দিনকয়েক আগে, অনেক রাত্তিরের দিকে গুটিগুটি এসে ম্যাঁও বসেছিলো, চুপচাপ, আমাদের গেটের ঠিক ভেতরে, এক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে। ভোরের দিকে গেট খুলতে গিয়ে গার্ড দেখে ম্যাঁও মরে গেছে, ঐখানেই বসে বসে, গেটের রেলিংএ মাথা রেখে।
গতবছর জানুয়ারির কোন এক সকালে নিজেদের শারীরিক রক্ষণাবেক্ষণের তাগিদে রোজকার মত হাঁটতে বের হচ্ছিলাম। লিফ্ট থেকে বেরিয়ে মেন গেটের দিকে এগিয়ে যেতে নজরে পড়ল বিড়ালটা। ও আমাদের লক্ষ্য করেনি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল গেটের ঠিক ভেতরে, এক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে।
তারপর গেটের বাইরে পৌঁছে ওর থেকে নজর সরে যেতেই মন থেকে বিড়াল উধাও। অবশ্য দৃশ্যটাও তো এমন কিছু মনমাতানো ছিল না; গেটের কাছে একটা বিড়ালই তো বসেছিল – এই মাত্র। আমরা এ পাড়ার মানুষজনেরা কুকুর বিড়ালে ভীষণভাবে অভ্যস্ত, পারিবারিক পোষ্য এবং পাড়ার পোষ্য সবরকম মিলিয়ে। তবে সেদিন হাঁটতে হাঁটতে ক্ষণিকের জন্য হলেও, একটা খটকা লেগেছিল এই ভেবে যে আমাদের হাউসিং-এ তো কোন বিড়াল নেই। কিন্তু, ব্যস্ ঐ পযর্ন্তই। আরও পাঁচটা তুচ্ছ ব্যপারের সঙ্গে মিশে গিয়ে গেটে দাঁড়িয়ে থাকা বিড়ালের মত একটা তুচ্ছ ব্যপারও মাথা থেকে বেড়িয়ে গেল।
কয়েকদিন পর, হঠাৎ করে যেন মনে পড়িয়ে দিতে, সেই বিড়াল আবার নজরে পড়ল। সিকিউরিটি গার্ডদের চেয়ারগুলোর ঠিক পেছনে, মিটারবোর্ডের নীচে একটু অন্ধকার অন্ধকার মতো যে জায়গাটা, সেখান টানটান হয়ে শুয়ে ঘুমচ্ছিল। গার্ডদের কাছ থেকে জানা গেল যে কয়েকদিন আগে অনেক রাত্তিরের দিকে দুটো ছেলে একটা বাইকে করে এসে গেটের কাছে দাঁড়ায়। পিছনের ছেলেটার হাতে একটা বস্তা ছিল। ও গেটের কাছে এসে বস্তার মুখটা খুলতেই এই বিড়ালটা বস্তার ভেতর থেকে বেরিয়ে একদৌড়ে আমাদের কমপ্লেক্সে ঢুকে পড়ে। গার্ডরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলেদুটো হাওয়া। তারপর থেকে বিড়ালটা কিছুতেই গেটের বাইরে যায় না। সবসময় লোকচক্ষুর আড়ালে থাকাই পছন্দ করে। সারাটা দিন ওর কেটে যায় নিজেকে মানুষের কাছ থেকে আড়াল করে রাখার চেষ্টায়। তবে ঘন দুপুরের বা গভীর রাতের দিকে, যে সময়টায় লোকজনদের আনাগোনা প্রায় থাকে না বললেই চলে, ঠিক তখন গুটিগুটি এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে গেটের ঠিক ভেতরে, এক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে।
সেদিন গার্ডদের কাছে অর্জুনও দাঁড়িয়ে ছিল। অর্জুন আমাদের কমপ্লেক্সের একজন সুইপার। সব ফ্ল্যাট থেকে সকালে যে কুড়া বেরোয় তার মধ্যে থেকে মাছের কাঁটা, মুরগির হাড়, ভাত এসব বেছে বেছে বার করে ও বিড়ালটাকে খেতে দেয়। শুনলাম গার্ড আর ড্রাইভাররাও তাদের টিফিন থেকে বিড়ালকে খাওয়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এদের সবার একটাই সমস্যা। আমাদের বিড়াল কিছুতেই খেতে চায় না। তবে খাক বা না খাক, মেন্ গেটে লোকজন কম থাকলে, গুটিগুটি পায়ে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে গেটের ঠিক ভেতরে, এক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে।
আমাদের কত্তাগিন্নীর একদিন একটু কৌতুহল জাগল। সেটা প্রশমনের জন্য আমরা এক নির্জন দুপুরে ছোট প্লাস্টিকের বাটিতে একটু ডাল-ভাত-মাখা সঙ্গে নিয়ে জলের পাম্পের আড়ালে শুয়ে থাকা সেই বিড়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বেশ অনেকক্ষণের নাছোড়বান্দা চেষ্টায় কিছুটা আলাপ হল। সেই অভিজ্ঞতায় বিড়াল খুশী হয়েছিল কিনা বুঝতে পারিনি, তবে আমরা যে হয়েছিলাম সেটা নিশ্চিত। আলাপচারিতার শেষে উভয়পক্ষই যেন কিছুটা বিভ্রান্ত, কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বয়েস আন্দাজ করলাম ১২-১৩ বছর, যে হিসেবে সে বৃদ্ধ বা অতিবৃদ্ধ। দাঁত প্রায় নেই বললেই চলে। একটি চোখে দৃষ্টিশক্তি পূর্ণরূপে স্তব্ধ, অন্যটাতে যৎসামান্য। এরপরের কয়েকদিন সঙ্গে নিয়ে যাওয়া খাবার খাওয়াতে খাওয়াতে আন্দাজ করলাম ওর খাবারের প্রতি এত অনীহা কারণ। আর পাঁচটা বিড়ালের মতো ওর সামনে ‘খাবার’ রাখলেই ও খেতে অভ্যস্ত নয়। ওকে আদর করে করে, ওর গলায়, ঘাড়ে, বুকে সুড়সুড়ি দিয়ে দিয়ে, ওর সঙ্গে গল্প করে করে ওকে খাওয়াতে হয়; ঐ যেমন করে মানুষরা তাদের বাচ্চাদের খাওয়ায় আর কি। তা সেদিন আমরাও বকবক করলাম, আদর করলাম, একটুআধটু বকাবকিও করলাম এবং বিড়াল খেল, চেটেপুটে। অনেকক্ষণ সময় লাগল, কিন্তু খেল। অর্জুন তো দেখে থ! এরপর থেকে রোজকার খাবারে মাছ যোগ করা হলো।
কিছুদিনের মধ্যেই চেহারা বা চালচলনে সামান্য হলেও একটু উন্নতি নজরে পড়ল। আমরা তার নতুন নামকরণ করলাম – ম্যাঁও। এইসবের মধ্যেও লক্ষ্য করতাম মেন্ গেটে লোকজন কম থাকলে, গুটিগুটি পায়ে এসে ম্যাঁও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে গেটের ঠিক ভেতরে, এক দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে।
কিছুদিন এভাবে চলার পর, পরিচয় একটু গভীর হল। তারপর থেকে ম্যাঁও তার আচার, ব্যবহার, চালচলন, আহ্লাদ, আদিখ্যেতা, নিঃসঙ্গতা সবকিছুর ভেতর দিয়ে সবসময় বোঝানোর চেষ্টা করত যে সে যে কোন একটা আলতুফালতু, রাস্তাঘাটের ঊচ্ছিষ্ঠ খেয়ে বেড়ানো, হেনতেন বিড়াল নয়। তার একটা আভিজাত্য আছে, কৌলিন্যবোধ আছে, সবচেয়ে বড় কথা তার আত্মসন্মান আছে। সে আলাদা। সে বড়ো হয়ে উঠেছে এমন এক পরিবারে যে পরিবারের কাছে সে একটা পোষা বেড়াল ছিল না; পরিবারের সে একজন সম্পূর্ণ সদস্য ছিল।
কিন্তু শেষ বয়েসে কেন যে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল সেটা ম্যাঁওয়ের কাছে একেবারেই বোধগম্য নয়। অবশ্য তার জন্য যে সে খুব একটা চিন্তিত তাও নয়। সে বড় হয়েছে শুধু এই জেনে যে, যেহেতু সে একটা বিড়াল এবং তার চেয়েও বড়কথা এক পোষ্য বিড়াল, তাই পৃথিবীতে তার কয়েকটা মাত্র কাজ – মানুষের কাছে আদরআহ্লাদ খেয়ে বেড়ানো, তাদের কাছে আদিখ্যেতা করে বেড়ানো, আর সারাদিন ধরে শুধু খাওয়া এবং ঘুমনো; আর কদাচিৎ কখনো একটু খেলতে খেলতে দুএকটা জিনিসপত্র ভেঙ্গে ফেলা। তবে জীবনের শেষবেলায় পৌঁছে তার উপলব্ধি যে মানুষ অথবা মনুষ্যেতর প্রাণীদের চরিত্রের বিশ্লেষণ মানুষরাই আজ পর্যন্ত করে উঠতে পারে নি, তো সে তো কোন ছাড়।
রজত বন্দ্যোপাধ্যায়, ০২/০৫/২০১৯
