মিসির আলীর অমিমাংসিত রহস্য পর্ব – ৯ হুমায়ূন আহমেদ

মিসির আলীর অমিমাংসিত রহস্য পর্ব – ৯

মিসির আলীর অমিমাংসিত রহস্য পর্ব – ৯

হোম মিনিস্টার সাহেব ফাইল থেকে মুখ না।–তুলেই বললেন, কেমন আছেন মিসির আলি সাহেব? জ্বি ভালো! ভালো থাকলেই ভালো। বসুন। হাতের কাজ শেষ হতে সময় লাগবে। আপনার যা বলার-এর মধ্যেই বলতে হবে। আপনি আবার ভেবে বসবেন না, এটাও আমার একধরনের ভান। বেশি-বেশি কাজ দেখাচ্ছি… মিসির আলি বসলেন। মিনিস্টার সাহেব ফাইলে চোখ রেখে সহজ গলায় বললেন, খবরের কাগজ পড়েছেন? জ্বি-না।পড়লে একটা ইন্টারেষ্টিং খবর দেখতে পেতেন। আমার মন্ত্রিত্ব চলে যাচ্ছে–অন্য একজন আসছেন।সত্যি নাকি?

না, সত্যি না। কিন্তু আমাদের দেশের লোকজন খবরের কাগজে যা পড়ে তা-ই বিশ্বাস করে। সবাই ঘটনা সত্যি বলে ধরে নিয়েছে। যে-কারণে আজ আমার কাছে কোনো দর্শনাধী নেই। অন্যদিন ওয়েটিং রুম মানুষে গিজগিজ করত। আজ শুধু আপনি এসেছেন। খবরের কাগজ পড়েন নি বলে এসেছেন। পড়লে হয়তো আসতেন না। এখন বলুন কি ব্যাপার।একটা পুরানো জিডি এন্ট্রি আমার দেখা দরকার। থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা বলেছে পাওয়া যাচ্ছে না।কত দিনের পুরানো? সতের বছর।তাহলে না-পাওয়ারই সম্ভাবনা। তবু চেষ্টা করে দেখা যাবে। এখন বলুন, আপনার তদন্ত কতদূর? শুনেছি রোজ ভিলায় আছেন? সত্যি নাকি?হ্যাঁ।খুবই ভালো। এখন বলুন, কিছু পেয়েছেন? পেয়েছি।এর মধ্যে পেয়েও গিয়েছেন। কী পেয়েছেন?

এটা যে হত্যাকাণ্ড এ-ব্যাপারে মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছি।বাহ্, ভেরি গুড। তাহলে হত্যাকারী কে বলে ফেলুন। শুনে দেখি চমকে উঠি কি না।হত্যাকারী কে, তা এখনো জানি না।হোম মিনিস্টার ফাইল বন্ধ করে সিগারেট ধরাতে-ধরাতে বললেন,  ছোটোবেলায় ডিটেকটিভ বই খুব পড়তাম—এখনো পড়ি। একটা খুন হয়। বাড়ির সবাইকে খুনী বলে সন্দেহ হতে থাকে। যার ওপর সন্দেহ সবচেয়ে কম হয়-দেখা যায় সে-ই খুনী। আপনি ঐ পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখুন না কেন। এই মুহূর্তে কার ওপর আপনার সবচেয়ে কম সন্দেহ হচ্ছে? মিসির আলি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে কম সন্দেহ হচ্ছে আপনার ওপর।হোম মিনিস্টার তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, তার মানে? আপনি কি রসিকতা করার চেষ্টা করছেন?

জ্বি-না স্যার, আমি রসিকতা করার চেষ্টা করছি না। ওসমান গনির পরিবারের সঙ্গে আপনি পরোক্ষভাবে হলেও জড়িত। এই পরিবারের সঙ্গে আপনার স্বাৰ্থ জড়িত।ওসমান গনি আমার ছেলেবেলার বন্ধু! মাঝে-মাঝে ওর বাড়িতে গান শুনতে যেতাম। এর ভেতর স্বাৰ্থ কী আছে?আপনি আপনার মেজো ছেলেকে নাদিয়ার সঙ্গে বিয়ে দেবার চেষ্টা অনেকদিন থেকে করছেন। নাদিয়া রাজি হচ্ছে না বলেই বিয়েটা হচ্ছে না।বন্ধুর কন্যার সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেবার ইচ্ছা হওয়াটা কি দোষের কিছু? মোটেই দোষের কিছু নয়, বরং এটাই স্বাভাবিক। আমি কিন্তু দোষের কিছু বলি নি। আমি শুধু বলেছি-এই পরিবারের সঙ্গে আপনার স্বার্থজড়িত। পরোক্ষভাবে হলেও জড়িত। কাজেই এই পরিবারে একটা হত্যাকাণ্ড ঘটলে–আপনার কথাও ভাবা হবে। আপনাকে বাইরে রাখা হবে না।

আমি যে নাদিয়ার সঙ্গে আমার ছেলের বিয়ে দিতে চেয়েছি, এটা আপনাকে কে বলল? নাদিয়া? জি-না, সে বলে নি। নাদিয়ার সঙ্গে আমার কথাবার্তা খুব কমই হয়। সে বিব্রত বোধ করতে পারে বলে এই প্রশ্ন তাকে করি নি।তাহলে আপনি কার কাছ থেকে এই তথ্য জানলেন? এটা কি কোনো গোপন তথ্য যে, কেউ জানবে না? বিয়ের আলোচনা কেউ গোপনে করে না। তা ছাড়া আপনার ছেলেও তো অযোগ্য ছেলে না। খুবই যোগ্য ছেলে।কী করে জানেন? আমি আপনার ছেলের সঙ্গে কথা বলেছি।আই সী। আপনি দেখি চষে ফেলছেন। গুড। চা খাবেন? খেতে পারি।মিনিস্টার সাহেব চায়ের কথা বলে, মিসির আলির দিকে ঝুকে এসে নিচু গলায় বললেন, আপনার কথা সত্যি। আমার স্বাৰ্থ আছে। ভুল বললাম, স্বাৰ্থ একসময় ছিল, এখন নেই।

একসময় আমার ছেলেকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। ওসমান গনিকে অনেক অনুরোধ করেছি। সে কখনো হ্যাঁ বলে নি, আবার কখনো নাও বলে নি। আমার মধ্যে লোভ কাজ করেছে। ওসমান কোটিপতি। কিন্তু মিসির আলি সাহেব, সেই লোভ এখন আর নেই। লোভের চেয়ে বাস্তবতা এখন বেশি কাজ করছে। আমি এখন মোটামুটি নিশ্চিত যে, নাদিয়া নামের মেয়েটি পুরোপুরি উন্মাদ। মেয়েটা রাতে ঘুমায় না। বারান্দার এ-মাথা থেকে ও—মাথা পর্যন্ত হাঁটে, আর খিলখিল করে হাসে। সিগারেট টানে। আপনি তো ঐ বাড়িতেই আছেন। আপনি লক্ষ করছেন না? খিলখিল হাসি শুনি নি, তবে উনি রাত জাগেন তা সত্যি।

আমি সত্যি কথাই আপনাকে বললাম। তদন্ত করছেন, ভালোমতো করুন। কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপও বের হয়ে যেতে পারে।চা চলে এল। মিসির আলি চায়ের কাপ হতে নিলেন। মিনিস্টার সাহেব নিলেন। না। রাগী-রাগী চোখে তিনি চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে রইলেন।মিসির আলি সাহেব।জ্বি।আপনার কি ধারণা নাদিয়া মেয়েটি কিছু করেছে? এখনো বলতে পারছি না।তার পক্ষে করা কি সম্ভব? অসম্ভব কিছু না। সবই সম্ভব।কেন সে এটা করবে? মানসিকভাবে অসুস্থ হলেই করবে। তার মার কারণে একটা ছোট্ট বাচ্চা মারা গেছে। সেই থেকে মার ওপর তীব্র ঘৃণা জন্মাতে পারে।

ঘৃণা এক পর্যায়ে ইনসেনিটিতে রূপ নিতে পারে। বলা হয়ে থাকে, নিতান্ত অপরিচিত একজনকে হত্যার চেয়ে পরিচিত একজনকে হত্যা অনেক সহজ।কেন? ঘৃণা ব্যাপারটি অপরিচিত কারো প্ৰতি থাকে না, কিন্তু পরিচিত জনের প্রতি থাকে।মিনিস্টার সাহেব বললেন, আমার ধারণা মেয়েটি কিছু করে নি, কিন্তু আমার স্ত্রীর ধারণা, করেছে। আমার স্ত্রীর ধারণা, এই মেয়ে পিশাচ ধরনের। একে বৌ করে আনলে আমরা সবাই মারা পড়ব।মিসির আলি বললেন, স্যার, আজ উঠি।মিনিস্টার সাহেব ক্ষীণ গলায় বললেন, আচ্ছা!

রাত এগারটায় নিয়মমতো মিসির আলি বিছানায় ঘুমুতে গেলেন। এ-বাড়িতে এসে খুব অনিয়ম হচ্ছে। রোজ ঘুমুতে দেরি হচ্ছে। সকালের মর্নিং-ওয়াক করা হচ্ছে না। মিসির আলির পরিকল্পনা হল, আজ থেকে আবার আগের নিয়মে ফিরে যাবেন।বিছানায় শুয়ে হাতের কাছে রাখা টেবিল ল্যাম্প জ্বালালেন। কিছুক্ষণ কোনোএকটা বই পড়ে চোখ ক্লান্ত করবেন-এতে চট করে ঘুম চলে আসে। মিসির আলির হাতের বইটির নাম GhostGiri, লেখিকা বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ টোরি হেডেন। বইটি লেখা হয়েছে। ন বছর বয়সী এক মেয়ে জেড়িকে নিয়ে। অসম্ভব রূপবতী এই বালিকা মানসিক প্রতিবন্ধী স্কুলে তাঁর ছাত্রী ছিল। মেয়েটি পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, কিন্তু কখনো কথা বলত না। তার শারীরিক কোনো অসুবিধা ছিল না, তবু সে থাকত কুঁজো হয়ে। যদিও সোজা হয়ে দাঁড়ানো তার জন্যে কোনো সমস্যা নয়।

মনস্তত্ত্ববিদ টোরি হেডেন এই আশ্চর্য মেয়েটির কথা ডিটেকটিভ উপন্যাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর ভঙ্গিতে বর্ণনা করেছেন। মেয়েটির মনের ভেতরকার গোপন অন্ধকার এক-এক করে আলোতে বের করে নিয়ে এসেছেন। মিসির আলি দু শ পৃষ্ঠা পর্যন্ত একটানা পড়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন, রাত বাজছে তিনটা। আরো তিরিশ বাকি আছে। এখন শুয়ে পড়া উচিত। কিন্তু বইটি শেষ না-করে ঘুমুতে যেতে তাঁর ইচ্ছা করল না।আব্দুল মজিদ ফ্লাস্কে করে চা রেখে গেছে। তিনি এক কাপ চা এবং পরপর দুটি সিগারেট খেলেন। সিগারেট খেতে-খেতে জোিড নামে মেয়েটির কথা ভেবে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর মনে হল, এ-জাতীয় মানসিক প্ৰতিবন্ধী বাংলাদেশেও আছে। কিন্তু তাদের সাহায্য করার জন্যে টোরি হেডেনের মতো প্রতিভাবান এবং নিবেদিত মনস্তাত্ত্বিক নেই।

মিসির আলি আবার বই পড়া শুরু করার আগে বাথরুমে ঢুকলেন। আব্দুল মজিদ বারবার করে বলেছে গভীর রাতে বাথরুমে গেলে যেন দরজা কখনোই বন্ধ না-করা হয়।মিসির আলি দরজা বন্ধ করলেন। কেন জানি তাঁর একটু ভয় লাগল। সম্ভবত GhostGirl পড়ার কারণে এটা হয়েছে। সাময়িকভাবে হলেও ভয়ের একটা বীজ মনের গভীরে ঢুকে গেছে। চোখে-মুখে পানি দেবার জন্যে ট্যাপ খুললেন—আশ্চর্য ব্যাপার, ট্যাপে এক ফোঁটা পানি নেই। মুখে পানির ঝাপটা দেওয়া দরকার। তাঁর ঘরে বোতলে পানি আছে। ঐ পানি নিয়ে আসা যায়। মিসির আলি বাথরুমের দরজা খুলতে গিয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হলেন। দরজা খোলা যাচ্ছে না। দরজা বন্ধ। পরপর দুবার চেষ্টা করলেন। নব ঘোরানোই যাচ্ছে না। আশ্চর্য তো! ফুলের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। হালকা গন্ধ, কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি নব ছেড়ে দিয়ে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন। তাঁকে খানিকটা ভীত বলে মনে হল। তিনি নিঃশব্দে বাথরুমের অন্য প্রান্তে সরে গেলেন। এবং ছোট শিশুদের মতো হাঁটু গেড়ে বসে গেলেন। আর তখনি বাথরুমের বাতি নিভে গেল। ঘর হল নিকষ অন্ধকার! এত অন্ধকার মিসির আলি এর আগে কখনো দেখেন নি। আলোর ক্ষীণ রেখা সব অন্ধকারেই থাকে –কিন্তু বাথরুমে তাও নেই। তাঁর শরীর কাঁপছে, বুক ধড়ফড় করছে। এগুলি আর কিছুই নী, সেন্স ডিপ্রাইভেশনের ফলাফল। কেউ হঠাৎ অন্ধ হয়ে গেলে ভয়াবহ মানসিক আঘাতের সম্মুখীন হয়। তাঁরও তাই হচ্ছে! চোখ থেকেও কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না।

মিসির আলি বসে আছেন চুপচাপ। তাঁর পকেটে সিগারেটের প্যাকেট এবং দিয়াশলাই আছে। ইচ্ছা করলেই তিনি দিয়াশলাই জ্বালাতে পারেন। জ্বালালেন না, বরং উবু হয়ে একটা বড় ধরনের কোনো ঘটনার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন। সেই ঘটনা ঘটল। তিনি পরিষ্কার শুনলেন, ঠিক তাঁর কানের কাছে শিশুদের মতো গলায় কে- একজন ডাকল, মিসির আলি। এই মিসির আলি।জবাব দেবার ইচ্ছা প্ৰাণপণে দমন করে তিনি পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে রইলেন—একচুলও নড়লেন না। আবারো সেই অশরীরী শব্দ হল। বাথরুমের ভেতরে আবারো বালক-কণ্ঠে কে যেন বলল, মিসির আলি, তুমি কোথায়? তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছে?

একটু হাসির শব্দও যেন পাওয়া গেল। তারপর দীর্ঘনিঃশ্বাসের শব্দ। মিসির আলি নিজেকে আরো ছোট করে বসে রইলেন আগের জায়গায়। তিনি যে- ভঙ্গিতে গুটিসুটি মেরে বসেছেন, তাকে বলে Mothers womb position. মায়ের পেটে শিশুরা এইভাবেই থাকে। বসে থাকার এই ভঙ্গিটি ভয় কাটাতে সাহায্য করে। কারণ মায়ের জরায়ু এমন এক স্থান, যেখানে ভয়ের কোনো স্থান নেই। শিশুর জন্যে এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। ভয় পেলেই এই জায়গাটার জন্যে মানুষের মনে এক ধরনের ব্যাকুলতা জাগে।

মিসির আলি ভয় কাটানোর প্রচলিত পদ্ধতিগুলি নিয়ে দ্রুত ভাবছেন। ভয় কাটানোর সর্বজনস্বীকৃত পদ্ধতি হচ্ছে নগ্ন হয়ে যাওয়া। বলা হয়ে থাকে-ভৌতিক কোনো কারণে ভয় পেলে নগ্ন হওয়ামাত্র ভয় অর্ধেক কমে যায়। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী হতে পারে? মিসির আলির মাথায় আসছে না। মায়ের পেটে আমরা নগ্ন হয়ে ছিলাম, এই কি ব্যাখ্যা? এটা নিয়ে এক সময় ভাবতে হবে।ভয় কাটানোর আরেকটি পদ্ধতি হল বড়-বড় নিঃশ্বাস নেওয়া। এই পদ্ধতির পেছনে বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে-বড়-বড় নিঃশ্বাস নেবার অর্থ বেশি করে অক্সিজেন নেওয়া। শরীরে বেশি অক্সিজেন যাওয়া মানে মস্তিষ্কে বেশি অক্সিজেন যাওয়া।

তীব্র পিপাসা হচ্ছে। বুক-মুখ শুকিয়ে কাঠ। এত ভয় পাচ্ছেন কেন? বন্ধ ঘর। অশরীরী কণ্ঠ। গন্ধ-জমাট অন্ধকার-এর বাইরেও কি কিছু আছে? মিসির আলি নিজের নাড়ি ধরলেন। নাড়ি খুব দ্রুত চলছে। কত দ্রুত তা অবশ্যি তিনি ধরতে পারছেন না। সঙ্গে ঘড়ি নেই। মনে হচ্ছে বাথরুমের এই অন্ধকার ঘরে সময় আটকে গেছে। কখনো বোধ হয় ভোর হবে না। আইনষ্টাইনের থিওরি অব রিলেটিভিটি। সময় শ্লথ হয়ে গেছে। ভোর হতে কত বাকি?

এক সময় সামান্য আলোর আভা দেখা গেল। ভোর বোধহয় হচ্ছে। মিসির আলি বাথরুমের দরজায় হাত রাখলেন। দরজা খুলে গেল। তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ। দরজা খুলে তিনি বাইরে এলেন। আকাশ ফরসা হলেও চারদিক এখনো অন্ধকার! এই অন্ধকারে সবুজ শাড়ি পরে নাদিয়া ঘুরছেন। মিসির আলিকে দেখে তিনি খুশি-খুশি গলায় বললেন, আরে, আপনি কি রোজ এত ভোরে ওঠেন? মিসির আলি সিগারেট ধরাতে-ধরাতে বললেন, রোজ উঠি না, আজ উঠলাম।ভেরি গুড। আসুন, একসঙ্গে খানিকক্ষণ হাঁটি। চা দিতে বলেছি। চা খেতে-খেতে হাঁটার মধ্যে অন্য এক ধরনের আনন্দ আছে।মিসির আলি বাগানে নেমে এসে বললেন, আমি আজ চলে যাব। আপনার বাড়িতে বেশ আনন্দে সময় কেটেছে। আপনাকে ধন্যবাদ।নাদিয়া ভুরু কুঁচকে বললেন, আজ চলে যাবেন মানে? আপনি কি সমস্যার সমাধান করেছেন?

হ্যাঁ, করেছি। আপনি সকালে নাশতা খাবার সময় এ-বাড়িতে যারা উপস্থিত আছে সবাইকে ডাকুন, আমি সবার সামনে ব্যাখ্যা করব।সবার সামনে ব্যাখ্যা করার দরকার কী? আমাকে বলুন।আমি সবার সামনেই বলতে চাই।নাদিয়া কিছুক্ষণ স্থির চোখে মিসির আলির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন। মিসির আলিও হাসলেন।মেয়েটি আজও সবুজ শাড়ি পরেছে। মেয়েটি বোধহয় কালার-ব্লাইন্ড। একমাত্র কালার-ব্লাইণ্ডদেরই বিশেষ কোনো রঙের প্রতি দুর্বলতা থাকে। মিসির আলি বললেন, রবীন্দ্রনাথ যে কালার-ব্লাইন্ড ছিলেন তা কি আপনি জানেন?

না, জানি না। আপনার কাছে প্ৰথম শুনলাম।রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কালার-ব্লাইন্ড। তিনি সবুজ রঙ দেখতে পেতেন না।নাদিয়া বললেন, তাতে তাঁর সাহিত্যের বা গানের কোনো ক্ষতি হয় নি। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি হঠাৎ করে কালার-ব্লাইন্ডের প্রশ্ন তুললেন কেন? এমনি তুললাম। কোনো কারণ নেই।আপনি কি সত্যি-সত্যি রহস্যের মীমাংসা করেছেন? মনে হয় করেছি।মনে হয় বলছেন কেন? আপনি কি নিশ্চিত না? না। প্রকৃতি মানুষকে Truth—কে স্পর্শ করার অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু Absolute truth-কে স্পর্শ করার অনুমতি দেয় নি। ঐটি প্রকৃতির রাজত্ব। মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই।

বাড়ির সবাই এসেছে।মিসির আলি তাদের চোখে মুখে কৌতূহল এবং সেইসঙ্গে চাপা উদ্বেগ লক্ষ্য করলেন। সবচেয়ে বেশি চিন্তিত মনে হচ্ছে সাফকাতকে। সে রীতিমতো ঘামছে। ঘনঘন ঢোক গিলছে। মিসির আলি কীভাবে শুরু করবেন বুঝতে পারছেন না। নাদিয়া বললেন, বলুন কি বলবেন। চুপ করে আছেন কেন? মিসির আলি সিগারেট ধরলেন। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে খানিকক্ষণ কেশে গলা পরিষ্কার করে শুরু করলেন–

কাল রাতে আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। আমার বাথরুমের দরজা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বাতি নিভে গিয়েছিল। আমি অশরীরী একটি কণ্ঠ শুনলাম! একটা বাচ্চা ছেলে-আমার নাম ধরে ডাকল। ফুলের গন্ধ পেলাম। আপনারা বুঝতেই পারছেন, ভয়াবহ ব্যাপার। আমি আতঙ্কে অস্থির হয়ে গেলাম। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি কিন্তু এ-জাতীয় একটি পরিস্থিতির জন্যে মনে-মনে তৈরি ছিলাম। আমি জানতাম একদিন-না-একদিন এ-রকম ঘটনা আমার ক্ষেত্রে ঘটবে। দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। বাতি নিভে যাবে। গলার আওয়াজ শুনব। ফুলের গন্ধ পাব। আমি খুব ভালোমতো জানতাম, পুরো ব্যাপারটা সাজানো। তার পরেও আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছি।…

আমি আমার নিজের ভয় থেকেই পারছি, ওসমান গনি সাহেব এবং তাঁর স্ত্রী কী পরিমাণ ভয় পেয়েছেন। তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই, কিন্তু আমি নিশ্চিত যে, ওসমান গনি সাহেবকে এই অবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছিল। আমার ধারণা, তিনি আমার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ভয় পেয়েছেন। কারণ তিনি জানেন না যে পুরো ব্যাপারটা সাজানো। তিনি ধরেই নিয়েছেন যা ঘটছে সবই সত্যি। একটা ভয়ংকর ভীতিক কাণ্ড তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। এর সঙ্গে তিনি জড়িয়েছেন একটি শিশুর অপমৃত্যু।নাদিয়া মিসির আলিকে থামিয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ গলায়, সাজানো ঘটনা কেন বলছেন? সাজানো ঘটনা বলার পিছনে আপনার যুক্তি কী?

যুক্তির অংশে যাবার আগে আপনি আমার কিছু প্রশ্নের জবাব দিন। আপনার বাবার মৃত্যু মৃত্যু বাথটাবে, তাই না? হ্যাঁ।কতটুকু পানি ছিল বাথটাবে? অল্প পানি ছিল।আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে -ঐ রাতে কলে পানি ছিল না? আমার তেমন কিছু মনে পড়ছে না। পানি আছে কি না তা নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো মনের অবস্থা আমার ছিল না।

মিসির আলি সিগারেট ধরাতে-ধরাতে বললেন, পানি না-থাকাটাই কিন্তু স্বাভাবিক। পানি থাকলে বাথটাব পানিতে পূৰ্ণ হয়ে যেত। দরজা ভেঙে বাথরুমে ঢুকলে আপনি দেখতেন তখনো কল দিয়ে পানি পড়ছে। আপনি নিশ্চয়ই তা দেখেন নি? নাদিয়া বললেন, আমি এত কিছু লক্ষ করি নি। তবে বাথরুমে ঢুকে আমি কল দিয়ে পানি পড়তে দেখি নি। বাথরুমে পানি ছিল কি ছিল না, তা এত জরুরি কেন? জরুরি কেন, বলছি।……

 

Read more

মিসির আলীর অমিমাংসিত রহস্য শেষ – পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *