কোনাে পরিবারে একজন কেউ কানে কম শুনলে বাকি সবাই জোরে কথা বলে । আনিকাদের বাড়ির কেউই কানে কম শােনে না, তারপরেও সবাই জোরে কথা বলে। মনে হয় এ বাড়ির লােকজন সবাই সারাক্ষণ ঝগড়া করছে।
শওকত আনিকার কাছে এসেছে। সে বসেছে বারান্দায় পেতে রাখা চৌকিতে। কলাবাগানে মােটামুটি আধুনিক একটি ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় তােষকবিহীন চৌকি পেতে রাখা সাহসের ব্যাপার। আনিকাদের সে সাহস আছে। চৌকিটা বাড়তি বিছানা হিসেবে কাজ করে। হঠাৎ কোনাে অতিথি এসে পড়লে চৌকিতে ঘুমুতে দেয়া হয়। পরিবারের কোনাে সদস্য রাগ করলে এই চৌকিতে ঝিম ধরে বসে থাকে। আনিকা হাসতে হাসতে বলেছিল, আমাদের এই চৌকিটার নাম ‘রাগ–চৌকি।
তুমি যদি কখনাে রাত দুটা–তিনটার সময় আসসা, তাহলে দেখবে কেউ না কেউ রাগ করে চৌকিতে বসে আছে। শওকত বলেছিল, দু’জন যদি একসঙ্গে রাগ করে, তখন কী হয়? দু’জন পাশাপাশি বসে থাকে ? আনিকা বিরক্ত হয়ে বলেছিল, তােমার কি ধারণা বাড়িতে আমরা সব সময় ঝগড়া করি? আমাদের সম্পর্কে তােমার এত খারাপ ধারণা ?
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
তাদের সম্পর্কে শওকতের ধারণা খুব যে উঁচু তা না। আজ শুক্রবার ছুটির দিন। ছুটির দিনে সবার মন–মেজাজ ফুরফুরে থাকার কথা। অথচ শওকত আধঘণ্টা বসে থেকে চড়–থাপ্পড়ের শব্দ শুনেছে। কান্নার শব্দ শুনেছে। আনিকার বাবার গর্জন কিছুক্ষণ পরপরই শােনা যাচ্ছে আমি জ্যান্ত পুঁতে ফেলব! আমি অবশ্যই তােকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব! যাকে পুঁতে ফেলার কথা বলা হচ্ছে, তার নাম মিতু। আনিকার ছােটবােন । মিতু এবার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবে। গত পরশু রাতে সে বাসায় ফিরে নি। বান্ধবীর জন্মদিনের কথা বলে বান্ধবীর বাসায় থেকে গেছে। পরদিন জানা গেছে বান্ধবীর জন্মদিন ছিল না। বান্ধবীর বাসায় মিতু থাকে নি ।
অপরাধ অবশ্যই গুরুতর। শওকত অবাক হয়ে দেখল, কিছুক্ষণের মধ্যে সব স্বাভাবিক । আনিকার বাবা মতিয়ুর রহমান টিভি ছেড়েছেন। সেখানে তারা চ্যানেলে উত্তম–সুচিত্রার ছবি দেখাচ্ছে। তিনি আগ্রহ নিয়ে স্ত্রীকে ছবি দেখার জন্যে ডাকছেন। এই ভদ্রলােক একা কোনাে ছবি দেখতে পারেন না। ছবি দেখার সময় তার আশেপাশে সবসময় কাউকে না কাউকে লাগে। এক সময় দর্শকের সন্ধানে তিনি বারান্দায় উঁকি দিয়ে শওকতকে দেখে বললেন, তুমি কখন
এসেছ ?
শওকত উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, বেশিক্ষণ হয় নি।
তুমি চুপি চুপি বারান্দায় এসে বসে থাকবে— এটা কেমন কথা! তােমাকে চা–টা দিয়েছে ?
জি।
আনিকার সঙ্গে দেখা হয়েছে ? | জি দেখা হয়েছে। ও আমাকে নিয়ে কোথায় যেন যাবে— এই জন্যে খবর দিয়েছে। মনে হয় তৈরি হচ্ছে।
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
মতিয়ুর রহমান বললেন, মেয়েদের তৈরি হওয়া তাে সহজ ব্যাপার না। ঘণ্টা দুই লাগবে। এই ফাঁকে এসাে একটা ছবি দেখে ফেলি। উত্তম-সুচিত্রার ছবি। আগে দেখছ নিশ্চয়ই। সাগরিকা। চাচা, ছবি দেখব না ।
কিছুক্ষণ দেখ । একা ছবি দেখে মজা নাই। আনিকার সাজ শেষ করে বের হতে দেরি আছে। আমার মেয়েদের আমি চিনি না! এদেরকে হাড় মাংসে চিনি।
শওকত ছবি দেখতে বসল। মতিয়ুর রহমান ছবি দেখতে দেখতে ক্রমাগত কথা বলতে থাকলেন।
মিতুর ঘটনা শুনেছ ? জি–না।
অতি হারামি মেয়ে। বান্ধবীর জন্মদিন। রাতে বান্ধবীর সঙ্গে না থাকলে বান্ধবী না–কি কাদতে কাদতে মরেই যাবে। তারপর কী হয়েছে শােন। কাজী নজরুলের কবিতা পড়বি পর মালীর ঘাড়ে সে ছিল গাছের আড়ে। সেই বান্ধবী সকালে বাসায় উপস্থিত । আমি বললাম, মা, জন্মদিন কেমন হলাে ? সেই মেয়ে অবাক হয়ে বলল, কিসের জন্মদিন চাচা ? এইদিকে মিতু আবার চোখ ইশারা করতে করতে বলছে তাের জন্মদিনের কথা হচ্ছে। ঐ যে কালরাত সবাই মিলে তাের বাসায় সারারাত হৈচৈ করলাম। মিতুর বান্ধবী গেল আরাে
হকচকিয়ে। সে একবার আমার দিকে তাকায়, একবার মিতুর দিকে তাকায়।বুঝেছ শওকত, আজকালকার ছেলেমেয়েরা কোনাে কিছুই ঠিকমতাে পারে না। একটা মিথ্যা পর্যন্ত গুছিয়ে বলতে পারে না। মিতুকে প্রিলিমিনারি একটা কাচা দিয়েছি। রাতে আরাে একডােজ ওষুধ পড়বে। তার খবর আছে ।
যদিও সন্ধ্যা -পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
উত্তম–সুচিত্রার সাগরিকা‘ অনেকখানি দেখে শওকত বের হলাে। আনিকা মােটামুটি কঠিন টাইপ সাজ করেছে। তাকে দেখে শওকতের মায়া লাগছে। সাজলে এই মেয়েটাকে ভালাে লাগে না। কোনােরকম সাজসজ্জা ছাড়া সে যখন সাধারণভাবে থাকে, তখন তার চেহারায় মিষ্টি মায়া ভাব থাকে। সাজলে সেটা থাকে না। চেহারা রুক্ষ হয়ে যায়। বয়স্ক মা–খালা ধরনের মহিলা মনে হয় । আনিকার এমন কিছু বয়স হয় নি। ত্রিশ বছর অবশ্যি হয়ে গেছে। একটি কুমারী মেয়ের ত্রিশ বছর তেমন বয়স না। অথচ এই মেয়েটাকে দেখে মনে হয় দ্রুত তার বয়স বাড়ছে। মাথার চুল পড়তে শুরু করেছে।
শওকত বলল, আমরা কোথায় যাচ্ছি ? আনিকা বলল, আমার সাজসজ্জা দেখে বুঝতে পারছ না কোথায় যাচ্ছি?
বুঝতে পারছি না। আমার সাজ কেমন হয়েছে ? খারাপ না একটু শুধু কটকটা হয়েছে। কটকটা মানে কী? হাওয়াই মিঠাই টাইপ।
আনিকা আহত গলায় বলল, আমি যত সুন্দর করেই সাজি না কেন তুমি সবসময় বলাে, কটকটা। তুমি কি চাও আমি বিধবাদের কাপড় পরি ? সাদা শাড়ি, সাদা ব্লাউজ ?
তােমার যা পছন্দ তাই পরবে।
আনিকা বলল, আজ রিকশায় উঠব না । এসি আছে এমন কোনাে ইয়ােলাে ক্যাব নাও।।
শওকত বলল, আমরা যাচ্ছি কোথায় ? আনিকা বলল, মগবাজারে যাচ্ছি। কোনাে বিয়ের দাওয়াত ?
আনিকা কঠিন গলায় বলল, বিয়ের দাওয়াত–ফাওয়াত না । আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি । মগবাজার কাজি অফিসে যাব।
শওকত বলল, ঠাট্টা করছ ?
Read more
