মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১ হুমায়ূন আহমেদ

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

অদ্ভুত এক যন্ত্র।যন্ত্রে বাটির মতো জায়গা, বাটিতে থুতনি রেখে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতে হয়। যন্ত্রের ভেতর থেকে ক্ষণে ক্ষণে তীব্র আলো এসে চোখের ভেতর ঢুকে যায়। তখন বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। মনে হয় কেউ একজন তীক্ষ্ণ এবং লম্বা একটা সুচ চোখের ভেতর দিয়ে মগজে ঢুকানোর চেষ্টা করছে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হয়ে যাবার কথা। শেষ হচ্ছে না, কারণ ডাক্তার সাহেবের কাছে টেলিফোন এসেছে। তিনি উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলছেন। মিসির আলি বুঝতে পারছেন না, তিনি কি বাটি থেকে থুতনি উঠিয়ে নেবেন? নাকি যেভাবে বসে আছেন সেভাবেই বসে থাকবেন? নড়ে গেলে যন্ত্রের রিডিংয়ে গণ্ডগোল হতে পারে। তখন হয়তো আবার গোড়া থেকে শুরু করতে হবে। হিন্দিতে যাকে বলে—ফির পেহলে সে।

মিসির আলি নড়লেন না। ডাক্তার সাহেবের টেলিফোন আলাপ বন্ধ হবার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। ডাক্তার সাহেবের নাম হারুন অর রশীদ। নামের শেষে অনেকগুলো অক্ষর আছে। মনে হয় বিদেশের সব ডিগ্রিই তিনি জোগাড় করে ফেলেছেন।ডাক্তার সাহেবের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি হবার কথা। চুলে পাক ধরে নি, তবে দুই চোখের ভুরুর বেশ কিছু চুল পাকা। চিমটা দিয়ে তুরুর পাকা চুলগুলো তুলে ফেললে তার বয়স আরো কম লাগত।

ভদ্রলোক বেঁটে। ভারী শরীর। গোলাকার মুখ। চোখের দৃষ্টিতে সারল্য আছে, তবে ভুরু ঝোপের মতো বলে দৃষ্টির সারল্য চোখে পড়ে না। তিনি ঝকঝকে সাদা অ্যাপ্রন পরে আছেন। অ্যাপ্রনটা তাঁকে মানিয়েছে। বেশিরভাগ ডাক্তারের গায়ে অ্যাপ্রন মানায় না।ডাক্তার হারুন। এখন চরম রাগারগি শুরু করেছেন।

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

তার কথা শোনা যাচ্ছে, ওপাশের কথা শোনা যাচ্ছে না। মিসির আলির ধারণা ওপাশে টেলিফোন ধরেছেন হারুন সাহেবের স্ত্রী। রাগারাগির ধরনটা সেরকম। ডাক্তার সাহেবের গলার স্বর ভারী এবং খসখসে। তাঁর চিৎকার এবং হইচই শুনতে ভালো লাগছে।ডাক্তার। আমার সঙ্গে ফাজলামি করবে না। এই জিনিসটা আমার পছন্দ না। একেবারেই পছন্দ না। (ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলল।)

ডাক্তার : খবরদার পুরোনো প্রসঙ্গ তুলবে না।।

(ওপাশের কথা।)

ডাক্তার : কী। আমাকে বিয়ে করে ভুল করেছ? আরেকবার এই কথাটা বল তো? একবার শুধু বলে দেখ।

মনে হচ্ছে ডাক্তার সাহেবের স্ত্রী আরেকবার এই কথাটি বললেন।ডাক্তার : চিৎকার করছি? আমি চিৎকার করছি? আমি এক পেশোস্ট্রের চোখ পরীক্ষা করছি। তুমি খুব ভালো করে জানো পেশেন্টের সামনে আমি চিৎকার চেঁচামেচি করি না। শাট আপ, শাট আপ বললাম। Yes, I say shut up and go to hell.

হারুন মিসির আলির দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বললেন, আপনি এখনো এইভাবে বসে আছেন কী জন্য? আপনার চোখ দেখা তো শেষ।মিসির আলি বললেন, পরীক্ষা শেষ হয়েছে বুঝতে পারি নি। মাঝখানে আপনার টেলিফোন এল।আপনার চোখ ঠিক আছে, শুধু প্রেসার হাই। গ্রুকোমা। একটা ড্রপ দিচ্ছি। ঘুমুবার আগে চোখে এক ফোঁটা করে দেবেন। ভুল করবেন না।মিসির আলি বললেন, যদি ভুল করি তা হলে কী হবে? ডাক্তার নির্বিকার গলায় বললেন, অন্ধ হয়ে যাবেন–আর কী।অন্ধ হয়ে যাব?

হ্যাঁ। পনের দিন পর আবার আসবেন। ভালো কথা, আপনাকে ফি দিতে হবে না।হারুন বললেন, আপনাকে আমি চিনি। আপনি বিখ্যাত মানুষ। আমি বিখ্যাত মানুষদের কাছ থেকে ফি নেই না। বিখ্যাত মানুষরা দশ জায়গায় আমার কথা বলেন। তাঁদের কথার অনেক গুরুত্ব। এতে পসার দ্রুত বাড়ে।মিসির আলি বললেন, আপনি মনে হয় ভুল করছেন। আমাকে অন্য কারোর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। আমি বিখ্যাত কেউ না। আমি অতি সাধারণ একজন।হারুন ভুরু কুঁচকে বললেন, আপনার নাম কী?

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

মিসির আলি।হারুন বললেন, তা হলে তো ভুলই করেছি। মেজর মিসটেক। আমি আপনাকে নাটক করে এমন কেউ ভেবেছি। চেহারা খুব পরিচিত লেগেছে। ভালো কথা, আপনি কি অভিনয় করেন? গত সপ্তাহে টিভিতে কী যেন একটা নাটক দেখলাম, আপনি সেখানে ছিলেন?

জি না।অতি বোগাস এক নাটক। তারপরেও শেষ পর্যন্ত দেখেছি। নাটকের নামটা মনে পড়ছে না। ন দিয়ে নামের শুরু, এইটুকু মনে পড়ছে। আচ্ছা শুনুন, আপনি হাফ ফি দেবেন। আমার চারশ টাকা ফি, আপনি দু’শ দেবেন।হাফ কেন? প্রথমবার বাই মিসটেক ফ্রি বলেছিলাম। এইজন্য। আপনি আশা করে বসেছিলেন ফ্রি হয়ে গেছে। যখন দেখলেন হয় নি, তখন আশাভঙ্গ হয়েছে। হয়েছে কি না বলুন?

মিসির আলি কী বলবেন ভেবে পেলেন না। বোঝা যাচ্ছে এই ডাক্তার বিচিত্র স্বভাবের। তার সঙ্গে চিন্তা-ভাবনা ছাড়া কথা বলা ঠিক না। ফি দিয়ে চলে যেতে পারলে বাঁচা যেত। চোখের ড্রপের নামটা এখনো তিনি লিখে দেন নি।হারুন ভুরু কুঁচকে বললেন, কী হল, জবাব দিচ্ছেন না কেন? আপনার আশাভঙ্গ হয়েছে না? মনটা খারাপ হয়েছে না?

সামান্য হয়েছে।এই জন্যই ফি হাফ করে দিলাম।প্রেসক্রিপশনটা লিখে দিলে চলে যেতাম।হারুন কাগজ টেনে নিলেন। কলমদানি থেকে কলম বের করতেই আবার টেলিফোন। মনে হচ্ছে তাঁর স্ত্রী। কারণ ডাক্তার টেলিফোন ধরেই খ্যাকখ্যাক করে উঠলেন।তোমার প্রবলেমটা কী? রোগী দেখছি, এর মধ্যে একের পর এক টেলিফোন। আমাকে শান্তিমতো কিছু করতে দেবে না? (ওপাশের কিছু কথা।)

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

সব সময় টাইম মেনটেন করা যায় না। রোগীর চাপ থাকে। ক্রিটিক্যাল কেইস থাকে। তর্ক করবে না। স্টপ তর্ক। স্টপ। যাও আজ আমি বাসাতেই যাব না। ক্লিনিকে থাকব। সোফায় ঘুমাব। যা ভাবছ তা-না। চেম্বারে কেউ শখ করে থাকে না।হারুন টেলিফোন নামিয়ে মিসির আলির দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বললেন, আপনি বসে আছেন কেন?

প্রেসক্রিপশনটার জন্য অপেক্ষা করছি। আই ড্রপ।হারুন ড্রয়ার খুলে একটা প্যাকেট মিসির আলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, মেজাজ খুবই খারাপ। প্রেসক্রিপশন লিখতে পারব না। এটা নিয়ে যান। রাতে ঘুমাবার সময় এক ড্রপ করে দেবেন।দাম কত? দাম দিতে হবে না। ওষুধ কোম্পানি থেকে স্যাম্পল হিসেবে পাই। স্যাম্পলের ওষুধ বিক্রি করার অভ্যাস আমার নেই। দরিদ্র রোগীদের ফ্রি দিয়ে দেই।ধন্যবাদ।

এক মাস পর আবার আসবেন।আগে বলেছিলেন পনের দিন পর আসতে।এখন বলছি, এক মাস পর।জি অসব।মিসির আলি উঠে দাড়াতেই ডাক্তার বললেন, একটু বসুন।মিসির আলি বসে পড়লেন।আপনি আমার সম্পর্কে খারাপ ধারণা নিয়ে যাচ্ছেন। এই জন্যই বসতে বলছি। আমার সঙ্গে চা খেয়ে তারপর যাবেন। এবং একটা বিষয় মনে রাখবেন, আমি ডাক্তার যেমন ভালো, মানুষ হিসেবেও ভালো। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া সব জায়গায় হয়। এটা কিছু না। ভালো মানুষরা ঝগড়া করে। মন্দ মানুষের চেয়ে বেশিই করে।

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

মিসির আলি বললেন, আমি আপনার সম্পর্কে কোনো খারাপ ধারণা নিয়ে যাচ্ছি। না। আপনি খুব ভালো ডাক্তার–এটা জেনেই আপনার কাছে এসেছি। আপনি দামি একটা আই ড্রপ বিনা টাকায় আমাকে দিয়েছেন। এটা প্রমাণ করে যে, আপনি মানুষ হিসেবেও ভালো।দামি আই ড্রপ বুঝলেন কীভাবে?

প্যাকেটের গায়ে লেখা, বার শ টাকা রিটেল প্রাইস।আরে তাই তো! এত সহজ ব্যাপার মাথায় আসে নি।মিসির আলি বললেন, এরকম হয়। মাঝে মাঝে পর্যবেক্ষণ শক্তি এবং লজিক একসঙ্গে কাজ করে না।হারুন আনন্দিত গলায় বললেন, নামটা মনে পড়েছে–নদীর মোহনা।মিসির আলি বললেন, নাটকের নামটার কথা বলছেন?

জি। জি। নামকরণটা ভুল হল না? মোহনা তো নদীরই হবে? সমুদ্রের মোহনা হবে না। নাটকের নাম শুধু মোহনা রাখলেই হত। তাই না? কিংবা নদী নাম হলেও চলত। নায়িকার নাম নদী। লম্বা একটা মেয়ে, তবে তার চোখে মনে হয় সমস্যা আছে। সারাক্ষণ চোখ মিটমিট করছে। আমার কাছে এলে বিনা ভিজিটে চোখ দেখে দিতাম।দরজা ফাঁক করে কে একজন উঁকি দিচ্ছে। তার চেহারায় ভয়। ডাক্তার তার দিকে তাকিয়ে ধমকে উঠলেন, কী চাও? স্যার, বাসায় যাবেন না?

না। তুমি গাড়ি নিয়ে চলে যাও। সামছুকে বল, দুকাপ চা দিতে। চিনি আলাদা দিতে বলবে। লিকার যেন ঘন হয়।সত্যি চলে যাব স্যার? মিথ্যা চলে যাওয়া বলে কিছু আছে? গাধার মতো কথা। Get Lost, ম্যাডামকে গিয়ে বলবে, স্যার আজ আসবে না।ভীত মানুষটা সাবধানে দরজা বন্ধ করল। বন্ধ করার আগে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।হারুন মিসির আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, সব গাধা।মিসির আলি বললেন, আমি কি আপনাকে ছোট্ট একটা অনুরোধ করব? আপনি বাসায় চলে যান। আপনার স্ত্রী একা। উনার নিশ্চয় মনটা খারাপ আজ। আপনাদের একটা বিশেষ দিন। ম্যারেজ ডে।কে বলেছে আপনাকে?

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

অনুমান করছি।হারুন রাগী গলায় বললেন, আমি মিথ্যা পছন্দ করি না। আপনাকে কেউ নিশ্চয় বলেছে। অনুমান বলে পৃথিবীতে কিছু নেই।মিসির আলি বললেন, আপনার অফিসে আপনার এবং আপনার স্ত্রীর ছবি আছে। বাচ্চাকাচার ছবি নেই। যিনি অফিসে স্ত্রীর ছবি রাখেন। তিনি বাচ্চাকাচার ছবিও অবশ্যই রাখেন। সেই থেকে অনুমান করছি, আপনাদের ছেলেমেয়ে নেই। আপনার স্ত্রী বাসায় একা।আজ আমাদের ম্যারেজ ডে এটা বুঝলেন কীভাবে?

আজ ছয় তারিখ। দেয়ালে যে ক্যালেন্ডার ঝুলছে সেখান ছয় তারিখটা লাল কালি দিয়ে গোল করা।আমার স্ত্রী বা আমার জন্মদিনও তো হতে পারে।মিসির আলি বললেন, আপনার জন্মদিন হবে না, কারণ নিজের জন্মদিন মনে থাকে। আপনার স্ত্রীর জন্মদিনও হবে না। স্ত্রীরা জন্মদিনে স্বামী দেরি করে বাড়ি ফিরলে তেমন রাগ করে না। ম্যারেজ ডে ভুলে গেলে বা সেই দিনে দেরি করে স্বামী ঘরে ফিরলে রাগ করে। তা ছাড়া গোল চিহ্নের ভেতর লেখা M. এটা ম্যারেজ ডের আদ্যক্ষর হওয়ার কথা।

হারুন বললেন, আপনি তো যথেষ্ট বুদ্ধিমান লোক।মিসির আলি বললেন, খুব বুদ্ধিমান না। তবে কাৰ্যকারণ নিয়ে চিন্তা করতে আমার ভালো লাগে।আপনি করেন কী? আমি কিছুই করি না। অবসরে আছি।আগে কী করতেন? সাইকোলজি পড়াতাম।আপনার কি কোনো কার্ড আছে? জি না।হারুন বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে মিসির আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, এখন আমি আপনাকে চিনেছি।

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

আপনাকে নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে। আমার স্ত্রী আপনার বিশেষ ভক্ত। M দিয়ে আপনার নাম, মেহের আলি বা এই জাতীয় কিছু। আপনার নামটা কী বলুন তো। আগে একবার বলেছিলেন। ভুলে গেছি। সরি ফর দ্যাট।আমার নাম মিসির আলি।আপনার কি টেলিফোন আছে? সেল ফোন একটা আছে।হারুন আগ্রহ নিয়ে বললেন, নাম্বারটা লিখুন তো। শয়লাকে দিব। সে খুবই খুশি হবে। আচ্ছা আপনি নাকি যে কোনো সমস্যার সমাধান চোখের নিমিষে করে ফেলেন, এটা কি সত্যি?

সত্যি না।যে কোনো মানুষকে দেখে ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান সব বলে দিতে পারেন, এটা কি সত্যি? সত্যি না।শায়লা আপনার বিষয়ে যা জানে সবই তো দেখি ভুল।মগভর্তি চা চলে এসেছে। আগের লোকই চা এনেছে। ডাক্তার ধমক দিয়ে বললেন, ফজলু, তোমাকে না চলে যেতে বললাম? তুমি ঘুরঘুর করছ, কেন? Stupid. যাও সামনে থেকে। গাড়িতে বসে থাক।স্যার কি বাসায় যাবেন?

যেতে পারি। এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি নি। চা খেয়ে তারপর সিদ্ধান্ত নিব। এখন Get lost. ফজলু চলে গেল। মিসির আলি লক্ষ করলেন ফজলুর মুখ থেকে ভয়ের ছাপ কমেছে। তাকে আনন্দিত মনে হচ্ছে।হারুন মিসির আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, চা ভালো হয়েছে। খান। বিস্কিট আছে। বিস্কিট দেব? ভালো বিস্কিট।বিস্কিট লাগবে না।হারুন সামান্য ঝুঁকে এসে খানিকটা গলা নামিয়ে বললেন, আপনি কি ভূত বিশ্বাস করেন?

মিসির আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, না।হারুন আনন্দিত গলায় বললেন, আমিও না।মিসির আলি বললেন, ভূতের প্রসঙ্গ এল কেন? হারুন জবাব দিলেন না। তাঁকে এখন বিব্রত মনে হচ্ছে। মিথ্যা কথা ধরা পড়ে গেলে মানুষ যেমন বিব্রত হয় সেরকম। মিসির আলি বললেন, আপনি কি কখনো ভূত দেখেছেন?

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

হারুন ক্ষীণস্বরে বললেন, হুঁ।মিসির আলি বললেন, একটু আগেই বলেছেন, আপনি ভূত বিশ্বাস করেন না।হারুন বললেন, ভূত দেখি নি। আত্মা দেখেছি। আত্মা। আমার মায়ের আত্মা। সেটাও তো এক ধরনের ভূত। তাই না? ও আচ্ছা।আমার সামনে যখন কোনো বড় বিপদ আসে, তখন আমার মায়ের আত্মা এসে আমাকে সাবধান করে।তাই নাকি? জি! আত্মার গায়ে যে গন্ধ থাকে এটা জানেন?

মিসির আলি বললেন, জানি না।হারুন চাপা গলায় বললেন, গন্ধ থাকে। কেম্ফফরের গন্ধ। বেশ কড়া গন্ধ।সব আত্মার গান্ধই কি ফেম্ফফরের? নাকি একেক আত্মার গন্ধ একেক রকম? হারুন বিরক্ত হয়ে বললেন, আমি তো আত্মা শুঁকে শুঁকে বেড়াই না যে বলব কোন আত্মার গন্ধ কী? আমি শুধু আমার মার আত্মাকেই দেখি। তাও সব সময় না। যখন আমি বিপদে পড়ি তখন দেখি। তিনি আমাকে সাবধান করে দেন।মিসির আলি বললেন, উনি শেষ কবে আপনাকে সাবধান করেছেন?

হারুন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে চট কবে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, দেরি হয়ে যাচ্ছে, যাই। বলেই অপেক্ষা করলেন না। অ্যাপ্রন পর অবস্থাতেই দরজা খুলে বের হয়ে গেলেন।মিসির আলির কাপের চা এখনো শেষ হয় নি। চা-টা খেতে অসাধারণ হয়েছে। তার কি উচিত চা শেষ না করেই উঠে যাওয়া? এক এক ডাক্তারের চেম্বারে বসে চুকচুক করে চায়ের কাপে চুমুক দেয়াও তো অস্বস্তিকর। হঠাৎ করে বাইরে থেকে কেউ ধাক্কা দিয়ে দরজা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিলেও তো বিরাট সমস্যা। যদিও সেই সম্ভাবনা খুবই কম। তারপরও সম্ভাবনা থেকে যায়।

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

প্রবাবিলিটির একটা বইয়ে পড়েছিলেন যে কোনো মানুষের হঠাৎ করে শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে।মিসির আলি চা শেষ করলেন। তাড়াহুড়া করলেন না, ধীরেসুস্থেই শেষ করে চেম্বার থেকে বের হলেন। গেটের কাছে ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়ে গেল। তিনি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। গা থেকে অ্যাপ্রন খুলে ফেলেছেন বলে তাকে অন্যরকম লাগছে। ডাক্তারের হাতে সিগারেট। তিনি মিসির আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, গাড়িতে উঠুন। আপনাকে পৌঁছে দেই। আপনি থাকেন কোথায়?

মিসির আলি বললেন, আমি ঝিকাতলায় থাকি। আপনাকে পৌঁছাতে হবে না। আমি রিকশা নিয়ে চলে যাব।আপনাকে গাড়িতে উঠতে বলছি উঠুন। ড্রাইভারের পাশের সিটে বসবেন।মিসির আলি উঠলেন। এই মানুষটাকে না বলে লাভ হবে না। হারুন সেই শ্রেণীর মানুষ যারা যুক্তি পছন্দ করে না।হারুন বললেন, ড্রাইভারের পাশের সিটে বসত্বে কি আপনার অস্বস্তি লাগছে? না।

অস্বস্তি লাগা তো উচিত। আমি আরাম করে পেছনের সিটে বসব। আর আপনি ড্রাইভারের পাশে হেল্পারের মতো বসবেন, এটা তো এক ধরনের অপমান। আপনি অপমান বোধ ক্রছেন না? মিসির আলি বুললেন, অপমান বোধ করছি না। তা ছাড়া গাড়ি ড্রাইভার চালাবে না, আপনি চালাবেন। এই ক্ষেত্রে আপনার পাশে বসাই শোভন।গাড়ি আমি চালাব। আপনি বুঝলেন কীভাবে?

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

মিসির আলি বললেন, আপনি গাড়ি নিয়ে চলে যান নি। আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কারণ আপনি আমাকে আরো কিছু বলতে চান। সেই ক্ষেত্রে আপনি আমাকে আপনার পাশে বসাবেন এটাই স্বাভাবিক। আমাকে ড্রাইভারের পাশে বসিয়েছেন, সেখান থেকে ধারণা করেছি, গাড়ি অপনি চালাবেন।হারুন হাই তুলতে তুলতে বললেন, ঠিকই ধরেছেন। আপনার বুদ্ধি ভালো। আমার বুদ্ধ নেই। স্কুলে আমার নাম ছিল হাবা হারুন। হারুন নামে কেউ আমাকে ডাকত না। সবাই ডাকত হাবা হারুন। কলেজে আমার নাম হল হাহা। হাবা থেকে হা এবং হারুন থেকে হা নিয়ে হাহা।

গাড়ি মিরপুর সড়কে উঠে এসেছে। রাত এগারটার কাছাকাছি। এখানে রাস্তায় ভিড়। গাড়ি চলছে। ধীরগতিতে। প্ৰায়ই থামতে হচ্ছে।হারুন বিরক্ত হচ্ছেন না। ক্যাসেটে গান ছেড়ে দিয়েছেন। হিন্দি গান হচ্ছে! বয়স্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ টাইপ মানুষরা সাধারণত গাড়িতে হিন্দি গান শোনেন না। ইনি যে শুধু শুনছেন তা না, যথেষ্ট আনন্দও পাচ্ছেন। গানের সঙ্গে স্টিয়ারিংয়ে হাত দিয়ে তালও দিচ্ছেন। মিসির আলি বললেন, আপনি আমাকে কিছু বলবেন?

হারুন বললেন, ভেবেছিলাম বলব। এখন ঠিক করেছি বলব না।মিসির আলি বললেন, তা হলে আমাকে যে কোনো জায়গায় নামিয়ে চলে যান। আপনার দেরি হচ্ছে।হারুন বললেন, আপনাকে বাসায় পৌঁছে দেবার কথা বলে গাড়িতে তুলেছি। এখন পথের মাঝখানে নামিয়ে দেব না।মিসির আলি বললেন, পথে নামালেই আমার জন্য সুবিধা। কারণ আমি হোটেলে ভাত খেয়ে তারপর বাসায় যাব। বাসায় আমার রান্নার ব্যবস্থা নেই।

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

আমি আপনাকে বাসায় নামিয়ে দেব। সেখান থেকে আপনি যেখানে ইচ্ছা যাবেন। I keep my words. মিসির আলি চুপ করে গেলেন। অসময়ে চা খাওয়ার জন্য ক্ষুধা মরে গিয়েছিল। এখন আবার তার অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে। কলিজা ভুনা খেতে ইচ্ছা করছে। ঝাল কলিজা ভুনা, সঙ্গে পেঁয়াজ কঁচামরিচ।মিসির আলি সাহেব! জি।কোনো গন্ধ কি পাচ্ছেন?

এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ পাচ্ছি।হারুন গান বন্ধ করে দিয়ে বললেন, এয়ার ফ্রেশনারটার গন্ধ আপনার কাছে কেমন লাগছে? মোটামুটি লাগছে। এয়ার ফ্রেশনারের গন্ধ আমার কখনোই ভালো লাগে না।হারুন বললেন, আপনি কেম্ফরের গন্ধ পাচ্ছেন। গাড়িতে কোনো এয়ার ফ্রেশনার নেই। আমার মায়ের আত্মা আমাদের সঙ্গে আছে বলেই এই গন্ধ।ও আচ্ছা।

আপনি খুব হেলাফেলা করে ও আচ্ছা বলেছেন। এটা ঠিক করেন নি। আমি সিজিওফ্রেনিক পেশেন্ট না। স্কুলজীবনে আমাকে হাবা হারুন বলা হলেও আমি হাবা না।আপনার মা কি প্রায়ই আপনার সঙ্গে থাকেন? যখন কোনো বড় বিপদ আমার সামনে থাকে তখন তিনি আমার সঙ্গে থাকেন।মিসির আলি বললেন, আপনি কি কোনো বড় বিপদের আশঙ্কা করছেন? করছি।জানুতে পারি বিপদটা কী?

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ১

আমি খুন হয়ে যাব। কেউ একজন আমাকে খুন করবে। কে খুন করবে সেটাও আমি জানি। My mother told me. মিসির আলি বললেন, তিনি কি সরাসরি আপনার সঙ্গে কথা বলেন? নাকি স্বপ্নে বলেন? হারুন বললেন, তিনি নানানভাবে আমার সঙ্গে কম্যুনিকেট করেন। মাঝে মাঝে স্বপ্নেও করেন।আপনার মা কী বলেছেন? কে আপনাকে খুন করবে? আপনি জেনে কী করবেন?

কৌতুহল থেকে প্রশ্ন করেছি। বলতে না চাইলে বলবেন না।ডাক্তার গলা নামিয়ে বললেন, আমাকে খুন করবে। আমার স্ত্রী। ওর নাম শায়লা।মিসির আলি বললেন, খুন কবে হবেন সেটা কি আপনার মা আপনাকে বলেছেন? বলেছেন। তবে খুব নির্দিষ্ট করে কিছু বলেন নি। জন্ম-মৃত্যুর বিষয় নির্দিষ্ট করে আত্মারা কিছু বলতে পারে না। ওদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আছে। আমার খুন হবার কথা আজ রাতে।

মিসির আলি ধাক্কার মতো খেলেন। একটা মানুষ ভাবছে সে রাতে খুন হবে। তারপরও স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালাচ্ছে।নানান কায়দাকানুন করে এই কারণেই বাসায় যাওয়া পেছাচ্ছি। আপনাকে নামিয়ে দিয়ে কোনো একটা হোটেলে চলে যাব।মিসির আলি কী বলবেন ভেবে পেলেন না। মানুষটা মানসিকভাবে অসুস্থ। এতটা অসুস্থ তা শুরুতে বোঝা যায় নি।হারুন বললেন, আমাকে কীভাবে মারবে জানতে চান? কীভাবে?

বিষ খাইয়ে মারবে। বিষের নাম জানতে চান? পটাশিয়াম সায়ানাইড। পটাশিয়াম সায়ানাইডের নাম জানেন তো? KNC নাম জানি। আপনার স্ত্রী পটাশিয়াম সায়ানাইড পাবেন কোথায়? তার কাছে আছে। সে একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির কেমিস্ট্রির চেয়ারম্যান। সে কী করবে জানেন? কোনো একটি খাবারে এই জিনিস মিশিয়ে দেবে।আপনি কি আপনার আশঙ্কার কথা আপনার স্ত্রীকে জানিয়েছেন?

 

Read more

মিসির আলীর চশমা পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *