ম্যাজিক মুনশি পর্ব:৬ হুমায়ূন আহমেদ

ম্যাজিক মুনশি পর্ব:৬

একটি পদ্ধতিতে বিজোড়সংখ্যক নারী-পুরুষকে হাতে হাত রেখে চক্র বানিয়ে কোনো এক নির্জন স্থানে বসতে হয়। একমনে পরকাল এবং সেখানকার অধিবাসীদের বিষয়ে চিন্তা করতে হয়। মাঝে মাঝে জিকিরের মতো (chanting) বলতে হয়, আয়রে! আয়রে! পঠিত বিদ্যা কাজে লাগানোর জন্যে আমরা কয়েক বন্ধু মিলে ঠিক করি চক্রে বসা হবে। করতোয়া নদীর পাশে শ্মশানঘাট। শ্মশানঘাটে শ্মশানবন্ধুদের জন্যে বানানো একটা পাকা ঘর আছে। আমরা এক সন্ধ্যায় শশানঘাটে উপস্থিত হয়ে চক্রে বসি। আমার বন্ধুদের মধ্যে দুজনের নাম মনে আছে। একজন খালেকুজ্জামান ইলিয়াস। বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান। খালেকুজ্জামান নন্দিত কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোট ভাই।

আমার আরেক বন্ধুর নাম চিশতি হেলালুর রহমান। সে ছিল ছাত্রলীগের নিবেদিত কর্মী। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী তাকে ইকবাল হলে হত্যা করে।মূল ঘটনায় ফিরে যাই। আমাদের চক্র ছিল অসম্পূর্ণ। চক্রে মেয়েদের উপস্থিতি অতি আবশ্যকীয়। সুগন্ধি লাগবে। আমাদের মধ্যে দুটাই ছিল অনুপস্থিত। আসলে আমরা একত্রিত হয়েছিলাম ভূত ভূত খেলা করে মজা পাওয়ার জন্যে।কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনা অন্যরকম হয়ে গেল। চিশতির মুখ থেকে জন্তুর শব্দ বের হতে লাগল। শ্মশানঘর তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে ভরে গেল (এখন মনে হচ্ছে Ammonia-র গন্ধ)। চিশতির শরীর কাঁপছে এবং সে কিছুক্ষণ পরপর বলছে, আমার সামনে এটা কী? আমার সামনে এটা কী?

একসময় সে অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। বন্ধুদের বেশির ভাগ এইসময় দৌড়ে পালিয়ে গেল। আমি পালাতে পারছি না, কারণ সবকিছুর মূলে আমি। আমার অসহায় মুখ দেখে খালেকুজ্জামানও পালাল না। আমরা দুজন অনেক কষ্টে চিশতিকে টেনে টেনে করতোয়া নদীর পাশে নিয়ে আসি। তার চোখেমুখে পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরাই। জ্ঞান ফেরার পর চিশতি বলে, ভয়ঙ্কর একটা মানুষের মতো প্রাণী দেখে সে জ্ঞান হারিয়েছে। এই প্রাণীটা তার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিল?

আমি এবং খালেকুজ্জামান ভয়ে অস্থির হয়ে গেলাম। চিশতির অসীম সাহস। সে আমাদের দুজনকেই বাসায় পৌঁছে দিয়ে নিজে একা ফিরে গেল শ্মশানঘাটে। অদ্ভুত প্রাণীটার সঙ্গে সে কথা বলবে।ঐ রাতের ঘটনার পর থেকে চিশতির মনোজগতে একটা স্থায়ী পরিবর্তন হয়ে গেল। সে প্রায়ই একা শ্মশানঘাটে বসে থাকত। সে আমাকে বলেছে প্রাণীটার সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। কী কথা হয়েছিল তা আমাকে বলে নি।

আমার পর চক্র নিয়ে উৎসাহিত হলো আমার ছোটভাই জাফর ইকবাল (লেখক, বিজ্ঞানী এবং আরও অনেক কিছু)। সে থাকে ফজলুল হক হলে। পড়ে Physics. প্রায়ই শুনি সে বন্ধুদের সঙ্গে চক্রে বসছে। ভূত-প্রেত নামাচ্ছে। এক রাতে ঘটনা তাদের হাতছাড়া হয়ে গেল। (কী হয়েছিল পরিষ্কার না) তারা বাধ্য হলো হলের মাওলানা সাহেবকে ডেকে আনতে। মাওলানা তাদের ঘরে পা দিয়েই আঁতকে উঠে বললেন, কী সর্বনাশ! আপনারা তো জ্বিন নামিয়ে ফেলেছেন! কীভাবে নামালেন?

জাফর ইকবাল তার বই রঙিন চশমা-তে ঘটনাটির বিশদ বর্ণনা দিয়েছে।এখন আমি বিশেষ এক চক্রের পূর্ণ বিবরণ দিচ্ছি, তবে কেউ যেন এই ঝামেলায় না জড়ান তার জন্যে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। ভূত-প্রেত নামুক বা না-নামুক, এই পদ্ধতি এক ধরনের হিপনোটিক অবস্থার সৃষ্টি করবে। দৃষ্টিভ্রান্তি (Halliocination) ঘটার সমূহ সম্ভাবনা।

প্রস্তুতি

১. নয়জন সমবয়সী মানুষ একত্রিত হবেন (নয় সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ।

২. পাঁচজন ছেলে এবং চারজন মেয়ে।

৩. সবাইকে স্নান করে পরিষ্কার কাপড় পরতে হবে। শরীরে সুগন্ধি দেবেন। গলায় মিষ্টি গন্ধের ফুলের (বেলী, গন্ধরাজ, কামিনি) মালা পরবেন।

৪. পরিষ্কার করা (কয়েকবার ন্যাকড়া দিয়ে মোছা) একটি ঘরে সবাই একত্রিত হবেন। কর্মকাণ্ড শুরু হবে মধ্যরাতের পর যখন চারদিক নীরব হয়ে আসবে।

৫. ঘরের চার মাথায় চারটা মোমবাতি জ্বালাবেন।

৬. দরজা জানালা বন্ধ করে দিতে হবে যাতে বাতাসে মোমবাতি নিভে না যায়।

৭. ঘরের বাইরে উৎসুক কোনো দর্শক থাকতে পারবে না।

৮. মহিলা সদস্যরা চুড়ি পরবেন না। চুড়ির টুং টাং শব্দে সমস্যা হবে।

৯. সবাই থাকবেন খালি পায়ে।

১০. ভরাপেটে চক্র করা যাবে না। সামান্য খাদ্য গ্রহণ করা যেতে পারে। ফলমূল দুধ। এর বেশি কিছু না।

পদ্ধতি

১. একজন ছেলে একজন মেয়ে—এইভাবে সবাই গোল হয়ে দাঁড়াবেন।

২. সবাই পাশের জনের হাত ধরে চক্র বানাবেন। চক্র কোনো অবস্থাতেই ভঙ্গ করা যাবে না, অর্থাৎ হাত ছাড়া যাবে না।

৩. এখন নাচের ভঙ্গিতে সবাই কেন্দ্রের দিকে আসবেন এবং আগের জায়গায় ফিরে যাবেন। এরকম চলতে থাকবে যতক্ষণ না সবাই খানিকটা ক্লান্ত এবং অবসন্ন। পনের বা কুড়ি মিনিট। এই সময় কেউ কোনো কথা বলবেন না। ফিসফিস করেও না।

৪. এখন মূল অংশ। চক্র বড় করে ঘুরতে শুরু করবেন। chanting (জিকির) শুরু হবে। ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট স্বরে বলতে হবে, আয় আয় আয়। যখন ছেলেরা বলবে তখন মেয়েরা চুপ করে থাকবে। যখন মেয়েরা বলবে তখন ছেলেরা চুপ করে থাকবে। ঘূর্ণনপ্রক্রিয়া (নাচের ভঙ্গিতে) চলতেই থাকবে।

এইসময় একটা দুটা মোমবাতি বা সবকটি মোমবাতি নিভে যেতে পারে, আবার নাও নিভতে পারে।চক্র সফল হলে চক্রের মাঝখানে অলৌকিক উপস্থিতি লক্ষ করা যাবে। তাকে প্রশ্ন করলে সে উত্তর দেবে।যারা চক্র করছে তাদের কেউ গাঢ় আবেশে অজ্ঞান হয়ে পড়লে চক্র বন্ধ করে দিতে হবে। জ্ঞান ফেরানোর জন্যে চোখেমুখে পানির ছিটা দেওয়া যেতে পারে বা স্মেলিং সল্টের গন্ধ শোকানো যেতে পারে।কৃষ্ণশক্তির আরাধনা বা পরলোকের অনুসন্ধানে নৃত্য একটি বিশেষ অনুসঙ্গ। কেন এরকম তা জানি না। মৌলানা জালালুদ্দিন রুমি সুফিসাধনার সূত্রপাত করেন। এই সাধনায় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের বাইরের জগতের অনুসন্ধান করা হয়।

সুফিসাধকরা শুরুতে তাদের ডানহাত যেখানে পণ্ড তার উপর রাখেন। ডানহাতের উপর ক্রশ করে বাঁ হাত রাখা হয়। তারা সবাই দাঁড়ান বা পায়ের গোড়ালিতে ভর দিয়ে। একসময় ঘুরতে শুরু করেন। পৃথিবী যেমন তার অক্ষের উপর ঘুরে সেরকম ঘূর্ণন। তারা এইসময় জিকির শুরু করেন (আল্লাহু)। বেশকিছু সময় ঘূর্ণনের পর সমবেত নাচ শুরু হয়। তারা প্রবেশ করেন তাদের দাবি) অন্য এক অপার্থিব ভুবনে।ক্রিশানদের মধ্যেও একসময় এই ধরনের নাচের প্রচলন ছিল। St. Jhon তার বর্ণনা দিয়েছেন। নাচের সময় সুর করে বলা হতো–

And we all circled round him and responded to him; Amen. The twelfth of the numbers pales the round aloft; Amen to each and all it is given to dance, Amen.* (*The Mystic Sprial; Jilt Pruce. Thames and Hudon.) ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পবিত্র কাবা শরীফের চারদিকে ঘুরেন। আরবিতে এই ঘূর্ণনকে বলে tafa. এর অর্থ to attain the summit of a thing by spiraling round it.

অনেক বকবক করে ফেলেছি। নিজের বকবকানিতে আমি নিজেই মুগ্ধ। এখন চুপ করা যাক। নীরবতা হিরন্ময়।ম্যাজিক মুনশিকে ঢাকায় নিয়ে আসতে ছয়-সাত দিনের বেশি লাগার কোনো কারণ নেই। পনের দিন পার হয়ে গেল, আমার দুই কর্মচারীর কোনোই খোঁজ নেই। তারা সুনামগঞ্জ থেকে ইঞ্জিনের নৌকায় রওনা হয়েছে এই খবর পাওয়া গেল। কোন নৌকায় গিয়েছে নৌকার মাঝি ফিরেছে কি না তা জানা গেল না।নৌকাডুবি হয়ে তারা মারা গেছে তাও মনে হচ্ছে না। মারা গেলে খবর পাওয়া যেত। এর মধ্যে খবর রটে গেছে আমি দুই কর্মচারীকে সেন্টমার্টিন আইল্যান্ডে পাঠিয়েছিলাম, পথে সমুদ্রে ডুবে এরা মারা গেছে।

এর মধ্যে শাওন স্বপ্নে দেখল, নুহাশপল্লীর দিঘিতে দুটা লাশ উপুড় হয়ে ভাসছে। তাদের মুখ দেখা যাচ্ছে না। গায়ের কাপড় দেখে মনে হচ্ছে এরা আমার দুই নিখোঁজ কর্মচারী।তাদের দুজনের নামে দুটা মুরগি ছদগা দেওয়া হলো (এটাও কিন্তু ম্যাজিক)।কুড়ি দিনের মাথায় আমি ধানমণ্ডি থানার ওসি কামরুলের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কামরুল আমার অনেক নাটকে ওসির ভূমিকায় অভিনয় করেছে।কামরুল বলল, স্যার, এরা কি টাকাপয়সা নিয়ে পালিয়ে গেছে?

আমি বললাম, না। অযথা টাকা খরচ করার বিষয়ে তাদের অসাধারণ দক্ষতা আছে, কিন্তু টাকা নিয়ে পালানোর মানসিকতা নেই।কামরুল বলল, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। সাত দিনের মধ্যে আমি পাত্তা লাগাব।এক মাস পার হলো কোনো পাত্তা লাগানো গেল না। আমি থানায় জেনারেল ডায়েরি করালাম।একমাস ছদিন পর তারা ফিরল। দুজনের চেহারাই কাকলাসের মতো। কাপড় মলিন। একজনের পায়ে জুতা স্যান্ডেল কিছুই নেই। সে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। তারা নাকি ভুল করে ইন্ডিয়ান বর্ডারে চলে গিয়েছিল। ইন্ডিয়ান বর্ডার পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ওদের জেলে এতদিন ছিল।

আমার চিঠি মুনশির হাতে তারা দিতে পারে নি। চিঠি আছে ইন্ডিয়ান বর্ডার পুলিশের কাছে। এই চিঠি দিয়েই তারা নাকি শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করতে পেরেছে বিশেষ একজনকে খুঁজতে এসে ভুলে বর্ডার ক্রস করেছে।মুনশির সঙ্গে আমার আর যোগাযোগ করা হয় নি। সর্পরাজ আরজুর কাছে জানলাম, এক ভরাপূর্ণিমায় মুনশির মৃতদেহ দিঘির জলে ভেসে উঠেছে। মুনশির বিছানায় উঠে বসা বা নড়াচড়ার কোনো সামর্থ্যই ছিল না। দিঘি পর্যন্তু সে কীভাবে গেল সেটাই তারানগরের বর্তমান আলোচ্য বিষয়।রহস্যময় এই জগতের বিপুল রহস্যের অতি সামান্যই আমরা জানি। আমাদের উচিত এই সামান্য জ্ঞান নিয়েই তুষ্ট থাকা। বেশি জানতে না চাওয়া। Ignorence is bliss.

কৌতূহলী পাঠকদের জন্যে তারাশঙ্করের ডাইনী গল্পটি দিয়ে দেওয়া হলো।

ডাইনী

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

কে কবে নামকরণ করিয়াছিল সে ইতিহাস বিস্মৃতির গর্ভে সমাহিত হইয়া গিয়াছে, কিন্তু নামটি আজও পূর্ণগৌরবে বর্তমান ছাতি-ফাটার মাঠে জলহীন ছায়াশূন্য দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তরটির এক প্রান্তে দাঁড়াইয়া অপর প্রান্তের দিকে চাহিলে ওপারের গ্রামচিহ্নের গাছপালাগুলিকে কালো প্রলেপের মত মনে হয়। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন যেন কেমন উদাস হইয়া উঠে। এপার হইতে ওপার পর্যন্ত অতিক্রম করিতে গেলে তৃষ্ণায় ছাতি ফাটিয়া মানুষের মৃত্যু হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়; বিশেষ করিয়া গ্রীষ্মকালে। তখন যেন ছাতি-ফাটার মাঠ নামগৌরবে মহামারীর সমকক্ষতা লাভ করিবার জন্য লালায়িত হইয়া উঠে।

ঘন ধূমাচ্ছিন্নতার মত ধূলার একটা ধূসর আস্তরণে মাটি হইতে আকাশের কোল পর্যন্ত আছন্ন হইয়া থাকে; অপর প্রান্তের সুদূর গ্রামচিহ্নে সীমারেখা প্রায় নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। তখন ছাতি-ফাটার মাঠের সে রূপ অদ্ভুত, ভয়ঙ্কর! শূন্যলোকে ভাসে একটি ধূধূসরতা, নিম্নলোকে তৃণচিহ্নহীন মাঠে সদ্য-নির্বাপিত চিতাভস্মের রূপ ও উত্তপ্ত স্পর্শ। ফ্যাকাশে রঙের নরম ধূলার রাশি প্রায় এক হাত পুরু হইয়া জমিয়া থাকে। গাছের মধ্যে এত বড় প্রান্তরটার এখানে ওখানে কতকগুলি থৈৱী ও সেয়াকুল জাতীয় কণ্ঠকগুল্ম। কোনো বড় গাছ নাই—বড় গাছ এখানে জন্মায় না, কোথাও জল নাই, গোটাকয়েক শুভূগর্ভ জলাশয় আছে, কিন্তু জল তাহাতে থাকে না।

মাঠখানির চারিদিকেই ছোট ছোট পল্লী—সবই নিরক্ষর চাষীদের গ্রাম; সত্য কথা তাহারা গোপন করিতে জানে না—তাহারা বলে, কোন অতীতকালের এক মহানাগ এখানে আসিয়া বসতি করিয়াছিল, তাহারই বিষের জ্বালায় মাঠখানির রসময়ী রূপ, বীজপ্রসবিনী শক্তি পুড়িয়া ক্ষার হইয়া গিয়াছে। তখন নাকি আকাশলোকে সঞ্চরমাণ পতঙ্গ-পক্ষীও পঙ্গু হইয়া ঝরা-পাতার মত ঘুরিতে ঘুরিতে আসিয়া পড়িত সেই মহানগরের গ্রামের মধ্যে।

সে নাগ আর নাই, কিন্তু বিষজর্জরত এখনও কমে নাই। অভিশপ্ত ছাতিফাটার মাঠ! তাহারই ভাগ্যদোষে ঐ বিষজর্জরতার উপরে আর এক ক্রুর দৃষ্টি তাহার উপর প্রসারিত হইয়া আছে। মাঠখানার পূর্বপ্রান্তে দলদলির জুলা, অর্থাৎ অত্যন্ত গভীর পঙ্কিল ঝরনা জাতীয় জলটার উপরেই রামনগরের সাহাদের যে আমবাগান আছে, সেই আমবাগানে আজ চল্লিশ বৎসর ধরিয়া বাস করিতেছে এক ডাকিনী—ভীষণ শক্তিশালিনী নিষ্ঠুর ক্রুর একটা বৃদ্ধা ডাকিনী।

লোকে তাহাকে পরিহার করিয়াই চলে, তবু চল্লিশ বৎসর ধরিয়া দূর হইতে তাহাকে দেখিয়া তাহার প্রতিটি অঙ্গের বর্ণনা তাহারা দিতে পারে, তাহার দৃষ্টি নাকি অপলক স্থির, আর সে দৃষ্টি নাকি আজ চল্লিশ বৎসর ধরিয়াই নিবদ্ধ হইয়া আছে এই মাঠখানার উপর।দলদলির উপরেই আমবাগানের ছায়ার মধ্যে নিঃসঙ্গ একখানি মেটে ঘর; ঘরখানার মুখ ঐ ছাতি-ফাটার মাঠের দিকে। দুয়ারের সম্মুখেই লম্বা একখানি খড়ে-ছাওয়া বারান্দা—সেই বারান্দায় স্তব্ধ হইয়া বসিয়ী নিমেষহীন দৃষ্টিতে বৃদ্ধা চাহিয়া থাকে ঐ ছাতি-ফাটার মাঠের দিকে।

তাহার কাজের মধ্যে সে আপন ঘরদুয়ারটি পরিষ্কার করিয়া গোবরমাটি দিয়া নিকাইয়া লয়, তাহার পর বাহি হয় ভিক্ষায়। দুই-তিনটা বাড়িতে গিয়া দাড়াইলেই তাহার কাজ হইয়া যায়, লোকে ভয়ে ভয়ে ভিক্ষা বেশী পরিমাণেই দিয়া থাকে; সেরখানেক চাল হইলেই সে আর ভিক্ষা করে না, বাড়ি ফিরিয়া আসে। ফিরিবার পথে অর্ধেক চাল বিক্রি করিয়া দোকান হইতে একটু নুন, একটু সরিষার তেল, অরি খানিকটা কেরোসিন তেল কিনিয়া আনে। বাড়ি ফিরিয়া আর একবার বাহির হয় শুকনো গোবর ও দুই-চারিটা শুকনো ডালপালার সন্ধানে।

ইহার পর সমস্তটা দিন সে দাওয়ার উপর নিস্তব্ধ হইয়া বসিয়া থাকে। এমনি করিয়া চল্লিশ বৎসর সে একই ধারায় ঐ মাঠের দিকে চাহিয়া বসিয়া আছে। বৃদ্ধার বাড়ি এখানে নয়, কোথায় যে বাড়ি সে কথাও কেহ সঠিক জানে না। তবে একথা নাকি নিঃসন্দেহ যে, তিন-চারখানা গ্রাম একরূপ ধ্বংস করিয়া অবশেষে একদা আকাশপথে একটা গাছকে চালাইয়া লইয়া যাইতে যাইতে এই ছাতি-ফাটার মাঠের নির্জন রূপে মুগ্ধ হইয়া নামিয়া আসিয়া এইখানে ঘর বাঁধিয়াছে। নির্জনতা উহারা ভালোবাসে, মানুষের সাক্ষাৎ উহারা চায় না।মানুষ দেখলেই যে তাহার অনিষ্ট-স্পৃহা জাগিয়া উঠে। ঐ সর্বনাশী লোলুপশক্তিটা সাপের মত লকলকে জিভ বাহির করিয়া ফণা তুলিয়া নাচিয়া উঠে।

না হইলেও সে তো মানুষ।আপনার দৃষ্টি দেখিয়া সে আপনিই শিহরিয়া উঠে। বহুকালের পুরানো একখানি—আয়না—সেই আয়নায় আপনার চোখের প্রতিবিম্ব দেখিয়া তাহার নিজের ভয় হয়—ক্ষুদ্রায়তন চোখের মধ্যে পিঙ্গল দুইটি তারা, দৃষ্টিতে ছুরির মত একটা ঝকঝকে ধার। জরা-কুঞ্চিত মুখ, শণের মত সাদা চুল, দন্তহীন মুখ। আপন প্রতিবিম্ব দেখিতে দেখিতে ঠোঁট দুইটি তাহার থরথর করিয়া কাপিয়া উঠিল। সে আয়নাখানি নামাইয়া রাখিয়া দিল। আয়নাখানার চারিদিকে কাঠের ঘেরটা একেবারে কালো হইয়া গিয়াছে, অথচ মৃত অবস্থায় কি সুন্দর লালচে রঙ, আর কি পালিশই না ছিল! আর আয়নার কাচখানা ছিল রোদ-চকচকে পুকুরের জলের মত।

কাচখানার ভিতর একখানা মুখ কি পরিষ্কারই না দেখা যাইত। ছোট কপালখানিকে ঘেরিয়া একরাশ চুল ঘন কালো নয়, একটু লালচে আভা ছিল চুলে; কপালের নিচেই টিকোল নাক; চোখ দুইটি ছোটই ছিল— চোখের তারা দুইটিও খয়রা রঙেরই ছিল–লোকেও সে চোখ দেখিয়া ভয় করিত। কিন্তু তাহার বড় ভালো লাগত, ছোট চোখ দুইটি আরও একটু ছোট করিয়া তাকাইলে মনে হইত, আকাশের কোল পর্যন্ত এ চোখ দিয়া দেখা যায়।অকস্মাৎ সে শিহরিয়া উঠিল—সরুণ দিয়া চেরা, ছুরির মত চোখে, বিজলীর মত এই দৃষ্টিতে যাহাকে তাহার ভালো লাগে তাহার আর রক্ষা থাকে না। কোথা দিয়া যে কি হইয়া যায়, কেমন করিয়া যে কি হইয়া যায়, সে বুঝিতে পারে না; তবে হইয়া যায়।

প্রথম দিনের কথা তাহার মনে পড়িয়া যায়।বুড়া শিবতলার সম্মুখেই দুর্গাসায়রের বাঁধাঘাটের ভাঙা রাণার উপর সে দাঁড়াইয়া ছিল—জলের তলে তাহার ছবি উল্টা দিকে মাথা করিয়া দাঁড়াইয়া জলের ঢেউয়ে আঁকিয়া-বাঁকিয়া লম্বা হইয়া যাইতেছিল—জল স্থির হইলে লম্বা ছবিটি অবিকল তাহার মত দশ-এগারো বৎসরের মেয়েটি হইয়া তাহারই দিকে চাহিয়া হাসিতেছিল। হঠাৎ বামুন-বাড়ির হারু সরকার আসিয়া তাহার চুলের মুঠি ধরিয়া টানিয়া সানবাঁধানো সিঁড়ির উপর তাহাকে আছাড় দিয়া ফেলিয়া দিয়াছিল। তাহার সে রূঢ় কণ্ঠস্বর সে এখনও শুনিতে পায় হারামজাদী ডাইনী, তুমি আমার ছেলেকে নজর দিয়েছ? তোমার এত বড় বাড়? খুন করে ফেলব হারামজাদীকে।

হারু সরকারের সে ভয়ঙ্কর মূর্তি যেন স্পষ্ট চোখের উপর ভাসিতেছে।সে ভয়ে বিহ্বল হইয়া চীকার করিয়া কাঁদিয়াছিল—ওগো বাবু গো, তোমার দুটি পায়ে পড়ি গো! আম দিয়ে মুড়ি খেতে দেখে যদি তোর লোভই হয়েছিল, তবে সে-কথা বললি না কেন হারামজাদী? হ্যাঁ, লোভ তো তাহার হইয়াছিল, সত্যই হইয়াছিল, মুখের ভিতরটা জলে ভরিয়া পরিপূর্ণ হইয়াছিল!হারামজাদী, আমার ছেলে যে পেট-বেদনায় ছটফট করছে।

সে আজও অবাক হইয়া যায়, কেমন করিয়া এমন হইয়াছিল—কেমন করিয়া এমন হয়! কিন্তু এ যে সত্য তাহাতে তো আর সন্দেহ নাই। তাহার স্পষ্ট মনে পড়িতেছে, সে হারু সরকারের বাড়ি গিয়া অঝোরঝরে কাদিয়াছিল, আর বার বার মনে মনে বলিয়াছিল—হে ঠাকুর, ভালো করে দাও, ওকে ভালো করে দাও। কতবার সে মনে মনে বলিয়াছিল—দৃষ্টি আমার ফিরাইয়া লইতেছি, এই লইলাম। আশ্চর্যের কথা, কিছুক্ষণ পরে বার-দুই বমি করিয়া ছেলেটি সুস্থ হইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল।

সরকার বলিয়াছিল, ওকে একটা আমি আর দুটি মুড়ি দাও দেখি।সরকার-গিন্নী একটা ঝাঁটা তুলিয়াছিল, বলিয়াছিল, ছাই দেব হারামজাদীর মুখে। মা-বাবা-মরা অনাথা মেয়ে বলে দয়া করি—যেদিন হারামজাদী আসে সেই দিনই আমি ওকে খেতে দিই। আর ও কিনা আমার ছেলেকে নজর দেয়! আবার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছে দেখ। ওর ঐ চোখের দৃষ্টি দেখে বরাবর আমার সন্দেহ ছিল, কখনও আমি ওর সাক্ষাতে ছেলেপুলেকে খেতে দিই নি। আজ আমি খোকাকে খেতে দিয়ে ঘাটে গিয়েছি, আর ও কখন এসে একেবারে সামনে দাঁড়িয়েছে। সে কি দৃষ্টি ওর!

লজ্জায় ভয়ে সে পালাইয়া গিয়াছিল। সেদিন রাত্রে সে গ্রামের মধ্যে কাহারও বাড়ির দাওয়ায় শুইতে পারে নাই; ইয়াছিল গ্রামের প্রান্তে ঐ বুড়াশিবতলায়। অঝেরঝরে সে সমস্ত রাত্রি কাদিয়াছিল আর বলিয়াছিল—হে ঠাকুর, আমার দৃষ্টিকে ভালো করে দাও, না-হয় আমাকে কানা করে দাও।গভীর একটা দীর্ঘনিশ্বাস মাটির মূর্তির মত নিস্পন্দ বৃদ্ধার অবয়বের মধ্যে এতক্ষণে ক্ষীণ একটি চাঞ্চল্যের সঞ্চার করিল। ঠোঁট দুইটি থরথর করিয়া কাশিতে লাগিল।

পূর্বজন্মের পাপের যে খণ্ডন নাই—দেবতার দোষই বা কি, আর সাধ্যই বা কি? বেশ মনে আছে, গৃহস্থের বাড়িতে সে আর ঢুকিবে না ঠিক করিয়াছিল। বাহির-দুয়ার হইতেই সে ভিক্ষা চাহিত—গলা দিয়া কা যেন বাহির হইতে চাহিত না, কোনওমতে বহুকষ্টে বলিত, দুটি ভিক্ষে পাই মা! হরিবোল।

কে রে? তুই বুঝি? খবরদার ঘরে ঢুকবি নে! খবরদার! না মা, ঘরে ঢুকব না মা।কিন্তু পরক্ষণেই মনের মধ্যে কি যেন একটা কিলবিল করিয়া উঠিত, এখনও উঠে। কি সুন্দর মাছভাজার গন্ধ, আহা-হা! বেশ খুব বড় পাকা-মাছের খানা বোধ হয়।এই—এই! হারামজাদী বেহায়া! উঁকি মারছে দেখ! সাপের মত!

ছি ছি ছি! সত্যিই তো সে উঁকি মারিতেছে—রান্নাশালার সমস্ত আয়োজন তাহার নরুণ-চেরা ক্ষুদ্র চোখের এক দৃষ্টিতে দেখা হইয়া গিয়াছে। মুখের ভিতর জিবের তলা হইতে ঝরনার মত জল উঠিতেছে।বহুকালের গড়া জীর্ণ-বিবর্ণ মূর্তি যেন কোথায় একটা নাড়া পাইয়া দুলিয়া উঠিল; ফাট-ধরা শিলিগ্রন্থি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি শৃঙ্খলাহীন অসমগতিতে চঞ্চল হইয়া পড়িল; অস্থিরভাবে বৃদ্ধা এবার নড়িয়া-চড়িয়া বসিল বা হাতে শীর্ণ দীর্ঘ আঙুলগুলির নখাঘ দাওয়ার মাটির উপর বিদ্ধ হইয়া গেল। কেন এমন হয়, কেমন করিয়া এমন হয়, সে-কথা সারাজীবন ধরিয়াও যে বুঝিতে পারা গেল না। অস্থির চিন্তায় দিশাহারা চিত্তের নিকট সমস্ত পৃথিবীই যেন হারাইয়া যায়।

কিন্তু সে তার কি করিবে? কেহ কি বলিয়া দিতে পারে, তার কি করিবে, কি করিতে পারে? প্রহৃত পশু যেমন মরীয়া হইয়া অকস্মাৎ আঁ-আঁ গর্জন করিয়া উঠে, ঠিক তেমনই ই-ই শব্দ করিয়া অকস্মাৎ বৃদ্ধা মাথা নাড়িয়া শণের মত চুলগুলাকে বিশৃঙ্খল করিয়া তুলিয়া খাড়া সোজা হইয়া বসিল। ফোকলা মাড়ির উপর মাড়ি চাপিয়া, ছাতি-ফাটার মাঠের দিকে নরুণ-চেরা চোখে চিলের মত দৃষ্টি হানিয়া হাঁপাইতে আরম্ভ করিল।।

Read more

ম্যাজিক মুনশি পর্ব:৭ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *