কবীর সাহেব হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন। তার হাসি দেখে মিসির আলির ভালাে লাগল ।
হােটেল জসুর খুবই পছন্দ হয়েছে। হােটেলের সব কর্মচারী বড় একটা ঘরে থাকে। জসুর ব্যবস্থা হয়েছে সেখানে। বিনিময়ে বাবুর্চির ফুটফরমাশ খাটবে। জসুর মাথায় ঢুকেছে সে বাবুর্চি হবে। সে স্বপ্নে দেখেছে, বিশাল এক রেস্টুরেন্টের ক্যাশবাক্সে সে বসেছে। রেস্টুরেন্টের নাম ‘জসুর মােরগপােলাও’।
রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে জসু মিসির আলির খোঁজ নিতে এল । মিসির আলি বললেন, জসু, তােমার বিষয়টা নিয়ে আমি এখন চিন্তাভাবনা শুরু করব।
জসু অবাক হয়ে বলল, আমার কোন বিষয় ?
মিসির আলি বললেন, এক ভূতনি এসে তােমার পা চাটে ওই বিষয়। ভূতনিটার বয়স কত ? | জসু বলল, তার বয়স কত ক্যামনে বলব ? আমি তাে তারে বয়স জিগাই নাই।
তাকে তাে দেখেছ ? জি দেখছি। দেখে বয়স কী রকম মনে হয় ? পারুল আপার বয়সী মনে হয় । চেহারাও উনার মতাে। খুবই সৌন্দর্য। মিসির আলি বললেন, পারুল আপা হলাে ছক্কার স্ত্রী ?
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১২
জি। এমন সুন্দর উনার চেহারা। দেখলে আপনি ফিট পড়বেন। রাইতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে।
মিসির আলি ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন। জসুর ভূতনি ফ্রয়েডিয়, এটা বােঝা যাচ্ছে। তবে ফ্রয়েডিয় ভূতনির সঙ্গে ‘হুড়বুড়ি’ নাম যাচ্ছে না ।
২১২ বি ঘরের সামনে এক চিলতে বারান্দার মতাে আছে। সেখানে কবীর সাহেব চাপাচাপি করে দুটা লাল লঙের প্লাস্টিকের চেয়ার এবং টেবিল ঢুকিয়েছেন।
মিসির আলি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে বাইনােকুলারে কাক-দম্পতিকে আগ্রহ নিয়ে দেখছেন। মিসির আলির ধারণা কাক-দম্পতিও বিষয়টা টের পেয়েছে। মনুষ্য সম্প্রদায়ের কেউ-একজন তাদের প্রতি লক্ষ রাখছে, এটা তারা জানে। বিষয়টাতে কাক-দম্পতি মনে হয় খানিকটা চিন্তিত।।
দুপুর বারােটার মতাে বাজে। জসু কিছুক্ষণ আগে প্লেটে করে সিঙারা দিয়ে গেছে। গরম সিঙারা, ভাপ উঠছে, কিন্তু কেন জানি মিসির আলির খেতে ইচ্ছা করছে না। এটাও বয়স হওয়ার লক্ষণ। ক্ষিধে হবে, কিন্তু খেতে ইচ্ছা করবে না। মিসির আলি হঠাৎ লক্ষ করলেন, বিদেশিনী এক তরুণী হােটেলের বারান্দায় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। মেয়েটির পরনে ঘাগড়া জাতীয় পােশাক। মাথায় স্কার্ফ।
চোখে রােদ চশমা। মেয়েটি এগিয়ে আসছে মিসির আলির দিকে। মিসির আলি বাইনােকুলার নামিয়ে তরুণীর দিকে তাকালেন। তরুণী বলল, চাচাজি, কেমন আছেন ? আমার নাম পারুল। চম্পার বড় বােন পারুল । আমি আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্যে এসেছি। আমি কি আপনার সামনের চেয়ারটায় বসতে পারি ?
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১২
চম্পা-পারুলদের কেউ হােটেল খুঁজে বের করে চলে আসবে, এটা মিসির আলি ভাবেন নি । পারুল মেয়েটা যে এত রূপবতী তাও ভাবেন নি। বিস্ময় চাপা দিয়ে মিসির আলি সহজ গলায় বললেন, বসতে পারাে । বােরকা নেই, ব্যাপার কী ?
আমি তাে কখনাে বােরকা পরি না। আমার ছােটবােন পরে। তােমার ছােটবােন কি তােমার মতােই রূপবতী ? জি। আমরা যমজ বােন। তবে আমার চোখ নীল, ওর চোখ কালাে।
পারুল বসতে বসতে বলল, চাচাজি, আমি দূর থেকে দেখেছি আপনি বাইনােকুলার চোখে দিয়ে গাছের দিকে তাকিয়ে আছেন । কী দেখছিলেন ?
কাক দেখছিলাম।
কাক?
হা কাক। কেন কাক দেখছিলাম, এইসব জিজ্ঞেস করে সময় নষ্ট করবে না। আমার কাছে কী জন্যে এসেছ সেটা বলাে।
আপনাকে আপনার আগের বাসায় নিয়ে যেতে এসেছি। আপনি রাজি না হওয়া পর্যন্ত আমি আপনার পা ধরে বসে থাকব।
মিসির আলি কিছু বােঝার আগেই পারুল চেয়ার থেকে মেঝেতে নেমে এসে দু’হাতে পা চেপে ধরল।
মিসির আলি বললেন, পা ধরা অতি গ্রাম্য ব্যাপার। পা ছাড়াে।
পারুল বলল, গ্রাম্য ব্যাপার হােক বা আধুনিক ব্যাপার হােক, আমি আপনার পা ছাড়ব না।
আমাকে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছ কেন?
আমরা দুই বোেন মহাবিপদে পড়েছি। আপনি আমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন। কী রকম বিপদ শুনলে আপনি চমকে উঠবেন।
কী রকম বিপদ বলাে?
আমাদের মৃত শশুর ফিরে এসেছেন। বাসায় যােরাফিরা করছেন। খাওয়াদাওয়া করছেন। আপনার কথাও জিজ্ঞেস করলেন। আপনি কোথায় গেছেন জানতে চাইলেন।
মিসির আলি শান্ত গলায় বললেন, আমি এই মুহর্তে যদি তােমার সঙ্গে যাই তাঁকে দেখতে পাব ?
হঁ্যা দেখতে পাবেন । একজন মৃত মানুষ জীবিত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ?
Read More