রজনী শেষ:পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

রজনী শেষ:পর্ব

বাবা আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি পা টিপে-টিপে আমার নিজের ঘরে চলে এলাম। পারুল কিছুক্ষণ পর চা নিয়ে ঢুকল। সে খুব ভয় পেয়েছে। মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে আছে। সে টেবিলে চা নামিয়ে রেখে বলল, ভাইয়া ঐ মেয়েটা বলে গেছে আজ সন্ধ্যাবেলা নিউমার্কেটে বইয়ের দোকানগুলোর সামনে তুমি যেন যাও। খুব নাকি দরকার।কী দরকার কিছু বলে নি? না। কিন্তু ভাইয়া, তুমি ঘরে ছেড়ে যাবে না। বাবার অবস্থা খুবই খারাপ। তুমি আগে দেখ নি, তাই কিছু বুঝতে পারছ না। বুঝলে? হ্যাঁ, বুঝলাম।মেয়েটা কে? আমাদের সঙ্গে পড়ে।মেয়েটার সঙ্গে কোনো কথাই বলতে পারি নি। তাকে আরেক দিন আসতে বলবে? আমি হ্যাঁ-না কিছু না-বলে শার্ট গায়ে দিলাম। পারুল তীক্ষ্ণ গলায় বলল, কোথায় যাচ্ছ? ধীরেন কাকু বলেছেন হাসপাতালে একটু খোঁজ নিতে, সিট পাওয়া যায় কি না।

পারুল আমার কথা বিশ্বাস করল না। তার চোখ দিয়ে ঘৃণা ফুটে বেরুচ্ছে। আমার ইচ্ছা করছে প্রচণ্ড একটা চড় বসিয়ে দিতে। কারণ আমি সত্যি-সত্যি হাসপাতালেই যাচ্ছি। যাবার আগে দু এক মিনিটের জন্যে নিউমার্কেটে হয়তো থামব। সেটা বিরাট কোনো অন্যায় নিশ্চয়ই হবে না।টুকু লম্বা-লম্বা পা ফেলে এগিয়ে আসছে।যখন কারো সঙ্গেই কথা বলতে ইচ্ছ করে না তখনই টুকুর সঙ্গে দেখা হয়। তার হাত থেকে সহজ নিস্কৃতি বলে কোন কথা নেই। গায়ের সঙ্গে গা লাগিয়ে কথা বলবে। চলে যেতে চাইলে হাত চেপে ধরবে। পেছনে পেছনে আসবে।টুকু সরু গলায় ডাকল, দোস্ত। আমি না শোনার ভান করলাম।

দোস্ত একটা কথা শুনে যা।আমার কাছে টাকা-পয়সা নেইরে টুকু। দোস্ত-দোস্ত বললে কোন লাভ হবে না।টাকাপয়সার দরকার নেই। আল্লাহর কসম। বিশ্বাস কর আমার পকেটভর্তি টাকা। দরকার হলে তুই কিছু নে সত্যি বলছি নে।টুকু একগাদা এক শ টাকার নোট বের করল। চকচকে নোট। আমি হকচকিয়ে গেলাম।দোস্ত তুই নে। কত লাগবে বল? লাগবে না কিছু।লাগবে লাগবে। চাচাজানের কথা শুনেছি। পানির মতো টাকা খরচ হবে। ডাক্তার ফাক্তার কত হাঙ্গামা। তার উপর ধর-আল্লাহু না করুক সত্যি-সত্যি যদি কিছু হয় তখন তো…..

আমি বহু কষ্টে নিজেকে সামলালাম। টুকুর উপর রাগ করা অর্থহীন। কেন রাগ করছি তা বোঝার ক্ষমতা তার নেই। আমি কঠিন স্বরে বললাম, পথ ছাড় টুকু, কাজ আছে।এক মিনিট দোস্ত। জাস্ট ওয়ান মিনিট। একটা খুবই জরুরি কথা। তোর পায়ে ধরছি দোস্ত, শুনে যা।টুকু সত্যি-সত্যি নিচু হয়ে আমার পা চেপে ধরল।বল কী বলবি।টাকা কীভাবে পেয়েছি সেটা বলব।বলার দরকার নেই। বুঝতে পারছি।তুই যা ভাবছি, তা না দোস্ত। আপঅন গড। মজুমদার সাহেব আমাকে টাকাটা দিয়েছেন। সন্ধ্যাবেলা ডাকিয়ে নিয়ে গেলেন। তারপর একটা খামের মধ্যে করে দিয়ে দিলেন। তিন হাজার এক শ টাকা।কেন দিল?

সেটা বলে নি। বলেছে—টুকু, আমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে। আমি বললাম–দেব। তখন মজুমদার সাহেব খামটা দিলেন।কাজটা কি? সেটা তো দোস্ত বলে নি। পরে বলবে। অ্যাডভান্স পেমেন্ট। রাত আটটার সময়। যেতে বলেছে।ভালোই তো, যা।কিন্তু দোস্ত মনটা খারাপ। কী কাজ কে জানে! মানুষ-মারা কাজ। কাউকে মেরে ফেলতে বলবে।টুকু হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম, পথ ছাড়। কাজ আছে। টাকাটা কি ফিরিয়ে দেব দোস্ত? তোর ইচ্ছা।ফেরত দেব কীভাবে? হাজার টাকার মতো খরচ হয়ে গেছে। একটা গরম শাল কিনলাম।ভালোই করেছিস, অস্ত্রপাতি লুকিয়ে রাখার জন্যে শাল হচ্ছে চমৎকার জিনিস।

টুকু ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলল। নিচু গলায় বলল, তুই কিছু টাকা রেখে দে দোস্ত। তোর কাছ থেকে এক টাকা দুটাকা করে মেলা নিয়েছি।আমার লাগবে না। যাই রে টুকু।টুকু আমার সঙ্গে-সঙ্গে আসতে লাগল। সে আসবেই। রিকশায় না-ওঠা পর্যন্ত সে আসবে। রিকশায় ওঠার পরও সে অনেকক্ষণ রিকশা ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে।দোস্ত একটা বুদ্ধি দে। কী করব যাব মজুমদারের কাছে? টাকা নিয়েছি, যাবি না মানে? না গেলে মজুমদার তোকে ছাড়বে? যদি সত্যি-সত্যি মানুষ মারার কথা বলে, তখন কী করব? একটা লম্বা ছুরি সাথে করে নিয়ে যা। তোর নতুন শালের আড়ালে লুকিয়ে রাখবি। মানুষ মারার কথা বললে ছুরিটা বের করে ওর ভুড়ির মধ্যে বসিয়ে দিবি।

ঠাট্টা করছিস কেন রে দোস্ত? একটা সিরিয়াস প্রবলেম।ঠাট্টা করছি তোকে বলল কে? ওকে মারতে পারলে তোর আগের সব পাপ কাটা যাবে।টুকু ফ্যাকাসেভাবে হাসতে লাগল। তার কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম। থরথর করে ঠোঁট কাপছে। একটা হাত প্যান্টের পকেটে। এক শ টাকার চকচকে নোটগুলি সে নিশ্চয়ই এই হাতে ধরে আছে। নতুন নোটের স্পর্শের মতো আরামদায়ক আর কিছুই নেই। আমি ক্লান্ত গলায় বললাম, চলি রে টুকু।

নিউমার্কেটে এশার সঙ্গে দেখা হল।কী সুন্দর তাকে লাগছে! এশা হচ্ছে সেই রকম মেয়ে, যাকে যেদিন দেখা যায় সেদিনই মনে হয় সে সাজের নতুন কোনো কায়দা করেছে—যার জন্যে তাকে অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে সুন্দর লাগছে। আজ তাকে লাগছে ইন্দ্রাণীর মতো। হালকা নীল রঙের একটা শাড়ি। সেই নীলের ছায়া যেন চোখে পড়েছে। যেমন নীল-নীল লাগছে তার চোখ। সে নরম গলায় বলল, আমি ভেবেছিলাম তুমি আসতে পারবে না। তোমার বাবার শরীর কেমন?

ভালো।সত্যি ভালোতো? আমি খুব খারাপ দেখেছিলাম।এখন চমৎকার! খাওয়াদাওয়া করে বারান্দায় বসে আছেন।আশ্চর্য তো! একে বলে মিরাকুলাস রিকভারি। ধীরেনবাবু বলে আমাদের একজন ডাক্তার আছেন, তিনি যাকে বলে সাক্ষাৎ নীলরতন রায় কিংবা এই জাতীয় কিছু। এক ডোজ কী খাইয়ে দিয়েছেন-বাবা উঠে বসে বললেন, হুঙ্কা বোলাও।ঠাট্টা করছ? আরে না! বাবা অসুস্থ থাকলে আসতাম নাকি? আমার কেন জানি মনে হয় অসুস্থ থাকলেও তুমি আসতে। পুলিশ-বক্সের সামনে যেতে বলেছিলাম। গিয়েছিলো, তাই না?

হুঁ।তুমি যাবার কিছুক্ষণ পরই আমি গেলাম। এক পুলিশ অফিসার আমাকে খুব যত্ন করল। তোমার নাকি খুব বন্ধু।বোসম ফ্রেন্ড। পুলিশের কোনো হেল্প লাগলে বলবে, ব্যবস্থা করে দেব। ডেকেছ কেন, ব্যাপারটা কি? এক জায়গায় আমার সঙ্গে যেতে হবে।কোথায়? বলছি। খুব তৃষ্ণা লেগেছে। দাঁড়াও, পানি খেয়ে নিই। খুব ঠাণ্ডা পানি খেতে ইচ্ছা করছে।ঠাণ্ডা পানি এখানে পাবে কোথায়? পাব। ওষুধের দোকানগুলোতে ফ্রিজ থাকে। ওরা ফ্ৰিজে ঠাণ্ডা পানি রাখে। মিষ্টি করে চাইলে দেয়।এশা এত মিষ্টি করে পানি চাইল যে, ফার্মেসির ছেলেটি বলল, আপা বসুন, পানি দিচ্ছি।বসব না ভাই। এক জায়গায় যেতে হবে।এশা পানি খেল অনেক সময় নিয়ে। যেন পানি নাচা খাচ্ছে। তার কপালে খুব সূক্ষ্ম ঘাম। ঠোঁট দুটি ফ্যাকাসে। কিছু একটা নিয়ে সে মনে হচ্ছে খুব চিন্তিত।আমি বললাম, আমরা যাব কোথায়? মগবাজারের দিকে।ব্যাপারটা কি?

বলব। যেতে-যেতে বলব। একটা রিকশা নাও। রোগা দেখে একজন রিকশাওয়ালা নেবে, যে খুব আস্তে আস্তে যাবে। যত দেরিতে পৌঁছানো যায় ততই ভালো। আমার ভয় করছে।কোনো রিকশাওয়ালা মগবাজারে যেতে রাজি না। সেখানে নাকি বিরাট গণ্ডগোল হয়েছে। বাস পুড়েছে, পুলিশের জিপ পুড়েছে। দোকান ভাংচুর হয়েছে। একটা ঘড়ির দোকান লুট হয়েছে। পুলিশের গুলিতে দুজন নাকি মারা গেছে।নিৰ্ঘাত মাসুমের কাণ্ড। একটা কিছু সে নিশ্চয় ঘটিয়েছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, মগবাজারে এত বড় কাণ্ড ঘটল, তার কোনো ছাপ এখানে নেই। দিব্যি দোকানপাট খোলা, ব্যবসাবাণিজ্য চলছে।

এক বুড়ো রিকশাওয়ালাকে পাওয়া গেল। সে সম্ভবত মগবাজারের গণ্ডগোলের কথা জানে না। ভাড়াও চাইছে কম। বুড়ো রিকশাওয়ালাগুলো খুব কম ভাড়া চায়। এত কষ্ট করে রিকশা টানে যে, শেষ পর্যন্ত দুটা টাকা বাড়তি দিতে হয়, তার পরেও মনে অনুশোচনা গেঁথে থাকে বুড়োলোকটাকে কষ্ট দেবার জন্যে।এশা বলল, হুড নামিয়ে দাও। হাওয়া খেতে খেতে যাই। রিকশাওয়ালা এতই কমজোরি যে, হুড নামাতে গিয়েই পরিশ্রমে সে হাঁপাচ্ছে।

আমি হালকা গলায় বললাম, তোমার কবিতার বই চলছে কেমন? এশা অবাক হয়ে বলল, কি কবিতার বই? মাসুম বলল, কী-একটা বই নাকি বের হয়েছে? জনে-জনে সেই বই জোর করে বিক্রি করছ।এশা তরল গলায় হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, মাসুমটা এত মিথ্যা কথা বলে কেন বল তো? তার লাভটা কী? কী আনন্দ পায়? বই তাহলে বের হয় নি? না। তবে একদিন নিশ্চয়ই হবে। আমার প্রথম বইটার নামও ঠিক করে রেখেছি। নাম জানতে চাও? না।না চাইলেও বলছি নাম হচ্ছে রজনী। নামটা কেমন? আমি তার উত্তর না দিয়ে বললাম, আমরা কোথায় যাচ্ছি সেটা বল।বলছি। এক মিনিট লাগবে বলতে। তার আগে বল রজনী নামটা কেমন?

শরৎচন্দ্র মার্কা।আমারও তাই মনে হয়। তবে প্রথম কবিতার নামে বইটার নাম। প্রথম কবিতাটার নাম হচ্ছে রজনী। ভরা দুপুরের রোদে হাঁটলে আমার কেন জানি মনে হয় এটা দুপুর না, গভীর রাত। কড়া রোদটাকে এক সময় মনে হয় চাঁদের আলো। ঐ নিয়ে লেখা। খুব সুন্দর হয়েছে।সুন্দর হলে তো ভালোই।বলব কয়েকটা লাইন? শুনবে? না। আহ্‌, শোন না! ভালো না লাগলেও তো অনেকে অনেক কিছু করে। এই যে তুমি তোমার অসুস্থ বাবাকে ফেলে আমার সঙ্গে যাচ্ছ, তোমার নিশ্চয়ই ভালো লাগছে না? তবু তো তুমি যাচ্ছ। কি, যাচ্ছ না?

কোথায় যাচ্ছি সেটা বল।এশা তা বলল না, নিচু গলায় তার রজনী কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল। তার গলা ভার-ভার হয়ে গেল। মনে হচ্ছে তার চোখে জল টলমল করছে। তার কবিতায় নিশ্চয়ই এমন কিছু দুঃখের ব্যাপার নেই। অন্য কোনো দুঃখের কান্না সে এই কবিতা বলার ফাঁকে কেঁদে নিচ্ছে।আমি এশার হাতে হাত রাখলাম। অনেক দিন পরপর এশার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তার হাতে হাত রাখার মতো সুযোগ প্রায় কখনোই হয় না।এশা কবিতা আবৃত্তি থামিয়ে রুমাল দিয়ে চোখ মুছে বলল, মানুষ হিসেবে তুমি বেশ অদ্ভুত। এতক্ষণ পর তুমি আমার হাতে হাত রাখলে? তাও ধরলে বাঁ হাত।আমি চমকে হাত সরিয়ে নিলাম। এশা ফিসফিস করে বলল, হাত সরিয়ে নিও না। আমি জানি আজই শেষ। আর কোনোদিন তুমি আমার হাতে হাত রাখবে না। পাশাপাশি হাঁটবে না।এর মানে কি?

মানে কিছু নেই। এমনি বললাম। আমরা এসে গেছি। রিকশা ছেড়ে দাও। এখান থেকে হেঁটে হেঁটে যাব।স্ট্রিট-লাইট নেই। রাস্তাঘাট গণ্ডগোলের জন্যেই হয়তো অতিরিক্ত ফাঁকা। আমার নিজেরই ভয়ভয় লাগছে, এশার কেমন লাগছে কে জানে। তার ভাবভঙ্গিতে কিছু প্রকাশ পাচ্ছে না। আমরা মূল রাস্তা ছেড়ে একটা গলির ভেতর ঢুকে পড়লাম। এশা আমার হাত ধরে ছোট-ঘোট পা ফেলছে। এক সময় সে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, আমার জীবনটা খুব কষ্টে-কষ্টে কেটেছে। ছোটবেলায় বাবা মরে গিয়েছিলেন। মা আবার বিয়ে করলেন। মার সঙ্গে নতুন সংসারে চলে এলাম। অচেনা-অজানা একজন নির্বোধ মানুষকে বাবা ডাকতে লাগলাম। নতুন সংসারে তিনটা ভাইবোনের জন্মের পর মা মারা গেলেন। আমার অবস্থাটা চিন্তা করে দেখ। এমন একটা সংসারে বড় হচ্ছি, যার সঙ্গে আমার কোনো যোগ নেই।

বুঝলে বীরু, খুব ছোটবেলা থেকেই আমি স্বাধীনভাবে বড় হতে চেয়েছি। নিজেকে অন্যরকম করতে চেয়েছি। মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে আলাদা, এটা আমি কখনো মেনে নিতে চাই নি। সহজভাবে মিশি ছেলেদের সঙ্গে। চমৎকার কিছু ছেলেদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, সেই সঙ্গে কিছু আজেবাজে ধরনের ছেলেদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে।এশা চুপ করল। বড় করে শ্বাস টানল। আমার যে-হাত এতক্ষণ ধরে ছিল, সেই হাত ছেড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল, আমার পেটে একটা বাচ্চা আছে। তাকে নষ্ট করে ফেলতে হবে। আমার একা খুব ভয় লাগছে। তুমি অল্প কিছুক্ষণ আমার সঙ্গে থাক। যদি মরেটরে যাই তুমি বাসায় খবর দিও। এই জন্যেই তোমাকে এনেছি।এখা কথাগুলো বলল খুব সহজ ভঙ্গিতে। যেন খুবই সাধারণ একটা খবর দিচ্ছে। কথা শেষ করে ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল। গাঢ় বেদনার কোনো ছায়া সে নিঃশ্বাসে নেই।

আমরা দাঁড়িয়ে আছি একটা ক্লিনিকের সামনে। এশা আমাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। এক সময় কালো মোটা একজন নার্স এসে আমাকে বলল, আমাদের ওয়েটিং রুম আছে। আপনি ভেতরে এসে বসুন। সময় লাগবে।আমি রাত এগারোটা পর্যন্ত বসে রইলাম। রাত এগারটায় এক জন ডাক্তার এসে। বললেন, আপনি এখন চলে যেতে পারেন। রুগী ভালো আছে, ঘুমুচ্ছে। আজ রাতটা এখানে থাকতে হবে।আমি বললাম, রুগীকে কি একটু দেখতে পারি?

হ্যাঁ, পারেন। আসুন আমার সঙ্গে।এশা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। কম পাওয়ারের একটা টেবিল ল্যাম্প তার মাথার কাছে। সেই আশোয় কী সুন্দরই না তাকে দেখাচ্ছে। মাথার পাশের জানালাটা খোলা। সাদা পর্দা থরথর করে কাঁপছে। জানালার ওপাশে বিপুল অন্ধকার।আমি নিচু হয়ে এশার হাত স্পর্শ করলাম। আমি কোনো দিন এশার হাতে হাত রাখব না, এশা এই কথাটি ঠিক বলে নি। আমি আবার তাকে ছুঁয়েছি।নার্স অদ্ভুত চোখে আমাকে দেখছে। আমি বললাম, সিস্টার, আমি কি এখানে কিছুক্ষণ বসতে পারি?

আমি চুপচাপ বসে আছি। আকাশে মেঘ ডাকছে। জানালার পর্দা কাঁপিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। ঝুমঝুম শব্দ হচ্ছে। বৃষ্টির ফোটা পড়তে শুরু করেছে। নিশ্চয়ই আজ সারা রাত প্রবল বর্ষণ হবে। আমি বসেই আছি। রাত বাড়ছে। আমি অপেক্ষা করছি। কিসের অপেক্ষা? আমি জানি না।মানুষ হয়ে জন্মানোর সবচে বড় কষ্ট হচ্ছে মাঝে-মাঝে তার সবকিছু পেছনে ফেলে চলে যেতে ইচ্ছা করে কিন্তু সে যেতে পারে না। তাকে অপেক্ষা করতে হয়। কিসের অপেক্ষা তাও সে ভালোমতো জানে না।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *