রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-২৪)

শুভ্র বলল, আমি চা খাই নামনিরুজ্জান হাত ধরে টেনে তাকে বসিয়ে ফেললহাসিমুখে বলল, আমাদের মধ্যে একটা ভুল বােঝাবুঝি থাকবে এটা কেমন কথা? আমরা আলাপ আলােচনার মাধ্যমে ..

রূপালী দ্বীপএখানে আলাপআলােচনার কিছু নেই। 

আচ্ছা, না থাকলে নাইচা তাে খাওয়া যাবেআমার সঙ্গে চা খেতে তো অসুবিধা নেই?” 

অসুবিধা আছে। 

ওসি সাহেব হাই তুলতে তুলতে বললেন, শুভ্র সাহেব, ঢাকা থেকে আপনার কাছে এক ভদ্রলােক এসেছেনরফিক নামউনি থানার বাইরে অপেক্ষা করছেনআপনি কি ওনার সঙ্গে কথা বলবেন

শুভ্র বলল, ওনাকে অপেক্ষা করতে বলুনমনিরুজ্জামানের মুখ ছাইবর্ণ হয়ে গেলসে পরপর দুবার ঢােক গিললশুভ্র দেখল তার বাবার কথাই ঠিক হয়েছেভয় কাজ করছে। 

থানার সামনে পর্যটনের এসি বসানাে মাইক্রোবাস অপেক্ষা করছেমাইক্রোবাসের পেছনে একটি পাজেরাে গাড়িপাজেরােতে সুলেমান অপেক্ষা করছেসে টেকনাফ পর্যন্ত যাবেসুলেমানের সঙ্গে আরাে দুজনএই দুজনের চোখ ছােট ছোট, হাক ভাব কেমন কেমনএরা কখনাে চোখে চোখে তাকায় নাকথা বলে মাটির দিকে তাকিয়েদুজনের গায়েই চামড়ার জ্যাকেটথানার বারান্দায় রফিক সাহেবও হাঁটাহাঁটি করছেন। 

শুভ্র বের হতেই রফিক সাহেব এগিয়ে গেলেনশুভ্র বলল, আপনি এখানে

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪

রফিক সহজভাবে বললেন, চিটাগাংএকটা কাজ ছিল এসেছিলামআজই ঢাকা ফিরে যাবভাবলাম, আপনার সঙ্গে দেখা করে যাইস্যারকে কিছু বলতে হবে

না, কিছু বলতে হবে না। 

আপনারা কি আজ রাতটা চিটাগাং থাকবেন? না কি রাতেই কক্সবাজার চলে যাবেন

বুঝতে পারছি নাআমার বন্ধু রানা এইসব দেখছেসে যা ঠিক করে, তাই। 

সুলেমান একটা ব্যবস্থা করে রেখেছেআমার মনে হয় সেইটাই ভাল ব্যবস্থা হবেছােটখাট সমস্যা যেহেতু হচ্ছে ..

কী ব্যবস্থা ?” 

পর্যটনের মাইক্রোবাস যাবেআপনারা সবাই বেশ আরাম করে যেতে পারবেনপেছনে পেছনে সুলেমান যাবে পাজেরাে জীপ নিয়েদুজন বডিগার্ডও আছেনছাড়াও এসপি সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছেতিনি পুলিশ এসকর্টের ব্যবস্থা করেছেনপুলিশের একটা জীপ আগে আগে যাবেটেকনাফ পর্যন্ত যাবেআমি বলছি কি আপনারা সবাই খাওয়াদাওয়া করে মাইক্রোবাসে উঠে বসুন এবং এক টানে চলে যান টেকনাফএটাই সবচেভাল বুদ্ধি। 

ভাল বুদ্ধি মন্দ বুদ্ধি নাআমাদের টীম লীডার হল রানাযা বলে তাই করা হবেআপনি গাড়িটাড়ি নিয়ে চলে যান। 

জ্বি আচ্ছা। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪

আর সুলেমানকে বলুন সে যেন আর আমার পেছনে পেছনে না আসে| জ্বি আচ্ছা, বলে দিচ্ছিআপনাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাটা শুধু করি সারা দিন খাননি, আমারই খারাপ লাগছে। 

কিছু করতে হবে না। 

আমি ব্যবস্থা করে রেখেছিলামনাপ্লীজ নাখাবারগুলি প্যাকেট করে পৌছে দিই?আপনাকে কিছু করতে হবে নাআমি কি তা হলে চলে যাব ? ‘হঁ্যা, চলে যাবেনদলবল নিয়ে যাবেনLeave us alone. জ্বি আচ্ছাআপনার খুব কষ্ট হল

কষ্ট কিছু হয়নিআমি অনেক কিছু শিখেছিরফিক সাহেব, আপনার সঙ্গে কি সিগারেট আছে ? একটা সিগারেট দিন তো। 

রফিক বিস্মিত হয়ে তাকালেনতার কাছে সিগারেট ছিল নাতিনি সিগারেট আনতে নিজেই চলে গেলেনশুভ্র দাড়িয়ে আছে। 

হাজতের দরজা খোলা হয়েছেওসি সাহেব দাড়িয়ে আছেনতিনি আনুশকার দিকে 

তাকিয়ে বললেন, আপনারা বের হয়ে আসুন। 

আমাদের কি ছেড়ে দিচ্ছেন

জরীর কী হবে? কি বদমাশটার সঙ্গে যাবে, না আমাদের সঙ্গে যাবে

সেটা উনি ঠিক করবেনউনি যদি আপনাদের সঙ্গে যেতে চান, তা হলে যাবেনআবার যদি মনিরুজ্জামান সাহেবের সঙ্গে যেতে চান, তাও যেতে পারেন। 

থ্যাংক য়ু ওসি সাহেবআপনি কি আরেকটা ছােট্ট কাজ করবেন?কাজটা কী বলুন, দেখি পারি কি নাআমি এই পাগলীটাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইওকে নিয়ে কী করবেন? আমি ওর চিকিৎসা করাবসুস্থ করে তুলব। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪

মিস আনুশকা, এইসব শখ ক্ষণস্থায়ী হয়কিছুদিন পর দেখবেন অসহ্য বােধ হচ্ছেনা পারছেন গিলতে, না পারছেন উগরে ফেলে দিতেবরং সে এখানে থাকুকআমি কোনো একটা মহিলা সংগঠনে পাঠিয়ে দেবযােগাযােগও করছি। 

আমার সঙ্গে দিয়ে দিতে আইনগত কোনাে বাধা আছে

না, আইনগত কোনাে বাধা নেইতা হলে আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে। 

ওসি সাহেব হেসে ফেললেনআনুশকা বলল, মেয়েটার নাম কী ? ওর নামটাম নেই বা থাকলেও এখন কেউ জানে না। 

না থাকলেই ভালআমি ওর নতুন একটা নাম দেব” 

নইমা ঘুমুচ্ছেমুনা অনেক চেষ্টা করেও তার ঘুম ভাঙাতে পারছে নাআনুশকা বলল, মুন, ভাল করে দেখ, মরেটরে যায়নি তাে

মুনা হেসে উঠল খিলখিল করেমুনার সঙ্গে পাগলীটাও হাসতে শুরু করলতার হাসি আর থামে নাহাসির শব্দে ঘুম ভাঙল নইমারসে হতচকিত গলায় বলল, কী হয়েছে? কী হয়েছে? মুনা হাসতে হাসতে বলল, আপা, আমাদের ছুটি হয়ে গেছেআমরা এখন যাচ্ছি। 

কোথায় যাচ্ছি ? দারুচিনি দ্বীপ। 

আমি কোথাও যাব নাআমি ঢাকা চলে যাবআনুশকা, আমাকে ঢাকা পাঠাবার ব্যবস্থা করঅসম্ভব, আমি তােদের সঙ্গে যাব নামরে গেলেও নামৱে গেলেও নামরে গেলেও না আচ্ছা আচ্ছা, তােকে ঢাকা পাঠাবএরকম করিস না তো! গায়ে কি এখনাে জ্বর আছে

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪

মুনা বললাে, হ্যা আপা, জ্বর আছেবেশ জ্বর। 

জরী বলল, আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি নাআমরা রেলস্টেশনে বসে আছি কেন

রানা রাগী গলায় বলল, রেলস্টেশনে বসে আছি, কারণ এক জায়গায় বসে আলাপআলােচনা করে ডিসিশান নিতে হবে। 

কী ডিসিশান

ডিসিশান হচ্ছে আমরা কি আজ রাতেই কক্সবাজার রওনা হব, না আজ রাতটা চিটাগাংথেকে পরদিন ভােরে রওনা হব। 

ডিসিশান নিচ্ছ না কেন

হুট করে তাে আর ডিসিশান নেয়া যায় নাচিন্তা-ভাবনার ব্যাপার আছেআনুশকা, তােমার কী মত

আনুশকা হাই তুলতে তুলতে বলল, তুমি হচ্ছ দলপতিতুমি ডিসিশান নেবেতুমি যা বলবে তাই হবেতুমি যদি বল, রাত তিনটায় রওনা হবে ফাইন উইথ মি। 

বল্ট বলল, আমাদের খাওয়াদাওয়ার কী হবে রে রানা? খিদেয় মরে যাচ্ছি। 

খিদেয় মরে যাবি কী জন্যে? একটু আগে সবাইকে দেড় ফুট সাইজের একটা কলা খাওয়ালাম না

এই কলাই কি আমাদের ডিনার?” আচ্ছা একটা কথা, আমরা কি খাওয়া দাওয়া করার জন্যে বের হয়েছি, না আমাদের অন্য উদেশ্যও আছে ?

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪

নীরা বলল, ক্ষুধার্ত অবস্থায় কিছুই ভাল লাগে না রানাসুকান্তের মতো কবির কাছেও ক্ষুধার্ত অবস্থায় পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটির মতো মনে হয়েছে| হবে, খাবার ব্যবস্থাও হবেআগে বাসার খোখবর করে দেখিমোতালেব, তুই আয় আমার সঙ্গে। 

আমি যাব কী জন্যে ? আমি তো আর দলপতি না, কিংবা দলপতির অ্যাসিসটেন্টও না। 

রানা রাগ করেও বের হয়ে গেল। 

সন্ধ্যা হয়ে গেছেএখন কক্সবাজারে রওনা হওয়া ঠিক হবে নাপথে কোনাে বিপদআপদ হয় কি না কে বলবে ? জঙ্গলের ভেতর গাড়ির চাকা পাংচার হয়ে গেলোচাকা ঠিক করা হচ্ছে, এর মধ্যে বেরিয়ে এল একদল ডাকাতসঙ্গে এতগুলি মেয়ে ... রিস্ক নেয়া যাবে নারতিটা এখানেই থাকতে হবেস্টেশনের প্লাটফর্মে কাটাতে হবে! হােটেল নেয়ার প্রশ্নই আসে নাএত টাকা হােটেলওয়ালাকে সে কেন খামাখা দোবে? তা ছাড়া অনেক টাকা বাজেটের 

অতিরিক্ত খরচ হয়েছেআগে যে বাসা ঠিক করা হয়েছিল তাকে টাকা দিতে হয়েছেআর একটা রাত স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কাটানো এমন কিছু না রানা ভোরে রওনা হবার জন্যে বারো সীটারের একটা লক্কর মুড়ির টিন মার্কা মাইক্রোবাস ঠিক করলসেসবচেকম ভাড়ায় যেতে রাজি হয়েছে। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪

রাতের খাবার কিনে ফিরলপরােটাগােশতআনুশকা পরােটা হাতে নিয়ে বলল, গােল গোল এই জিনিসগুলি কি ? রানা থমথমে গলায় বলল, কেন, পরােটা কখনো খাওনি ? খেয়েছিলোহাতৈরি পরােটা খাইনিএইগুলি কীভাবে খায়

খেতে না চাইলে খাবে নাআমাকে বাজেটের দিকে লক্ষ রাখতে হবেপােলাওকোর্মা খাওয়ানাে সম্ভব নাখিদে লাগলে খাবে, না লাগলে নাহ। 

গােশতগুলিও তাে মনে হচ্ছে প্লাস্টিকেররানা বলল, সবাই হাতে হাতে নিয়ে নাও পারহেড দুটা করে পরোটা। 

নইমা কিছুই খেল নাসে ঢাকা চলে যাবেকিছুতেই থাকবে নাতাকে টিকেট কেটে রাতের ট্রেনে তুলে দিলেই হবেতাকে অনেক বােঝানাের চেষ্টা করা হচ্ছে, সে বুঝ মানছে না। 

নীরা বলল, এত কাছে এসে ফিরে যাবি ? হ্যা, ফিরে যাবএখন তাে আর কোনাে সমস্যা নেইসমস্যা নেই, সমস্যা হবেআমার শিক্ষা হয়ে গেছে। 

(চলবে)

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(শেষ-পর্ব)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *