পঞ্চাশ মিনিটের ক্লাস। আমি উপস্থিত হলাম চল্লিশ মিনিট পর। ক্লাসে ঢুকেই স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল। টিচার নেই। কাওসার স্যার ক্লাস নিতে আসেন নি।……….. যে যার মতাে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছে। কেউ কেউ ডিজাইন টেবিলে বসে কাজ করছে। তবে বেশির ভাগই গল্প করছে। ফরিদা বলল ইউনিভার্সিটির কারেন্ট গুজব শুনেছিস? আমাদের বিখ্যাত গৰু স্যার রেজিগনেশন লেটার পাঠিয়েছেন।
আজ ক্লাসে আসেন নি এই কারণেই এমন গুজব? ………..তিনি গত তিনদিন কোনাে ক্লাসে আসছেন না। তিনদিন আগে থেকেই বাজারে গুজব ভাসছে। দুই রকমের গুজব। একটা হলাে তিনি চাকরি করবেন না রেজিগনেশন লেটার দিয়েছেন। দ্বিতীয়টা হলাে–ইউনিভার্সিটি তার চাকরি নট করে দিয়েছে। দু’টা গুজব যখন বাজারে চালু থাকে তখন দুটা গুজবের একটা সত্যি হয়। কোনটা সত্যি কে জানে!
যেটাই সত্যি হােক ফলাফল তাে একই। ………….তা ঠিক। আমরা গুজব অনুসন্ধান কমিটি করেছি। আমি সেই কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল। আমার দায়িত্ব হচ্ছে আজ বিকাল চারটার মধ্যে রিপাের্ট দেয়া। তুই আমার সঙ্গে কাজ করবি?
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৬)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি কাজ শুরু করে দিয়েছি। স্যারের নাম্বারে টেলিফোন করেছি। সেই নাম্বারে কেউ ধরছে না। ইউনিভার্সিটি থেকে ঠিকানা নিয়ে তার বাসায় গিয়েছি। সেখানেও কেউ নেই। তবে বিভিন্ন জায়গায় স্পট লাগানাে আছে। খোজ বের হয়ে পড়বে। তােকে দেখে মনে হচ্ছে হয় তাের প্রচণ্ড মন খারাপ নয় তাের খুব ক্ষিধে লেগেছে। কোনটা সত্যি?
দুটাই সত্যি। আমি সকালে নাশতা করি নি। এবং আমার মনও খারাপ। ……………….ক্যান্টিনে নাশতা করে নে। ভেজিটেবল রােল আছে, গরম গরম ভাজছে। নাশতা খেয়ে আয় তাের সঙ্গে গােপন কথা আছে। খুবই গােপন সিক্রেট টু দা হাইয়েস্ট ওয়ার্ডার।
মুখ পাচার মতাে করে রাখলে গােপন কথা বলা যাবে না। মনের দুঃখ এক পাশে সরিয়ে আমার কাছে আয়। গােপন কথা শুনে যা। …………আমি ফরিদার দিকে তাকালাম। যত দিন যাচ্ছে এই মেয়ে তত মােটা হচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সে তার বিশাল শরীর নিয়ে মােটেই চিন্তিত না। মনের সুখে খাওয়া দাওয়া করছে। ক্লাসের শেষে বাড়ি যাবার আগে অবশ্যই সে আইসক্রিম খাবে। সে একা খাবে না। সঙ্গে যারা থাকবে তাদের সবাইকে খেতে হবে। মানুষকে নানান ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। ফরিদা এমন মেয়ে যাকে কোনাে ক্যাটাগরিতে ফেলা যাবে না।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৬)-হুমায়ূন আহমেদ
ফার্স্ট ইয়ারের প্রথম সেমিস্টার শুরুর দিনে ফরিদা সবাইকে একটা কাগজ পাঠাল। কাগজের ওপর লেখা জন্মদিন— জানিয়ে দিন। ……..তার নিচে গুটি গুটি করে লেখা— ……সহযাত্রী বন্ধুদের অনুরােধ করা যাচ্ছে— তাঁরা যেন তাদের জন্মদিন এই কাগজে লিখে দেন। যাতে ক্লাসের পক্ষ থেকে এবং আমার নিজের পক্ষ থেকে আমরা জন্মদিন পালন করতে পারি।
ফরিদা তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। জন্মদিন পার্টি হচ্ছে। ফরিদা একাই একশ। কথায় কথায় ‘খুবই গােপন। সিক্রেট টু দি হাইয়েস্ট ওয়ার্ডার’ বলা তার মুদ্রাদোষ। ভেজিটেবল রােল খেতে খেতে মাকে টেলিফোন করলাম। মা তার স্বভাব মতাে উল্লসিত গলা বের করলেন, মৃ তুই বিশ্বাস করবি না— এক মিনিট আগে মনে হলাে— তাের টেলিফোন আসছে।
আমার মােবাইলের ব্যাটারি শেষ হয়ে আসছে। মােবাইল অফ ছিল। এক মিনিট আগে অন করেছি। কারণ আমি নিশ্চিত তুই টেলিফোন করবি। টেলিপ্যাথির কথা অনেক শুনেছি এই প্রথম নিজের চোখে দেখলাম। কী যে অবাক হয়েছি! এখনাে গায়ের সব লােম খাড়া হয়ে আছে। তাের সঙ্গে গাড়ি আছে না? তুই এক কাজ কর— গাড়ি নিয়ে হুট করে চলে আয় আমার গায়ের নােম যে খাড়া হয়ে আছে নিজের চোখে দেখে যা। আসতে পারবি ?
Read more