লীলাবতী পর্ব – ০৯ হুমায়ূন আহমেদ

লীলাবতী

মাসুদ চুপ করে আছে। সিদ্দিকুর রহমান হুক্কায় লম্বা টান দিয়ে সুলেমানকে ডেকে সহজ গলায় বললেন, তোমাকে বলছিলাম মাসুদ যে-ট্রেনে নামবে সেই ট্রেনেই তাকে কানে ধরে তুলে দিবে। এই কাজটা তুমি করো নাই। যা-ই হোক, সকাল দশটায় একটা ট্রেন আছে। ঐ ট্রেনে তুলে দাও।সুলেমান হ্যাঁ-সূচক ঘাড় কাত করল। সিদ্দিকুর রহমান সহজ গলায় বললেন, কানে ধরে নিয়ে যাবে। ভুল হয় না যেন।সুলেমান আবারো হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।

লীলা বিচারপ্রক্রিয়া শুনল। কিছুই বলল না। সে এই বাড়িতে আর থাকছে। না। চলে যাচ্ছে। বাড়ির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যোগ রাখার আর অর্থ হয় না। পৃথিবীর সবকিছু তার নিজের নিয়মে চলে। এই বাড়ি চলবে বাড়ির নিয়মে। এই বাড়ির নিয়ম যদি হয় কথায়-কথায় কানো ধরে ঘোরানো তাহলে তা-ই সই। লীলা যখন তার ব্যাগ গোছাচ্ছিল তখন মাসুদ এসে তার সামনে দাঁড়াল।

লীলা বলল, কিছু বলবে? মাসুদ কথা বলে নি। লীলা একবার ভাবল কিছু উপদেশ দেয়। তেমন কোনো উপদেশ তার মাথায় আসে নি। লীলা বলল, তুমি কিছু বলতে চাইলে বলো। মাসুদ তখন বিড়বিড় করে বলল, আমাকে আপনার সঙ্গে নিবেন? লীলা বলল, না।মাসুদ বলল, আমি কী করব বলে দেন।লীলা বলল, তুমি কী করবে সেটা তুমি চিন্তা করে বের করবে।

মাসুদ সামনে থেকে চলে গেল। তার কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যি তাকে কানে ধরে স্টেশনের দিকে নিয়ে গেল সুলেমান। সুলেমানের পেছনে আছে লাঠি হাতে লোকমান। তাদের পেছনে গ্রামের কিছু লোকজন, কিছু বাচ্চ-কাচ্চা। সিদ্দিকুর রহমান সাহেব বলে দিয়েছিলেন ছেলেকে যেন পরীবানুর বাড়ির সামনে কিছুক্ষণ রাখা হয়। সেই কাজটা করা হলো। পরীবানু বাড়ি থেকে বের হয়ে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ এই দৃশ্য দেখে বাড়িতে ঢুকে গেল।ট্রেন ছুটছে। আকাশ মেঘলা। বাইরের পৃথিবী অন্ধকার দেখাচ্ছে। দেখতে ভালো লাগছে। দূরের গাছপালাকে কুচকুচে কালো লাগছে।

বাবার কাছ থেকে বিদায়ের দৃশ্য কেমন হবে এটা নিয়ে লীলার মনে সামান্য দুশ্চিন্তা ছিল। তবে লীলা মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে আবেগঘন কিছু হবে না। বাবা স্বাভাবিক সৌজন্যের কিছু কথাবার্তা বলবেন। লীলা ঠিক করেছে, সে বিদায় নেবার সময় তীক্ষ্ণ চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকবে। তার দেখার ইচ্ছা এই অতি কঠিন মানুষটার চোখে পানি আসে কি-না। পানি না এলেও চোখ কি ছলছল করবে?

সিদ্দিকুর রহমান মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, ফি আমানিল্লাহ। যাও। তুমি এসেছিলে, মনে তৃপ্তি পেয়েছি, এর বেশি আমার কিছু বলার নাই। তোমার দাদির একটা গয়না আমার কাছে আছে। আমার খুব শখ গয়নাটা তোমাকে দেই। গয়নাটা নিবে?

লীলা বলল, না।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তোমার মায়ের একটা খাতা আমার কাছে আছে। নানান সময়ে সে গুটুর গুটুর করে কী সব লিখত। এই বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় সে খাতাটা ফেলে গেছে। মনে হয় ইচ্ছা করেই ফেলে গেছে। তুমি চাইলে খাতাটা তোমাকে দিতে পারি।ইচ্ছা করে ফেলে যাবে কেন?

খাতায় আমার সম্পর্কে, আমার দাদিজান সম্পর্কে অনেক অন্দমন্দ কথা আছে। মনে হয় তোমার মা চেয়েছিল। আমি লেখা পড়ে মনে কষ্ট পাই।খাতাটা আমি নিব।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, মা শোনো, তোমার পড়াশোনার খরচ, বিবাহের খরচ সব আমি দিতে চাই।আপনাকে কিছু দিতে হবে না।আচ্ছা ঠিক আছে।বাবা, আমি এখন রওনা দেই।তোমার জন্যে পালকি আনতে লোক গেছে। পালকি আসুক, তারপরে যাবে।কথাবার্তার এই পর্যায়ে লীলা লক্ষ করল, তার বাবার চোখে পানি। তিনি চট করে মাথা সরিয়ে ফেললেন যেন লীলা চোখের পানি দেখতে না পায়।

মায়ের লেখা খাতা লীলা বেশ খানিকটা পড়ে ফেলেছে পালকিতে আসতে আসতে– আজ শুক্রবার। জুম্মাবার। আমার মনে কোনো শান্তি নাই। আমি আজ ফজরের নামাজ পড়িয়া আল্লাহপাককে বলিয়াছি— ও আল্লাহগো, ও দয়াময়, তুমি দয়া করো। তুমি ডাইনির হাত হইতে আমাকে উদ্ধার কর। মানুষ কী প্রকারে এমন হইতে পারে?

আমি আমার দাদি শাশুড়িকে ডাইনি বলিতেছি। ইহা অতীব অন্যায়। কিন্তু কত দুঃখে বলিতেছি, তাহা কি কেউ বুঝিবে? গত বুধবারের ঘটনা। বুধবারে এই অঞ্চলে বিরাট হাট বসে। উনি লোকজন নিয়া হাটে গিয়াছেন। বাড়ি প্রায় খালি। আমার দাদিশাশুড়ি আমাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন।

আমি উনার সম্মুখে উপস্থিত হইতেই উনি বলিলেন, নাতবউ, তোমার বুনি দুইটা এত বড় কেন? বিবাহের পূর্বেই কেউ হাতাপিতা করিয়াছে? বিবাহের পূর্বে হাতাপিতা করলে বুনি বড় হয়।আমি এতই অবাক হইলাম যে আমার জবান বন্ধ হইল। আমি চুপ করিয়া আছি, তখন ডাইনি বলিল, ব্লাউজ খোল, আমি তোমার বুনি দেখব।

আমি বলিলাম, আপনি যদি আমাকে কোনোদিন এই জাতীয় কথা বলেন। তাহলে আমি খেজুরের কাঁটা দিয়া আপনার চোখ গালাইয়া দিব। আল্লাহর কসাম।এই হইল ঘটনা। এই ঘটনা আমি কাহাকে বলিব? কে আমার কথা শুনিবে? উনি তাহার দাদিজানের বিষয়ে অন্ধ। কেন অন্ধ তাহাও বুঝি না।ও আল্লাহপাক, ও দয়াময়, তুমি এই খবিস ডাইনির হাত হইতে আমাকে উদ্ধার করো।

লীলা ট্রেনের জানালা থেকে মাথা ভেতরে নিয়ে এলো। হঠাৎ তার খানিকটা মন খারাপ লাগছে। কেন লাগছে তা বুঝতে পারছে না। সে মঞ্জুমামার দিকে তাকাল। বেচারার আরো কিছুদিন থাকার ইচ্ছা ছিল। লীলা জোর করেই তাকে নিয়ে এসেছে। ট্রেনে উঠার সময় তার বেশ মন খারাপ ছিল। এখন আর মন খারাপ নেই। মহাউৎসাহে তিনি রাজনীতির আলাপ জুড়েছেন।

শুনেন, পরিষ্কার হিসাব শুনেন–বাঙালি জাতি যুক্তভাবে কিছু করতে পারে না। বাঙালি বিযুক্ত জাতি। ভাইয়ে ভাইয়ে লড়াইয়ের জাতি। এখানে যুক্তফ্রন্ট চলে? চলে না। হক সাহেব বিরাট বোকামি করেছেন। আমাদের দরকার লাঠির শাসন। মিলিটারির শাসন। বাঙালি গরমের ভক্ত, নরমের যম। বুঝেছেন কিছু?

লীলা চোখ বন্ধ করে আছে। চলন্ত ট্রেনে তার সবসময় ঘুম পায়। ছাড়া ছাড়া ঘুম না, গাঢ় ঘুম। ঘুমের মধ্যে বিচিত্র সব স্বপ্ন। মঞ্জুমামার রাজনীতির গল্প শুনতে শুনতে সে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখল— এক থুড়গুড়ি বুড়ি তার পাশে বসে আছে। বুড়ি ফোকলা দাতে পান খাচ্ছে। পানের লাল রস গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। বুড়ি বলল, এই মেয়ে তোর নাম লীলা না? তুই আয়নার মেয়ে না? লীলা বলল, জি।বুড়ি বলল, তোর মা কি জীবিত আছে না মারা গেছে?

মা মারা গেছেন।কস কী! আমি তো যাইতেছি তোর মার সাথে সাক্ষাতের জন্যে। মারা গেলে সাক্ষাৎ ক্যামনে হইব? আপনি কে? আমি তোর মায়ের দাদি শাশুড়ি। তুই তো আমারে কদমবুসিও করলি না। কদমবুসি কর।আমি আপনাকে কদমবুসি করব না।অবশ্যই করবি। তোর বাপ করে, তুই করবি না। এইটা কেমন কথা?

বুড়ি কদমবুসি করানোর জন্যে লীলার হাত ধরে টানাটানি করতে লাগল। তখনি লীলার ঘুম ভাঙিল। হাত ধরে টানাটানি করছেন মঞ্জুমামা। তার মুখ আতঙ্কগ্ৰস্ত। লীলা বলল, কী হয়েছে মামা? খুবই খারাপ অবস্থা। অবস্থা ফর্টি নাইন।অবস্থা ফর্টি নাইন মানে কী? ঐ লোক তো মারা যাচ্ছে।আমাদের সঙ্গে যে যাচ্ছে। কলেজের টিচার।আনিসুর রহমান সাহেব? জ্বর বেড়েছে?

জ্বর বাড়াবাড়ি না। উনি নিজেই এখন আগ্নেয়গিরি।বলো কী! বদনায় পানি ঢেলে এই জ্বর কমানো যাবে না। দমকলে খবর দিতে হবে। এরকম সিরিয়াস রোগী সঙ্গে আনাই ঠিক হয় নি। হুশ করে মারা যাবে। আমরা ডেড়বডি নিয়ে পড়ব বিপদে। শরীরে হাত রাখলে হাত গরমে পুড়ে যাচ্ছে, আবার পায়ের তলা বরফের মতো ঠাণ্ডা। এটা খারাপ লক্ষণ।

লীলা উঠে এলো। আনিসের মাথার কাছে বসতে বসতে বলল, আপনার জ্বর নাকি খুব বেড়েছে? আনিস জবাব দিল না। লীলা বলল, আপনি তো থারথার করে কাপছেন। শীত লাগছে? জি।লীলা আনিসের কপালে হাত রাখল। আনিস চমকে উঠল। হিম-শীতল হাত। লীলা বলল, আপনি যখন ট্রেনে উঠেছেন তখনো কি আপনার এত জ্বর ছিল?

জ্বর ছিল, এতটা ছিল কি-না জানি না।আপনার মাথায় পানি ঢালা দরকার। ট্রেনের কামরায় পানি ঢালব কীভাবে বুঝতে পারছি না।কিছু করতে হবে না। ধন্যবাদ।লীলা বলল, আপনি তো আমাদের সঙ্গে ঢাকা যাচ্ছেন না, আপনি যাবেন আপনার মায়ের কাছে। ভৈরব স্টেশনে নামবেন তাই না? হুঁ।স্টেশন থেকে একা যাবেন? আনিস বিড়বিড় করে বলল, জানি না।জানি না মানে কী?

আনিস জবাব দিল না। তার শরীর কাঁপছে। থারথার করে কাঁপছে। মুখে ফেনা জমছে। মঞ্জু বলল— ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে উনার মৃগী বেরাম আছে। ভালো বিপদে পড়লাম দেখি! লীলা বলল, বিপদ তো বটেই, কী করা যায় সেটা ভেবে বের করো।আমার মাথায় তো কিছুই আসছে না।

লীলা বলল, সামনের স্টেশনে ট্রেন থামবে। সেখানে আমরা উনাকে নিয়ে নেমে পড়ব। সেখান থেকে রিটার্ন ট্রেন যদি পাওয়া যায় তাহলে ট্রেনে বাড়ি ফিরে যাব। আর যদি ট্রেন না পাওয়া যায় তাহলে মহিষের গাড়ি কিংবা গরুর গাড়িতে বাড়ি ফিরব। আমরা তো মাত্র একটা স্টেশন পার হয়েছি। বেশিদূর তো যাই নাই।

মঞ্জু বিরক্ত মুখে বলল, লীলা, তোর তো মাথা খারাপ হয়ে গেছে।লীলা বলল, মামা, আমার মাথা খারাপ হয় নি। আমার চেয়ে ভালো বুদ্ধি যদি কিছু তোমার মাথায় আসে তুমি বলো, আমি শুনিব। উনার জ্বর যেভাবে বাড়ছে উনি তো কিছুক্ষণের মধ্যে কোমায় চলে যাবেন।

কোমায় যাক কিংবা সেমিকোলনে যাক, আমরা কি তাকে নিয়ে ফেরত যাব না-কি! এই লোকের দরকার চিকিৎসা। তাকে কোনো একটা হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। বাড়িতে নিয়ে লাভ কী? বাড়িতে কি হাসপাতাল আছে? হাসপাতাল না থাকলেও সেবাযত্ন আছে। বাজারে পাশ করা ডাক্তার আছে।বাড়িতে ফেরত যাবি? হুঁ।ঘটনা। যদি তার আগেই ঘটে যায় তাহলে কী করবি?

লীলা জবাব দিল না। সে আনিসের কপালে আবারো হাত রাখল। আনিস চমকে উঠল। তার কাছে মনে হচ্ছে, বরফের একটা খণ্ড তার মাথায় কেউ রেখেছে। বরফের ভেতর থেকে শুকনা বকুল ফুলের গন্ধের মতো গন্ধ নাকে আসছে। বরফ যেমন ঠাণ্ডা, বকুল ফুলের গন্ধটাও ঠাণ্ডা। নাকের ভেতর দিয়ে গন্ধটা ঢুকছে, সবকিছু ঠাণ্ডা করে দিচ্ছে। আনিস বলল, পানি খাব। বলেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। মেঘলা দিন, কামরার ভেতর তেমন আলো নেই, তবু সে চোখ মেলে রাখতে পারছে না। চোখের ভেতর কড়া আলো ঢুকে যাচ্ছে। চোখ কড়াকড়ি করছে।

কেউ-একজন চামচে করে তার ঠোটে পানি ধরছে। সেই কেউ-একজনটা কে? একটু আগে সে তাকে চিনতে পারছিল, এখন আর চিনতে পারছে না। তবে চেনা-চেনা লাগছে। ও আচ্ছা! মনে পড়ছে—যূথি। মা’র সঙ্গে রাগ করে সে কাঁচি দিয়ে খ্যাচ করে মাথার একগাদা চুল কেটে ফেলে, চুলের শোকে কেঁদে অস্থির। সে যূথিকে বলেছিল, এই যূথি, তুই তো তোর কাটা চুলগুলি ফেলেই দিবি— এক কাজ কর, আমাকে দিয়ে দে।

যূথি বলল, তুমি চুল দিয়ে কী করবে? সে বলল, জমা করে রাখব। একটা কোটায় ভরে সুটকেসে রেখে দেবী। যূথি বলল, চুল রেখে কী হবে? আসল মানুষটাকে রেখে দাও। বলেই কী ভয়ঙ্কর লজ্জা যে পেল! পরের তিনদিন তার আর দেখা নাই। এত যার লজ্জা সে কীভাবে অবলীলায় বলল, চুল রেখে কী হবে? আসল মানুষটাকে রেখে দাও। যূথির বয়স তখন কত হবে, চোদ-পনেরোর বেশি হবে না। এই বয়সে মেয়েদের আবেগও বেশি থাকে, লজ্জাও বেশি থাকে। বয়স যত বাড়তে থাকে লজা-আবেগ দুটাই কমতে থাকে।

আনিসের বুক শুকিয়ে আসছে। সে বিড়বিড় করে বলল, যূথি, পানি খাব। যূথি চামচে করে ঠোঁটে পানি দিচ্ছে। এত ঠাণ্ডা পানি সে কোথায় পেয়েছে কে জানে! মনে হচ্ছে সমস্ত মুখ ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছে। খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, যূথির সঙ্গে এইভাবে ট্রেনে দেখা হয়ে গেল! বেচারির ঘাড়ে এসে পড়ল রোগীর যত্ন। চামচে করে পানি খাওয়াতে হচ্ছে।

আনিসের যখন টাইফয়েড হলো তখনো যূথি খুব সেবা করেছে। যূথি মেয়েটার জন্মই হয়েছে সেবা করার জন্যে। আনিসের হাত-পা কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে। সে ক্লান্ত গলায় বলল, যূথি, তোমার চুলগুলি আমি খুব যত্ন করে রেখেছি। একটা হরলিক্সের কৌটায় ভরে সুটকেসে রেখে দিয়েছি। যূথি বলল, শুধু রেখে দিলে তো হবে না। মাঝে মাঝে বের করে রোদে দিতে হবে। সাজি মাটি দিয়ে ধুতে হবে।

কথাগুলি কি সত্যি যূথি বলছে, না অন্য কেউ বলছে? যূথি খুব নরম করে কথা বলে, এমন কঠিন করে কাটা কাটা ধরনের কথা বলে না। কে কথা বলছে চোখ মেলে দেখতে পারলে হতো। চোখ মেলা যাচ্ছে না। আনিস বুঝতে পারছে সে গভীর অতলে তলিয়ে যাচ্ছে। ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দ হচ্ছে, কিন্তু সে ট্রেনে করে যাচ্ছে না। সে ভাসতে ভাসতে যাচ্ছে।

আরে এ তো দেখি আরেক ঘটনা। মালেকভাইকে দেখা যাচ্ছে। মালেক ভাইয়ের চোখে কালো চশমা। চাদর দিয়ে শরীর ঢাকা।মালেক ভাই, ছাড়া পেলেন কবে? আনিস! জি মালেক ভাই।মারা যাচ্ছ না-কি?

জি।মৃত্যু খারাপ জিনিস না। মৃত্যু ভালো জিনিস।জি।সাহসী মানুষ মৃত্যুকে হাসিমুখে গ্ৰহণ করে।জি।আনিস, তুমি কি সাহসী? জি না।স্বদেশী আন্দোলনের সময় ছেলেগুলি যে ফাঁসিতে ঝুলেছে তারা সবাই যে ভয়ঙ্কর সাহসী ছিল তা-না। পরিস্থিতি তাদের সাহসী করেছে।জি।স্বদেশী আন্দোলন থেকে মুসলমান ছেলেরা পিছিয়ে গেল কেন আনিস?

আমি জানি না মালেক ভাই।কেন জানবে না? অবশ্যই জানো। আমি তোমাকে ব্যাখ্যা করেছি।এখন আমার কিছু মনে পড়ছে না মালেক ভাই। আমার শরীর খুব খারাপ। আমার জ্বর এসেছে। আমার মাথা এলোমেলো।তাহলে আমি বলি, তুমি শোনো।মালেক ভাই, আজ বাদ থাক।বাদ থাকবে কেন? তুমি চোখ বন্ধ করে শোনো। তোমার পাশে যে রূপবতী বসে আছে সে কে?

তার নাম যূথি।যূথি বলছি কেন? তার নাম তো লীলাবতী।ও হ্যাঁ, লীলাবতী। জ্বরের কারণে আমার মাথার ঠিক নাই। কী বলতে কী বলছি।মেয়েটার সঙ্গে তোমার প্রেম হয়ে যায় নাই তো?

জি না।গুড। ভেরি গুড। প্রেম হচ্ছে হৃদয়ের দুর্বলতা। আমরা সর্বক্ষেত্রে হৃদয়ের দুর্বলতা পরিহার করব।জি।এখন শোনো, মুসলমান ছেলেরা কেন স্বদেশী আন্দোলন থেকে সরে গেল।আজ থাক মালেকভাই। শোনো, মন দিয়ে শোনো–স্বদেশীরা বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ বই থেকে প্রেরণা পেত। এই বইয়ের মূলমন্ত্র বন্দেমাতরম গান–

বাহুতে তুমি মা শক্তি

হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি

তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।

তুংহি দূৰ্গা দশপ্রহরণ ধারিণী…কোনো মুসলমান ছেলে কি এই গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে নিতে পারে?

আপনি তো মুসলমান না! আপনি আল্লাহই বিশ্বাস করেন না।আমার কথা আসছে কেন? আমি তো স্বদেশী আন্দোলন করছি না। আমি একজন কমিউনিষ্ট। আমি সাম্যের কথা বলি–বিপ্লবের মাধ্যমে সাম্য।মালেক ভাই, আমার মাথাটা একটু তুলে ধরবেন! আমি বমি করব।ঐ মেয়েটাকে বলো–কী যেন তার নাম? লীলাবতী।পণ্ডিত ভাস্করাচার্যের একমাত্র কন্যা–লীলাবতী।

মাগরিবের নামাজ শেষ করে সিদ্দিকুর রহমান মাঝউঠোনে ইজিচেয়ারে বসে আছেন। মাগরিবের ওয়াক্তে ঘরে আলো দিতে হয়, আজি আলো দেয়া হয় নি। শুধু উঠোনে একটা হারিকেন জ্বলিয়ে রাখা হয়েছে। ঘরের ভেতর আলো না জুলানোর একমাত্র কারণ রমিলা। লীলা চলে যাবার পর থেকে তার মাথা পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে আছে।

তার গায়ে কোনো কাপড় নেই। সে কিছুক্ষণ পরপর সাপের মতো ফোসফোস করে কী যেন বলছে। দেয়ালে মাথা ঠুকে রক্ত বের করে ফেলেছে। সিদ্দিকুর রহমান সব খবর পেয়েছেন। কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। তিনি যদি শুধু সামনে গিয়ে বলেন–রমিলা, কাপড় পরো। সে কাপড় পরবে। সিদ্দিকুর রহমানের চেয়ার ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। ক্লান্তি লাগছে।

তার মনে হচ্ছে শরীরও খারাপ করেছে। মাথায় কোনো যন্ত্রণা নেই, কিন্তু মাথা দপদপ করছে। এটা কি বড় ধরনের রোগ-ব্যাধি শুরু হবার পূর্বলক্ষণ? তার কোনো অসুখ-বিসুখ হয় না। কাজেই অসুখের পূর্বলক্ষণ সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা নেই। রমিলার মাথা খারাপ হবার কিছুদিন পর এক গভীর রাত্রে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে তিনি আল্লাহপাকের কাছে বলেছিলেন— ইয়া রহমানুর রহিম, তুমি আমাকে যে-কোনো রোগ-ব্যাধি দিতে চাইলে দিও, কিন্তু আমার মাথাটা যেন ঠিক থাকে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যেন আমি সুস্থ মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারি। আমার যেন রমিলার মতো না হয়।

সিদ্দিকুর রহমানের ধারণা আল্লাহপাক তাঁর কথা শুনেছেন। সবরকম রোগব্যাধি থেকে তাকে মুক্ত রেখেছেন। আজ যদি রমিলার মতো অবস্থা তার হতো! একটা ঘরে তাকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তার গায়ে কোনো কাপড় নেই। লোকজন আসছে, তাকে নগ্ন অবস্থায় দেখছে। তিনিও হাসিমুখে তাদের সঙ্গে গল্প করছেন। স্বাভাবিকভাবেই গল্প করছেন। যেসব পাগল সম্পূর্ণ নগ্ন থাকে তারা কথাবার্তা বলে খুবই স্বাভাবিকভাবে। এই ধরনের পাগলদের পাগলামি নগ্নতায় সীমাবদ্ধ।

চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। সুলেমান হারিকেন জ্বলিয়ে তার ইজিচেয়ারের পেছনে এনে রাখল। সিদ্দিকুর রহমান বললেন— সুলেমান, মাসুদকে কি তুমি ট্রেনে তুলে দিয়েছিলে? সুলেমান বলল, জি।টিকিট কেটে দিয়েছ, না-কি বিনা টিকিটে তুলে দিয়েছ?

বিনা টিকিটে।এটা ভালো করেছ। সে কি কান্নাকাটি করছিল? জি না।চোখের পানি ফেলে নাই? জি না।এটা খারাপ না। শুনে আনন্দ পেলাম। কিছুটা তেজ তাহলে এখনো আছে। বিষধর সাপের বিষ আর পুরুষের তেজ–দুটাই এক জিনিস। বিষধর সাপের বিষ শেষ হয়ে গেলে সাপের মৃত্যু হয়। পুরুষের তেজ শেষ হওয়া মানে পুরুষের মৃত্যু। বুঝেছ?

জি।মেয়েদের তেজটা কী জানো? জি না।মেয়েদের তেজ তাদের চোখের পানিতে। যখন কোনো মেয়ের চোখের পানি শেষ হয়ে যায়— তখন সেই মেয়েরও মৃত্যু হয়। বুঝেছ? জি।তোমাকে কেন জানি চিন্তিত মনে হচ্ছে। সুলেমান, তুমি কি কোনো বিষয় নিয়া চিন্তিত?

সুলেমান জবাব দিল না। মাথা নিচু করে বসে রইল। তাকে দেখে এখন সত্যি সত্যি খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, কোনো বিষয়ে নিয়া চিন্তা করার প্রয়োজন হলে সেটা আমারে বলো। আমি চিন্তা করব। চিন্তা করার ক্ষমতা আল্লাহপাক সব মানুষকে দেন নাই। অল্পকিছু মানুষ চিন্তা করতে পারে। জগতের বেশিরভাগ মানুষ তোমার মতো কাজ করতে পারে। চিন্তা করতে পারে না।

সুলেমান এখনো মাথা নিচু করে আছে। তার দৃষ্টি উঠানে নিবদ্ধ। সিদ্দিকুর রহমান ঠিকই ধরেছেন। সে খুবই চিন্তিত এবং ভীত। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেছে। কারণ একটু আগে সে বড় ধরনের একটা মিথ্যা কথা বলেছে। তার ধারণা— মিথ্যা কথাটা ধরা পড়ে গেছে।

এখনি সওয়াল-জবাব শুরু হবে। তার কঠিন শাস্তি হবে। সিদ্দিকুর রহমানের নিয়ম হলো, কঠিন শাস্তি দেবার আগে-আগে তিনি হালকা মেজাজে হাসিমুখে কথাবার্তা বলেন। অপরাধীর সঙ্গে ঠাট্টা-তামাশাও করেন। অপরাধীর ধারণা হয়ে যায় সে মাপ পেয়ে গেছে। সে যখন মোটামুটিভাবে নিশ্চিন্ত হতে শুরু করে তখনি শাস্তির হুকুম হয়। তার বেলাতেও কি এই ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে! সেরকমই তো মনে হচ্ছে। সুলেমান গুটিয়ে গেল।

মিথ্যা কথা সে যা বলেছে তা হলো, মাসুদকে সে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসে। নি। উত্তরপাড়ার সুরুজ মিয়ার বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছে। এই কাজটা যে সে নিজ থেকে করেছে তা-ও না। এত সাহস তার নেই। কাজটা সে করেছে লীলাবতীর কথামতো। লীলাবতী বলে গিয়েছিল— মাসুদ ফিরে এলে তার বাবা তাকে আবার ট্রেনে করে পাঠিয়ে দিতে বলবেন।

এই কাজটা তখন যেন না করা হয়। মাসুদকে যেন লুকিয়ে রাখা হয়। দু’একদিন পর তার বাবার রাগ খানিকটা পড়বে। ছেলের জন্যে মনখারাপ হবে। তখন যেন মাসুদকে নিয়ে আসা হয়। বুদ্ধিটা খুবই ভালো। সমস্যা একটাই— যার বুদ্ধি সে উপস্থিত নাই। বুদ্ধি দেয়া মানুষটা চলে গেছে। যন্ত্রণা এসে পড়েছে তার ঘাড়ে। অন্যের বুদ্ধিতে এত বড় যন্ত্রণা মাথায় নেয়া ঠিক হয় নাই।সুলেমান! জি চাচাজি? আমার মেয়ে লীলাবতীকে যখন ট্রেনে তুলে দিলা তখন কি সে কাঁদতেছিল?

জি।অল্প কেঁদেছে, না বেশি কেঁদেছে? বেশি কেঁদেছে। ঘনঘন শাড়ি দিয়ে চোখ মুছেছে। সিদ্দিকুর রহমান ইজিচেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। আগ্রহ নিয়ে বললেন— আমার এই মেয়ে যে পুরোপুরি তার মা’র মতো হয়েছে তা কিন্তু না। তার মাকেও আমি ট্রেনে তুলে দিয়েছিলাম। সে এক ফোটা চোখের পানি ফেলে নাই।

সুলেমান শঙ্কিত বোধ করছে। সে আবারো একটা মিথ্যা কথা বলে ফেলেছে। লীলাবতী কোনো চোখের পানি ফেলে নাই। সহজ স্বাভাবিকভাবে ট্রেনে উঠে বসেছে। বরং হাসিমুখে সবার দিকে তাকিয়েছে। তাহলে আগ বাড়িয়ে সুলেমান এই মিথ্যা কথাটা কেন বলল?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *