সর্পরাজ অনেক কষ্টে নিচে নেমে গেল। ঝড়ের গতি ক্রমেই দেখি বাড়ছে। দুএক ফোটা করে বৃষ্টি পড়ছে। সমুদ্রঝড় আমি কখনো দেখি নি। শুনেছি তখন ঢেউ ফুলে ফেঁপে পাহাড়ের মতো হয়। এখানেও তাই হচ্ছে। প্রকাণ্ড ঢেউ লঞ্চের গায়ে আছড়ে পড়ছে। লঞ্চ ঢেউয়ের উপর উঠে যাচ্ছে না। ঢেউ লঞ্চের একতলায় ঢুকে যাচ্ছে। একতলা পানিতে ভর্তি হলে লঞ্চ ডুববে, এটাই স্বাভাবিক।সারেং মনে হয় সব আশা ছেড়ে দিয়েছে।
এতক্ষণ হুইল ধরে ছিল, এখন হুইল ছেড়ে সিগারেট ধরিয়ে বলল, আল্লাহর হাতে সোপর্দ করে দিলাম।সাৱেং-এর চেহারা দেখে মনে হলো না সে খুব দুশ্চিন্তায় আছে। সিগারেট সে বেশ আয়েশ করে টানছে। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষ এভাবে সিগারেট টানে না।সারেং বলল, হাওরের এই জায়গায় প্রায়ই ঝড় উঠে। আকাশে মেঘের ছিটাফোটা নাই, তারপরেও ঝড়। অনেক নৌকা ডুবেছে। দুই বছর আগে একটা একতলা লঞ্চ ডুবেছে। এগারোজন মানুষ মারা গেছে।আমি বললাম, এই জায়গাতেই ঝড় কেন উঠে?
এই পথে জ্বিনের বাদশার যাতায়াত, তার কারণে ঝড় উঠে।লঞ্চের একতলা থেকে সমবেত কণ্ঠে আযানের আওয়াজ আসছে। আমি সারেংকে বললাম, আযান কেন দিচ্ছে, জ্বিনের বাদশা তাড়াবার জন্যে? সারেং বলল, মহা দুর্যোগে আযান দেওয়ার বিধান আছে।আমি বললাম, আযান হচ্ছে নামাজের জন্যে আহ্বান। দুর্যোগ কেটে গেলে সবাই কি নামাজ পড়বে? সারেং বলল, দুর্যোগ কেটে গেলে কাউরে নামাজ পড়তে দেখি না। আপনি জটিল কথা বলেছেন।
ছোটবেলার ঝড়ের এক স্মৃতি আমার আছে। নানার বাড়িতে আছি। হঠাৎ বিকেলে কালবৈশাখী ঝড় উঠল। এমন অবস্থা যে-কোনো মুহূর্তে বাড়িঘর ভেঙে পড়বে। ছোটদের সব চুকানো হয়েছে খাটের নিচে। মাথার উপর বাড়ি ভেঙে পড়লেও যেন জীবন রক্ষা হয়। পুরুষরা সবাই আযান দিচ্ছেন। উঠানে শিলপাটা ছুড়ে ফেলা হলো। শিলপাটা দেখে ঝড় নাকি তার রাগ সামলে অন্য বাড়ির দিকে যায়। আমার নানিজান জলচৌকিতে দাড়িয়ে যেদিক থেকে বাতাস আসছে সেদিকে আঙুল দেখিয়ে সূরা পাঠ করছেন। ঝড়ের দিকপরিবর্তনের সঙ্গে তার আঙুলের দিকও পাল্টাচ্ছে।
নানার বাড়ির সেই ভয়াবহ ঝড় হঠাৎ করেই থেমে গেল। ছোটরা দৌড়ে গেলাম আমবাগানের দিকে।এই ঝড়ও কি হঠাৎ থামবে?ফোটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছিল, এখন প্রবল বর্ষণ শুরু হলো। সারেং বলল, আর ভয় নাই বৃষ্টি নামছে।বৃষ্টি নামলে ভয় নাই কেন?জ্বিনের বাদশা আগুনে তৈয়ার। জ্বিন জাতি বৃষ্টির মধ্যে থাকতে পারে না। তার উপর ঘূর্ণি বন্ধ হয়েছে। দক্ষিণা বাতাস ছাড়ছে।আমি বললাম, আপনার কাছে কম্পাস আছে? না।লঞ্চ যেভাবে ঘুরপাক খেয়েছে কম্পাস ছাড়া দিক বুঝবেন কীভাবে? যতদূর চোখ যায় পানি ছাড়া কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। সূর্যও মেঘে ঢাকা।সারেং বলল, আপনি আরেকটা জটিল কথা বলেছেন।
সারেং অমির জটিল কথায় মুগ্ধ। আমি হাওরের ঝড় এবং বৃষ্টি দেখে মুগ্ধ। ঝড়ের প্রকোপ মোটেই কমে নি, কিন্তু আমার ভয় কমে গেছে। মানুষ বেশিক্ষণ আতঙ্কগ্রস্ত অবস্থায় থাকতে পারে না। প্রকৃতি ব্যবস্থা রেখেছে। আতঙ্কিত মানুষের পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে প্রচুর এনড্রেলিন নামের জারক রস বের হয়। আতঙ্কিত মানুষের ভয় কেটে যায়।লেখকদের একটি বিশেষ ক্ষমতা আছে।তারা যে-কোনো সময় তাদের নিজেদের ভুবনে ঢুকে যেতে পারেন। আমি সেই প্রস্তুতি নিলাম। চোখের সামনে হিমুকে দেখলাম।
সে লঞ্চে যাচ্ছিল। ঝড়ের মধ্যে লঞ্চ পড়েছে। হিমু তার স্বভাব অনুযায়ী বিচিত্র কর্মকাণ্ড করে যাচ্ছে।এই বিষয়ে উপন্যাসটি আমি লিখতে শুরু করেছি। নাম দিয়েছি হিমুর আছে জল।জলযানে চমৎকার ঝড়ের বর্ণনা কোনো লেখকের লেখায় আমি তেমনভাবে পাই নি। তবে শরৎচন্দ্রের লেখায় সমুদ্রঝড়ের চমক্কার বর্ণনা আছে। শ্রীকান্ত দ্বিতীয় খণ্ডে শ্রীকান্ত সমুদ্রঝড়ে পড়েছিল।শরৎচন্দ্র থাকতেন বার্মায়। বার্মা থেকে বঙ্গদেশে জাহাজে ফেরার পথে বঙ্গোপসাগরে ঝড়ের মুখে পড়েছিলেন। নিজের অভিজ্ঞতাই তিনি শ্রীকান্তের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন।
কয়েক লাইন উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না– ছোটবেলায় অন্ধকার রাত্রে ঠাকুমার বুকের ভিতর ঢুকিয়া সেই যে গল্প শুনিতাম, কোনো এক রাজপুত্র এক ডুবে পুকুরের ভিতর হইতে রূপার কৌটা তুলিয়া সাতশ রাক্ষসীর প্রাণ সোনার ভোমর হতে পিষিয়া মারিয়াছিল এবং সেই সাতশ রাক্ষসী মৃত্যুযন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে পদভরে সমস্ত পৃথিবী মাড়াইয়া গুড়াইয়া ছুটিয়া আসিয়াছিল, এও যেন তেমনি কোথায় কী একটা বিপ্লব বাঁধিয়াছে; তবে রাক্ষসী সাতশ নয়, সাতকোটি, উন্মুক্ত কোলাহল এদিকেই ছুটিয়া আসিতেছে। আসিয়াও পড়িল।
রাক্ষসী নয়—ঝড়। তবে এরচেয়ে বোধ করি তাহাদের আসাই ঢের ভালো ছিল।এই দুর্জয় বায়ুশক্তির বর্ণনা করাও ঢের দূরের কথা, সমগ্র চেতনা দিয়া অনুভব করাও যেন মানুষের সামর্থ্যের বাহিরে।ঝড়ের প্রকোপ কিছুটা কমেছিল, হঠাৎ আবার বাড়ল। লঞ্চ ডানদিকে কাত হয়ে গেল। আতঙ্কজনক অবস্থা।
এর মধ্যে দেখি সর্পরাজ এবং ম্যানেজার বিশাল এক পিতলের ডেগ নিয়ে অনেক কষ্টে আসছে। আমি বললাম, ডেগ দিয়ে কী হবে? ম্যানেজার বলল, স্যার আপনি ডেগের ভেতর বসে থাকবেন। ডেগ পানিতে ভাসবে।সর্পরাজ বলল, ডেগের ভিতর একটা লোটা দিয়ে দিয়েছি। বৃষ্টির পানি জমলে পানি সেঁচবেন।ম্যানেজার বলল, নিচে বিরাট এক ঝামেলা হয়েছে স্যার। আমি বললাম, ঝড়ের ঝামেলা তো চলছেই। আর কী ঝামেলা?সোনালি মেয়েটা ভয়ে ফিট পড়েছে। দাঁতে দাঁত লেগে গেছে। ছোটানো যাচ্ছে না।সে যাচ্ছে নাকি?
মেয়েটার হাতে টাকা নাই পয়সা নাই, শুরু করেছে এমন কান্দা।সর্পরাজ বলল, ছবিতে ছোটখাটো একটা রোল তারে দিয়ে দিয়েন। মেয়েটা নাচও জানে। নিচে যখন গানবাজনা হচ্ছিল তখন তালে তালে নাচল। সবাই ভালো বলেছে।আমি ভালো যন্ত্রণায় পড়লাম। ঝড়-তুফান চলছে, এর মধ্যে ফিল্মে ঢোকার সুপারিশ।ম্যানেজার বলল, সোনালি বলেছে একটা পাসিং শট পেলেও নাকি তার জীবন ধন্য।যেসব পাঠক পাসিং শট বুঝতে পারছেন না তাদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি— পাসিং শট হচ্ছে মূল অভিনেতা অভিনেত্রী কথা বলছে, দূর দিয়ে কেউ হেঁটে চলে গেল। দূর দিয়ে হেঁটে চলে যাওয়াটাই শট।
নাটকে অভিনয় করার তীব্র আগ্রহ আমি মেয়েদের মধ্যেই বেশি দেখেছি। তারা যে-কোনো মূল্যে অভিনয় করতে চায়। মূল্যটা যে কত বড় তা জেনেও না-জানার ভান করে।আমি একবার এক বিয়েতে গিয়েছিলাম। বিয়ের কনে আমাকে দেখে আবেগজর্জরিত গলায় বলল, আঙ্কেল, আমার সারা জীবনের স্বপ্ন অভিনয় করা।আমি বললাম, স্বপ্ন পূরণের সুযোগ তো পেয়ে গেছ। বিয়ে হয়ে গেল, বাকি জীবন কাটবে স্বামীর সঙ্গে অভিনয় করে।ঝড় থেমে গেছে।আমাদের লঞ্চ ঝোঁপঝাড়ে ভর্তি একটা জায়গায় থেমে আছে। জায়গাটা দেখাচ্ছে খানিকটা সুন্দরবনের বাড়ির মতো। সন্ধ্যা মিলিয়েছে। আকাশ মেঘশূন্য।
কিছুক্ষণের মধ্যে রূপার থালার মতো প্রকাও চাদ উঠলেও আমি বিস্মিত হব না।প্রবল উত্তেজনার অবসান হলে শরীরে কোমল আলস্য নেমে আসে। লেখকের ভাষায় কোমল আলস্য বললাম। সাধারণ ভাষায় শরীর ছেড়ে দেয়। আমার শরীর মন দুইই ছেড়ে দিয়েছে। ডেকে চেয়ার পেতে বসেছি। এক হাতে সিগারেট অন্য হাতে চায়ের কাপ। আমার চমক্কার লাগছে।।অসংখ্য ছেলেমেয়ে তীরে দাঁড়িয়ে উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে।তাদের চাঞ্চল্য দেখে মনে হচ্ছে জীবনে এই প্রথম তারা লঞ্চ নামক জলযান দেখল।
শিশুদের সংখ্যা আরও বাড়ছে। ভাটি অঞ্চল সম্পর্কে প্রচলিত কথা হলো, সাতটার কম কারোর ছেলেমেয়ে থাকলে তাকে আঁটকুড়া বলা হয়। কথা সত্যি হতে পারে।সর্পরাজ মুখভর্তি পান নিয়ে আমার পাশে বসে আছে। শুধু ঝড়ের সময় তার মুখে পান দেখি নি। এই সময়টুকু ছাড়া সারাক্ষণ তার মুখে পান। আমার ধারণা ঘুমের মধ্যেও সে পান খায়। তার স্ত্রী (আমি ডাকি সর্পরানী) ঘুমন্ত স্বামীর মুখে পান ঠেলে দেয়।সর্পরাজ বলল, স্যার, এই জায়গাটার নাম তারানগর।আমি বললাম, এমন অজপাড়াগাঁর নাম নগর।
এর উত্তরে মুখভর্তি পান নিয়ে সে কী বলল, ঠিক বোঝা গেল না। তার সিলেটি ভাষা আমার কাছে বেশিরভাগ সময় দুর্বোধ্য মনে হয়।সর্পরাজ লঞ্চের ডেকে টকটকে লাল রঙের পিক ফেলে বলল, স্যার, মুনশি সাবরে খবর দিয়া আনব? আলাপ করলে মজা পাবেন।আমি বললাম, কাউকে খবর দিয়ে আনতে হবে না। আমি যথেষ্ট মজা এমনিতেই পাচ্ছি। আমরা মূল লোকেশনের দিকে কখন রওনা হব? সর্পরাজ বলল, সমইস্যা আছে।সমস্যার বিষয়টা শুনলাম। আমরা মূল লোকেশন থেকে অনেক উত্তরে চলে এসেছি।
সুনামগঞ্জ ফিরে যাওয়ার মতো ডিজেল লঞ্চে নেই। ডিজেলের সন্ধানে লোক গেছে।আমি বললাম, এত সামান্য ডিজেল নিয়ে আমরা রওনা হয়েছিলাম? এই প্রশ্নের উত্তরে অদ্ভুত কথা শুনলাম। লঞ্চ যখন আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা হলো তখনই এক ড্রাম ডিজেল ফেলে দেওয়া হলো। আল্লাহ যেন বোঝেন লঞ্চযাত্রীরা এখন সম্পূর্ণ অসহায়। তাঁর রহমত ছাড়া এদের গতি নেই।শিশুদের সঙ্গে এখন কিছু বয়স্ক ব্যক্তিও যুক্ত হয়েছেন। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার জন্যে সর্পরাজ এগিয়ে গেল।
সর্পরাজ : মুনশি সাব আছুইন নি?
সমবেত উত্তর : অয় অয়। (অর্থাৎ হ্যাঁ হ্যাঁ।)
সর্পরাজ : মুনশি সাবরে খবর দেউক্কা। লিখক হমায়ূন সাব লঞ্চে আইছুইন। মুনশি সাবের লগে উনার খুবই আলাপের খায়েশ।
শিশুর দলের একজন : লইয়া আইরাম। (অর্থাৎ নিয়ে আসছি)
এই শিশু ছুটে যাচ্ছে। তার পেছনে কম করে হলেও আরও কুড়িজন যাচ্ছে। আমার বিরক্তির সীমা রইল না। সর্পরাজকে স্পষ্ট জানিয়েছি, আমি কারও সঙ্গেই কথা বলতে চাচ্ছি না। নিতান্ত পরিচিত বলয়ের বাইরে আমি মুখ খুলতে পারি না। আশপাশে কয়েকজন অপরিচিত মানুষ থাকলেই আমার মনে হয় আমি কোনো সেমিনারে এসেছি। সেমিনারে প্রধান বক্তা আমি। কোন বিষয়ে সেমিনার এখনো জানি না। বক্তৃতায় কী বলব তাও জানি নাসর্পরাজ আমার সামনে বসতে বসতে বলল, মুনশিরে খবর দিছি।
চইলা আসবে।মুনশি সাবকে খবর দিতে আমি বলি নি।সর্পরাজ বলল, উনারে যদি আপনার পছন্দ না হয় আমার দুইগালে দুইটা চড় দিবেন।উনি করেন কী? মসজিদের ইমাম। মিজিক দেখায়।কী দেখায়? মিজিক। জুয়েল আইচ উনার কাছে দুধের শিশু।মসজিদের ইমাম ম্যাজিক দেখান? জি অয়।আমি খানিকটা অবাক হলাম। মসজিদের ইমাম ম্যাজিশিয়ান?
প্রায় দেড় শ বছর আগে নেত্রকোনায় মসজিদের জুনৈক ইমাম গান লিখতেন। গানে সুর দিয়ে গাইতেন। তাঁর নাম উকিল। মসজিদে ইমামতি করতেন বলে নামের শেষে মুনশি যুক্ত হয়েছে। তিনি পরিচিত হয়েছিলেন উকিল মুনশি হিসেবে।উকিল মুনশির একটি গান—শোয়া চান পাখি, আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি? আমি শ্রাবণ মেঘের দিন ছবিতে ব্যবহার করেছিলাম। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কমিটির জ্ঞানী বিচারকরা শ্রেষ্ঠ গীতিকারের পুরস্কার উকিল মুনশিকে দিলেন।
তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমার কাছে জানতে চাওয়া হলো, উকিল মুনশির ঠিকানা কী? তাকে কোথায় পাওয়া যাবে? আমি বললাম, কবর খুঁড়লেই পাওয়া যাওয়ার কথা। দেড়শ বছর পার হয়েছে এটা একটা সমস্যা।কোনো ছবির মৌলিক গানের জন্যে গীতিকারকে পুরস্কার দেওয়ার বিধান আছে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, হাছন রাজার গান ব্যবহার করলে তাদের শ্রেষ্ঠ গীতিকার পুরস্কার দেওয়া যায় না। উকিল মুনশি যে সেই দলেরই পুরস্কার কমিটি তা জানতেন না। বাংলাদেশের যে-কোনো কমিটিতে বেশিরভাগ সদস্য মূর্খ থাকবেন এটা নিপাতনে সিদ্ধ।
গায়ক উকিল মুনশির পর আরেকজন পাওয়া গেল ম্যাজিক মুনশি। খারাপ কী!সর্পরাজ বলল, স্যার কি আমার উপর নারাজ হয়েছেন? মিজিক মুনশি খবর দিলাম এই কারণে।কিছুটা নারাজ হয়েছি। আমার একা থাকতে ভালো লাগছিল।আপনি তো মিজিক ভালো পান।।তা অবশ্য পাই।। তাহলে উনার মিজিক দেখলে আপনার দিলখোশ হবে।আমি দিলখোশ হওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করছি। মুনশি সাহেব আসছেন না। সন্ধ্যা পুরোপুরি মিলিয়েছে।
আকাশে আলোর আভা নেই। শত শত জোনাকি পোকা বের হয়েছে। অনেকদিন পর একসঙ্গে এত জোনাকি পোকা দেখলাম।এক যাত্রায় অনেক অভিজ্ঞতা। শাওন সঙ্গে থাকলে বলতাম, জোনাকি ঝিকিমিকি গানটা করো তো। সঙ্গে সঙ্গে সে গান ধরত কি না জানি না। বিয়ের আগে তাকে গান গাইতে বললে এক সেকেন্ডের মাথায় গান ধরত। বিয়ের পর সাধ্যসাধনা করতে হয়।
পুত্র নিষাদকে খুব মিস করছি। একসঙ্গে এত জোনাকি পোকা দেখে সে কী কত কে জানে। নুহাশপল্লীতে মাঝে মাঝে কিছু জোনাকি পোকা দেখা যায়। নিষাদ তাদের ধরার জন্য পেছনে পেছনে ছছাটে। তার কী আনন্দ! শিশুর দল এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত বাড়িতে তাঁদের করার কিছু নেই। বাবা-মারাও চান না তারা ঘরে ফিরুক।আমি সর্পরাজকে বললাম, তোমার ম্যাজিক মুনশি সাহেব সম্ভবত আসবেন। আমি আমার কেবিনে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ একা থাকব।
লেখালেখি করবেন?
কাগজে-কলমে করব না, মনে মনে করব।
মনে মনে কীভাবে লিখবেন?
আমি বললাম, লেখকরা মনে মনে যত লেখা লিখেন তার ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ লিখেন কাগজে কলমে।সর্পরাজ পান মুখে ঢুকাতে ঢুকাতে বলল, অয় অয়। তার অয় অয় ধ্বনির পরপরই সোনালি মেয়েটি প্রায় দৌড়ে উপস্থিত হয়ে প্রথমে আমাকে তারপর সর্পরাজকে কদমবুসি করল। সর্পরাজ এই ঘটনায় কোনো অস্বাভাবিকত্ব খুঁজে পেল না। তরুণী মেয়েরা ছুটে এসে তাকে কদমবুসি করবে এটাই যেন স্বাভাবিক। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে পান চিবুতে লাগল। আমি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললাম, ব্যাপার কী? সোনালি বলল, আপনি আমাকে সিনেমায় রোল দিবেন এটা শোনার পর থেকে মাথা আউলা হয়ে গেছে।
ঝোল দেব তোমাকে কে বলেছে? ম্যানেজার স্যার বলেছেন।সামনের চেয়ারটায় বসো।মেয়েটি বসল। আমি বললাম, পড়াশোনা কতদূর করেছ?
ইন্টার পর্যন্ত পড়েছি। পরীক্ষা দিতে পারি নাই। পরীক্ষার আগের দিন ডিরেক্টর সবুজ ভাই বললেন, ব্যাংককে ধারাবাহিক নাটক করব, ভগ্ন সৈকত। চলো আমাদের সঙ্গে, একটা সাইড রেলি দিয়ে দিব।সাইড রোল পেয়েছিলে? জি-না। আমি আর সবুজ ভাই ব্যংককে গেলাম শনিবারে। রোববারে নাটকের দলের বাকি সবার আসার কথা। তারা ভিসা পায় নাই বলে আসতে পারল না।
তুমি সবুজ ভাইয়ের সঙ্গে কত দিন ব্যংককে ছিলে? সাত দিন। সবুজ ভাই অপেক্ষায় ছিলেন যদি নাটকের দল চলে আসে। ব্যাংককে খুব মজা করেছিলাম। সবুজ ভাই খুব আমুদি মানুষ।তুমি এখন যাও। আমার প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।সোনালি আনন্দিত গলায় বলল, আপনার মাথা বানায়ে দিব স্যার?
আমি নাপিতের চেয়েও ভালো মাথা মালিশ করতে পারি।আমি বললাম, মা মালিশ করতে হবে না।সর্পরাজ বলল, দেখি আমার মাথা বানাও। মাথা বানানি কেমন হিখছ পরীক্ষা হউক।সোনালি মহানন্দে সর্পরাজের মাথার চুল টানতে লাগল। আমি কেবিনের দিকে রওনা হলাম।কেবিনে বসে আছি। নুহাশপল্লীর ম্যানেজার দুটি মোমবাতি এবং একটি লণ্ঠন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। দুটি মোমবাতির একটি বাতাসের ঝাপটায় নিভে গেছে। অন্যটি নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাতাসের বিরুদ্ধে তার জীবনযুদ্ধ দেখতে ভালো লাগছে।ম্যানেজার বলল, স্যার আপনার জন্য একটা খাসি ছদকা দিয়েছি।কেন?
আল্লাহপাক আপনার জীবন রক্ষা করেছেন এইজন্য।ছদকার সিস্টেমটা কী? কোনো গরিব মানুষকে খাসি দিয়ে দেওয়া হয়েছে? ম্যানেজার বলল, মুরগি দুদকায় এই বিধান। গরু-খাসির বেলায় অন্য বিধান। আল্লাহর নামে জবেহ করা হয়। যার নামে ছদকা সে খেতে পারে না। অন্যরা পারে। আপনি যাতে খেতে পারেন তার জন্য আলাদা একটা খাসি কাটা হয়েছে। খানা দিতে সামান্য বিলম্ব হবে।হোক বিলম্ব। এখন সামনে থেকে যাও।আমি আধশোয়া হয়ে বিছানায় বসে আছি। ম্যাজিক মুনশির কারণেই হয়তো মাথায় ঘুরছে ম্যাজিক।
বলা হয়ে থাকে ম্যাজিকের শুরু প্রাচীন মিসরের ফারাওদের সময়ে। ফারাওরা (ফেরাউন) ছিলেন ম্যাজিকের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তাদের রাজসভাতে নামী ম্যাজিশিয়ানরা মন্ত্রীর পদমর্যাদায় থাকতেন। অবিশ্বাস্য সব কর্মকাণ্ড করে আঁরা সম্রাটকে আনন্দ দান করতেন। পবিত্র কোরান শরীফ এবং বাইবেলে তার উল্লেখ আছে।
সূরা আরাফের ১১৫ থেকে ১১৭ নম্বর আয়াতে আছে— তারা (জাদুকররা) বলল, হে মুসা! তুমি ছুড়বে না আমরা ছুড়ব? মুসা বলল, তোমরাই ছোড়ো। যখন তারা ছুড়ল লোকের চোখে ভেলকি লেগে গেল। এবং তারা ভয় পেয়ে গেল যেন তারা ভোজবাজি দেখছে।
মুসার প্রতি আমি হুকুম করলাম, তুমিও তোমার লাঠি ছোড়। হঠাৎ লাঠিটা ওদের ভুয়া সৃষ্টি গ্রাস করে ফেলতেলাগল। এখানে কিন্তু লাঠির সাপ হয়ে যাওয়ার কথা নেই। বাইবেলে আছে। বাইবেলে মুসা (আঃ)-এর কথা বলা হয় নি। বলা হয়েছে তার ভাই এরন-এর কথা।এরন প্রথমে তার লাঠি ফেললেন, সেটা সাপ হয়ে গেল। তখন ফেরাউনের নির্দেশে তার জাদুকররা লাঠি ফেলল। সেগুলি সাপ হয়ে গেল। তখন এরনের সাপ সবগুলিকে গিলে খেয়ে ফেলল। {Exodus vil 10, 11, 12}
ঊনবিশং শতাব্দীর বিখ্যাত জাদুকর রবার্ট হেলার (১৮৩৩-১৮৭৮) দাবি করেন তিনি লাঠি সাপ হয়ে যাওয়ার জাদু কায়রো শহরে বেশ কয়েকবার দেখেছেন। তিনি এই জাদুর ব্যাখ্যাও করেন। তার মতে লাঠিটা আসলেই সাপ। হিপনোটিক পদ্ধতিতে কিংবা কোনো ড্রাগ খাইয়ে সাপকে শক্ত লাঠির মতো করা হয়। সাপকে ছুড়ে ফেললে তার হিপনোটিক spell কিংবা ড্রাগের প্রভাব কেটে যায়।অতি প্রাচীন ম্যাজিকের কিছু তথ্য ব্রিটিশ মিউজিয়ামের লাইব্রেরিতে সংক্ষিত আছে।
যীশুখ্রিষ্টের জন্মের ৩৭৬৬ বছর আগে সম্রাট কুফুর দরবারে এই জাদু দেখানো হয়। জাদুকরের নাম চাচা আংখ (Tchatcha-en-ankk}, জাদুকর একজনের মাথা কেটে তা জোড়া দিয়ে সম্রাটের বিস্ময় উৎপাদন করেন।আধুনিক জাদুকররা ইলেকট্রিক করাতে তরুণীর দেহ দুভাগ করে আবার জোড়া দেন। এই কাজে তাদেরকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিতে হয়। প্রায় চার হাজার বছর আগেকার জাদুকরের হাতে নিশ্চয়ই এই প্রযুক্তি ছিল না। সম্রাট কুফুর দরবারের জাদুকর কোন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন আজ আর তা জানার কোনো উপায় নেই।স্যার আসব?
আমি চমকে তাকালাম। দরজার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে তিনিই যে ম্যাজিক মুনশি তাতে সন্দেহ রইল না। মুখভর্তি দাড়িগোঁফ। মুনশি মাওলানারা দাড়ি রাখেন। গোঁফ রাখেন না। পানি পান করার সময় গোফ পানি স্পর্শ করলে পানি নষ্ট (বা হারাম হয়ে যায়, এই কথা প্রচলিত। যদিও হজরত আলী (রাঃ) -র গালপাট্টা ছিল। গোঁফ ছিল, দাড়িও ছিল।দরজার সামনে যিনি দাড়িয়ে আছেন তার মাথার চুল গ্রামের বয়াতিদের মতো লম্বা। মধ্যবয়স্ক মানুষ। অত্যন্ত সুপুরুষ। চোখের তারা ঘন কালো।
চোখ যক্ষা রোগীর মতো ঝকমক করছে। তবে মানুষটির যক্ষা নেই। থাকলে খুকখুক কাশি শুনতাম।মুনশি সাহেব সবুজ রঙের পাঞ্জাবি পরেছেন। নবিজী (দঃ) সবুজ রঙ পছন্দ করতেন। তার মাথার পাগড়ি ছিল সবুজ। ম্যাজিক মুনশির সবুজ পাঞ্জাবির পেছনে নবিজীর (দঃ) পছন্দের রঙ কাজ করতে পারে।তিনি পাঞ্জাবির সঙ্গে লুঙ্গি পরেছেন। লুঙ্গির রঙ ধবধবে সাদা। পায়ে খড়ম। বিশেষ ধরনের খড়ম। ময়মনসিংহ অঞ্চলে এই খড়মকে বলে বউলওয়ালা
খড়ম।
আপনিই কি ম্যাজিক মুনশি?
জি জনাব। আসসালামু আলায়কুম।
ওয়ালাইকুম সালাম।
আপনার খবর অনেক আগে পেয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে আসা উচিত ছিল। মাগরেবের নামাজ শেষ করে এসেছি বলে বিলম্ব হয়েছে। আপনার কাছে ক্ষমা চাই।আমি বললাম, ক্ষমা করার মতো কোনো অপরাধ আপনি করেন নি। ভাই, ভেতরে আসুন।ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকলেন। আতরের গন্ধে কেবিন ভরে গেল। আতরটা সাধারণ আতরের মতো না। চা-পাতা জাল দিলে চায়ের যে মিষ্টি গন্ধ পাওয়া যায় সেই গন্ধ। চা-পাতা থেকে আতর তৈরি হয় বলে আমার জানা নেই।
ভাই বসুন।ভদ্রলোক বসতে বসতে বললেন, শাজারাতি মুমবারাকাতিন যাইতুনাতিন।আমি বললাম, এর অর্থ কী? মুনশি বললেন, এটা সূরা আননুনের একটা আয়াত। এর অর্থ পূতপবিত্র জয়তুন বৃক্ষ। আপনি আমার আতরের গন্ধে চমকেছেন। এই আতরটা জয়তুনের তেল থেকে তৈরি।আমি চমকেছি কীভাবে বুঝলেন? আপনার চোখের তারা চমকায়েছে। তার থেকে বুঝেছি।আতরের গন্ধেই যে চমকেছি তা তো নাও হতে পারে।আপনার চোখের তারা যখন চমকায়েছে তখন নাকের চামড়াও কুঁচকেছেন, সেই থেকে বুঝেছি।
Read more
