আয়নায় নিজেকে দেখে ছেলেরা সাধারণত মুগ্ধ হয় না। অতি বুদ্ধিমান ছেলেকেও আয়নায় খানিকটা বােকা বােকা লাগে। কিন্তু মােবারক মুগ্ধ। তার মনে হচ্ছে সে নিজেকে দেখছে না, অন্য কাউকে দেখছে। তার কোনাে জমজ ভাইকে। যে ভাই কলেজে অধ্যাপনা করেন। এবং যে ভাই-এর কলাবাগান টাইপ জায়গায় একটা বাড়ি আছে। বাড়ির সামনে বাগান আছে। যে ভাই তার স্ত্রী দুই ছেলেমেয়েসহ বাগানে বসে বিকালে চা খায়। চায়ের সঙ্গে হালকা নাশতা থাকে। কোনােদিন নিমকি, কোনােদিন সমুচা।
চুল আচড়ানােই ছিল, তারপরেও মােবারক আচড়ানাে চুলের উপরই কয়েকবার চিরুনী চালালাে। চুলের স্টাইলটা অন্যরকম করবে কি-না ভাবল। শেষে মনে হল অন্যরকম করা ঠিক হবে না। হঠাৎ করে নতুন স্টাইলে চুল বসবে না। খাড়া খাড়া হয়ে থাকবে। যা আছে তাই ভাল। শুধু ভাল না— বেশ ভাল, যাকে বলে উত্তম।
নিজেকে উত্তম’ করার জন্যে মােবারককে বেশ কিছু জটিল প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে ভাের সাতটায় গােসল। শীতের শুরুতে সকালবেলা গােসল—কঠিন আজাবের একটি। সেই আজাবকে সহনীয় করার জন্যে মেসের বয় মনু মিয়াকে দুটা টাকা দিয়েছিল। কথা ছিল, দু’টাকার বিনিময়ে মনু মিয়া এক কেতলি টকটকে গরম পানি বালতিতে ছেড়ে দেবে। মনু মিয়া দাঁত বের করে বলেছে, চিন্তা নাই দুই কেতলি পানি ছাড়তাছি। বলক তুলা পানি। শইল্যে ফুসকা পইড়া যাইব।
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-১
মােবারক সেই পানি মাথায় ঢেলে শিউরে উঠল। হিমালয়ের বরফগােলা পানি। মনু এক ফোটা গরম পানিও দেয় নি। হারামজাদাটাকে এই পানিতে চুবিয়ে দিতে পারলে মন শান্ত হত। মােবারককে বরফগােলা পানি দিয়ে গােসল সারতে হল। এক প্যাকেট লেমন শ্যাম্পু কিনেছিল। প্যাকেটে চা চামুচের এক
চামুচের বেশি শ্যাম্পু হবে না। তার দামই নিল চার টাকা। শ্যাম্পু দুই নম্বরী কি-না কে জানে। মাথায় ফেনা হচ্ছে না, চোখ জ্বালাপােড়া করছে। এই শ্যাম্পু দেয়ার কারণে মাথায় আরাে আধাবালতি বরফ-পানি বেশি ঢালতে হল। ভদ্র সাজার এ-কী যন্ত্রণা! |
মােবারকের গায়ে ইস্ত্রী করা পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির ডান হাতায় পানের পিকের দাগ আছে। লাল দাগ ছিল । ধােপাখানায় পাঠানাের পর লাল দাগ হলুদ হয়েছে, এবং আরাে কড়া হয়েছে। হারামজাদা ধােপার পাছায় একটা লাথি মারতে পারলে ভাল হত। ভাগ্য ভাল দাগটা এমন জায়গায় যে চট করে চোখে পড়ে না। পায়জামা ছিল না বলে প্যান্টের উপর পাঞ্জাবি পরতে হয়েছে। সেই প্যান্টও সে গতকালই ইস্ত্রী করে আনিয়েছে। সবই ভাল, শুধু স্যান্ডেলজোড়া ইজ্জত মেরে দিয়েছে। স্যান্ডেলের দিকে তাকানাে যায় না। মােটরগাড়ির টায়ার দিয়ে হাফসােল করােনােটা বােকামি হয়েছে। দেখেই মনে হয় ফকিরের স্যান্ডেল। ভিক্ষার জন্যে প্রচুর হাঁটাহাঁটি করতে হবে এটা মাথায় রেখে বানানাে।
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-১
একটাই ভরসা— বড়লােকরা সাধারণত পায়ের দিকে তাকায় না। এটা অবশ্যি সাধারণ বড়লােকের কথা। অতি অতি বড়লােকরা কী করে মােবারক জানে না। আজ হয়ত জানবে । একজন অতি অতি বড়লােকের কাছে যাবার জন্যেই সকাল থেকে এই কষ্ট। শ্যাম্পুর চোখ জ্বলুনি এখনাে যায় নি।
বড়লােকদের কাছে ভাল সাজ পােশাকে যেতে হয়। সাধারণ প্রচলিত ধারণা— মলিন পােশাকে উপস্থিত হলে করুণা পাওয়া যায়। মােবারক নিশ্চিতভাবে জানে ধারণা ভুল । ময়লা পােশাকে লেবেনডিস সেজে গেলে বড়লােকরা নাক কুঁচকে তাকান। ভাবটা এরকম যেন পােশাক থেকে মুরগির গুয়ের গন্ধ আসছে। এই দুর্গন্ধের হাত থেকে বাচার জন্যে কথাবার্তা দ্রুত শেষ করে হাতটা এমনভাবে নাড়ান যেন মুরগি তাড়াচ্ছেন।
মুরগি হবার দরকার কী । একটু না হয় ঝামেলা করে ফিটফাট হওয়া গেল। তবে শ্যাম্পুটা না দিলেও হত! চোখ শুধু যে জ্বালা করছে তাই না, একটু লাল লালও হয়েছে। তার মত মানুষের লাল চোখ মানায় না। লাল চোখ মানায় শুধু মেথরদের আর অতি অতি বড়লােকদের। তাদের জন্মই হয়েছে চোখ লাল করে রাখার জন্যে।
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-১
আজ সকাল সাড়ে ন’টায় মােবারকের এ্যাপয়েন্টমেন্ট। দেখা হবে মুখােমুখি। এই মুখােমুখি দেখা হবার জন্যে ঝামেলা কম করতে হয় নি। টেলিফোন করতে হয়েছে পাচবার। যে ফার্মেসী থেকে সে টেলিফোন করে, তারা একটা কলের জন্যে পাঁচ টাকা করে নেয়। যাকে বলে দুপুরে ডাকাতি ।
পাচটা কলে পঁচিশ টাকা চলে গেল। পঁচিশ টাকা কোনাে খেলা কথা না। পঁচিশ টাকায় তিনবেলা খাওয়া হয়ে যায়। টেলিফোন করাও কোনাে সহজ ব্যাপার না। সব সময় সাবধান থাকা। বেফাস কিছু যদি মােবারক বলে ফেলে তাহলে সব কেঁচে যাবে। বাণিজ্যের যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এক ঝাকিতে সব শেষ । প্রথম টেলিফোনটা একটা বাচ্চা মেয়ে ধরল। মিষ্টি গলা। অতি ভদ্র ব্যবহার। আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন।
মােবারক থতমত খেয়ে বলল, আমার নাম মােবারক। মােবারক হােসেন।
আপনি কার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছেন?
মােবারক পড়ে গেল বিপদে। আসলেইতাে সে কার সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছে। শুরুতেই দেখি সব কেচে যাচ্ছে। মােবারক হড়বড় করে বলল, পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দেখে টেলিফোন করছি।
ও আচ্ছা। আপনাকে ম্যানেজার চাচুর সঙ্গে কথা বলতে হবে। ম্যানেজার সাহেব কি আছেন? জ্বি আছেন। ডেকে দেব? আলা দাও। তবে তােমার সঙ্গে একটু কথা বলে নেই। তােমার নাম কী ? আমার নাম আয়না। বাহু কী সুন্দর নাম আয়না। কোন ক্লাসে পড় ?
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-১
কেজি ওয়ান।
আমার নাম মােবারক ঈদ মােবারকের মােবারক। খুকি এখন তুমি ম্যানেজার সাহেবকে ডেকে দাও ।।
আপনি টেলিফোন ধরে থাকুন। আমি ডাকছি।
মােবারক ধরে থাকল। খুবই কায়দার টেলিফোন। নানান রকম বাজনা বাজছে। একটা শেষ হয়তাে আরেকটা শুরু হয়। ম্যানেজার চাচু এসে আর টেলিফোন ধরেন না। এক সময় ধরলেন এবং ম্যানেজার টাইপ লােকদের স্বভাব মত গভীর ভঙ্গিতে বললেন, কে ?শব্দটা মওলানা সাহেবদের কাফ উচ্চারণের মত। নাভি থেকে আসছে। মােবারক নরম স্বরে বলল, স্যার আমার নাম মােবারক হােসেন। পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দেখে টেলিফোন করছি। বিজ্ঞাপনটা গতকালের দুটা দৈনিক পত্রিকায়…
মােবারকের কথা শেষ করতে না দিয়েই ম্যানেজার বললেন, আপনি ইন্টারেস্টেড পার্টি ।
জ্বি স্যার। বয়স কত ? স্যার, পয়ত্রিশ। থার্টি ফাইভ ক্রস করেছে।
এটা মােবারকের আসল বয়স না। সে পাঁচ বছরের মত কমিয়েছে। কেন কমিয়েছে নিজেও জানে না।
এখন আমি ব্যস্ত আছি, কথা বলতে পারছি না। আমি কি স্যার কিছুক্ষণ পরে করব ?
এক ঘণ্টা পরে করুন। তবে এই নাম্বারে না— আমি নাম্বার দিচ্ছি। কাগজ কলম আছে ?
আপনি বলুন। আমার স্মৃতিশক্তি ভাল। মনে থাকবে।
ম্যানেজার সাহেব নাম্বার বলেই খট করে টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন। ভাবটা যেন তিনি মহাব্যস্ত। নিঃশ্বাস ফেলার সময়ও নাই।
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-১
এরপর থেকে শুরু হল ঝামেলা মােবারক যতবারই টেলিফোন করে বুড়াে মানুষের মত গলায় কে একজন বলে, ম্যানেজার সাহেব মিটিং-এ আছেন। পরে করেন। মােবারকের মেজাজ পুরাে খারাপ হয়ে গেল। আরে তুই ব্যাটা ম্যানেজার, তাের এত কী মিটিং। তুই কি মন্ত্রী না-কি যে ঘুম থেকে উঠে চা খেয়ে মিটিং শুরু করবি । রাত বারটার সময় মিটিং শেষ করে ঘুমুতে যাবি। ঘুমের মধ্যেও স্বপ্ন দেখবি মিটিং করছিস। তুই হচ্ছিস চার পয়সা দামের ম্যানেজার ।
যাই হােক ম্যানেজার সাহেব এক সময় টেলিফোন ধরলেন। ধমকের স্বরে বললেন, কে ? আবারাে সেই কাফ’ মার্কা কে ?
মােবারক বিনয়ে গলে গিয়ে বলল, স্যার আমার নাম মােবারক। মােবারক হােসেন। সকালে আপনার সঙ্গে কথা বলেছি।।
সকাল থেকেতাে অনেকের সঙ্গেই কথা বলছি। আপনার ব্যাপারটা কী বলুন। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে টেলিফোন করছেন ?
জ্বি স্যার। আপনি কি ইন্টারেস্টেড পার্টি ? জ্বি স্যার ।
আপনার বয়স কত? পয়ত্রিশ।
আপনি এক কাজ করুন, বুধবার সকাল সাড়ে নটায় চলে আসুন। মুখােমুখি কথা হওয়া দরকার।
কোথায় আসব।
সঙ্গে কাগজ কলম আছে ? ঠিকানা বলছি, লিখে নিন। কাঁটায় কাঁটায় সকাল সাড়ে নটায় চলে আসবেন। ইন্টারেস্টেড পার্টিতাে আপনি একা না। আরাে অনেকেই আছে। স্যার সরাসরি কথা বলবেন।
ম্যানেজার সাহেবের এই কথায় মােবারক খুবই দমে গেল। ইন্টারেস্টেড পার্টি আরাে আছে মানে কী? তার ধারণা ছিল সে-ই একমাত্র ইন্টারেস্টেড পার্টি। যেহেতু সে একা, তার সুযােগ থাকবে জায়গা মত মােড় দিয়ে দাম বাড়াতে। এখন দেখা যাচ্ছে এখানেও ইন্টারেস্টেড পার্টি। দেশটা যাচ্ছে কোথায় ?
রূপার পালঙ্ক-পর্ব-১
কিডনীর মত একটা জিনিস বিক্রি করতে লােজন হামলে পড়বে এটা কী করে হয় ? তাের শরীরে আছেই দুটা কিডনী। একটা বিক্রি করে দিলি, বাকিটা যদি নষ্ট হয়ে যায়- তুই যাবি কোথায় ? তুইতাে আর পয়সা দিয়ে এই জিনিস কিনতে পারবি না।
মােবারক স্পষ্ট কল্পনায় দেখল বুধবার সকাল সাড়ে নটা। একটা হলঘরের মত ঘরে সে বসে আছে। তার সঙ্গে মেয়ে পুরুষ মিলিয়ে আরাে ত্রিশজনের মত আহে। সবার হাতে নম্বর ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। নম্বর অনুসারে ডাক পড়ছে। চাকরির ইন্টারভ’র মত ইন্টার হচ্ছে। কারাে ইন্টারভু ভাল হয়েছে। সে বের হয়ে এসেছে হাসি মুখে। সবাই তাকে ঘেঁকে ধরেছে। সবার প্রশ্নকী জিজ্ঞেস করল?
কী জিজ্ঞেস করল? আবার কারাে ইন্টারভ্য খুব খারাপ হয়েছে, বের হয়ে এসেছে কাঁদো কাঁদো মুখে। সে ওকননা গলায় বলল, ইজি ইজি কোচেন জিজ্ঞেস করেছে। উত্তরও জানা ছিল, বলতে পারি নি । উক্তটা মাথায় ছিল। মুখে আসে নি।
কী ধরনের প্রশ্ন হতে পারে? জেনারেল নলেজের দু’ একটা প্রশ্নতাে থাকবেই।
পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব কত? কোন তারিখে চাঁদে মানুষ প্রথম নামে? বর্তমান পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য কী কী ?
Read more