আমি চিঠি নিয়ে বসলাম। যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েই পড়তে শুরু করলাম। এক-দুই পৃষ্ঠা পড়ার পরই স্বীকার করতে বাধ্য হলাম, রসায়নের এই অধ্যাপিকার বাংলা গদ্যের উপর ভালো দখল আছে। হাতের লেখাও গোটা গোটা। নির্ভুল বানান।চিঠির মূল বক্তব্য সন্তানের মৃত্যু রহস্যের সমাধান। আমার কাছে সমাধান খুব কঠিন বলে মনে হলো না। সন্তানের মা সমাধান নিজেই করেছেন।
সমাধানের স্পষ্ট ইঙ্গিতও চিঠিতে দেয়া। ভদ্রমহিলা তাঁর শাশুড়িকে দায়ী করেছেন। সেটাই স্বাভাবিক। এই বৃদ্ধা হত্যাকাণ্ড নির্বিঘ্নে করার জন্যে বাড়ির সবাইকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। খুনি বৃদ্ধার মোটিভও পরিষ্কার। এই বৃদ্ধা তার ছেলেকে কাছে রাখতে চান। তিনি চান না ছেলে আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকুক। ছেলেকে পাশে রাখার জন্যে যে ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা তিনি করেছেন তা কাজ করেছে। ছেলে নতুন ফ্ল্যাটে উঠে নি।
যে রহস্যের কথা চিঠিতে বলা হয়েছে সেই রহস্য সাদামাটা রহস্য। রহস্যভেদের জন্যে মিসির আলির মতো মানুষ লাগে না। আমার মতো গড়পড়তা মেধার যে-কোনো মানুষই এই রহস্যভেদ করবে।অনেকদিন পর হোটেলের রান্নার বাইরে খাবার খেলাম। বাবুর্চি মিসির আলি সাহেব। চিকন চালের ভাত। আলু ভর্তা। ডিম ভাজি এবং ডাল। খেতে বসে মনে হলো, অনেকদিন এত ভালো খাওয়া হয় নি।
মিসির আলি বললেন, বাঙালি রান্না দুই রকম। ব্যাপক আয়োজনের রান্না এবং আয়োজনহীন রান্না। আপনাকে কিছু রান্না আমি শিখিয়ে দেব। নিজে রাঁধবেন। নিজের রান্না খাবেন। আলু ভর্তার জন্যে আলু আলাদা সিদ্ধ করতে হবে না। ভাতের সঙ্গে দিয়ে দেবেন। ডাল রান্নার মূল মন্ত্র হচ্ছে সিদ্ধ। যত সিদ্ধ হবে ডাল তত খেতে ভালো হবে। তবে তেলে বাগার দিতে হবে।
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
সিদ্ধ হতে হতে ডাল যখন ‘কিলয়েড’ ফর্মে চলে যাবে তখন বাগার প্রক্রিয়া শুরু করবেন। বাগারের কারণে তেল ডালের কণার উপর আস্তরণ তৈরি করবে। বাগারের তেলে বাঙালি মেয়েরা পেঁয়াজ-রসুন ভেজে নেয়। আমি তার প্রয়োজন দেখি না। পেঁয়াজরসুন ছাড়া ডাল রাধে বিধবারা। সেই ডাল খেতে সুস্বাদু। ইলিশ মাছ খুব অল্প আঁচে সিদ্ধ। হয়, এটা কি জানেন?
জানি না।মসলা মাখিয়ে ইলিশ মাছের টুকরো রোদে রেখে দিলেও সিদ্ধ হয়ে যায়। আপনাকে রোদে রাখতে হবে না। গরম ভাতের উপর রেখে ঢাকনা দিয়ে রাখলেই হবে।মসলা কী? মসলা হচ্ছে লবণ। আর কিছু না। বাঙালি মেয়েরা ভাপা ইলিশে নানান মসলা দেয়। মসলা মাছের স্বাদ নষ্ট করে। কোনো রকম মসলা ছাড়া ভাপা ইলিশ একবার খেলেই আপনার আর মসলা খেতে ইচ্ছা করবে না।
আমি ঘোষণা করলাম, আগামীকাল রাতের সব রান্না আমি করব। মেন ইলিশ মাছ, ডাল, আলু ভর্তা। ভালো ঘিও কিনে আনব। গরম ভাতের উপর এক চামচ ঘি ছেড়ে দেয়া হবে। ভাতের গন্ধের সঙ্গে ঘিয়ের গন্ধ মিশে অমৃতসম কিছু তৈরি হবার কথা। ভেবেই আনন্দ পাচ্ছি এবং এক ধরনের উত্তেজনাও বোধ করছি। দুপুরে বাজার করতে হবে। একটা ফ্রিজ কেনা দরকার।মিসির আলি হঠাৎ বললেন, ব্যাচেলর জীবনে কিছু আনন্দ আছে, তাই না?
আমি ধাক্কার মতো খেলাম। আমার মনে হলো, রান্নাবান্নার এই বিষয়টি মিসির আলি ইচ্ছা করে আমার ভেতর ঢুকিয়েছেন যেন আমি ব্যস্ত থাকতে পারি।রাতের খাওয়া শেষে দু’জন বারান্দায় চেয়ার পেতে বসেছি। দক্ষিণমুখী বারান্দা। ভালো হাওয়া দিচ্ছে। দু’জনের হাতেই সিগারেট। মিসির আলি সিগারেটে লম্বা টান। দিয়ে বললেন, আজকাল সিগারেটের প্যাকেটে লেখা থাকে ‘ধূমপান মৃত্যু ঘটায়’। পড়েছেন?
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
আমি বললাম, পড়েছি। মিসির আলি বললেন, আমার নিজের ধারণা সিগারেটের প্যাকেটে এই সতর্কবাণী দেয়ার পর থেকে সিগারেটের বিক্রি অনেক বেড়েছে।আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন? মিসির আলি হাই তুলতে তুলতে বললেন, মানুষের মৃত্যু বিষয়ে আছে প্রচণ্ড ভীতি। সে মৃত্যু কী জানতে আগ্রহী। এই আগ্রহের কারণে অবচেতনভাবে মানুষ মৃত্যুর কাছাকাছি যেতে চায়। সিগারেট সেই কাছাকাছি থাকার সহজ উপায়।
আমি বললাম, যুক্তি খারাপ না।মিসির আলি আগ্রহের সঙ্গে বললেন, যারা ছাদে বেড়াতে চায় তাদেরকে দেখবেন এক সময় ছাদের রেলিং-এ বসেছে। অতি বিপদজনক জেনেও এই কাজটা করছে। মূল কারণ একটাই, মৃত্যুর কাছাকাছি যাওয়া। মানুষ অতি বিচিত্র প্রাণী। ভালো কথা, আপনি কি আমার কন্যার চিঠিটা পড়েছেন?
তিনবার পড়তে বলেছিলেন, আমি দু’বার পড়েছি।মিসির আলি আগ্রহ নিয়ে বললেন, চিঠি পড়ে কি কোনো খটকা লেগেছে? আমি বললাম, হুট করে আপনাকে বাবা ডাকাটায় সামান্য খটকা লেগেছে। ‘বাবা’ ডাক ছাড়া চিঠিতে খটকা নেই। চিঠির রহস্য আপনার মতো মানুষের পক্ষে মুহূর্তেই বের করার কথা।মিসির আলি নিচু গলায় বললেন, রহস্য বের করেছি। একটা কাগজে লিখে খামে বন্ধ করে রেখেছি। খামটা আপনি রাখবেন, তবে খুলে এখনো পড়বেন না।কখন পড়ব?
আপনি নিজে যখন রহস্যভেদ করবেন। তখন পড়বেন।আমি রহস্যভেদ করব? হা আপনি করবেন। আমি আপনাকে সাহায্য করব। আপনি একা বাস করছেন, রহস্য নিয়ে কিছুদিন ব্যস্ত থাকবেন। মানব মনের গতি প্রকৃতি জানবেন। আপনি লেখক মানুষ, এতে আপনার লাভই হবে।আমি বললাম, সাগর নামের বাচ্চাটা তার দাদির হাতে খুন হয়েছে এটা তো বোঝা যাচ্ছে।
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
মিসির আলি বললেন, চট করে সিদ্ধান্তে যাবেন না। মানসিকভাবে সম্পূর্ণ অসুস্থ না হলে কেউ এই কাজ করতে পারে না। চিঠি পড়ে কি মনে হয়, ছেলেটির দাদি মানসিকভাবে অসুস্থ? তা মনে হয় না। তাহলে কি ছেলেটির বাবা মানসিক রোগী? চিঠিতে সে রকম আছে। হারুন নামের ডাক্তার তার মা’কে দেখে এইসব।মিসির আলি বললেন, এক কাজ করলে কেমন হয়?
ডাক্তার ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা করুন। তাঁকে চোখ দেখাতে যান। আপনি লেখক মানুষ। উনি আপনাকে চিনতে পারবেন। আমার ধারণা, উনি মন খুলে আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। রাত অনেক। হয়েছে, চলুন ঘুমুতে যাওয়া যাক।খামটা দিন।মিসির আলি পাঞ্জাবির পকেট থেকে খাম বের করে দিলেন। তিনি খাম পকেটে নিয়েই গল্প করতে এসেছিলেন।ডা. হারুনের কাছে মিসির আলি আমাকে নিয়ে গেলেন। এমনিতেই তাঁর চোখ দেখাবার কথা। সঙ্গে আমিও দেখাব।
ভদ্রলোকের আচারআচরণ লক্ষ করব। তেমন সুযোগ হলে কিছু প্রশ্নও করব। তবে প্রশ্নের প্রয়োজন নেই। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন মানুষকে দেখলেই চেনা যাবে। তাদের চোখে থাকবে ভরসা হারানো দৃষ্টি।আমি ডাক্তার সাহেবকে দেখে হতাশই হলাম। সম্পূর্ণ সহজ-স্বাভাবিক একজন মানুষ। হাসিখুশি। তার টেবিলে বরফ মেশানো হলুদ রঙের পানীয়। রঙ দেখে মনে হচ্ছে হুইস্কি। যদি হুইস্কি হয় তাহলে ব্যাপারটা অবশ্যই অস্বাভাবিক।কোনো ডাক্তারই হুইস্কি খেতে খেতে রোগী দেখতে পারেন না। আমি গ্লাসের। দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, কী খাচ্ছেন?
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
ডা. হারুন আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে বললেন, হুইস্কি খাচ্ছি। আপনি খাবেন? আমি না-সূচক মাথা নাড়লাম।খেয়ে দেখতে পারেন। খারাপ লাগবে না। দিনের শেষে ক্লান্তি নিবারক।আমি বললাম, আপনি ক্লান্তি নিবারণ করুন। আমি তেমন ক্লান্তি বোধ করছি না।ডাক্তার গ্লাসে চুমুক দিয়ে আমার চোখ দেখতে বসলেন। যত্ন করেই চোখ দেখলেন। বিল দিতে গেলাম। তিনি বললেন, মিসির আলি সাহেব আমার বন্ধু মানুষ। আপনাকে বিল দিতে হবে না।আমি বললাম, আপনি কি বন্ধুর বন্ধুদের কাছ থেকে বিল নেন না? না।
তাহলে তো একসময় দেখা যাবে, কারো। কাছ থেকেই আপনি বিল নিতে পারছেন না। সবাই ফ্রি।আমি এমন কোনো হাসির কথা বলি নি। কিন্তু ভদ্রলোক মনে হলো খুব মজা পেলেন। এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে অনেকক্ষণ হাসলেন। অ্যালকোহলের অ্যাফেক্টও হতে পারে। তিনি ফ্ল্যাস্ক থেকে ঐ বস্তু আরো খানিকটা ঢালতে ঢালতে বললেন, আমি টিটাটোলার মদ সিগারেট কিছুই খাই না। গ্লাসে যে বস্তু দেখছেন তা হলো তেঁতুলের পানি। তেঁতুলের পানি Arteriosclerosis কমায়। আমি যা করছি তা হলো দেশীয় ভেষজের মাধ্যমে চিকিৎসা।
আমি বললাম, আপনি তেঁতুলের পানি খাচ্ছেন, আমাকে কেন বললেন হুইস্কি খাচ্ছি! হারুন সাহেব বললেন, আপনি ভ্রূ কুঁচকে গ্লাসটার দিকে তাকাচ্ছিলেন। এই জন্যেই বলেছি। আপনার আগেও কয়েকজন রোগী আপনার মতোই ভ্ৰ কুঁচকে গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বলেছে, কী খাচ্ছেন? আমি তাদেরকেও বলেছি, হুইস্কি খাচ্ছি।তাদের ভুল ভাঙান নি?
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
না। শুধু আপনারটাই ভাঙিয়েছি।আমার ভুল ভাঙালেন কেন? ডাক্তার হাসতে হাসতে বললেন, আপনি বন্ধু মানুষ। বেহেশতে আমরা কিন্তু আত্মীয়স্বজন পুত্রকন্যা পাব না। বন্ধু পাব। আমাদেরকে দেয়া হবে সতুরজন হুর। এরা। সবাই বন্ধু। পবিত্র সঙ্গী। কেউ আত্মীয় না।আপনি কি বেহেশত দোজখ এইসব বিশ্বাস করেন? অবশ্যই করি। নামাজ পড়েন?
সময়মতো পড়া হয় না, তবে রাতে ঘুমুবার আগে কাজা পড়ি।বেহেশতে যাবার জন্যে পড়েন? ডাক্তার বেশকিছু সময় চুপ করে থেকে বললেন, বেহেশত দেখার প্রতি আমার আগ্রহ আছে। সেখানে যেসব পবিত্র সঙ্গিনী আছে, তাদের একজনকে আমি দেখেছি। স্বপ্নে দেখেছেন? স্বপ্নে না, ঘোরের মধ্যে দেখেছি। সেই গল্প অন্য একদিন বলব।
আমরা চলে যাবার জন্যে উঠে দাঁড়িয়েছি হঠাৎ ডাক্তার মিসির আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার মা আমাকে জানিয়েছেন, আপনি এখন নিজের বাসায় থাকেন না। অন্য এক জায়গায় থাকেন। আপনি যে ঘরে থাকেন, সেখানে দেয়াল ঘড়ি আছে। ঘড়িটা বন্ধ। ঘড়িতে সবসময় তিনটা বেজে থাকে। আমার মা কি ঠিক বলছেন?
মিসির আলি চিন্তিত গলায় বললেন, হ্যাঁ।এখন কি বিশ্বাস করছেন, আমার মা’র সঙ্গে আমার কথা হয়? দেখা হয়? মিসির আলি বললেন, না। কখন বিশ্বাস হবে? যখন তাঁকে নিজে দেখব। ডাক্তারের ঠোঁটের কোনায় হালকা হাসির। | আভাস দেখা গেল। যেন তিনি মজার কোনো কথা বলবেন বলে ভাবছেন। সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।মিসির আলি বললেন, আজ উঠি?
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
ডাক্তার বললেন, আরো কিছুক্ষণ বসুন, গাড়ি দিয়ে নামিয়ে দেব। একটা প্রশ্নের জবাব দিন, আপনি কি ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন বিশ্বাস করেন? মিসির আলি বললেন, করি।ডাক্তার বললেন, এদের তো আপনি চোখে দেখেন নি, তাহলে কেন বিশ্বাস করেন? মিসির আলি বললেন, আমি চোখে না দেখলেও নানান যন্ত্রপাতি এদের অস্তিত্ব বের করেছে। একটি যন্ত্রের নাম সাইক্লন্ট্রন। পৃথিবীর কোনো যন্ত্রপাতি মৃত মানুষের অস্তিত্ব বের করতে পারে না।
ডাক্তার বললেন, সে রকম যন্ত্রপাতি তৈরি হয় নি বলেই পারে না। আমার পড়াশোনা যদি পদার্থবিদ্যায় হতো আমি নিজেই এরকম একটা যন্ত্র বানানোর চেষ্টা করতাম। যন্ত্রটার নাম দিতাম Soul searcher. যে যন্ত্র আত্মা অনুসন্ধান করে বেড়াবে। মনে করা যাক এই ঘরে একটা আত্মা আছে, যন্ত্রের কাজ হবে ঘরের প্রতিটি স্কয়ার ইঞ্চের রেডিও অ্যাকটিভিটি মাপবে, তাপ মাপবে, ইলেট্রিক্যাল চার্জ মাপবে, ম্যাগনেটিক বলরেখার ম্যাপ তৈরি করবে। সমস্ত ডাটা কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা হবে। সফটওয়্যারের কাজ হবে anamoly detect করা।
ডাক্তার সাহেব প্রবল উৎসাহে বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। যেন তিনি ক্লাস নিচ্ছেন, আমরা দুই মনোযোগী শ্রোতা। তাঁর ঘরে বোর্ড না থাকায় সামান্য সমস্যা হচ্ছে। যন্ত্রের খুঁটিনাটি বোর্ডে একে দেখাতে পারছেন না। কাগজ-কলমে একে দেখাতে হচ্ছে।আমরা রাত সাড়ে এগারোটায় ছাড়া পেলাম। ডাক্তার সাহেব নিজেই পৌঁছে। দিলেন। তবে গাড়িতেও তিনি বকবক করতেই থাকলেন, এক মুহূর্তের জন্যেও থামলেন না।প্রথম যেটা তৈরি করতে হবে তা হলো ম্যাগনেটিক টানেল, কিংবা Magnetic Cone তৈরি করা।
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
আত্মাকে যদি কোনোক্রমে ভুলিয়ে ভালিয়ে টানেলে ঢুকিয়ে ফেলা যায় তাহলেই কর্ম কাবার।আমি বোকা বোকা মুখ করে বললাম, কর্ম কাবার মানে কী? আত্মা মারা যাবে? মানুষ মরে আত্মা হয়, আত্মা মরে কী হবে? ভেবেছিলাম আমার রসিকতায় তিনি রাগ করবেন। ভাগ্য ভালো, রাগ করলেন না। তিনি বুঝাতে চেষ্টা করলেন আত্মা কী? ‘আত্মা হলো পিওর ফরম অব এনার্জি। আমরা যেসব এনার্জির সঙ্গে পরিচিত তার বাইরের এনার্জি। আমাদের এনার্জির ট্রান্সফরমেশন হয়। এক ফরম থেকে অন্য ফরমে যেতে পারে। আত্মা নামক এনার্জির কোনো ট্রান্সফরমেশন নেই। বুঝতে পারছেন তো?’
আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, তারপরেও প্রবল বেগে হা-সূচক মাথা নাড়লাম।রাতে মিসির আলি সাহেবকে নিয়ে খেতে বসেছি। আয়োজন সামান্য। দুপুরের ডাল গরম করা হয়েছে। ডিম ভাজা হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে ডাল টকে গেছে। মিসির আলি সাহেব ব্যাপারটা ধরতে পারছেন না। টক ডাল খেয়ে যাচ্ছেন। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি আছেন। গভীর চিন্তায়। আমি বললাম, মিসির আলি সাহেব, আপনি কি আত্মা বিশ্বাস করেন?
তিনি আমাকে চমকে দিয়ে বললেন, হা।খুব যে ভেবেচিন্তে তিনি হা বললেন তা কিন্তু মনে হলো না। বলতে হয় বলে বলা। আত্মা-বিষয়ক দ্বিতীয় প্রশ্ন করতে যাচ্ছি তার আগেই মিসির আলি বললেন, ডাক্তার সাহেব গাড়ি করে আপনার বাসায় আমাদের পৌছে। দিয়েছেন, ব্যাপারটা আপনার কেমন লেগেছে?
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
আমি বললাম, ভালো লেগেছে। ভদ্ৰলোক নিতান্তই ভালো মানুষ। ভালো মানুষরা পাগলাটে হয়, উনিও পাগলাটে।মিসির আলি বললেন, উনার গাড়ির ড্রাইভার কিন্তু আপনার বাড়ির ঠিকানা জানতে চায় নি। সে ঠিকানা জানতো। আগে এসেছে। ঠিক বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।আমি বললাম, তাই তো! মিসির আলি বললেন, ডাক্তার সাহেব আপনাকে চেনেন না। আজই প্রথম চিনলেন। উনি আপনার বাড়ি চেনেন, কারণ উনি আমাকে অনুসরণ করছেন। আমার পেছনে লোক লাগিয়ে রেখেছেন।আপনার পেছনে লোক লাগিয়ে রাখবে কেন?
সেটাই তো বুঝতে পারছি না।আমি বললাম, ঘড়ির ব্যাপারটা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উনি যে বলে দিলেন আপনার ঘরের ঘড়িটা বন্ধ। তিনটা বেজে আছে।সির আলি বললেন, এটা তুচ্ছ বিষয়। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করার কিছু নেই।আমি বললাম, তুচ্ছ বলছেন কেন? ঘড়িটা তো বাইরে থেকে দেখা যায় না। এই ঘড়ি দেখতে হলে ঘরে ঢুকতে হবে। হবে না?
মিসির আলি আমার কথায় গুরুত্ব দিলেন। না। বরং মনে হলো কিছুটা বিরক্তই হলেন। আমাকে হতাশ গলায় বললেন, শরীরটা খারাপ লাগছে। ডালটা কি নষ্ট ছিল? আমি বললাম, হ্যাঁ।মিসির আলি বললেন, আমার কাছে টকটক অবশ্যি লাগছিল। আমি ভাবলাম কাঁচা আম দিয়ে ডাল টক করা হয়েছে।এই সিজনে কাঁচা আম পাবেন কোথায়? মিসির আলি বললেন, তাও তো কথা।
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর ভেদবমি শুরু হলো। চোখ-মুখ উল্টে অজ্ঞান হয়ে বিছানায় পড়ে গেলেন। সামান্য টক ডাল এই অবস্থা তৈরি করতে পারে তা আমার ধারণাতেও ছিল না।বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবার মনে হয় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। টেলিফোন করা মাত্র অ্যাম্বুলেন্স চলে এলো। তাঁকে ক্লিনিকে ভর্তি করলাম। তাঁর জ্ঞান ফিরল ভোর রাতে। জ্ঞান ফেরার পর প্রথম যে বাক্যটি বললেন তা হলো আগামী দুই বছর আমি ডাল বা ডালজাতীয় কিছু খাব না।
দু’ধরনের মানুষের মধ্যে পাগলামি প্রকাশিত হয়। প্রতিভাবান মানুষ এবং কর্মশূন্য মানুষ। মিসির আলি প্রতিভাবান মানুষ। তাঁর মধ্যে পাগলামি প্রকাশিত হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং হাসপাতালের বিছানায় তা পূর্ণমাত্রায় প্রকাশিত হলো। তিনি এত বিষয় থাকতে ‘ভূত নিয়ে প্রবন্ধ লেখা শুরু করলেন। অতি ব্যস্ত প্রবন্ধকার। যখনই তাঁর কাছে যাই তাঁকে। প্রবন্ধের কোনো বিষয় নিয়ে ব্যস্ত দেখি।
হাসপাতালে তাঁর কিছু ভক্ত জুটে গেল। এর মধ্যে একজন নার্স, নাম— মিতি। তার প্রধান এবং একমাত্র দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াল মিসির আলিকে ভূতের গল্প শোনানো। জানা গেল তার গ্রামের বাড়ি (নয়াবাড়ি শ্রীপুর) ভূতের হোস্টেল। এমন কোনো ভূত নাই, যে এই মেয়ের গ্রামের বাড়িতে থাকে না। কুয়াভূত নামে এক ভূতের নাম তার কাছেই শুনলাম। এই ভূত থাকে কুয়ায়। হঠাৎ হঠাৎ কুয়া থেকে উঠে কুয়ার পাড়ে বসে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ায়। মানুষজনের শব্দ শুনলে ঝপাং করে কুয়ায় ঝাপ দিয়ে পড়ে।
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
তেঁতুল ভূত’ বলে এক ধরনের ভূতের কথা শোনা গেল, তারা থাকে তেঁতুল গাছে। এপ্রিল-মে মাসে যখন তেঁতুলের হলুদ ফুল ফোটে তখন তারা তেঁতুল ফুল চুষে ফুলের মধু খায়। যেসব গাছে তেঁতুল ভূত থাকে সেসব গাছে এই কারণেই তেঁতুল হয় না। মিতিদের গ্রামের বাড়িতে তিনটি তেঁতুল গাছের কোনোটিতেই তেঁতুল হয় না। বিশাল গাছ, প্রচুর ফুল ফুটে, কিন্তু তেঁতুল হয় না।মিসির আলি এইসব উদ্ভট গল্প যে শুনছেন তা-না, রীতিমতো নোট করছেন। নানা মন্তব্যে খাতা ভর্তি করছেন। কুয়াভূত বিষয়ে তার মন্তব্যের পাতাগুলি পড়লাম
কুয়াভূত
পানিতে বাস করে এমন প্রজাতি
নারীধৰ্মী কারণ কুয়াভূতকে সবসময় কুয়ার পাড়ে চুল আঁচড়াতে দেখা যায়। তবে এমনও হতে পারে পানিজীবী এই ভূতশ্রেণীর সবারই লম্বা চুল। সবাই চুল আঁচড়াতে পছন্দ করে।
প্রকৃতি: ভীতু প্রকৃতির। মানুষের আগমনের ইশারা পেলেই এরা কুয়াতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
কর্মকাণ্ড : এদের প্রধান কর্মকাণ্ড কুয়ার পানিতে ছোটাছুটি করা এবং পানি ছিটাছিটির খেলা করা।
চরিত্র : উপকারী চরিত্রের ভূত। মিতির এক খালার ছোট ছেলে একবার পানিতে পড়ে গিয়েছিল। কুয়াভূতরা বাচ্চাটিকে ঘাড়ে ধরে ঝুলিয়ে রেখেছিল। বালতি নামিয়ে দিলে কুয়াভূতরা বাচ্চাটাকে বালতিতে তুলে দেয়।
গন্ধ : কুয়াভূতদের গায়ে পুরনো শ্যাওলার গন্ধ। কেউ কেউ বলে মাছের গন্ধ।
খাদ্য : এদের খাদ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ওদেরকে কুয়ার পাড়ে বসে পান। সুপারির মতো কী যেন চিবাতে দেখা গেছে।
পোশাক : এদের প্রিয় এবং একমাত্র পোশাক সাদা রঙের। সাদা রঙের কাপড় ছাড়া এদেরকে কেউ অন্য কোনো রঙের কাপড়ে দেখে নি।
কথাবার্তা : এদের কথাবার্তা কেউ কখনো শোনে নি, তবে হাসির শব্দ অনেকেই শুনেছে।
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
আমি কিছুতেই ভেবে পাই না মিসির আলির মতো অতি বুদ্ধিমান একজন মানুষ কুয়াভূত বিষয়ে এতগুলি কথা এত গুরুত্বের সঙ্গে কেন লিখছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ভাই আপনি কি কুয়াভূতের ব্যাপারটা বিশ্বাস করছেন?
মিসির আলি বললেন, আমি বিশ্বাসও করছি না, আবার অবিশ্বাসও করছি না। মিতি মেয়েটা বানিয়ে বানিয়ে ভূত বিষয়ে এত কথা কেন বলবে? আমি বললাম, মানুষ বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলে না? মানুষ প্রয়োজনে মিথ্যা বলে, অপ্রয়োজনে মিথ্যা বলে, বানিয়ে বলে, অন্যকে বিপদে ফেলার জন্যে বলে।মিসির আলি বললেন, আপনার কি ধারণা মিতি মেয়েটা আমাকে বিপদে ফেলার জন্যে কুয়াভূত নামক মিথ্যা বলছে?
আমি হাল ছেড়ে চুপ করে গেলাম। মিসির আলিকে যে রোগের কারণে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, সেই রোগ তার সেরে গেছে, তবে দেখা গেছে তিনি নানা ধরনের রোগে ভুগছেন। শরীরের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতিই না-কি নষ্ট। দু’টা কিডনির একটা যায় যায় অবস্থায় আছে। লিভারে জমেছে ফ্যাট। তাঁর চিকিৎসা ডাক্তাররা মহাউৎসাহে চালাচ্ছেন। মিতি নামের নার্স চালাচ্ছে ‘ভূত-চিকিৎসা’।মিসির আলি একদিন আগ্রহ নিয়ে বললেন, মেয়েটার গ্রামের বাড়িতে একদিন বেড়াতে গেলে কেমন হয়? আমি বললাম, আপনি মিতির গ্রামের বাড়িতে যেতে চাচ্ছেন?
হ্যাঁ। কুয়ার পাড়ে সারারাত বসে থাকব। কুয়াভূতের হাসি শুনব। তারা জলকেলি করবে, সেই শব্দও শুনব।আপনি কি সত্যি যেতে যাচ্ছেন? অবশ্যই।চোখের ডাক্তার সাহেবের সমস্যা বিষয়ে এখন তাহলে ভাবছেন না? মিসির আলি বললেন, সেই সমস্যার সমাধান তো করেছি। আর কী?
মিসির আলীর চশমা পর্ব – ৪
তাদের তো কিছু জানাচ্ছেন না! মিসির আলি বললেন, আপনার জন্যে অপেক্ষা করছি। আপনি যুক্তির উপর যুক্তি দাঁড় করিয়ে সমস্যার সমাধান করে গভীর আনন্দ পাবেন। আপনার আনন্দ দেখতে ইচ্ছা করছে।মিসির আলি হঠাৎ গলা নামিয়ে বললেন, একটা অদ্ভুত ব্যাপার কী জানেন? অনেক বড় রহস্য লুকিয়ে আছে মিতির কাছে।আমি বললাম, কী রহস্য?
মিসির আলি তাঁর বিখ্যাত রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, আপনি চুপচাপ বসে না থেকে আমার চিঠিকন্যার সঙ্গে দেখা করে আসুন না। প্রাথমিক তদন্ত। আপনি আপনার মতো কথা। বলবেন, প্রশ্ন করবেন। শুধু একটা প্রশ্ন আমি শিখিয়ে দেব।কোথায় দেখা করব, তাঁর বাসায়? না। তাঁর কলেজে। তিনি চাচ্ছেন না তাঁর স্বামী চিঠির ব্যাপারটা জানুক। কাজেই মিটিং অফিসে হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
Read more
