তাঁর সঙ্গে হেঁটে হেঁটে মিলনায়তনের বাইরে আসছি। তিনি বললেন, ট্র্যাজেডি আর কমেডির পার্থক্য জানাে?
স্যার!
শােনন, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ইন্টারভিউ নিচ্ছেন মুজিবুর রহমানের (বেতারশিল্পী, পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক)। জিজ্ঞেস করলেন, ট্র্যাজেডি আর কমেডির পার্থক্য কী?
মুজিবুর রহমান বললেন, ধরা যাক, আমি মধুর ক্যান্টিন থেকে আসছি। কলার খােসা পায়ের নিচে পড়ল, আর আমি পিছলে পড়ে গেলাম। তাহলে এটা কমেডি।
আর আমার জায়গায় যদি আপনি পড়তেন, তাহলে সেটা হতাে ট্র্যাজেডি। কারণ এটা হচ্ছে মহতের পতন।
আনিসুজ্জামান স্যারের মনের জোর আর রসবােধের পরিচয় আবারও পেয়ে আমি বিস্মিত হয়ে গেলাম।
যাক, স্যারের এই পা হড়কে পড়ে যাওয়াটা মহতের পতন হলেও শেষতক ট্র্যাজেডি বলে গণ্য করতে হলাে না। এটাকে আমরা কমেডি হিসেবেই নিতে পার লাম। কারণ স্যার ভেঙেও পড়েননি, হাত-পাও ভাঙেননি। রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত আর পাদ্রি সাহেবের সেমিনার মুক্তধারার এই বাংলা উৎসবের প্রধান ঘটনা ছিল সেমিনার। কিন্তু প্রধান আকর্ষণ ছিল সংগীতায়ােজন।
রম্য কথা -পর্ব-(২)
আগেই যেমনটা বলেছি, সেমিনারে শ্রোতাসমাগম হতাে খুব কম। কিন্তু তাতে | সেমিনারের গুরুত্ব বা গৌরব কোনােটাই কমেছে বলে আমি অন্তত মনে করি না। ঢাকা থেকে যাওয়া প্রকাশকেরা ফরিদ আহমেদ, মনিরুল হক আর আহমেদ মাহমুদুল হক, তারিক সুজাত, মাহমুদুজ্জামান বাবুসহ আমরা বসে পড়লাম দর্শকসারিতে, কখনাে বা মঞ্চে।
কথা বলছেন হয়তাে সমরেশ মজুমদার, সভাপতি ড. আনিসুজ্জামান, প্রশ্ন করছেন জ্যোতির্ময় দত্ত, তাঁর পাশেই হাসান ফেরদৌস আর রাবেয়া খাতুন, তর্ক জমে উঠলে মুখ খুলছেন গােলাম মুরশিদ। আর বইমেলার নামে সবকিছু হলেও বইমেলার অংশটাই ছিল সবচেয়ে নিষ্প্রভ। কারণ প্রকাশকেরা ঢাকা থেকে মাস দুয়েক আগে জাহাজে করে অনেক অনেক বই চালান করেছিলেন, সেসব নিউইয়র্ক সমুদ্রবন্দরে পড়ে ছিল, ছাড়ানাে যায়নি। এই নিয়ে প্রকাশকেরা অনেকটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন।
হয়তাে আমার সঙ্গে যাওয়া মঞ্জুরুল ইসলাম বা উদ্যোক্তাদের মধ্যে ফাহিম রেজা নূর বা প্রথম আলাে বন্ধুসভার কর্মীরাও দর্শকসংখ্যা বৃদ্ধি ও দর্শকমানকে উন্নততর করেছেন।
তা সত্ত্বেও আমাদের মন ভরে না। সেমিনারে দর্শকসংখ্যা কম থাকবে কেন? তখন আনিসুজ্জামান স্যার আমাদের সান্ত্বনা দিলেন একটা ঘটনা বলে । | রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত বক্তৃতা দেবেন। সভাপতি একজন পাদ্রি। নির্দিষ্ট সময়ে দুজনেই অনুষ্ঠানস্থলে হাজির। কিন্তু শ্রোতা বলতে একটা কাকপক্ষীও নেই। সভাপতি
বললেন, হবে হবে । শ্রোতা আসবে। কেউই আসে না। বৃষ্টি শুরু হলাে। কিছু মানুষ এসে ঢুকল ওই ভবনে। এবার শ্রোতা হবে । তাও হয় না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, বিলিয়ার্ড খেলা হচ্ছে, বৃষ্টিতাড়িত আশ্রয়প্রার্থীরা সবাই খেলা দেখছে। তখন রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত বললেন, সেমিনার বাতিল করে দিন।
রম্য কথা -পর্ব-(২)
সভাপতি বললেন, না, হবে । আপনি বক্তৃতা আরম্ভ করুন। বক্তা বক্তৃতা করলেন। সভাপতি হাততালি দিলেন। তারপর সভাপতির ভাষণ শেষ হলে বক্তা হাততালি দিলেন । ধন্যবাদ দিয়ে সভাপতি অনুষ্ঠান শেষ করলেন।
সবচেয়ে দামি ক্রিম মাওলা ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আহমেদ মাহমুদুল হক উপস্থিত ঢাকার প্রকাশকদের মধ্যে সবচেয়ে সুদর্শন। অন্তত গাত্রবর্ণের দিক থেকে তার উজ্জ্বলতা ফরিদ আহমেদ কিংবা মনিরুল হকের চেয়ে বেশি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একটা জিনিসের অভাব খুবই বােধ করতে লাগলেন। তা হলাে, মুখে মাখার ক্রিম। একটা ক্রিম কেনা দরকার, বারবার জানাচ্ছিলেন তিনি।
এই সমস্যার সমাধান হলাে লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে। একটা বড় মল বা সুপারমার্কেটে গেছি আমরা। লস অ্যাঞ্জেলেসের বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে উদ্যোগী সমাজসেবক ধরনের মানুষ বাচ্চু ভাই আমাদের এই মলে নামিয়ে দিয়ে গেছেন। আমরা যে যার মতাে করে কেনাকাটা করছি। সবার কেনাকাটা শেষ হলাে। আবার গাড়িতে উঠতে হবে। শুধু মাহমুদুল হকের কেনাকাটা শেষ হয় না।
কারণ তিনি মুখে মাখার ক্রিম কিনছেন। একটা হারবাল প্রসাধনীর দোকানে তিনি অনেক খুঁজে পেতে একটা ক্রিম পেয়েছেন। সেটার দাম দেওয়ার জন্য তাকে লম্বা কিউর পেছনে দাঁড়াতে হয়েছে। অনেকক্ষণ পরে তিনি কাউন্টারে পৌঁছালেন। দাম কত? ৯০ ডলার।
রম্য কথা -পর্ব-(২)
আহমেদ মাহমুদুল হক হাসবেন, না কাঁদবেন-বুঝতে পারছেন না। হিসাব কষে দেখা গেল, ক্রিমের দাম পড়ছে ছয় হাজার টাকারও বেশি! ঢাকায় এটা ২০০ টাকায় সারা যেত। এতক্ষণ ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর দামের ভয়ে চলে আসাটাও শােভন নয়।
অগত্যা বিরস বদনে তিনি দাম পরিশােধ করলেন। সময় প্রকাশনীর ফরিদ আহমেদ কৌতুকপ্রিয় মানুষ। তিনি সারাক্ষণ লেগে রইলেন মাহমুদুল হকের পেছনে। মাহমুদ, আপনাকে তাে আরও ফরসা দেখা যাচ্ছে।
সেই মহা মূল্যবান ক্রিমের টিউবটি সবার দর্শনীয় ও আলােচ্যবস্তুতে পরিণত হলাে।
কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে নিউইয়র্ক ফেরার পরে সেটা কেবল আলােচ্যই রইল, দ্রষ্টব্য রইল না।
কারণ ফেরার পথে মাহমুদ সাহেব মূল্যবান ক্রিমটা হাতের ব্যাগে রেখেছিলেন। নিষ্ঠুর আমেরিকান পুলিশ সেটা এয়ারপাের্টে প্লেনে ওঠার আগে বাজেয়াপ্ত করেছে।
তখন ফরিদ আহমেদের নেতৃত্বে শুরু হলাে মাহমুদুল হককে সান্ত্বনা দেওয়ার পালা। বারবার করে সবাই বলতে লাগলেন, আহা মাহমুদ, এত দামি ক্রিমটা ওরা কেড়ে নিল । ফেলে দিল।
ঐশ্বরিয়া রাই প্রসঙ্গ নিউইয়র্কে একবার এসেছিলেন ঐশ্বরিয়া রাই। বাংলাদেশিদের অনুষ্ঠানে।
অনুষ্ঠানের আয়ােজকদের উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। সংগৃহীত অর্থ দান করা হবে বাংলাদেশের পথশিশুদের জন্য। ঐশ্বরিয়া রাইও বিশ্বসুন্দরী প্রতিযােগিতার সময় অঙ্গীকার করে রেখেছিলেন, ‘শিশুদের জন্য একটা কিছু করতে চাই।’
নিউইয়র্কে ঐশ্বরিয়ার একজন আত্নীয় থাকেন। তাঁকে ধরলেন উদ্যোক্তারা। শিশুদের জন্য চ্যারিটি প্রোগ্রাম। ঐশ্বরিয়া বললেন, আমাকে কোনাে টাকা-পয়সা দিতে হবে না, শুধু যাতায়াত আর হােটেলভাড়া। যথেষ্ট। আমি আসব।
রম্য কথা -পর্ব-(২)
ঐশ্বরিয়াকে বলা হলাে, আপনি টিকিট করে ফেলুন। আমরা এখানে শাের টিকিট বিক্রি করছি। আপনি এলে আপনাকে টাকা পরিশােধ করা হবে।
আমাদের তারিক সুজাতের এক আত্নীয় আছে নিউইয়র্কে। অঞ্জন। পড়াশােনা করেছে ফটোগ্রাফি নিয়ে, নিউইয়র্কে। সে-ই এই গল্প করেছে। গাড়িতে যখন সে এই সব গল্প করত, হাসতে হাসতে সিট থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা হলাে আমাদের। | অঞ্জনকে প্রধান উদ্যোক্তা, ধরা যাক, তার নাম মি. ক, বললেন, অঞ্জন, তােমার ওপরে দায়িত্ব ঐশ্বরিয়াকে রিসিভ করা। তাঁর টেক কেয়ার করা।
অঞ্জন দুটো লিমােজিন ভাড়া করে এয়ারপাের্টে গেল। ঐশ্বরিয়া রাই আর তাঁর মা এসেছেন। ঐশ্বরিয়া হাত বাড়িয়ে দিলেন, মাই নেম ইজ ঐশ্বরিয়া। অঞ্জন তাে মুগ্ধ। ঐশ্বরিয়ার মা-ও তাকে অঞ্জন বেটা অঞ্জন বেটা বলে ডাকতে লাগলেন। | লিমােজিনে করে তাঁদের হােটেলে আনা হলাে। কিন্তু ভাড়া দেবে কে? মিস্টার ক বললেন, অঞ্জন, তুমি তােমার ক্রেডিট কার্ড থেকে দিয়ে দাও। আমরা পরে তােমাকে শােধ করে দেব।
হােটেলের বুকিং ফি, সিকিউরিটি ডিপােজিট-সবই অঞ্জন দিচ্ছে তার ক্রেডিট কার্ড দিয়ে। তরুণ ছেলে একটা, প্রায় বেকার।
কিন্তু সমস্যা দেখা দিল । শাের টিকিট বিক্রি হয় না । খুব দামি হল ভাড়া নেওয়া হয়েছে । কিন্তু নিউইয়র্কের বাঙালি কেউই বিশ্বাস করছে না যে ঐশ্বরিয়া রাই এসেছেন। কারণ দই ভেবে চুন খেয়ে তারা অনেকবার মুখ পুড়িয়েছে।
রম্য কথা -পর্ব-(২)
ঐশ্বরিয়ার ভাই বলে দিলেন, দিদি কিম্ভ হল হাউসফুল না হলে মঞ্চে উঠবেন । তখন আমাদের দেশে যেভাবে ভােটপ্রার্থীরা বাসে করে ভােটকেন্দ্রে ভােটার নিয়ে যান, তেমনি করে জ্যাকসন হাইটস থেকে বাসে করে বাঙালি দর্শকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হলাে।
এদিকে অঞ্জনের মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম। এরই মধ্যে তার ক্রেডিট কার্ড থেকে ১৮ হাজার ডলার চলে গেছে। কিন্তু টিকিট তাে বিক্রি হয়নি। এই টাকা ফেরত পাওয়ার কোনাে আশা নেই।
সে তখন ফোন করল ব্যাংকে। বলল, সাত দিন আগে আমার ক্রেডিট কার্ড হারিয়ে গেছে। ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের সব লেনদেন বন্ধ করে দিল।
ঐশ্বরিয়া মঞ্চে উঠবেন। কঠিন সিকিউরিটি । অনেক টাকা দিয়ে দামি সিকিউরিটি ফোর্স ভাড়া করা হয়েছে। তাদের প্রধানের সঙ্গে অঞ্জনকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলাে, অঞ্জন যাকে যাকে অ্যালাউ করবে, কেবল সে সে মঞ্চে উঠতে পারবে ।
অনুষ্ঠান শুরু হলাে। এবার প্রধান উদ্যোক্তার মঞ্চে ওঠার পালা। সিকিউরিটি তাঁকে আটকে দিল। মি. ক বললেন, আমি অনুষ্ঠানের আয়ােজক। আমি উঠব না মঞ্চে?
অঞ্জনকে জিজ্ঞেস করা হলাে, এই লােক কি উঠবে মঞ্চে?
নাে। অঞ্জন জানিয়ে দিল। | তখন সিকিউরিটির লােকেরা মি. ক-কে পাঁজাকোলা করে ধরে হলের বাইরে। রেখে এল।
ঐশ্বরিয়া রাই আর তাঁর মা হােটেল থেকে বিদায় নেবেন । ওরা বলল, আপনাদের চেক আউট তাে হয়নি। সব টাকা বাকি। ক্রেডিট কার্ড রিফিউজড হয়েছে।
রম্য কথা -পর্ব-(২)
বিশ্বসুন্দরী রাগে কাঁপতে লাগলেন। মাকে বললেন, মা, তুমি দিয়ে দাও তাে। পরে স্পন্সর প্রতিষ্ঠানের মালিক ছুটে এসে বিল শােধ করলেন। তারপর তিনি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন। চারদিক থেকে হাজার হাজার ডলারের পাওনাদারেরা ছুটে আসছে।
আমি বাংলার গান গাই আমেরিকায় এবারের বাংলা উৎসবে সবচেয়ে জমেছিল হাবিবের কনসার্টগুলাে। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা হাবিব বলতে পাগল । নিউইয়র্কে হাবিব যখন ‘ভালােবাসব বাসব রে বন্ধু’ গানটা গাইতে আরম্ভ করল, পুরাে হলের দর্শকেরা মােবাইল ফোনে আলাে জ্বেলে দুই হাত মাথার ওপরে তুলে দোলাতে লাগল। সে এক অপূর্ব দৃশ্য।
তার পরেও আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে আছে লস অ্যাঞ্জেলেসের অনুষ্ঠানের একটা মুহূর্ত। মাহমুদুজ্জামান বাবু গান গাইছেন । তার নিজের লেখা গান, লালনের গান । শেষে ধরলেন ‘আমি বাংলার গান গাই। কোথেকে একজন এসে মাহমুদুজ্জামান বাবুর গায়ে জড়িয়ে দিলেন বাংলাদেশের একটা বড় পতাকা। পুরাে মিলনায়তন দাঁড়িয়ে পড়ল।
আর কী মায়াভরা এই গানটা: ‘আমি একবার দেখি বারবার দেখি দেখি বাংলার মুখ । বাবু গান করছেন, দর্শকদের চোখে পানি। এই প্রবাসীরা আমেরিকায় আছেন বটে, কিন্তু তাদের মন পড়ে আছে সাত সাগরের ওপারের নিভৃত এক দেশ বাংলায়। তাদের টানছে সেই ফেলে আসা শৈশব, স্কুল কলেজের বন্ধুদের মুখ, বাবা-মা-ভাইবােন-আত্নীয়স্বজনের স্মৃতি।
গান শেষ হলাে। মহিলাদের কান্না আর থামছে না। পপকর্ন দিয়ে গাঁথা একটা মালা নিয়ে মঞ্চে উঠেছে একটা শিশু। সেই মালা সে পরিয়ে দিল বাবুকে।
রম্য কথা -পর্ব-(২)
১১ অক্টোবর ২০০৭
সৌরভকাহিনী
আমাদের বন্ধু গীতিকার সৌরভ শমসেরের কাহিনী আপনাদের বলব কি বলব না, এটা নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরে দ্বিধান্বিত আছি। সৌরভের কাহিনীর অনেকটাই গৌরবের, তবে সবটা নয়। গৌরবেরটুকুন বলি। সৌরভ খুব সুন্দর মিল দিয়ে কথা বলতে পারে। আমি হয়তাে বললাম, আমার নাম আনিস?
সে বলবে, আমার নাম কি জানিস? আমি হয়তাে বললাম, হ্যালাে । সে বলল, হেলতে হেলতে জীবন চলে গেল।
এমনিতে তার সেন্স অব হিউমারও খুব ভালাে। দুখাই নামের একটা ছবি দেখে সে বলল, ছবির নামের বানান ভুল হয়েছে। দ-এর জায়গায় গ হবে।
ইয়াজউদ্দিনকে নিয়ে তার অমরবাণী, হায় হাসান, তুমি নাই, আছে ইয়াজুদ।
সৌরভ শমসেরের নাম গীতিকার হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পরে তার কতগুলাে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেল।
সৌরভ মদ্যপান করতে লাগল। আমি বলি, এই বেটা তুই মদ খাস কেন? সে বলল: যে খায় মদ না, সে এক বদনা। আমি বললাম: যে খায় মদ, সে এক বদ।
সে বলল, যে খায় মদ্য, সে লেখে পদ্য। পদ্য লেখার জন্যে মদ্যপান করা। অতীব জরুরি।
আমি বললাম, জরুরির সঙ্গে তাে কোনাে কিছুর ছন্দ মিলল না। আমি মেলাই। মদ খাওয়া জরুরি, এই কথা মনে হয় গরুরই।
সে আমার দিকে রােষের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।। তারপর বলল, আমি মদ খাই না। কথাটা সে মিথ্যা বলে নাই। সে মদ খায় না। মদই আসলে তাকে খায় ।
সে বলে, মদ কেন খাই? পয়লা নম্বরের মিল পাই।
মদ না খেলে নাকি তার মাথা খােলে না। তার উক্তি, ক্রিয়েটিভিটির গােড়ায় জল ঢালতে হয়।
রম্য কথা -পর্ব-(২)
তা যদি কেউ সৃষ্টিশীলতার গােড়ায় নিজের পয়সা দিয়ে কিনে জল ঢালে, আমার কী বলার আছে।
তবে কথা হচ্ছে, সে যে সব সময় নিজের পয়সায় মদ খায় তাও না। জিজ্ঞেস করলে জবাব দেয়, ভূতে জোগায়।
তাে সৌরভ মদ্যপান করে। কিন্তু মাতাল হয় না। এই কথা তার এক বন্ধু তাকে বলেছিল। সে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলল, কে বলেছে আমি মাতাল হই না। অবশ্যই হই ।
সে তার মাতলামাের প্রমাণ হিসেবে নিউ মার্কেটের সামনের রাস্তায় ভর সন্ধ্যাবেলা জলবিয়ােগ করতে লাগল। তার মুখে অভয়মন্ত্র: দ্যাখ শালা, আমি মাতাল হয়েছি কি না, কে এমন হিসু করে মাতাল বিনা।
মাতাল হিসেবে সৌরভ শমসেরের খ্যাতি অচিরেই ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। তখন তার মদের টাকা আর ভূতে জোগায় না। তাকেই জোগাড় করতে হয়।
সে চমৎকার সব কৌশল অবলম্বন করল। একদিন ঢাকা ইউনিভার্সিটির বিবিএর ফার্স্টবয়কে নিয়ে এল আমার সামনে। আমাকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে বলল, ওর বাবা মারা গেছে। লাশ নিয়ে যেতে হবে দেশের বাড়িতে। দুই হাজার টাকা লাগে। এক হাজার জোগাড় হয়েছে। আর এক হাজার কি তােমার কাছে হবে?
আমি বললাম, আমারও বাবা মারা গেছে। আপনি কি আমাকে ওই এক হাজার টাকা আপাতত দিতে পারেন? সৌরভ কেটে পড়ল। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই দু তিনজনকে পাওয়া গেল যারা জানালেন তারা সৌরভের সমাজসেবাব্রতে সাহায্য করেছেন। বিবিএর ফার্স্টবয়ের মৃত বাবার লাশ প্রেরণের জন্যে চাঁদা দিয়েছেন।
একদিন শুনি শেরাটন হােটেলের মােড়ে সৌরভকে পুলিশ একপায়ে খাড়া করে রেখেছে। কারণ কী। গভীর রাত। সৌরভ ওই পথ দিয়ে বেবিট্যাক্সিযােগে যাচ্ছে । পথের ধারে প্রহরারত পুলিশকে দেখে সে স্কুটার থামাতে বলল। পুলিশকে বলল, এই তােরা এখানে কী করিস? মাছি মারিস?
Read more
