হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৮

চিনি । 

আরেকবার পাঠিয়েছিলাম এক শ একটা ডাব । ডাব পাঠানাের পর উনার সঙ্গে আমার বন্ধুর মতাে সম্পর্ক হয়ে গেছে। মাই ডিয়ার লােক। আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিব। পুলিশের সঙ্গে পরিচয় থাকা ভালাে। কখন কোন কাজে লাগে। চা খাব, আপনার কাজের ছেলেটাকে সুন্দর করে এক কাপ চা বানাতে বলেন। বাসায় ঝামেলা, চা বানানাের অবস্থায় কেউ নাই বিধায় আপনার এখানে চা খেতে এসেছি।যখন নামিবে আঁধারমিসির আলি বললেন, কী ঝামেলা ? 

ছক্কার ছেলেটা মারা গেছে। নিউমােনিয়া হয়েছিল। ডাক্তাররা বুঝে না-বুঝে অ্যান্টিবায়ােটিক দিয়েছে। অ্যান্টিবায়ােটিক বিষ ছাড়া কিছু না। 

মল্লিক সিগারেট ধরালেন। মিসির আলি বললেন, আপনার নাতি মারা গেছে, আর আপনি স্বাভাবিকভাবে গল্পগুজব করছেন ? 

মল্লিক বললেন, মৃত্যু হলাে কপালের লিখন । দুঃখ করে লাভ কী ? যত স্বাভাবিক থাকা যায় ততই ভালাে । 

মিসির আলি বললেন, ছক্কা কি তার ছেলের মৃত্যুসংবাদ জানে ? 

মল্লিক বললেন, না। পুলিশের ডলা খেয়ে বাড়ি ফিরে জানবে। ডাবল। অ্যাকশান হবে। 

জসু চা বানিয়ে এনেছে। মল্লিক তৃপ্তি করেই চা খাচ্ছেন। মিসির আলি তাকিয়ে আছেন মানুষটার দিকে। 

যখন নামিবে আঁধার

মল্লিক সাহেব চায়ের কাপ নামিয়ে মিসির আলির দিকে খানিকটা ঝুঁকে এসে বললেন, আপনাকে বলেছি না আপনার বাসায় একজন মৃত মানুষকে ঘােরাফিরা করতে দেখি ? 

জি বলেছেন। এই মানুষটার পরিচয় জেনেছি। উনি আপনার পিতা। ও আচ্ছা। 

মল্লিক সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, “ও আচ্ছা’ বলে উড়ায়ে দিবেন না। উনি আমাকে বলেছেন, আপনি মহাবিপদে পড়বেন। গাড়ি চাপা পড়ে মারা পড়বেন। গাড়ির রঙ কালাে। গাড়ি চালাবে অল্পবয়সী মেয়ে । বুঝেছেন ? 

জি। 

সাবধানে থাকবেন। সাবধানে। সাবধানের কোনাে মাইর নাই। কথায় আছে– 

বামে না ডানে 

চল সাবধানে। আপনার পিতা আমাকে বলেছেন আপনাকে সাবধান করে দিতে। সাবধান করে দিলাম । 

মিসির আলি খাতা খুলে বসেছেন। আজকের দিন শুরু করবেন ব্যক্তিগত কথামালায় এক পাতা লিখে। তাঁর সামনে চায়ের কাপ, পিরিচে টোস্ট বিস্কুট । সকালের প্রথম চা। জসু পরােটা-ভাজি আনতে গেছে। সে নিজে ভালাে পরােটা বানায়, তবে নিজের বানানাে পরােটা সে খেতে পারে না। তার পরােটা-ভাজি সে দোকান থেকে কিনে আনে। দুপুরে প্রায়ই সে মল্লিক সাহেবের কাচ্চি হাউস থেকে খেয়ে আসে। কাচ্চি হাউসের লােকজন তাকে চেনে। জসুকে টাকা দিতে হয় না। 

যখন নামিবে আঁধার

মিসির আলি লিখছেন— 

নাতিদের প্রসঙ্গে মল্লিক সাহেব দু’বার আমাকে বলেছেন, তার এক হালি নাতি। দুই নাতি এবং দুই নাতনি। 

আমি তার দুই নাতির কথাই জানি। জসুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সেও দুই জনের কথাই বলছে। 

মল্লিক সাহেবের দুই ছেলে যেমন তাদের দুই বাবাকে দেখে, মল্লিক সাহেবও কি একইভাবে দুই নাতির জায়গায় চার নাতি দেখেন ? বিষয়টা পরিষ্কার হওয়া প্রয়ােজন। তবে তাড়াহুড়ার কিছু নেই। হাতে সময় আছে। 

মল্লিক সাহেবের বাড়ির অবস্থা শান্ত। পশ্চিম রণাঙ্গন নিপ’-টাইপ শান্ত। একটি শিশু মারা গেছে, তার প্রভাব কারও ওপরেই মনে হয় পড়ে নি । ছক্কা-বক্কা ছেলে কোলে নিয়ে আগের মতােই হাঁটাহাঁটি করছে। আগে দু’জনের কোলে দুটি ছেলে থাকত। এখন একজন ভাগাভাগি করে দু’জনের কোলে থাকছে। 

 সুরমা হােমিও হাসপাতালে মল্লিক সাহেব নিয়মিত বসা শুরু করেছেন। সুরমা তার প্রথম স্ত্রীর নাম। 

এই স্ত্রীকে মনে হয় মল্লিক সাহেব খুবই পছন্দ করতেন। তার বেবিটেক্সির প্রতিটির পেছনে লেখা, সুরমা পরিবহন। 

যখন নামিবে আঁধার

মল্লিক সাহেবের প্রথম স্ত্রী সম্পর্কে কোনাে তথ্য এখনাে আমার হাতে নেই। মহিলা রূপবতী ছিলেন, সবসময় বােরকা পরে থাকতেন। ঘরের মধ্যেও বােরকা খুলতেন না। | এই বাড়ির সবকিছুই জট পাকিয়ে আন্ধা গিট্ট হয়ে আছে। এই জাতীয় আন্ধা গিট্টর সুবিধা হচ্ছে, কোনােরকমে একটা গিট্ট খুলে ফেললে বাকিগুলি একের পর এক আপনাতেই খুলতে থাকে। আমাকে অবশ্যি গিটু খােলার দায়িত্ব কেউ দেয় নি। কর্মহীন মানুষ কর্ম খুঁজে বেড়ায়। 

আমার মনে হয় এই দশাই চলছে। মিসির আলি খাতা বন্ধ করলেন। ঠান্ডা সরপড়া চায়ে চুমুক দিলেন। তাঁর মুখ সামান্য বিকৃতও হলাে না। নিজের মনেই ভাবলেন, এক ধরনের নির্বিকারত্ব সবার মধ্যেই আছে। তিনি যেমন চায়ের ঠান্ডা গরম বিষয়ে নির্বিকার, মল্লিকের দুই পুত্রও আশপাশে কী ঘটছে সেই বিষয়ে নির্বিকার। পুলিশ তাদের ধরে নিয়ে গেলেও তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের শিশুপুত্র বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেও তাদের কিছু যায় আসে না। অবশ্য এই শিশুটা বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে তা 

 মল্লিক সাহেব তার চিকিৎসা করেছেন। হােমিওপ্যাথিক ওষুধ দিয়েছেন।

 

Read More

হুমায়ন আহমেদ এর যখন নামিবে আঁধার পর্ব-৯

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *