আমি সরাসরি তাদের কাছে গেলাম। আজহার চাচা আমাকে দেখে আনন্দিত গলায় বললেন, অনেক আগেই চলে যেতাম— তুই আসবি, তাের সঙ্গে দেখা হবে এই জন্যেই বসে আছি। তাের বাবা বলল তাের না–কি ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার টাইমের কোনাে ঠিক নেই। কখনাে দুপুর তিনটায় ফিরিস, কখনাে রাত আটটা ?
আমি হাসলাম। হঠাৎ আপনার দেখা পেয়ে খুবই আনন্দ পাচ্ছি জাতীয় হাসি। আমার আসলেই ভালাে লাগছে।চাচা আপনি না–কি কবরের জন্যে জায়গা কিনছেন ? ……হারে মা, কিনে ফেললাম। ধানমণ্ডিতে যখন এক বিঘার একটা প্লট কিনি তখন খুবই আনন্দ পেয়েছিলাম। কবরের জায়গাটা কেনার পরও সমান আনন্দ পেয়েছি। তোর বাবাকে কিনে দিতে চাচ্ছি সে কিনবে না।
আপনি তাে চাচা ডেনজারাস মানুষ। ডেনজারাস কেনরে মা? ……….প্রথমে কাফনের কাপড় কিনে দিলেন। এখন কবরের জন্যে জায়গা কিনে দিচ্ছেন। কয়েকদিন পর কবরের জায়গাটা বাঁধিয়ে ফেলবেন। তারপর মৌলবি রেখে দেবেন সে প্রতি বৃহস্পতিবারে গিয়ে ওজিফা পাঠ করবে। এদিকে কবরে কোনাে ডেডবডিই নেই। বাবা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ
আজহার চাচা শব্দ করে হেসে উঠলেন। তার হাসি আর থামতেই চায় না। অনেক কষ্টে হাসি থামান, আবার হাে হাে করে ওঠেন। তিনি বাবার কাধে ধাক্কা দিয়ে বললেন তােমার মেয়ের কথাবার্তা শুনেছ ? জোকারী ধরনের কথাবার্তা। এ রকম কথা কয়েকটা শুনলে তাে হাসতে হাসতে দম বন্ধ হয়েই মারা যাব। বলে কী—কবরে কোনাে ডেডবডি নেই, এদিকে প্রতি বৃহস্পতিবার ওজিফা পাঠ হচ্ছে। হা হা হা।
বাবা বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। চোখের ভাষায় বলার চেষ্টা করলেন— তুমি কেন বুঝতে পারছ না আমি এই লােকটার সঙ্গ পছন্দ করছি না ? কেন তুমি তারপরেও মানুষটাকে প্রশ্রয় দিচ্ছ? তার সঙ্গে রসিকতা করার কোনাে দরকার নেই।
আজহার চাচা বললেন, মৃন্ময়ী মা আমার ছেলেটাকে আজ জোর করে ধরে নিয়ে এসেছি। ছােটবেলায় কত এসেছে এখন আর আসতে চায় না। তার কথা তাের মনে আছে তাে মা ডাক নাম শুভ | তােদের বসার ঘরে ও একা একা বসে আছে। ও চা–টা কিছু খাবে কিনা একটু জিজ্ঞেস করিসতাে। যা লাজুক ছেলে মুখ ফুটে কিছু বলবে না। একে নিয়ে বিরাট বিপদে আছি। তাকে এমন কোনাে মেয়ের হাতে তুলে দিতে হবে যে তার নাকে দড়ি দিয়ে কেনি আংগুলে। বেধে রাখবে।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি বাবার দিকে তাকালাম। বাবা হতাশ দৃষ্টি দিয়ে ইশারায় বলার চেষ্টা করলেন— খবরদার ঐ দিকে যাবি না। তার মনে ক্ষীণ সন্দেহও হলাে— হতাশ দৃষ্টিটা আমি কি বুঝেছি! সে কারণেই হয়তাে আজহার চাচার দিকে তাকিয়ে বললেন, তােমার ছেলে কি মেয়েদের সঙ্গে কথা বলে ? সে শুনেছি কঠিন ধর্ম পালন করে।আজহার চাচা আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, মৃন্ময়ী মা তাে বাইরের কেউ না । তার সঙ্গে কথা বলতে দোষ নাই।
বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, একটা ছেলে একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলবে তার জন্যে যদি দোষ–গুণ বিচার করতে হয় তাহলে কথা না বলাই উচিত। মৃন্ময়ী তাের যাবার দরকার নেই— তােকে দেখে বেচারা হয়তাে অস্বস্তিতে পড়বে। কী দরকার ? তােকে দেখে মনে হচ্ছে তুই খুব টায়ার্ড। তুই একটা হট শাওয়ার নে— নাশতা খেয়ে রেস্ট নে। তাের পরিশ্রম বেশি হচ্ছে। তাের রেস্ট দরকার।
আমি তাদের সামনে থেকে চলে এলাম। আমার কাছে মনে হচ্ছে কোনাে একটা ঝামেলা হয়েছে। বড় কোনাে ঝামেলা। বাবা মুখ শুকনা করে বসে আছেন। তিনি খুবই টেনশানে আছেন । আজহার চাচা তার ছেলে শুভকে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। এটাই কি টেনশানের কারণ ? তিনি কিছুতেই চাচ্ছেন না আমি আজহার চাচার ছেলের সামনে যাই।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ
বাবা যেখানে বসেছেন আমার ঘর তার থেকে অনেক দূরে। বাবা আজহার চাচার সঙ্গে কী কথা বলছেন কিছুই শুনতে পাচ্ছি না। তবে একটু পর পর আজহার চাচার হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আজহার চাচা আজ খুব আনন্দে আছেন।
বসার ঘর অন্ধকার। এই ঘরে বড় বড় জানালা আছে। জানালায় ভারী পর্দা টানা থাকে বলে ঘর অন্ধকার হয়ে থাকে। বসার ঘরে কেউ বসলে বাতি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আজ বাতি জ্বালানাে হয় নি। আজহার চাচার ছেলে শুভ ঘরের এক কোণায় জড়সড় হয়ে বসে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে সামান্য ভীত।
Read more
