নীরা বলল, দেখ নইমা, দারুচিনি দ্বীপ হচ্ছে আমাদের জন্যে একধরনের তীর্থ । তীর্থে যাবার জন্যে সবাই মন ঠিক করে অনেকে রওনাও হয়, কিন্তু তার পরেও সবার তীর্থ–দর্শন হয় না। তুই এত বড় সুযােগ হেলায় হারাবি?
‘হ্যা, হারাব। আমি এত পুণ্যবান নই যে তীর্থ দর্শন করব। তােরা যা। ‘তুই সত্যি যাবি না?”
ঠিক হল, নইম ঢাকায় ফিরে যাবে। তার গায়ে জ্বর এবং বেশ ভাল জ্বর। তাকে একা একা ছেড়ে দেয়া যায় না। ছেলেদের একজন কাউকে সঙ্গে যেতে হবে। কে যাবে সঙ্গে ? রানা বলল, লটারি হবে। লটারিতে যার নাম উঠবে, সে যাবে। এটা ফাইন্যাল ডিসিশন। এ ছাড়া উপায় নেই। কাগজের টুকরায় সব ছেলেদের নাম। লেখা থাকবে। নইমা চোখ বন্ধ করে একটা নাম তুলবে। যার নাম উঠবে তাকে যেতেই হবে —।
লটারি হল। নাম উঠল রানার। তার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
সঞ্জু বলল, দলপতি চলে গেলে আমাদের হবে কী করে? দলপতিকে তো যেতেই হবে। রানা থাকুক, আমি যাব। | রানা ক্ষীণ গলায় বলল, তুই যাবি ?
সঞ্জু বলল, যে সব ব্যবস্থা করল, তা ছাড়া আমার চাকরির একটা ইন্টারভ্যুও আছে। তার প্রিপারেশন দরকার।
রানা বলল, তােরা কি মিষ্টিপান খাবি ? পান নিয়ে আসি। রানা পান আনার কথা বলে সরে পড়েছে – কারণ তার চোখে পানি এসে গেছে। সঞ্জুটা এত ভাল কেন?
মানুষকে এত ভাল হতে নেই। মানুষকে কিছুটা খারাপ হতে হয়। সঞ্জুর ইন্টারভু – এইসব বাজে কথা। সে এই কাজটা করল তার দিকে তাকিয়ে।
রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব
ঢাকাগামী তুর্ণা নিশীথা ছেড়ে দিচ্ছে। দরজা ধরে সঞ্জু দাড়িয়ে আছে। সঞ্জুর মুখ হাসি হাসি। সে হাত নাড়ছে। রানার খুব ইচ্ছা করছে টেনে সঞ্জুকে নামিয়ে সে লাফ দিয়ে উঠে পড়ে। কিন্তু সে জানে এই কাজটা সে পারবে না। সবার লােভ হয়, করতে পারে না। এই পৃথিবীতে খুব অল্পসংখকে মানুষই আছে যারা জীবনের মােহের কাছে পরাজিত হয় না। সে সেই অল্প ক‘জনের একজন নয়। তার জন্ম হয়েছে – লােভের কাছে, মােহের কাছে বারবার পরাজিত হবার জন্যে।
ইঞ্জিন বসানাে ছিপছিপে ধরনের নৌকা। মাথার উপর একচিলতে ছাদ। ছাদের নিচে ইঞ্জিন। দেখলে বিশ্বাস হয় না এরা সমুদ্রে মাছ ধরতে যায়। কিন্তু শাঝি যখন বলছে তখন বিশ্বাস করতে হবে। | নৌকায় বাংলাদেশি ফ্ল্যাগ উড়ছে। সেন্ট মার্টিন যেতে হলে বার্মার আকিয়াব শহরের পাশ দিয়ে যেতে হয়। জলযানগুলিতে সে কারণেই পতাকা ওড়াতে হয়। যাতে দূর থেকে বােঝা যায় – কোন নৌকা বাংলাদেশের, কোণ্ডলি বার্মার।।
নৌকার মাঝি চিটাগংয়ের প্রায় দুর্বোধ্য ভাষায় বােঝাল – ইয়া নাফ নদী, ইয়ানর অর্ধেক আঁরার, অর্ধেক বার্মার।।
মােতালেব বলল, অত্যন্ত আপত্তিজনক কথা – নদীর আবার অর্ধেক অর্ধেক ভাগাভাগি কী? নদী হচ্ছে প্রেমিকার মতো। প্রেমিকার আবার ভাগাভাগি ! এটা কি মগের মুল্লুক?
শাঝি দাঁত বের করে বলল, ইয়ান মগের মুল্লুক । বার্মাইয়ারা বেগুন মগ। আনুশকা বলল, ঢেউ কেমন? ‘আছে, ছােড ছােড গইর। ‘কী বলছেন, বাংলা ভাষায় বলুন – ছােড ছোড গইর মানে কী? মাঝি আনন্দিত গলায় বলল, অল্প বিস্তর ঢেউ।
রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব
ঢেউ যা উঠছে তাকে অল্প বিস্তর বলাটা ঠিক হচ্ছে না। নীরা মুখ কালো করে ঢেউ দেখছে।
মুনা বলল, কী নীল পানি দেখছেন আপা? নদীর পানি এত নীল হয় ? আশ্চর্য !
নীরা জবাব দিল না। নাফ নদীর নীল পানি তাকে অভিভূত করতে পারছে না। হঠাৎ তার মনে পড়েছে, সে সঁতার জানে না। সে রানার দিকে তাকাল।
রানা খুব ব্যস্ত হয়ে নৌকায় জিনিসপত্র তুলছে। মালামালের সঙ্গে প্রচুর ডাবও যাচ্ছে। রানা কোত্থেকে যেন সস্তা দরে আঠারোটা ডাব কিনেছে। সাগরে মিষ্টি পানির সাপ্লাই।
মােতালেব রানাকে সাহায্য করছে। বন্টু দাড়িয়ে আছে এক পাশে। বুদ্বুর মন খুব খারাপ। ট্রেনে ওঠার পর থেকে মুনা তার সঙ্গে একটা কথাও বলেনি। এর মানে সে বুঝতে পারছে না।
মুনার পুরাে ব্যাপারটাই সবসময় তার কাছে এক ধরনের রহস্য। মেয়েটা তাকে পছন্দ করে, না করে না? তাকে সে একটা সুয়েটার কিনে দিয়েছে। ধরে নেয়া যেতে পারে, পছন্দ করে বলেই দিয়েছে। কিন্তু কথাবার্তায় কিংবা আচার–আচরণে
তার কোনাে প্রমাণ নেই।
বন্দুর একবার ধারণা হয়েছিল, তার বড় ভাই উপস্থিত বলেই মুনা তার সঙ্গে কথা বলছে না। মেয়েরা আড়াল পছন্দ করে। কিন্তু সঞ্জু তাে কাল রাতেই চলে গেছে। এর পরেও মুনা কথা বলবে না কেন? বন্দু নিজ থেকে উদ্যোগ নিয়ে আজ ভােরবেলা কথা বলার চেষ্টা করেছে। মুনাকে গিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে বলেছে – মুনা, চা খেতে যাবি? একটা দোকানে দেখলাম গুড়ের চা বানাচ্ছে।
রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব
মুন৷ বলল, গুড়ের চা খাবার জন্যে আমি খুব ব্যস্ত হয়ে আছি আপনাকে কে বলল? চিনির চ–ই খাই না, তো গুড়ের চা।।
‘চা না খেলে না খাবি – চল, হেঁটে আসি। “আপনার সঙ্গে হাঁটতে যাব?‘ ‘হ্যা। অসুবিধা আছে ?
‘অবশ্যই অসুবিধা আছে। বাটকু লােকের সঙ্গে আমি হাটি না। লােকজন দেখে ফিক ফিক করে হাসে। তারা মনে মনে বলে — লম্বা মেয়েটা এই বাটকুটার সঙ্গে
হাঁটছে কেন?
বন্টুর মন এই কথায় অত্যন্ত খারাপ হল। এই জাতীয় কথা কি কেউ বলতে পারে? বলতে পারা কি উচিত? মুনার দেয়া স্যুয়েটার সে এখন পরে আছে। ইচ্ছা করছে সুয়েটারটা খুলে টেকনাফের নদীতে ফেলে দিতে। দরকার নেই শালার স্যুয়েটারের!
রানা বিরক্ত গলায় বলল, তােরা সব হাবার মতাে তীরে দাড়িয়ে আছিস কেন? আমাদের কি রওনা দেয়া লাগবে না? জোয়ার–ভাটার ব্যাপার আছে। যাকে বলে। সমুদ্রযাত্রা। এক্ষুনি রওনা দিতে হবে। নাে ডিলে।
নীরা নিচু গলায় বলল, আমি যাচ্ছি না। রানা হতভম্ব হয়ে বলল, আমি যাচ্ছি না মানে ? ‘আমি সাতার জানি না। ‘আমরা তাে সাঁতরে যাচ্ছি না। নৌকায় করে যাচ্ছি।‘ ‘আমার ভয় লাগছে। আমি যাব না।
রানা অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলার চেষ্টা করল – ঢেউ যা একটু নদীতেই দেখা যাচ্ছে – নৌকা সমুদ্রে পড়লেই সব শান্ত। তাই না মাঝি ?
রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব
মাঝি হাসিমুখে বলল, উল্টা কথা ন–কইও। সাগরে ডাঙ্গর ডাঙ্গর গইর ঢেউ। তুই ন–জান? | নীরা বলল, অসম্ভব, আমি যাব না। আমাকে বটি দিয়ে কুচিকুচি করে কেটে ফেললেও যাব না।
আনুশকা বলল, শােন নীরা, তীর্থস্থানে সবার যাবার সৌভাগ্য হয় না। অনেকেই খুব কাছ থেকে ফিরে যায় ,
নীরা আনুশকাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, স্যরি, এক সময় আমি এরকম কথা বলেছিলাম। আমি সবার কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাচ্ছি। আমি যাব না। প্লীজ,
নীরার গলায় এমন কিছু ছিল যে সবাই বুঝল, নীরা যাবে না। কেউ কিছু বলল না। দীর্ঘ সময় সবাই চুপচাপ। রানার চোখে পলক পর্যন্ত পড়ছে না।
জরী বলল, নীরা, সত্যি যাবে না?
‘না জরী। আমি যাব না। নৌকায় উঠলেই আমি ভয়ে মরে যাব। আমি পানি অসম্ভব ভয় পাই। তােদের সঙ্গে ঠিক করেছি কিন্তু আসল কথাটাই কখনো মনে আসেনি।
মুন বলল, তাহলে কী হবে?
‘আমাকে নিয়ে কাড়কে চিন্তা করতে হবে না। আমি একটা বাস ধরে কক্সবাজার চলে যাব। সেখান থেকে ঢাকা।
আনুশকা বলল, এটা একটা কথা হল? ‘আমি যা করছি খুব অন্যায় করছি। আমি সেটা জানি। ‘ভয়কে জয় করতে হয় নীরা।
‘সব ভয় জয় করা যায় না।
রানা বলল, এখন তা হলে কী করা? নীরাকে একা একা যেতে দেয়া যায় না। একজন–কাডকে নীরার সঙ্গে যেতে হবে। কে যাবে?
বল্টু বলল, আমি। আমি নিয়ে যাব।
রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব
মুনা অবাক হয়ে বন্দুর দিকে তাকিয়ে আছে। কী বলছে এই মানুষটা? সে কি মুনার উপর রাগ করে বলছে? এত রাগ কেন? মুনার সমস্ত অন্তরাত্মা কেঁদে উঠল। তার চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা করল – অয়ন ভাই, আপনি যাবেন না। প্লীজ, প্লীজ। আমি নিতান্তই দরিদ্র পরিবারের একটা মেয়ে। আপনিও হত–দরিদ্র একজন মানুষ। কোনােদিন যে আবার আমরা সমুদ্রের কাছে আসতে পারব – আমার মনে হয় না।
কী সুন্দর একটা সুযােগ ! আমার উপর রাগ করে আপনি এই সুযােগটা নষ্ট করবেন
আমি জানি, আমি নানানভাবে আপনাকে কষ্ট দিই। আপনাকে আহত করি। কেন করি আমি নিজেও জানি না। প্রতিবার কষ্ট পেয়ে আপনি যখন মুখ কালো করেন তখন আমার ইচ্ছা করে খুব উঁচু একটা বিল্ডিং–এ উঠে সেখান থেকে লাফিয়ে রাস্তায় পড়ে যেতে। অয়ন ভাই, বলুন তাে আমার স্বভাবটা উল্টো হল কেন? কেন আমি আর দশটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক হলাম না ? আপনার ধারণা, আমি খুব বাজে ধরনের একটা মেয়ে। আপনার এই ধারণা সত্যি নয়। খুব ভুল ধারণা। আমি যে কত ভাল একটা মেয়ে সে জানে শুধু আমার মা। একদিন আপনিও জানবেন।
সেই দিনটির জন্যে আমি কত যে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি! অয়ন ভাই, আমাদের আর্থিক অবস্থাটা যে কত খারাপ সেটা তাে আপনি জানেন – তার পরেও মা’র সংসার–খরচের টাকা চুরি করে আপনার জন্যে একটা স্যুয়েটার কিনলাম। আপনার একটাই স্যুয়েটার। সেটাও অনেকখানি ছেড়া। ছড়া ঢাকার জন্যে আপনি সবসময় স্যুয়েটারের উপর একটা শার্ট পরেন। একদিন আমাকে বললেন – মানুষ কেন যে শার্টের উপর স্যুয়েটার পরে আমি জানি না। কী বিশী লাগে দেখতে! মনে হয় শার্টের উপর একটা ভারী গেঞ্জি পরে আছে।
রূপালী দ্বীপ-শেষ-পর্ব
আপনার কথা শুনে আমি সেদিন কী কষ্ট যে পেয়েছিলাম ! সারা রাত কেঁদেছি আর বলেছি, কেন একজন মানুষ আপনার মত দরিদ্র হয় – আর কেন আরেকজন হয় শুভ্র ভাইয়ার মতাে ধনী ?
নানা ধরনের কষ্টের মধ্যে আমি বড় হচ্ছি। একধরনের আশা নিয়ে বড় হচ্ছি – গভীর রাতে ঘুম ভেঙে হঠাৎ মনে হয় — হয়তো সামনের দিনগুলি অন্যরকম হবে।
অয়ন ভাই, আমি একটা ঘােরের মধ্যে আপনার সঙ্গে দৌড়াতে দৌড়াতে ট্রেনে উঠে পড়লাম। সবাই আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছিল। আমি কিন্তু একটুও লজ্জা পেলাম না। মনে মনে বললাম – এই ব্যাপারটা নিয়তি সাজিয়ে রেখেছে। নিয়তি চাচ্ছে আমি যাই আপনার সঙ্গে।
রাতে একসময় আপনারা সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি কিন্তু জেগে রইলাম। জেগে জেগে ঠিক করলাম দারুচিনি দ্বীপে নেমে আমি কী করব। কী করব জানেন? আমি আপনার কাছে গিয়ে বলব, – অয়ন ভাই, আসুন তো আমার সঙ্গে — সমুদ্রে কোমর পর্যন্ত ডুবিয়ে দাড়াই। আপনি অবাক হয়ে আসবেন আমার সঙ্গে। আমি এক সময় বলব, আমার কেমন যেন ভয়-ভয় লাগছে। আপনি আমার হাতটা একটু ধরুন তো! আপনি হাত ধরবেন আর সঙ্গে সঙ্গে আমি বলব — অয়ন ভাই, আমি আপনাকে নিয়ে এত ঠাট্টা-তামাশা করি। আমি জানি আপনি খুব রাগ করেন। কিন্তু আমি যে আপনাকে কতটা ভালবাসি তা কি আপনি জানেন? এই সমুদ্রে যতটা
Read more