এক শ্রাবণ মাসের মধ্যরাতে রমিলার মুক্তি ঘটল। ফুলবানু হঠাৎ গোঙানি ধরনের শব্দ করে নিথর হয়ে গেলেন। রমিলা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। ফুলবানুর ঘরের দরজা ভালোমতো বন্ধ করে পুকুরপাড়ে চলে গেল। গায়ে সাবান ডলে মনের আনন্দে সাতার কেটে পুকুরে গোসল করল। ভেতর বাড়িতে ফিরে এসে ভেজা কাপড় বদলে পাটভাঙা নতুন একটা শাড়ি পরল। চুল বঁধিল। চোখে কাজল দিল।
সূর্য ডোবার পর আয়নায় নিজেকে দেখা নিষেধ, তার পরেও অনেকক্ষণ আয়নায় নিজেকে দেখে সিদ্দিকুর রহমানের শোবার ঘরের বন্ধ দরজার কড়া নাড়ল। সিদ্দিকুর রহমান ভীত গলায় বললেন, কে? কে? রমিলা শান্ত গলায় বলল, আমি। খারাপ সংবাদ আছে। আপনার দাদিজান মারা গেছেন।কী সর্বনাশ! বলো কী! কখন?
এই তো কিছুক্ষণ। দরজা খোলেন।তিনি দরজা খুলে স্ত্রীকে দেখে খুবই অবাক হলেন। মরা-বাড়িতে সে এত সাজপোজ করেছে কেন? তার কি মাথায় গোলমাল হয়েছে! যে-যন্ত্রণা তার উপর দিয়ে গিয়েছে মাথায় গোলমাল হবারই কথা।রমিলা বলল, আপনি যান। মুনশি-মওলানা খবর দেন, আত্মীয়স্বজন খবর দেন। আমি কিছুক্ষণ শান্তিমতো ঘুমাব। অনেকদিন আমি শান্তিমতো ঘুমাইতে পারি না। কেউ যেন আমারে না ডাকে।
মরার সময় দাদিজান কি কিছু বলেছেন? অনেক সময় মৃত্যুর আগে-আগে জবানবন্ধ মানুষের জবান খুলে যায়। কথা বলে। দাদিজান কিছু বলেছেন? হ্যাঁ, বলেছেন। তিনি বলেছেন আপনি যেন আপনার প্রথম স্ত্রীর সন্তানটাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসেন। নিজের সন্তান অন্যখানে মানুষ হবে এইটা কেমন কথা?সত্যি বলেছেন?
রমিলা ছোট করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, না, দাদিজান কিছু বলেন নাই। মৃত্যুর সময় তার জবান খুলে নাই। এইটা আমার নিজের কথা। আপনার প্রথম স্ত্রীর ঘরে যে মেয়েটা আছে সে এখন কত বড়? অনেক বড় হয়েছে। দশ-এগার বছর। সে আসবে না। আগেও কয়েকবার চেষ্টা করেছি। তার মামারা দেয় না। সেও আসতে চায় না।
আবার চেষ্টা করেন। চেষ্টা করতে তো দোষ নাই। মেয়েটার নাম কী? ভালো নাম লীলাবতী। সবাই লীলা বলে ডাকে।বাহ, সুন্দর নাম– লীলা! তারা যদি দুই ভইন থাকত। তাইলে পরের ভইনের নাম হইত খেলা। দুই ভইনের একত্রে নাম— লীলা-খেলা।বলতে বলতে রমিলা হেসে ফেলল। শব্দ করে হাসি। হাসির দমকে তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। একসময় সে হাসি সামলাবার জন্যে মুখে আঁচলাচাপা দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। মাথার ঘোমটা খুলে শাড়ির আঁচল চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।সিদ্দিকুর রহমান অবাক হয়ে বললেন, কী ব্যাপার, হাসে। কেন?
রমিলা বলল, জানি না কেন হাসি।হাসি থামাও।থামাইতে পারতেছি না।সে হাসতেই থাকল।রমিলার মাথা-খারাপের লক্ষণ সেদিনই প্রথম প্রকাশ পেল।সন্ধ্যা নেমে গেছে। সিদ্দিকুর রহমান আগের জায়গাতেই বসে আছেন। এখনো শীত নামার কথা না, কিন্তু শীত-শীত লাগছে। সারা শরীরে আরামদায়ক আলস্য। একটা কলা থাকলে কম্বল বিছিয়ে শুয়ে থাকা যেত। সেটা মন্দ হতো। না। গায়ের উপর হিম পড়ত। শীতের প্রথম হিমের অনেক গুণাগুণ আছে। আয়ুৰ্বেদিক কিছু ওষুধে প্রথম শীতের শিশিরের ব্যবহার আছে।
তিনি উঠে বসলেন। দীর্ঘ ঘুমের পরে শরীরে ভোতা ভাব চলে আসে, সেই ভাবটা আছে। হাত-পা ভারি-ভারি লাগছে। বাড়ির দিকে রওনা হতে ইচ্ছা! করছে না। বরং ইচ্ছা করছে রেললাইনের স্লিপারে পা দিয়ে হাটা শুরু করতে। তিনি একজন সুখী এবং পরিতৃপ্ত মানুষ। সুখী মানুষদের মধ্যেই হঠাৎ বৈরাগ্য দেখা দেয়। অসুখী মানুষরা সাধু-সন্ন্যাসী হয় না। তৃপ্ত পরিপূর্ণ মানুষরাই হয়। বৈষয়িক দিক দিয়ে তিনি সফল মানুষ না। বাড়ি-ঘর, দিঘি জলমহালের তাঁর যে বিশাল সাম্রাজ্য সেটাও পূর্বপুরুষের করে যাওয়া। তিনি পূর্বপুরুষের সম্পদ রক্ষা করে যাচ্ছেন। এর বেশি কিছু না।
ভোগী মানুষ বলতে যা বোঝায় তিনি তাও না। শহরবাড়ি নামের সুন্দর বাংলো বাড়ি ছেড়ে তিনি বাস করেন মূল বাড়িতে। মূল বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম দুই দিকেই ঘন জঙ্গল। হাওয়া একেবারেই আসে না। গরমের সময় কষ্ট হয়। তালের পাখা পানিতে ভিজিয়ে বাতাস করতে হয়। গরমের সময় হাওয়া করার জন্যে তার নিজস্ব একজন লোক আছে। তার নাম বন্দু। সে সারারাত একতালে পাখা করে যেতে পারে। তিনি বন্দুকে অত্যন্ত স্নেহ করেন।
উত্তরবন্দে বন্দুকে তিনি দুই বিঘা ধানী জমি দিয়েছেন। মুখে-মুখে দেয়া না— দলিলপত্র করে দেয়া। দাতা হিসেবে তার কোনো সুনাম নেই। বিত্তবান মানুষরা এক পর্যায়ে স্কুল দেয়, মাদ্রাসা দেয়, নতুন মসজিদ বানায়। সিদ্দিকুর রহমান সেদিকে যান নি— তবে তিনি তাঁর নিজের খুব কাছের মানুষদের জন্যে অনেক করেছেন। লোকমান এবং সুলেমান এই দুই ভাইকেও এক বিঘা করে জমি দিয়েছেন। ঘর তুলে দিয়েছেন। এই দুই ভাই তাঁর পাহারাদার।
এরা সারারাত বাড়ির উঠানে বসে থাকে। লোকমানের হাতে থাকে টোটাভরা দোনলা বন্দুক। সুলেমানের হাতে অলঙ্গা। তালকাঠ দিয়ে বানানো বর্শাজাতীয় অস্ত্ৰ। অলঙ্গাচালনায় সুলেমান অত্যন্ত পারদর্শী।অতি বিত্তবান মানুষদের শত্রু থাকবেই। তারও আছে। উপগ্রহের মতো তারা তাকে ঘিরে পাক খায়। তাকে সাবধান থাকতে হয়। দিনের বেলা একা ঘুরে বেড়ালেও রাতে তা করা যায় না। লোকমান এবং সুলেমানকে সঙ্গে রাখতে হয়। তিনি সাবধান থাকেন।
রেললাইনের স্লিপারে পা দিয়ে অতি দ্রুত কে যেন আসছে। কুয়াশার কারণে লোকটাকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গিতেই সিদ্দিকুর রহমান তাকে চিনলেন–লোকমান। তার খোজে আসছে। লোকমান জানে চেয়ারম্যান সাহেবের রেললাইনের পাশ ধরে হাঁটার অভ্যাস আছে। প্রথমে সে খোঁজ নিতে এসেছে রেল সড়কে।
তিনি গলা-খাকারি দিলেন। এতদূর থেকে গলা-খাকারির শব্দ শুনতে পারার কথা না। কিন্তু লোকমান ঠিকই শুনল। থমকে দাঁড়িয়ে গেল এবং মাথা সামান্য নিচু করে দ্রুত তার দিকে আসতে শুরু করল। সিদ্দিকুর রহমান এক ধরনের তৃপ্তি বোধ করলেন। অর্থ-বিত্তের মতো লোকমানও এক ধরনের সম্পদ। এই সম্পদের গুরুত্বও কম না।কোনো খবর আছে লোকমান?
জি-না।মাগরেবের ওয়াক্ত কি হয়েছে? লোকমান চাঁদরের ভেতর থেকে হাত বের করে হাতের দিকে তাকিয়ে থাকল। যদি হাতের পশম না দেখা যায় তাহলে সূর্য ড়ুবে গেছে। মাগরেবের নামাজের ওয়াক্ত হয়েছে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম আকাশ লাল থাকতে থাকতে নামাজটা পড়ে ফেলতে হয়।লোকমান বলল, জি, নামাজের ওয়াক্ত হয়েছে।
নামাজের ব্যবস্থা করো। নামাজ পড়ে তারপর যাব। ওজুর পানি লাগবে না। ওজু আছে।লোকমান অতি দ্রুত গাছের শুকনা পাতা সরিয়ে নিজের গায়ের চাঁদর পেতে দিল। গায়ের চাঁদর সরানোয় লোকমানের কাধে রাখা বন্দুক দেখা যাচ্ছে। সে বন্দুক মাঠে শুইয়ে রেখে ঝিম ধরার মতো করে বসে আছে। বন্দুকের মাথা পূর্বদিক করে রাখা। বন্দুকের মাথা কখনো পশ্চিম দিক করে রাখতে নাই।
সিদ্দিকুর রহমান নামাজ শেষ করলেন। অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি। সময় নিয়ে নামাজ পড়লেন। নামাজের শেষে দোয়া করলেন। অদ্ভুত দোয়া। তিনি বললেন, হে রহমানুর রহিম, তুমি রমিলার প্রতি তোমার রহমত প্ৰকাশ করো। তুমি তার মৃত্যু দাও। আমি তোমার পাক দরবারে তোমার বান্দার মৃত্যু কামনা করছি। এই অন্যায় দোয়ার জন্যে তুমি আমাকে ক্ষমা করো, ক্ষমা করো দয়াময়।
চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। বনের ভেতরে শিয়াল ডাকতে শুরু করেছে। গতবছর শিয়ালের ডাক প্রায় শোনেনই নি। এই বছর শিয়ালের উপদ্রব বেড়েছে। সমানে হাঁস-মুরগি খাচ্ছে। এত শিয়াল কোথেকে এসেছে কে জানে? বন্য পশুপাখি কখনো এক জায়গায় থাকে না। তারা জায়গা বদল করে। মানুষও তো এক অর্থে পশু। তার ভেতরেও জায়গা বদলের প্রবণতা আছে। কিন্তু সে জায়গা বদলায় না। সে চেষ্টা করে শিকড় গেড়ে বসতে। বাড়ি-ঘর বানায়। গাছপালা লাগায়। এমন ভাব করে যেন সে থিতু হয়েছে। অথচ সে কখনো থিতু হয় না। সে সবসময়ই জায়গা বদলের অস্থিরতা নিয়ে বাস করে।
সিদ্দিকুর রহমান চাঁদর থেকে নামলেন। চাপা গলায় ডাকলেন, লোকমান!
লোকমান ছুটে এলো।
সাথে টর্চ আছে?
জি আছে।
চলো রওনা দেই।
জি আচ্ছা।
না গিয়ে রেললাইন ধরে হাঁটি। উত্তরদিকে যাই।
জি আচ্ছা।
সিদ্দিকুর রহমান বকটা যো-জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক সেখানে উপস্থিত হলেন। লোকমান কোনো কথা না বলে তার পেছনে পেছনে আসছে। একে বলে আনুগত্য। এ-ধরনের আনুগত্য আজকাল পাওয়া যায় না। তার ভাগ্য ভালো তিনি পেয়েছেন। তিনি যা করতে বলবেন লোকমান তা-ই করবে। কোনো প্রশ্ন করবে না। আচ্ছা, তিনি যদি লোকমানকে বলেন–লোকমান, তুমি রেললাইনের উপর বসে থাকে। আমি না বলা পর্যন্ত নড়বে না। ট্রেন গায়ের উপর এসে পড়লেও নড়বে না। তাহলে সে কি শুনবে?
লোকমান! জি? পান খেতে ইচ্ছা করছে। পানের বাটা নিয়ে আসো। আর সবাইকে বলে আসো, আমার ফিরতে সামান্য দেরি হবে।একলা থাকবেন? হ্যাঁ, একাই থাকব। কোনো অসুবিধা নাই। টর্চটা আমার কাছে দিয়ে যাও। শোনো লোকমান, আমি হাঁটা ধরছি। উত্তর দিকে যাব। তুমি তাড়াতাড়ি এসে আমাকে ধরে।
কথা শেষ করার আগেই লোকমান প্ৰাণপণে দৌড়াতে শুরু করেছে। সিদ্দিকুর রহমান জানেন তিনি বেশিদূর যেতে পারবেন না, তার আগেই লোকমান উপস্থিত হবে। লোকমান একা আসবে না, সঙ্গে সুলেমানকে নিয়ে আসবে। তারা দুই ভাই তাঁর পেছনে পেছনে এগোতে থাকবে। এরা দুইজন যেন তার ছায়া। মানুষের একটা ছায়া পড়ে, তাঁর পড়ে দুই ছায়া।
সিদ্দিকুর রহমান হাঁটতে শুরু করলেন। রেললাইনের পাশেই বন। বনের ভেতর জমাটবাঁধা অন্ধকার। সেখানে জোনাকি পোকা জুলছে। একটা-দুটা জোনাকি না— শত শত জোনাকি। একসঙ্গে এত জোনাকি তিনি অনেকদিন দেখেন নি। শেষ কবে দেখেছিলেন মনে করার চেষ্টা করলেন। তাও মনে পড়ছে না। শুধু মনে আছে, তিনি ঘন জঙ্গলের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন। চারদিকে শত শত জোনাকি। কিছু জোনাকি তার নাকে-মুখে এসে পড়তে শুরু করল। জোনাকির শরীর থেকে ঝাঝালো গন্ধ নাকে এসে লাগছে। কবে ঘটেছে এই ঘটনা? কবে?
কেউ কি রেললাইনে বসে আছে? সে-রকমই তো মনে হচ্ছে। সিদ্দিকুর রহমানের হাতে টর্চ। টর্চের আলো ফেললেই ঘটনা। কী বুঝা যায়। কিন্তু তাঁর টর্চের আলো ফেলতে ইচ্ছা করছে না। জিন ভূত না তো? অঞ্চলটা খারাপ। অনেকেই কী সব দেখেছে–রেললাইন ধরে হেঁটে যায়। শিস বাজায়।সিদ্দিকুর রহমান আরো কিছুদূর গেলেন। যে বসেছিল। সে উঠে দাঁড়িয়েছে। জিন হলে উঠে দাড়াত না। কুয়াশায়ে মিলিয়ে যেত।
কে?
ছায়ামূর্তি বলল, স্যার আমি।
এখানে কী করো?
ছায়ামূর্তি জবাব দিল না। মনে হয় তার কাছে জবাব নেই। সিদ্দিকুর রহমান এগিয়ে গেলেন। ছায়ামূর্তি স্পষ্ট হলো। সে তার হাতের জ্বলন্ত সিগারেট ফেলে দিল।ছায়ামূর্তির নাম আনিস। সিদ্দিকুর রহমানের দুই মেয়ের জায়গির মাস্টার। এই লোকের একা একা রেললাইনে বসে থাকার অভ্যাস আছে সিদ্দিকুর রহমান জানতেন না। তাকে নিরীহ গোবেচারা ধরনের মানুষ বলেই জানতেন।
এখানে কী করছো? কিছু করছি না। বসে ছিলাম। তুমি কি প্রায়ই এদিকে আসো?আনিস জবাব দিল না। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, চলো আমার সঙ্গে। হাঁটি।রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটাপথ। চাঁদের আলোয় রেললাইন চকচক করছে, সেই সঙ্গে পায়ে চলা পথও চকচক করছে। সিদ্দিকুর রহমান আগে আগে যাচ্ছেন। আনিস তার পেছনে। আনিসের গায়ে ছাইরঙা চাঁদর। দূর থেকে চাঁদরটা সাদা দেখাচ্ছিল। এর কী কারণ হতে পারে? সিদ্দিকুর রহমানের মাথায় এই প্রশ্ন ঘুরছে।
আনিস!
জি স্যার।
বাংলা তারিখ কত?
কার্তিকের ছয় তারিখ। তেরশ সাতান্ন।
পড়েছিল। তিনি হাতের ইশারায় তাকে কাছে ডাকলেন। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোমার সঙ্গে কি সিগারেট আছে? আনিস অপ্ৰস্তৃত গলায় বলল, জি আছে।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, দাও একটা সিগারেট খাই।আনিস সিগারেটের প্যাকেট এগিয়ে দিল। অতি সস্তার বিক সিগারেট। সিদ্দিকুর রহমানের মতো মানুষের হাতে এই সিগারেট দেওয়া যায় না।
মাস্টার শোনো, আজ থেকে তিনশ বছর আগে আমার পূর্বপুরুষ এই অঞ্চলে এসেছিলেন। তার নাম নওরোজ খাঁ। পাঠান বংশের মানুষ। তাঁর সঙ্গে ছিল তার স্ত্রী এবং পাঁচ বছর বয়সের ছোট্ট একটা মেয়ে। মেয়েটার নাম লীলাবতী। নওরোজ খ্যা ঘন জঙ্গলের ভিতর ঘর বানিয়ে স্ত্রী এবং মেয়েটাকে নিয়ে থাকতেন। মেয়েটা কালাজ্বরে মারা যায়। জঙ্গলের ভিতর কোথাও তার কবর আছে।
আনিস কিছু বলল না। তার মাথায় একটা প্রশ্ন এসেছে। সিদ্দিকুর রহমানের নামের শেষে খা নাই কেন? প্রশ্নটা সে করল না। জায়গির মাস্টারের মুখে প্রশ্ন মানায় না। সিদ্দিকুর রহমান সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে কাশলেন। কাশির বেগ কমে এলে বললেন, আমার বড় মে?
আমার নাম আনিস। আনিসুর রহমান।এই অঞ্চলে আমার অনেকগুলি নাম আছে— কুঁজা মাস্টার, গুঁজা মাস্টার। কুঁজা হয়ে হাঁটি এইজন্যে কুঁজা মাস্টার। কলেজের প্রিন্সিপ্যাল গণি সাহেব আমাকে ডাকেন ভোঁতা-মাস্টার। সবসময় মুখ ভোঁতা করে রাখি বলে এই নাম। হ্যাঁ, আমি সবসময় মুখ ভোঁতা করে রাখি। মাঝে মাঝে মুখ ভোঁতা করে রেললাইনে বসে ভাবি— একটা ট্রেন এসে গায়ের উপর দিয়ে চলে গেলে কেমন হয়?
রেলগাড়ি ঝমাঝম
ভোঁতা মাস্টার আলুর দাম।
না হয় নাই, ছড়াটা আরো লম্বা–
আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি
ভোঁতা মাস্টার শ্বশুরবাড়ি
রেলগাড়ি ঝমাঝম
ভোঁতা মাস্টার আলুর দাম।
আলুর দাম হওয়া খারাপ কিছু না। সব সমস্যার সমাধান। আমার সমস্যা ভালো লাগে না, এইজন্যেই আমি সমস্যার ভিতর থাকি। যে যার নিন্দে, তার দুয়ারে বসে কান্দে। যে যা পছন্দ করে না তাকে তার মধ্যে থাকতে হয়। যেসব মানুষ আমি পছন্দ করি না— তারা থাকে আমার আশেপাশে। যেমন সিদ্দিকুর রহমান।
সিদ্দিকুর রহমান সাহেবকে আমি পছন্দ করি না। কেন করি না। আমি জানি না। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কারণটা আমার কাছে পরিষ্কার না। একটা কারণ হতে পারে মানুষটা ক্ষমতাবান। জমি-জমা, অর্থ-বিত্ত, লোক-লঙ্কর বিরাট রাজত্ব। আর আমি বেতনবিহীন কলেজের হতদরিদ্র ভোঁতা মাস্টার। দস্তয়োভস্কির উপন্যাসের চরিত্র। আমার নুন নাই পান্তাও নাই। তবে নুন পান্তা যে কাঁচামরিচ দিয়ে ডলে খেতে হয় সেই কাঁচামরিচটা আছে।
রেললাইনের উপর বসে আমি প্রায়ই ভাবি–একজন মানুষ যার নাম সিদ্দিকুর রহমান, সে দস্তয়োভস্কির নামও শুনে নাই। কিন্তু সে নিজে দস্তয়োভস্কির এক চরিত্র এবং সে এরকম আরো চরিত্র পুষছে। আমি আনিসুর রহমান সেরকম একটি চরিত্র। ভোঁতা মাস্টার, কুঁজা মাস্টার, গুঁজা মাস্টার। নাম নেই মানুষ। নাম থাকে না পশুদের। তাহলে আমি কি পশু গোত্রের কেউ? কিংবা ক্ৰমে ক্রমে পশু হয়ে যাচ্ছি?
গত সন্ধ্যাবেলায় আমি রেললাইনের উপর বসেছিলাম। হঠাৎ ভূতের মতো পেছন থেকে উদয় হলেন সিদ্দিকুর রহমান। তাঁর সঙ্গে আমার কিছু কথাবার্তা হলো। আমার কথাবার্তা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও ছিল না। উপায় কী? অতি ক্ষমতাধর সামন্ত প্ৰভু প্রশ্ন করলে তাঁর ক্রীতদাসদের জবাব দিতে হয়। হ্যা আমি ক্রীতদাস। অবশ্যই ক্রীতদাস। তিনবেলা অন্নদান করে তিনি আমাকে কিনে নিয়েছেন। আমি তার অন্নদাস।সিদ্দিকুর রহমান প্রশ্ন করলেন, সন্ধ্যাবেলা রেললাইনের উপর বসে আছ কেন?
আমি অতি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, স্যার, আপনাকে আরেকদিন বলব।এই লোক আর চাপাচাপি করল না। চাপাচাপি করলে কিছু একটা বানিয়ে বলে দিতাম। যদিও আমার বলার ইচ্ছা ছিল–আমি রেললাইনে বসে থাকলে তোর কী? রেললাইন তোর তালুকের উপর দিয়ে যায় নাই। সরকারি রেললাইন। ইচ্ছা হলে আমি বসে থাকব। ইচ্ছা হলে শুয়ে ঘুমাব। আমার উপর দিয়ে মালগাড়ি চলে যাবে।
হ্যাঁ, তুই তুই করেই বলতাম। সব মানুষ সমান। মেধায় বুদ্ধিতে একজন বড় একজন ছোট। অথচ আমরা মানুষ বিচার করার সময় তার মেধাবুদ্ধি দেখি না। আমরা দেখি মানুষটার টাকা পয়সা আছে কি-না। উদাহরণ দিয়ে বুঝাই? এই অঞ্চলের জামে মসজিদের ইমাম সাহেবের নাম আব্দুল নুর— নূরের চাকর। এই নূরের চাকরের সঙ্গে গত শনিবার আমার দেখা।
আমি উনাকে দেখে মাথা নিচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছি (এটা আমার স্বভাব।— আমি সবসময় চেষ্টা করি। সবাইকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে। বেশির ভাগ সময় সম্ভব হয় না।) উনি বললেন, মাস্টার সাহেব, আসসালামু আলায়কুম।আমি থমকে দাঁড়িয়ে বললাম, ওয়ালাইকুম সালাম।উনি গলা তীক্ষ্ণ করে বললেন, একজন মুসলমানের সঙ্গে আরেকজন মুসলমানের যখন দেখা হয় তখন সালাম দিতে হয়। এটা ইসলাম ধর্মের শিক্ষা।
আমি বললাম, জি জি।উনি বললেন, যে বয়োকনিষ্ঠ সে আগে সালাম দিবে। এটাই ধর্মীয় বিধান। আপনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। কিন্তু আপনি সালাম দেন না। এর কারণটা কী? জুমার দিন। আপনি জুমার নামাজ আদায় করতে আসেন না, এর কারণ কী? আমি বললাম, আমি আপনার মতো ভালো মুসলমান না, আমি খারাপ মুসলমান। এইজন্যেই যাই না।পাঞ্চেগানা নামাজ পড়েন না? জি-না।আল্লা-খোদা বিশ্বাস করেন? না-কি তাও করেন না?
আমি জবাব দিলাম না। জবাব দিতে পারতাম। বলতে পারতাম, জি-না আমি আল্লাহ খোদা, ভগবান, জেসাস ক্রাইস্ট, গড কিছুই বিশ্বাস করি না। আমাকে মালেকভাই বলেছিলেন, শুধু নিজেকে বিশ্বাস করবি আর কিছুই বিশ্বাস করবি না। আমি কুঁজা মাস্টার আরো কুঁজা হয়ে গেলাম।
মওলানা আব্দুল নূর কঠিন চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর খড়খড়ে গলায় বললেন, চিন্তা করে জবাব দেন।যে প্রশ্নগুলি এই মওলানা আমাকে করেছেন সেই প্রশ্ন তিনি কিন্তু সিদ্দিকুর রহমান সাহেবকে করবেন না। কারণ সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের হিসাব আলাদা।
উনি প্রতিবছর গ্রামের একজন মানুষকে নিজ খরচে হজে পাঠান। মওলানা সাহেবকেও একদিন পাঠাবেন। আব্দুল নূর সেই অপেক্ষায় আছেন। মওলানা সাহেবের মাসিক একশত টাকা বেতনও তিনি দেন। সারা বৎসরের খোরাকির চাল দেন।মওলানা আব্দুল নূর এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। যেন আমার প্রশ্নের জবাব না। শুনে তিনি যাবেন না। আমি বললাম, মওলানা সাহেব, আপনার বয়স সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের চেয়ে অনেক বেশি।
ধর্মীয় নিয়মে পথেঘাটে দেখা হলে উনারই উচিত আপনাকে সালাম দেয়া। উনি তা করেন না। আগবাড়িয়ে সবসময় আপনি সালাম দেন। এর কারণ কী? উনি তো প্রায়ই জুম্মার নামাজেও যান না। এই প্রসঙ্গে কি আপনি তাঁকে কিছু বলেছেন? একটু আগে মওলানা সাহেব আমার জবাবের অপেক্ষা করেছেন। এখন আমি তার জবাবের অপেক্ষা করছি। ফলাফল কেউ কারো প্রশ্নের জবাব দিলাম না। দুজনই মাথা নিচু করে দুদিকে চলে গেলাম।
আমি অভাজন ব্যক্তি। আমার ফটফট করে কথা বলা উচিত না। আমি বলিও না। মুখ বুজে থাকি। মাঝে মাঝে মেজাজ খারাপ হয় তখন বলি। সমস্যা হলো আমার সারাক্ষণই মেজাজ খারাপ থাকে। তখন ইচ্ছা করে আশেপাশে যারা থাকে তাদের সবার মেজাজ খারাপ করে দেই। আমার মেজাজে কারো কিছু যায় আসে না। কেউ খেয়ালও করে না। শুধু সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের দুই মেয়ে খেয়াল করে। তারা আমার ভয়ে অস্থির হয়ে থাকে।
