পুলিশ ইন্সপেক্টর বললেন, স্যার, আপনি রেস্ট নিন। পরে আপনার সঙ্গে আলাপ করব । আপনার কিছু সাহায্যও আমাদের দরকার । মৃত মানুষকে জীবিত দেখার ঘটনা কিন্তু ঘটেছে। একজন দাবি করছেন, তিনি মল্লিক সাহেব । তার কর্মচারীরাও তা-ই বলছে।
মিসির আলি চোখ না মেলেই বললেন, একজন মৃত মানুষ কখনােই জীবিত হয়ে ফিরবে না। এটা মাথায় রাখুন। আমার ধারণা আমি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে পারব । তবে সুস্থ হওয়ার জন্যে আমাকে কিছুটা সময় দিন।
রকিব বললেন, অবশ্যই স্যার। অবশ্যই।
মিসির আলি চোখ বন্ধ করলেন। চোখ মেললেন তের ঘণ্টা পর। শারীরিক এবং মানসিকভাবে তিনি তখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
মুন হাউস হােটেলে ২১২ নম্বর ঘর। সময় সন্ধ্যা ৭টা। | মিসির আলি বিছানায় বসে আছেন। তার সামনে প্লাস্টিকের লাল চেয়ারে মল্লিক সাহেব বসে আছেন। মল্লিক সাহেবের মুখ হাসি হাসি । তাকে দেখেই মনে হচ্ছে তিনি আনন্দময় সময় কাটাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ আগে ছােট্ট একটা নাটক হয়েছে। নাটক দেখেও তিনি তৃপ্তির হাসি হেসেছেন।
নাটকটার প্রধান চরিত্র জসু। সে মিসির আলির জন্যে চা নিয়ে এসেছিল। ঘরে ঢুকে মল্লিক সাহেবকে বসে থাকতে দেখে আর্ত চিৎকার দিল—ও আল্লাগাে! হাত থেকে চায়ের কাপ পড়ে গেল । সে ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৭
মল্লিক সাহেব আনন্দিত গলায় বললেন, ভয় খাইছে। প্যান্টে পিশাব না করে দেয়। | মিসির আলি বললেন, ভয় পাওয়ারই কথা। সবার কাছে আপনি একজন মৃত মানুষ । আপনার শবদেহ কুয়া থেকে তােলা হয়েছে। তারপর আপনাকে জীবিত দেখা যাচ্ছে। আপনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, সিগারেট খাচ্ছেন ।
মল্লিক দাঁত বের করে তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, পুরা ঘেংড়া অবস্থা! | মিসির আলি বললেন, ঘেংড়া অবস্থা মানে কী ?
অতিরিক্ত বেড়ছেড়াকে বলে ঘেংড়া অবস্থা। পাবলিক তাে ভয় খাবেই। পাবলিকের ভয় খাওয়ারই কথা। পুলিশও ভয় খাচ্ছে। ঘটনা শােনেন, মজা পাবেন। আমি পুলিশ ইন্সপেক্টর রকিব সাহেবের সঙ্গে হাত মিলাবার জন্যে হাত বাড়ালাম, উনি লাফ দিয়ে দুই ফুট সরে গেলেন । একমাত্র আপনাকে দেখলাম ভয় খান নাই । আপনাকে দেখে কিছুটা আচানক হয়েছি। আপনি কেন ভয় খান নাই ?
মিসির আলি বললেন, আমি জানি মৃত মানুষ কখনাে জীবিত হয়ে ফেরে না। অন্য কোনাে ব্যাপার আছে। এইজন্যে ভয় পাই নি।
মল্লিক সাহেব আগ্রহ নিয়ে বললেন, অন্য ব্যাপারটা কী ? আমারে একটু বুঝায়ে বলেন।
মিসির আলি বললেন, আপনার যমজ ভাই আছে, যে দেখতে অবিকল আপনার মতাে। সে মারা গেছে অথবা খুন হয়েছে। তার ডেডবডি কুয়ায় ফেলা হয়েছে। আপনার না।
মল্লিক সাহেব গলা নামিয়ে বললেন, আমার যমজ ভাই আছে, তার বিষয়ে কেউ জানল না—এটা কেমন কথা!
মিসির আলি বললেন, কেউ জানে না তা ঠিক না। আপনার দুই ছেলে তাে প্রায়ই বলত, এরা দুজন মল্লিককে দেখে। একজন ভালাে। একজন মন্দ।
পাগলের কথা আপনি ধরবেন ? দু’টাই পাগল । নির্বোধ পাগল। প্রায়ই দেখবেন এরা কানে ধরে উঠবােস করছে। কেউ তাদের কানে ধরে উঠবােস করতে বলে নাই। তারপরেও করছে। বলুন তাে কেন ?
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৭
মিসির আলি বললেন, জানি না কেন ?
অনুমান করতে পারেন ?
অনুমানও করতে পারছি না। মল্লিক সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এই দুই ছাগলকে আমি প্রায়ই এক শ বার পঞ্চাশ বার কানে ধরে উঠবােস করতে বলি । এরা অ্যাডভান্স করে রাখে । খাতায় লেখা থাকে। সেখান থেকে বাদ দেয়। এদের কোনাে কথার উপর বিশ্বাস রাখা যায় ? আপনি বলেন ? পাগলের সাক্ষী কি কোর্ট গ্রাহ্য করবে ? চুপ করে থাকবেন না। কথা বলেন।
মিসির আলি বললেন, পাগলের সাক্ষ্য কোর্ট গ্রাহ্য করে না।
এই তাে এখন পথে আসছেন। বড় পুত্র ছক্কার ছেলে মারা গেল । কিসমত নাম। তার মধ্যে কোনাে বিকার নাই। এক ফোটা চোখের পানি নাই। আরেকজনের বাচ্চা কোলে নিয়ে ঘুরছে।
মিসির আলি বললেন, কিসমত কার ছেলে এই নিয়ে মনে হয় বিতর্ক আছে ।মল্লিক বললেন, কোনাে বিতর্ক নাই রে ভাই। বিতর্ক দুই বদ পুলার দুই বদ স্ত্রী তৈরি করেছে। কুৎসিত নােংরা কথা চালু করেছে। এইজন্যে এদের একজনরে আমি ডাকি বড়কুত্তি, আরেকজনরে ডাকি ছােটকুত্তি ।
আরে কুত্তি, তােদের শ্বশুর নাকি তােদের তার সাথে সেক্স করতে বলে। এ রকম ঘটনা ঘটলে তােরা কেন সােনামুখ করে তার কাছে যাবি ? কেন পাবলিকরে বলবি না ? পুলিশের কাছে যাবি না ? মিসির আলি সাহেব, বলেন, আমার কথায় কি যুক্তি আছে ?
যখন নামিবে আঁধার পর্ব-১৭
মিসির আলি বললেন, যুক্তি আছে।
মল্লিক বললেন, বড়কুত্তিটা আবার বলে তার কোনাে সন্তানাদি নাই। আরে কুত্তি, সিজারিয়ান করে তাের পেটের সন্তান বের করা হয়েছে। পেটে সিজারিয়ানের দাগ আছে।
মিসির আলি বললেন, সে তাহলে মিথ্যাটা কেন বলছে ?
মল্লিক সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমি জানি না। আমি যেমন জানি না, যারা এই কাণ্ড ঘটাচ্ছে তারাও জানে না। আমি ঘটনা জানার অনেক চেষ্টা নিয়েছি ভাইসাহেব । বড়কুত্তিটাকে তিন দিন খাওয়া পানি ছাড়া আটকায়ে রেখেছিলাম। ঘটনা কী বল। বললে ছাড়া পাবি।
ঘটনা বলেছে ?
বলে নাই। তবে এই বিষয়ে আমার অনুমান একটা আছে। অনুমান সত্য কি না জানি না।
কী অনুমান শুনি?
Read More