যাটিসটিক্সের ছাত্র আবু সুফিয়ানের। সে তার ঘরে ছিল। ইমরান স্যার দলবল নিয়ে ঘরে ঢুকলেন, আমি রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। রুম খালি, রুমে কেউ নেই। আমার কলিজা মোচড় দিয়ে উঠল। কী সর্বনাশ! সুফিয়ান বিস্মিত হয়ে বলল, স্যার কী ব্যাপার?
ইমরান স্যার বললেন, কোনো ব্যাপার না। রুটিন চেক। তুমি কি ঘরে ইলেকট্রিক হিটার ব্যবহার করো? ইলেকট্রিক হিটার দেখতে পাচ্ছি। হিটার জব্দ করা হলো। এখন নিব না। সকালে তুমি অফিসে জমা দিবে।জি আচ্ছা স্যার।পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে, নাকি মিটিং মিছিল নিয়ে আছ?
ঠিকমতো পড়ছি স্যার।ইমরান স্যার উঠলেন। রুম থেকে বের হওয়ার সময় কাপড় রাখার কাবার্ড থেকে হঠাৎ কাচের চুড়ির টুং শব্দ পাওয়া গেল। ইমরান স্যার থমকে দাঁড়ালেন। কাবার্ড খুললেন। ষােল-সতেরো বছরের একজন তরুণী মাথা নিচু করে হামাগুড়ি দিয়ে বসে আছে। তার চোখভর্তি পানি।
জানা গেল এই তরুণীকে সুফিয়ান বিয়ে করেছে। বিয়ে আত্মীয়স্বজন কেউ স্বীকার করেনি। মেয়েটির থাকার জায়গা নেই বলে সুফিয়ান তাকে হলে এনে তুলেছে। গত ছয় মাস ধরে সে এখানেই আছে। অমানবিক এক জীবনযাপন করছে। মেয়েটিকে পশুর এক জীবন থেকে আমি উদ্ধার করেছি এতে সন্দেহ নেই। আবার মেয়েটির স্বামীকে এই কারণেই কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে তাতেও সন্দেহ নেই।
মেধাবী এই ছাত্রকে গুরুতর অপরাধের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দু’বছরের জন্যে বহিষ্কার করে। সুফিয়ান দু’বছর পর আবার পড়াশোনায় ফিরে আসে। পড়াশোনা শেষ করে, দেশের বাইরে থেকে Ph.D ডিগ্রি এনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করে।
আমার কাছে ‘৬৯-এর গণআন্দোলনের একটি দিক হলো বন্দিনী এক তরুণী।হলের রিডিংরুমে দেশের সব কটা খবরের কাগজ আসে। আমি প্রতিটি খবরের নিবিষ্ট পাঠক। আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি জানার জন্যে কাগজ পড়ি তা কিন্তু না। আমার প্রধান আকর্ষণ চন্দ্র অভিযান বিষয়ে। আমেরিকা চাদে মানুষ পাঠাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট কেনেডির স্বপ্ন পূরণের জন্যে আমেরিকা মরিয়া হয়ে উঠেছে। খবরের কাগজে রোজই কোনো-না-কোনো খবর ছাপা হয়।
তৈরি হচ্ছে এপলো ১১, চন্দ্ৰতরীর নাম ইগল, পৃথিবী থেকে চাঁদে যেতে লাগবে চার দিন। নভোচারীদের একজনের নাম নীল আর্মস্ট্রং, তার পছন্দের খাবার ইতালির পিজা। তার বাচ্চা মেয়ে বাবাকে বলেছে—বাবা, চাঁদকে তুমি আমার হয়ে একটা চুমু দিবে। কেমন? মজার মজার কত খবর। পড়লে অদ্ভুত লাগে। সত্যি সত্যি মানুষ দে পা দিবে। আমি দেখে যেতে পারব। আমি এত ভাগ্যবান?
চন্দ্র অভিযানের আনন্দময় খবরের পাশাপাশি ভয়ঙ্কর সব খবর। পড়লে দমবন্ধ হয়ে আসে। তবে মাঝে মাঝে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার মতো ঘটনাও ঘটে। পহেলা ফেব্রুয়ারি এরকম এক ঘটনা ঘটল। আয়ুব খান বেতার ভাষণে বললেন, শীঘই আলাপ আলোচনার জন্যে আমি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিনিধিবর্গকে আমন্ত্রণ জানাব।
আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে কেমিস্ট্রির বইখাতা খুললাম। ধুলা ঝাড়লাম। সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে। এখন কেমিস্ট্রির বইখাতা খোলা যেতে পারে।পনের দিনের মাথায় ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক বন্দি অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলেন। সরকারি প্রেসনোটে বলা হয়, বন্দি পালাতে যাচ্ছিল বলে তাকে গুলি করা হয়েছে। ঘটনা এখন ঘটলে বলা হতো ‘ক্রসফায়ার’। পাকিস্তান সরকারের মাথায় ক্রসফায়ারের বুদ্ধি আসেনি।
আবারও কেমিস্ট্রির বইখাতা বন্ধ। জমুক ধুলো কেমিস্ট্রির বইখাতায়। ১৬ ফেব্রুয়ারি খবর বের হলো, পিণ্ডিতে আয়ুব খান গোলটেবিল বৈঠক ডেকেছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি শেখ মুজিবুর রহমান প্যারোলে মুক্তি নিয়ে সেই আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছেন।আবার আমার স্বস্তির নিঃশ্বাস। যাক সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
এখন ভাসানী কোনো ঝামেলা না করলেই হলো। এই মানুষটা বাড়া ভাত নষ্ট করতে পারদর্শী। হে আল্লাহ, তাকে সুমতি দাও সব যেন ঠিক হয়ে যায়। দেশ শান্ত হোক। দেশ শান্ত হোক।মাওলানা ভাসানীর সেই সময়ের কাণ্ডকারখানা আমার কাছে যথেষ্টই রহস্যময় মনে হচ্ছিল। আয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি যাননি। আয়ুব খানের (এর পরের একটা পেজ মিসিং আছে) ভয়ে আমার হাত-পা কাঁপতে লাগল। একসময় মিছিলে ঢুকে পড়লাম।
সঙ্গে সঙ্গে ভয় কেটে গেল। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছি। বুক ফুলিয়ে হাঁটছি। মিছিল শুরু হয়েছে পল্টন ময়দানে। শহিদ মতিয়ুরের জানাজা শেষের মিছিল। মিছিল কোনদিকে যাচ্ছে কোথায় যাচ্ছে কিছুই জানি না। মিছিলে লক্ষ লক্ষ মানুষ। আমি একসঙ্গে এত মানুষ জীবনে দেখিনি। মিছিল ইকবাল হলে শেষ হলো। সেখানে বক্তৃতা করেন শহিদ মতিয়ুরের বাবা। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, এক মতিয়ুরকে হারিয়ে আমি হাজার মতিয়ুরকে পেয়েছি।
পুত্রহারা কোনো বাবার বক্তৃতা দেওয়ার মানসিকতা থাকার কথা না। তিনি দিতে পেরেছেন কারণ তিনি সত্যি সত্যি তার সামনে লক্ষ মতিয়ুরকে দেখেছিলেন।মিটিং-এর পরপর চারদিকে নানান গণ্ডগোল হতে লাগল। পুলিশের গুলি, কাঁদানে গ্যাস। শুধু যে ঢাকায় গণ্ডগোল হচ্ছে তা-না। সারা পূর্বপাকিস্তানেই। গুজব রটল সেনাবাহিনী তলব করা হচ্ছে। সন্ধ্যা থেকে কার্ফ দেওয়া হবে।আনিস ভাই বললেন, হলে ফিরে যাবে?
আমি বললাম, না।আমরা এক মিছিল থেকে আরেক মিছিলে ঘুরতে লাগলাম। মেয়েদের একটা মিছিল বের হয়েছিল। নেতৃত্বে ছিল ইডেন কলেজের মেয়েরা। তাদের ভাবভঙ্গি অত্যন্ত উগ্র। মেয়েদের মিছিল দুই ট্রাক ইপিআরের সামনে পড়ল। মেয়েদের একজন এগিয়ে গেল। কঠিন গলায় বলল, গুলি করতে চান? করুন গুলি। যদি সাহস থাকে গুলি করুন।তরুণীর দৃপ্ত ভঙ্গি, কণ্ঠের বলিষ্ঠতা এখনো চোখে ভাসে।
সন্ধ্যার পরপর ঢাকা শহরে সত্যি সত্যি সেনাবাহিনী নামল। গভর্নর মোনায়েম খান বেতার এবং টেলিভিশনে ঘোষণা করলেন, বেসামরিক কর্তৃপক্ষকে সাহায্য করার জন্যে সেনাবাহিনী তলব করা হয়েছে। শহরের নিয়ন্ত্রণ সেনাবাহিনীর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা শহরে কাফু জারি করা হয়েছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত কার্টু বলবৎ থাকবে।আমি হলে ফিরে এসেছি। বাইরের ঝড়ের জগৎ থেকে ব্যক্তিগত শান্তির জগতে। আমার হাতে টমাস হার্ডির প্রেমের উপন্যাস। আমি নীল নয়না এক তরুণীর দুঃখগাথা পড়ছি। আবেগে আমার চোখ ভিজে ভিজে উঠছে।