রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১৭)

ইয়াজউদ্দিন সাহেবের ঘুম ভাঙল টেলিফোনের শব্দেটেলিফোন ধরার আগে তিনি ঘড়ি দেখলেনভোর ৬টা ৪০ মিনিটএত ভােরে টেলিফোন! কোনাে কি সমস্যা হয়েছে? তিনি টেলিফোন ধরলেন। 

রূপালী দ্বীপস্যার, আমি সুলেমানভাল আছ সুলেমান ? জি স্যার। 

বলাে কী বলবেছােট সাহেবের বিষয়ে কথা বলব। 

বলাে, আমি শুনছিওনারা স্যার চিটাগাং পৌছেছেন। 

ভাল কথাঢাকা থেকে যখন রওনা হয়েছে তখন চিটাগাং তো পেঁৗছবেইছাড়া কোনাে খবর আছে?” 

একটু সমস্যা হচ্ছে স্যারতুমি ভেঙে ভেঙে না বলে একনাগাড়ে বলে যাওকী ব্যাপার

পুলিশ ঝামেলা করছেসকালবেলা একদল পুলিশ এসে উপস্থিত উনারা নাকি কার স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছেনভদ্রমহিলার স্বামী মামলা করেছেনউনার কানেকশন ভালউপরের লেভেল থেকে চাপ আসছে। 

আর কিছু? জি না স্যার, আর কিছু না। ওদের কি থানায় নিয়ে গেছে

থানায় নিয়ে যায়নি, তবে নিয়ে যাবে বলে মনে হয়শুভ্র কেমন আছে? জ্বি, ভাল আছেনএই ঘটনায় নার্ভাস হয়নি

উনি এইসব ব্যাপারে এখনাে কিছু জানেন নাওর চোখে কি চশমা দেখেছ ?” 

ভেরি গুড়তুমি আরাে কিছু বলবে, না টেলিফোন রেখে দেব ? আমাকে কিছু করতে বলছেন স্যার? না, কিছু করতে বলছি নাতুমি শুধু লক্ষ রাখােজি আচ্ছা স্যারটেলিফোন তা হলে রাখি

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৭

স্যার, আরেকটা খবর ছিল বুফে কারের ম্যানেজার, তার নাম রশীদউদ্দিন ভূঁইয়া সে রেলওয়ে পুলিশের কাছে এজাহার দিয়েছে ছােট সাহেবের বিরুদ্ধে। 

শােনাে সুলেমান, তুমি সব কথা একবারে বলছ না কেন? ভেঙে ভেঙে কেন বলছ? রশীদউদ্দিন ভূঁইয়া শুভ্রের বিরুদ্ধে এজাহার কেন দেবে? শুভ্র কী করেছে

উনি কিছু করেননিকিছু করেনি, শুধু শুধু এজাহার ! স্যার, ছােট সাহেব উনার গায়ে থুথু দিয়েছেনকী বললে? শুভ্র তার গায়ে থুথু দিয়েছে? শুভ্র?জ্বি স্যারসত্যি দিয়েছে? জ্বি স্যার, সত্যি? কেন থুথু দিল?চা চেয়েছিলেনচা দিতে দেরি করেছিলেন, এই জন্যে থুথুচা দিতে দেরি করেছে, শুধু এই কারণে গায়ে থুথু দিয়েছে

জ্বিতবে স্যার রশীদউদ্দিন অত্যন্ত বদ টাইপের লােকসে লিখিত অভিযােগ করেছে মারপিটের। 

আচ্ছা, ঠিক আছে” 

ইয়াজুদ্দিন সাহেব টেলিফোন রাখলেনরাহেলার ঘুম ভেঙে গেছেতিনি ভীত গলায় বললেন, কার টেলিফোন ? শুভ্রের

নাসুলেমান টেলিফোন করেছিলশুভ্রের খবরাখবর দিলশুভ্র ভাল আছে? হা, ভাল আছেওর চশমা? হ্যান্ডব্যাগের সাইড পকেটে যে চশমা, সেটা বলেছ?না, বলিনি। 

বলনি কেন

সুলেমান বলল, দেখেছে শুভ্রের চোখে চশমা আছে, কাজেই চশমার কথা মনে করিয়ে দেবার প্রয়ােজন মনে করিনিরাহেলা, তুমি আমাকে খুব কড়া করেএক কাপ কফি করে দাও তো!‘ 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৭

রাহেলা চিন্তিত গলায় বললেন, খালিপেটে হঠাৎ কফি চাচ্ছ কেন? কখনও তাে খাও না । 

ইয়াজউদ্দিন বিরক্ত স্বরে বললেন, কখনাে খাই না বলে কোনােদিনও খাওয়া যাবে না তা হতাে নাএখন খেতে ইচ্ছা করছেদুধচিনি কিছুই দেবে নাকফি। 

রাহেলা কফি বানাতে গেলেনইয়াজউদ্দিন টেলিফোন করলেন রফিককেরফিক তঁর ঢাকা অফিসের জেনারেল ম্যানেজারনির্ভর করার মতো একজন মানুষকোনাে জটিল সমস্যাই রফিকের কাছে সমস্যা না। 

হ্যালাে রফিকস্লামলিকুম স্যারদুঃখিত যে, এত সকালে তােমার ঘুম ভাঙলামকোনাে সমস্যা নেই তাে স্যার? কী ব্যাপার?” 

তােমাকে একটু চিটাগাং যেতে হবেস্যার, আমি ফাস্ট ফ্লাইটেই চলে যাব। 

শুভ্র বোধহয় কীএকটা সমস্যায় পড়েছেতুমি দূর থেকে সমস্যাটা লক্ষ করবেসমস্যাটা কি বলব ?‘ 

আপনার বলার দরকার নেই স্যার, আমি জেনে নেবরাখি রফিকজ্বি আচ্ছাআপনি কোনাে চিন্তা করবেন নাআমি দেখছি। 

থ্যাংক রাহেলা কফি নিয়ে এসে দেখেন ইয়াজউদ্দিন সাহেব ঘুমিয়ে পড়েছেনবেশ আরাম করে ঘুমুচ্ছেন। 

গল্পউপন্যাসের অ্যাডভেঞ্চার এবং বাস্তব জীবনের অ্যাডভেঞ্চার একরকমের হয় নাগল্পউপন্যাসের পুলিশরা সবসময়ই বােকা ধরনের থাকেঅল্প ধমক ধামকে তার| ভড়কে যায়হাস্যকর সব কাণ্ড করেবাস্তবের পুলিশরা মােটেই সেরকমের নয়ধমকধামকে তারা অভ্যস্তনিয়ে মােটেই মাথা ঘামায় না। 

পুলিশের আইজি আনুশকার ছােটমামা শুনেও তারা তেমন ঘাবড়াল নাবিশ্বাস করল না, আবার অবিশ্বাসও করল নারানা লক্ষ করল, এরা প্ল্যাটফর্মে আছেশুধু একজন নেইসে খুব সম্ভবত টেলিফোন করতে গেছেসে ফিরে এলে কী হবে কে জানে? সবাইকে থানায় যেতে হলে কেলেঙ্কারিরানা একবার বাথরুম করে এসেছেআবার বাথরুম পেয়ে গেছেশরীরের সব জলীয় পদার্থ বের হয়ে যাচ্ছে। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৭

এরকম একটা টেনশানের ব্যাপার, কিন্তু দলের মধ্যে কোনো উদ্বে নেই! অবশ্যি আনুশকা ছাড়া আর কেউ কিছু জানে নাকাউকে বলা হয়নিআনুশকার ভেতর খানিকটা ভয়ভীতি থাকা উচিতএবং আনুশকার উচিত সবাইকে জানানোসে তা করছে নাবেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্ল্যাটফর্মে মালপত্র নামাচ্ছে| যাকে নিয়ে এত কাণ্ড সেই জরী খুব হাসিখুশিসে রানাকে এসে বলল

আমাকে একটা টুথব্রাস এনে দিতে পারবে

রানা চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, টুথব্রাশ দিয়ে কী করবে? জরী বলল, খেলবখেলর মানে কি?‘ 

জরী বলল, টুথব্রাশ দিয়ে মানুষ কী করে তুমি জান রানাশুধু শুধু জিজ্ঞেস করলে কেন টুথব্রাশ দিয়ে কী করব? আমি কিছুই আনিনি, কাজেই আমার টুথব্রাশ লাগবে, পেস্ট লাগবে, আয়না লাগবে, চিরুনি লাগবে। 

রা রানার গা জ্বলে যাচ্ছেএত বড় বিপদ সামনে, অথচ মেয়েটা কিছুই বুঝতে পারছে নাবােঝার চেষ্টাও করছে নাচেষ্টা করলে রানার শুকনাে মুখ থেকে এতক্ষণে ঘটনা আঁচ করে ফেলতমেয়েরা যে আয়নায় নিজের মুখ ছাড়া অন্য কোনো মুখের দিকেই ভালমত তাকায় না এটাই বোধহয় ঠিক। হােয়াট সেলকিস ক্রিয়েচার ! হযরত আদম যে এত বড় শাস্তি পেলেন, এদের জন্যেই পেয়েছেন। 

জুরী বলল, কী হয়েছে? এমন পাথরের মতো মুখ করে দাড়িয়ে আছি কেন? টুথব্রাশ একটা কিনে নিয়ে এসােপঁত মেজে চা খাবচা আনতে কেউ কি গেছে

ফার কথা ভুলে যাওফরগেট এবাউট টীসামনে গজবগজব মানে?‘ 

আনুশকাকে জিজ্ঞেস কর সামনে গজবএর মানে কীসে তোমাকে সুন্দর করে বুঝিয়ে দেবেতখন আর দাত মাজতে ইচ্ছা হবে নাইচ্ছা করবে সাঁড়াশি দিয়ে দাঁত টেনে তুলে ফেলতে‘ 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৭

জরী আনুশকার কাছে গিয়ে বলল, কোনাে সমস্যা হয়েছে? আনুশকা বিরক্ত গলায় বলল, সমস্যা হবে কেন ? কে বলেছে সমস্যার কথা? রানা বলছেওকে একটা টুথব্রাশ আনতে বলেছিলাম, ও ভয়ংকর গলায় বলল সামনে নাকি গজব। 

আনুশকা বলল, তুই ওর কথায় কান দিবি নাটুথব্রাশের কথা ভুলে যাআঙুলের ডগায় পেস্ট নিয়ে দাত মেজে ফেলমােতালেব কোথায়, মােতালেব ? ওর না মাইক্রোবাস ঠিক করার কথা

রানা কাছেই দাঁড়িয়ে আছেআনুশকার কথায় রাগে আবার তার গা জ্বলে গেলমাইক্রোবাস ঠিক করার দায়িত্ব মােতালেবের না, তারসে ঠিক করেও রেখেছেএক ফাকে দেখে এসেছে, বাস স্টেশনে চলে এসেছে। পুলিশের নাকের উপর দিয়ে মাইক্রোবাসে চড়ে বসা বুদ্ধিমানের কাজ হবে কি না তা বুঝতে পারছে না বলেই সে চুপচাপ আছেনয়তো এতক্ষণে জিনিসপত্র বাসে তুলে ফেলতরানার বাথরুমে যাওয়াটা খুবই জরুরি হয়ে পড়েছেএদেরকে পুলিশের হাতে ফেলে যেতেও ইচ্ছা করছে নাকী থেকে কী হয়ে যাবে কে জানে? বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশ ছুঁয়ে দিলে আঠারাে দুগুণে ছত্রিশ ঘাপ্লাস দু ঘা এক্সট্রাসব মিলিয়ে আটত্রিশ ঘা। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৭

প্ল্যাটফর্মের এক জায়গায় গােল হয়ে দাড়িয়ে থাকা পুলিশের দলটি থেকে একজন এদিকেই আসছেরানার পানির তৃষ্ণা পেয়ে গেছেবুক খাখা করছে। 

পুলিশ অফিসার আনুশকার কাছে এসে দাঁড়ালেনআনুশকা তার চামড়ার ব্যাগের ফিতা লাগাচ্ছিলসে পুলিশ অফিসারের দিকে না তাকিয়েই বলল, কিছু বলবেন

আপনারা যাচ্ছেন কোথায় ? রাঙ্গামাটিওখানে কি হল করবেন ? জায়গা পছন্দ হলে করবপছন্দ না হলে করব না। 

থাকবেন কোথায় ? হােটেল নিশ্চয়ই আছেআছে না?” পর্যটনের মােটেল আছে” 

তা হলে পর্যটনের মােটেলেই থাকবরুম কি বুক করা আছে ? এত কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?” 

এত কথা জিজ্ঞেস করেছি, কারণ আপনাদের দলেরই একজন খানিকক্ষণ আগে বললেন আপনারা সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ডে যাচ্ছেনযিনি বলেছেন তার নাম মােতালেব| জরী হাই তুলতে তুলতে বলল, কিছু জানে নাশুরুতে আমাদের সেন্ট মার্টিন যাবার প্ল্যান ছিল, পরে বদলানাে হয়েছেমােতালেব শেষ খবর পায়নিআমরা যখন ফাইন্যাল ডিসিশন নিই তখন সে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছিল। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৭

পুলিশ অফিসার আগের মতােসহজ গলায় বললেন, আপনাদের নেবার জন্য স্টেশনে একটা মাইক্রোবাস পঁড়িয়ে আছেবাসটা রাঙ্গামাটি যাবে নাবাস যাবে টেকনাফ। 

এত খবর নিয়ে ফেলেছেন ? পুলিশে চাকরি করিআমাদের কাজই হল খবর নেয়া ! আর কী খবর নিলেন

আরেকটা খবর হচ্ছে নইমা বলে আপনার যে বান্ধবীকে পাওয়া যাচ্ছে না বলছিলেন তিনি চা খাচ্ছেনস্টেশনের বাইরে টীস্টল আছেসেখানে চা খাচ্ছেন। 

তাকে কি বলেছেন যে, আমরা তার খোঁজ করছি ? জ্বি, বলা হয়েছে। 

থ্যাংক য়ু। থ্যাংক ভেরি মাচআমরা আরেকটা খবর নিয়েছিঢাকায় ওয়্যারলেস করে জেনেছি, আইজি নুরুদ্দিন সাহেবের আনুশকা নামে কোনো ভাগ্নি নেই

(চলবে)

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১৮)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *