লীলা পরীবানুর সঙ্গে কথা বলে অবাক হয়েছে। মেয়েটা গ্রামের মেয়েদের মতো কথা বলছে না। মোটামুটি শুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করছে। মেয়েটিকে লীলার বুদ্ধিমতী বলেও মনে হচ্ছে। মেয়েটা এই বাড়ির ব্যাপারগুলি বোঝার চেষ্টা করছে। যে-পরিস্থিতিতে মেয়েটা এসেছে সেই পরিস্থিতিতে পড়লে সব মেয়েই হাল ছেড়ে দেবে। স্রোতে গা ভাসিয়ে দেবে। কোনোকিছু বোঝার চেষ্টা করবে লীলা বলল, তুমি কি শহরে কিছুদিন ছিলে?
পরী বলল, জি। আমি ময়মনসিংহে থাকি। বিদ্যাময়ী স্কুলে পড়ি। ছুটিতে বাড়িতে আসি।কোন ক্লাসে পড়ো? এবার ম্যাট্রিক দিব।তোমার সঙ্গে মাসুদের পরিচয় কোথায় হয়েছে? ময়মনসিংহে? জি না। আমাদের বাড়িতে। উনি বাবার কাছে গান শুনতে আসতেন।তুমি গান জানো? জি না।লীলা বলল, তুমি কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকো। রান্না হয়ে গেলেই আমি তোমাকে নিয়ে খেতে বসব।
পরী কিছু বলল না। তবে লীলার কথামতো কুণ্ডলি পাকিয়ে খাটে শুয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে নতুন বউ ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমের মধ্যে সে স্বপ্নে দেখল তার দাদিকে। দাদি খাট ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখ হাসি-হাসি। তিনি বললেন, তোর শ্বশুরবাড়ি দেখতে আসছি। খুশি হয়েছি। এদের বিরাট শান-শওকত। তবে মানুষজন নাই। ঘরবাড়ি জিনিসপত্র দিয়া শান-শওকত হয় না। শান-শওকত হয় মানুষজন দিয়া। তুই একলা শুয়ে আছিস। তোর জামাই কই?
পরী হাসতে হাসতে বলল, তারে তালাবদ্ধ করে রেখেছে।কী জন্যে? জানি না।তালাবদ্ধ কে করছে? আমার শ্বশুর সাহেব করেছেন।এই লোকের দেখি স্বভাব ভালো না! সবেরে তালাবদ্ধ করে রাখে। নিজের স্ত্রীকেও শুনেছি তালাবন্ধ করে রেখেছে।বেশিক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকবা না দাদি। শেষে তোমারেও তালাবন্ধ করবে। আমারে তালাবন্ধ করে করুক, তোর জামাইরে কেন করবে? যা তারে ছুটিয়ে নিয়ে আয়।কীভাবে ছুটায়ে আনব? আমার কাছে চাবি নাই।চাবি আমি নিয়া আসছি। এই নে।
বৃদ্ধ বড় একটা পিতলের চাবি পরীর হাতে দিলেন। পরী সেই চাবি সঙ্গে সঙ্গে শাড়ির আঁচলে বেঁধে ফেলল। তখনি তার ঘুম ভাঙল। স্বপ্নটা এত বাস্তব ছিল যে ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে পরী শাড়ির আঁচল ঘুরেফিরে দেখল। রাত কত হয়েছে পরা বুঝতে পারছে না। কোনোরকম সাড়াশব্দ নেই। মনে হচ্ছে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে সঙ্গে এই বাড়িটাও বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের নিজেদের বাড়ির অবস্থা অন্যরকম। সন্ধ্যার পর থেকে লোকজন আসতে থাকে। রাত একটু বাড়ার পর ঢোলের বাড়ি পড়তে শুরু করে। মাঝরাতে শুরু হয়। গানের আসার। বন্দনা দিয়ে শুরু হয়–
পশ্চিমে বন্দনা করি সোনার মদিনা
ঝলমল ঝলমল ঝলমল ঝলমল
সোনার মদিনা…লীলা নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে পরীকে চমকে গিয়ে বলল, ঘুম ভেঙেছে? পরী বলল, জি।রান্না হয়ে গেছে। তুমি ঘুমাচ্ছিলে বলে ঘুম ভাঙাই নি। এসো খেতে বসি। মাথা ধরা এখনো আছে? না।বাবা-মা, ভাই-বোনদের জন্য মনখারাপ লাগছে? না।
মনখারাপ লাগছে না কেন? জানি না। খাওয়ার আয়োজন ভেতরের বারান্দায়। পোলাও-কোরমা, মাছভাজি–অনেক আয়োজন। পরী কিছুই খেতে পারছে না। হাত দিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করছে। লীলা বলল, খেতে পারছ না? পরী বলল, না। আপনি খান। আমি বসে থাকি।লীলা কিছুক্ষণ পরীর দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, পরী, তোমার কি সন্তান হবে?
পরী বলল, হ্যাঁ।বিয়েটা কি এইজন্যই তাড়াহুড়া করে গোপনে করে ফেলেছ? পরী হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।লীলা বলল, কয় মাস কী, এইসব হিসাব কি তোমার আছে? পরী বলল, হিসাব আছে। তিন মাস।লীলা বলল, তোমরা দু’জন যে বিরাট একটা অন্যায় করেছ, এটা কি জানো?
আমি কোনো অন্যায় করি নাই। আপনি কাউকে বলেন, শুকনা মরিচের ভর্তা বানিয়ে আমাকে দিতে। মরিচভর্তা ছাড়া অন্যকিছু দিয়ে আমি ভাত খেতে পারি না।লীলা পরীর দিকে তাকিয়ে আছে। পরী বসে আছে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। তাকিয়ে আছে লীলার দিকে। সেই দৃষ্টিতে কোনো অস্বস্তি নেই।
রাতের খাবারের পরপরই সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছিল। লোকমান হুক্কার নল তার হাতে ধরিয়ে দিল। তিনি ঘুমের ঘোরে। দুটা টান দিলেন। তার মনে হলো নল-হাতেই তিনি ঘুমিয়ে পড়বেন। এই লক্ষণ ভালো না। এই লক্ষণ বার্ধক্য এবং স্থবিরতার লক্ষণ। স্থবির মানুষরাই মুখভর্তি পান নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। হুঙ্কার নল হাতে ঘুমিয়ে পড়ে।
সিদ্দিকুর রহমান ঘুম তাড়াবার চেষ্টা করলেন। ঘুমটা যাচ্ছে না। আবারো যেন চেপে আসছে। জটিল কোনোকিছু নিয়ে চিন্তা করলে কিংবা কারো সঙ্গে জটিল আলোচনা করলে ঘুমটা হয়তো কাটবে। তিনি চাপা গলায় ডাকলেন, লোকমান! লোকমান তার ইজিচেয়ারের পেছনে বসেছিল। সেখান থেকে জবাব দিল— জি চাচাজি? মাস্টারের খবর কী?
উনি ভালো আছেন। আজ সারাদিনে জ্বর আসে নাই।উনারে ডেকে নিয়ে আসো।জি আচ্ছা। সিদ্দিকুর রহমান ঘুমিয়ে পড়তে চান না। এখন ঘুমিয়ে পড়া মানে রাত দুইটা-আড়াইটার দিকে ঘুম ভেঙে জেগে ওঠা। খাটে বসে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকা। সাপে-কাটা রোগীকে কিছুতেই ঘুমাতে দেয়া হয় না। তিনি কল্পনা করছেন চার-পাঁচ হাত লম্বা কালো একটা চন্দ্ৰবোড়া সাপ তার পায়ে ছোবল দিয়েছে। ওঝা এসে বিষ ঝাড়বে।
বিষ না নামানো পর্যন্ত তাকে জেগে থাকতে হবে।আমাকে ডেকেছেন? সিদ্দিকুর রহমান বললেন, মাস্টার, জলচৌকিটার উপর বসো।আনিস বসল। সিদ্দিকুর রহমান হঠাৎ লক্ষ করলেন, তার ঘুম পুরোপুরি চলে গেছে। তিনি সামান্যতম আলস্যও বোধ করছেন না। তার শরীর ঝনঝন করছে।মাস্টার, কেমন আছ?
জি ভালো।তুমি তো আমাদের মোটামুটি ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে। ভালো কথা, তুমি গায়ে সেন্ট মেখেছ না-কি? সেন্টের গন্ধ পাচ্ছি।আনিস লজ্জিত গলায় বলল, পাঞ্জাবির পকেটে কয়েকটা আমের মুকুল রেখেছি। আমের মুকুলের গন্ধ।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তুমি কি একটা জিনিস লক্ষ করেছ? ফুল যতক্ষণ গাছে থাকে তখন তার একরকম গন্ধ, যেই তুমি ফুল ছিড়ে হাতে নিবে তখনি তার অন্যরকম গন্ধ।ব্যাপারটা আমি লক্ষ করি নাই।লক্ষ করে দেখবে। কিছু-কিছু ফুলগাছ আছে যাদের শেকড়ের গন্ধও ফুলের গন্ধের মতো।আমি আপনার কাছে প্রথম শুনলাম। আগে কোনোদিন শুনি নাই।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, আমি এমন অনেক কথাই তোমাকে বলতে পারি যেটা তুমি আগে কখনো শোনো নাই। বলার মতো মানুষ পাই না বলে বলি না। সব কথা সবাইকে বলা ঠিক না। মাস্টার, খাওয়াদাওয়া করেছ? জি করেছি।আজ আমার বাড়িতে ছেলের বউ প্রথম এসেছে। খাওয়াদাওয়ার বিরাট আয়োজন করা উচিত ছিল। আয়োজন করা হয় নাই। মনে রাগ নিয়া উৎসবের আয়োজন করা যায় না।
রাগটা কী জন্যে? আপনাকে না জানিয়ে ছেলে বিয়ে করে ফেলেছে এই জন্যে? এটা রাগ করার মতো কোনো কারণ না।সিদ্দিকুর রহমান হতভম্ব হয়ে বললেন, এটা রাগ করার মতো কারণ না? আনিস বলল, জি-না। কোনো কারণ না। বিয়েটা সম্পূর্ণ আপনার ছেলের নিজের ব্যাপার। সে তার নিজের সংসার করবে। সেই সংসারে আপনি কে? আমি কেউ না?
জি না। আপনি কেউ না। মাসুদের সংসার মাসুদের। আপনারটা আপনার।আনিস জলচৌকিতে বসতে বসতে বলল, আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন মাসুদের বিষয়ে দুএকটা কথা বলব।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, অনুমতি দিলাম না।সিদ্দিকুর রহমান হুক্কার নলে টান দিতে লাগলেন। আগুন নিভে গেছে, নলে টান দিলে গুড়ুক গুড়ুক শব্দ হয়। শব্দটা শুনতে ভালো লাগে। মনে হয় তিনি কোনো–একটা কাজের মধ্যে আছেন। মাস্টার! জি?
তোমার একটা ব্যাপার আমি লক্ষ করেছি। তুমি কোনো-না-কোনোভাবে আমার সঙ্গে তর্ক বাঁধায়ে দিতে চাও। কোনো-একটা বিষয়ে তুমি আমার সঙ্গে একমত হয়েছ এরকম মনে হয় না।আনিস নিচু গলায় বলল, তার কারণ হয়তো এই যে, আপনি যে-মতের জগতে বাস করেন আমি সেই জগতে বাস করি না। আজ আপনার বাড়িতে ছেলের বউ এসেছে। এই উপলক্ষে সবাই নতুন কাপড় পেয়েছে। আমিও একটা পাঞ্জাবি পেয়েছি। অথচ এই আনন্দের দিনে আপনি আপনার ছেলেটাকে তালাবন্ধ করে রেখেছেন।এই ছেলে তোমার হলে তুমি তাকে কোলে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতে?
তা করতাম না। কিন্তু তাকে তালাবন্ধ করেও রাখতাম না।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, আমি আমার ছেলের বিষয়ে পরামর্শ করার জন্যে তোমাকে ডাকি নাই। যে-কারণে ডেকেছি সেটা মন দিয়ে শোনো।আনিস কৌতূহলী হয়ে বলল, কী কারণে ডেকেছেন? সিদ্দিকুর রহমান বললেন, আমি একটা আশ্রম বানাতে চাই।আনিস বলল, আপনি কী বললেন, বুঝতে পারলাম না। কী বানাতে চান? আশ্রম বানাতে চাই।আশ্রম বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন? অর্থটা পরিষ্কার হচ্ছে না। যেখানে আশ্রয় আছে সেটাই আশ্রম। আশ্রয় তো আপনার আছে।
সিদ্দিকুর রহমান আধশোয়া অবস্থা থেকে উঠে বসলেন, লোকমান টিক্কায় আগুন ধরিয়ে নতুন তামাক দিয়েছে। এই আম্বরী তামাকের বিশেষত্ব হলো— প্রথম কিছুক্ষণ খুব সুন্দর গন্ধ থাকে। তারপর হঠাৎ গন্ধটা মরে যায়। তিনি তামাক টানেন গন্ধ মরে না যাওয়া পর্যন্ত। এখন তামাকে টান দিলেন না। মাস্টারের দিকে তাকিয়ে খানিকটা লজ্জিত গলায় বললেন, আশ্রম বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছি সেটা আমিও জানি না।আপনার কল্পনায় কী আছে?
আমার কল্পনায় আছে খুব সুন্দর একটা জায়গা। চারদিকে গাছ। চেনা অচেনা গাছ। পানির ঝরনা। অতি নির্জন। কোনো লোকজন নাই। চারদিকে শান্তি।এরকম একটা জায়গার কথা আপনার মাথায় কী জন্যে এসেছে সেটা কি জানেন?একটা বইয়ে এরকম পড়েছিলাম। পড়াটা মাথার মধ্যে ঢুকে গেছে।বইটার নাম কী? লেখকের নাম কী?
কিছুই মনে নাই। বইটার ঘটনাও মনে নাই। যেটা মনে আছে সেটা হলো— একটা মানুষ আশ্রমে থাকে। মহাশান্তির মধ্যে বাস করে। পাহাড়ি একটা ঝরনা আছে। ঝরনার পানি টলটলা নীল। ঝরনা যেখানে পড়েছে সেখানে পানি জমেছে। মানুষটা নগ্ন হয়ে সেই পানিতে সাঁতার কাটে। এইটুকু মনে আছে। আর কিছু মনে নাই।আনিস বলল, আপনি আশ্রম কী জন্যে বানাতে চান, নগ্ন হয়ে সাঁতার কাটার জন্যে?
কথাটা বলেই আনিসের মনে হলো, সে খুবই অসৌজন্যমূলক কথা মানুষটাকে বলেছে। তার কথার মধ্যে ঠাট্টার ভাব প্রবল। এমন একজন বুদ্ধিমান মানুষ ঠাট্টা বুঝবেন না তা হয় না। কেউ তাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে এবং তিনি তা সহ্য করে যাবেন তা কখনো হবে না।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, মাস্টার, তুমি আমার সঙ্গে রসিকতা করার চেষ্টা করেছ। রসিকতাটা আমি গায়ে মাখলাম না। কারণ ঐ বইটার মানুষটা শুধু যে সাঁতারের সময় নগ্ন থাকতেন তা না। সারাক্ষণই নগ্ন থাকতেন। কে তাকে নিয়ে কী ভাবছে তা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। কারণ তিনি বাস করতেন সম্পূর্ণ তার নিজের অঞ্চলে। কেউ সেখানে ঢুকতে পারত না।
আপনি এরকম একটা জায়গা বানাতে চান? হ্যাঁ। আমি অনেকখানি জমি কিনেছি। এই বিষয়ে তোমার মতামত কী? আনিস বলল, আমি কোনো মতামত দিতে পারছি না। কারণ আপনি কী বলার চেষ্টা করছেন আমি বুঝতে পারছি না। ভাসাভাসা ঘটনা শুনে ভাসাভাসা মত দেয়া যায়।
সিদ্দিকুর রহমান বললেন, তোমার ভাসাভাসা মতটা কী? আনিস বলল, আমার ভাসাভাসা মতটা হলো, আপনার শরীরটা ভালো না। আপনি অসুস্থ। আপনার ভেতর মৃত্যুচিন্তা ঢুকে গেছে।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, মাস্টার, আমার মৃত্যুচিন্তা আছে। ভয় নাই। জীবনে একবার বিরাট ভয় পেয়েছিলাম। সেই ভয় আরো একবার পাব। এর বাইরে ভয় পাব না।কী দেখে ভয় পেয়েছিলেন?
সেটা তোমাকে বলব না। আচ্ছা তুমি এখন যাও। এখন আর কথা বলতে ইচ্ছা করতেছে না।কথা বলার দরকার নাই। দুজন চুপচাপ বসে থাকি।আচ্ছা থাকো বসে।কুঁজা মাস্টার বসে আছে। সিদ্দিকুর রহমান হঠাৎ ব্যাপারটায় মজা পেয়ে গেলেন। দেখা যাক মাস্টার কতক্ষণ বসে থাকতে পারে। একটা ধৈর্যের খেলা হয়ে যাক।
কেউ একজন আমাকে তিনটা ডিকশনারি পাঠিয়েছে। ইংলিশ টু ইংলিশ, ইংলিশ টু বেঙ্গলি এবং বেঙ্গলি টু বেঙ্গলি। প্রেরকের নাম শরিয়তুল্লাহ। ঠিকানা— এগারো তস্তুরিবাজার ঢাকা। আমি শরিয়তুল্লাহ নামের কাউকে চিনি না। তস্তুরিবাজারের শরিয়তুল্লাহ সাহেব জানেন না যে আমার ডিকশনারি প্রয়োজন। একজন জানেন, তিনি মালেক ভাই। তিনি তস্তুরিবাজারে থাকেন না। তিনি থাকেন রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে।
আমার চিঠি তাঁর কাছে পৌঁছেছে এবং তিনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। পৃথিবীতে অল্পসংখ্যক মানুষ আছে যারা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়। মালেক ভাই তেমন একজন।আমি ঠিক করে ফেললাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাব। পুলিশ ধরলে ধরবে। জেলখানায় তার সঙ্গে থাকতে পারাও হবে ভাগ্যের ব্যাপার। তিনি সব সময় বলতেন, সব মানুষেরই কিছুদিন জেলে থাকা উচিত। জেল মানুষকে শুদ্ধ চিন্তা করতে শেখায়। পৃথিবীর মহৎ চিন্তার আশি ভাগ করা হয়েছে জেলখানায়।
তাঁর কথা শুনে আমি বলেছিলাম, যে মহৎ চিন্তা জেলখানায় করা যাবে সেই চিন্তা ঘরে বসে করা যাবে না কেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, মানুষ যখন শারীরিকভাবে বন্দি থাকে তখন ভারসাম্য রক্ষার জন্য প্রকৃতি তার মন মুক্ত করে দেয়। মুক্ত মন ছাড়া মহৎ চিন্তা সম্ভব না।আমি বললাম, খারাপ চিন্তা কিংবা নিচ চিন্তা করার জন্যে আমরা কোথায় যাব?তিনি বললেন, জেলখানা। সৎ চিন্তা যেখানে হবে অসৎ চিন্তাও সেখানেই হবে। তাছাড়া ইকুইলিব্রিয়াম হবে না। প্রকৃতি ইকুইলিব্ৰিয়াম চায়।
ডিকশনারি হাতে পাওয়ার পর পরই আমি ঠিক করেছি, মালেক ভাই জেলখানা থেকে ছাড়া পেলেই তাকে বিশ্রামের জন্যে কিছুদিন এখানে নিয়ে আসব। জেলখানার লাপসি খেয়ে খেয়ে যে অভ্যস্ত তার সামনে সপ্তম ব্যঞ্জন দিলে সে কী করবে? মালেক ভাই কী করবেন। আমি জানি। তিনি গম্ভীর মুখে কিছুক্ষণ খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকবেন তারপর ভারী গলায় বলবেন— নগরের এক প্রান্তে প্রচুর খাবার কিন্তু কোনো ক্ষিধে নেই।
অন্য প্রান্তে প্রচুর ক্ষিধে কিন্তু কোনো খাবার নেই।মালেক ভাইয়ের সামনে যতবার ভালো কোনো খাবার দেয়া হয়েছে। ততবারই তিনি এই কথা বলেছেন। কিন্তু ভালো খাবার খেয়েছেন খুব আগ্ৰহ নিয়ে। কোনো এক বাড়িতে উনি হয়তো গলদা চিংড়ি খেলেন। এই গল্প তিনি করবেন কম করে হলেও পঞ্চাশবার। মুগ্ধ গলায় বলবেন— আহা কী রান্না! স্বাদ মুখে লেগে গেছে। বাবুর্চির হাত সোনা দিয়ে বঁধিয়ে দেয়া দরকার।
সমস্যা হচ্ছে, এই বাড়িতে তাকে আনা যাচ্ছে না। কারণ আমি নিজেই চলে যাচ্ছি। আমার মন টিকছে না। আমি এখানে বিশাল এক বাড়িতে বাস করি। চারদিকে খোলা প্ৰান্তর। অথচ আমার নিজেকে সারাক্ষণ বন্দি মনে হয়। কোনো রকমে যদি জেলে ঢুকতে পারতাম তাহলে হয়তো উল্টা ব্যাপার হতো। নিজেকে মুক্ত মনে হতো।
এই বাড়িতে থাকতে না চাওয়ার পিছনে আরো একটা বড় কারণ আছে। কারণটা হাস্যকর। লীলাবতী নামের মেয়েটাকে আমি প্রতিরাতেই স্বপ্নে দেখছি। অতি বিচিত্র সব স্বপ্ন। পরশু রাতে দেখেছি দুজন নৌকায় করে কোথাও যাচ্ছি। বেশ বড় পালতোলা নৌকা। নৌকা চলছে। বাইরে রোদ। আমি রোদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে ছাঁই-এর ভেতর শুয়ে আছি।
লীলাবতী ছাই-এর বাইরে। সে বলল, চারদিকে এত সুন্দর দৃশ্য আর তুমি যােচ্ছ ঘুমাতে ঘুমাতে! উঠ তো। আমি বললাম, ঘুম পাচ্ছে তো। সে বলল, আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাও। আমি বললাম, তাহলে তুমি ভেতরে আসো। আমি বাইরে যাব না। বাইরে রোদ। সে বলল, তোমার গায়ে রোদ লাগবে না। আমি শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথা ঢেকে রাখব।
স্বপ্নের শেষ অংশটা ভয়াবহ। আমি নৌকার গলুই-এ লীলাবতীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছি। লীলাবতী রোদ থেকে আমাকে বাচানোর জন্যে আমার মুখের উপর শাড়ির আঁচল ধরে আছে। শাড়ির আঁচলের ভেতর থেকে লীলাবতীর হাসি হাসি মুখ আমি দেখতে পাচ্ছি।এই ধরনের স্বপ্ন দেখার অর্থ একটাই— আমি সমস্যায় পড়েছি। ভয়াবহ সমস্যা।
সমস্যায় পড়ার কোনো কারণ কিন্তু নেই। লীলাবতীর সঙ্গে আমার দেখা হয় না বললেই হয়। আর দেখা হলেও কথা হয় না। তবে এক সন্ধ্যায়। একটা ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনাটা এরকম— আমি বসে অপেক্ষা করছি, আমার দুই ছাত্রী হারিকেন হাতে উপস্থিত হবে। তারা এলো না। চাঁদরে শরীর ঢেকে উপস্থিত হলো লীলাবতী। সহজ-স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমার সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বলল, মাস্টার সাহেব, ভালো আছেন? আমি বললাম, জি।হাতে বেত নিয়ে বসে আছেন কেন?
আমি হাতের বেত নামিয়ে রাখলাম। একটু মনে হয় অপ্ৰস্তুত বোধ করলাম। লীলাবতী বলল, জাইতরী কইতরী দুজনই আপনাকে প্রচণ্ড ভয় পায়। এটা কি ভালো? আমি বললাম, শিক্ষককে ভয় পাওয়া ভালো। শিক্ষক খেলার সাথি না। আমি তাদের সঙ্গে সাপ-লুড়ু খেলি না।আপনি বেত দিয়ে তাদের মারেন? মাঝে মাঝে শাসন করতে হয়। মানুষকে সবসময়ই কিছু অপ্রিয় প্রয়োজনীয় কাজ করতে হয়। শিক্ষকের শাসন সেরকম একটা বিষয়। অপ্রিয় কিন্তু প্রয়োজনীয়।
লীলাবতী শান্ত গলায় বলল, আপনি কিন্তু শাসন করার জন্যে তাদের মারেন না। আমি আড়াল থেকে কয়েকবার দেখেছি। আপনি তের ঘরের নামতা জিজ্ঞেস করেন। এরা দুইজনেই তের ঘরের নামতা জানে। আপনাকে ভয় পেয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। আপনি এই সুযোগটা গ্ৰহণ করেন।আমি চুপ করে রইলাম। লীলাবতী তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তার চোখে সামান্য উত্তেজনাও নেই। তার তাকানোর ভঙ্গি, কথা বলার ভঙ্গি বলে দিচ্ছে সে তৈরি হয়ে এসেছে।
মাস্টার সাহেব! জি।তের ঘরের নামতা আপনার একটা অজুহাত। আমি একবার শুনলাম জইতরী। ঠিকই বলল চার তের বাহান্ন। তারপরেও আপনি তাকে মারলেন। আপনার সমস্যাটা কী? আপনি নিজে কি তের ঘরের নামতা জানেন? আমার তো ধারণা। আপনি নিজেই জানেন না।
বলতে বলতেই লীলাবতী হাত বাড়িয়ে টেবিলের উপরে রাখা বেতটা টেনে নিল। এবং কঠিন গলায় বলল, বলুন সাত তের কত? এক্ষুনি বলুন। এক্ষুনি বলতে না পারলে কিন্তু আপনার সমস্যা আছে।আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। কী করছে এই মেয়ে? তার হাতে বেত। সে বেতটা দোলাচ্ছে। জাইতরী-কইতরীকে পড়বার সময় আমি যেভাবে বেত দোলাতাম অবিকল সেইভাবে। লীলাবতী বলল, দেরি করবেন না এক্ষুনি বলুন।
একানব্বই। লীলাবতী হেসে ফেলে বলল, হয়েছে। আপনি কী ভেবেছিলেন? আপনাকে মারব? লীলাবতী উঠে চলে গেল। আমার হতভম্ব ভাব কাটছে না। আমি বসেই আছি। কখন যে জাইতরী-কইতরী এসেছে, মাথা দুলিয়ে পড়তে শুরু করেছে। আমার খেয়াল নেই। আমি ওদের দিকে তাকিয়ে বললাম, কেমন আছ তোমরা?
দুই বোন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। একবার নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। কইতরীর চোখে তীব্র আতঙ্ক। আমি বুঝতে পারছি সে টেবিলের নিচ দিয়ে হাত বাড়িয়ে জইতরীর হাঁটু ধরেছে। আমি বললাম, আজ আমার শরীরটা ভালো না। আজ পড়াব না।জইতরী ক্ষীণ গলায় বলল, স্যার, চলে যাব?
আমি বললাম, হুঁ।আমি আমার জায়গায় বসে আছি। শুনতে পাচ্ছি মেয়ে দুটি মঞ্জু। সাহেবের ঘরে ঢুকে বিরাট হৈচৈ শুরু করেছে। তিনজন মিলে কোনো একটা খেলা বোধহয় খেলছে। মঞ্জু সাহেব অদ্ভুত ভাষায় কিছু বলছেন, মেয়ে দুটিও অদ্ভুত ভাষায় তার কথার জবাব দিচ্ছে। কিছুক্ষণ কান পেতে থেকে আমি অদ্ভুত ভাষার রহস্য উদ্ধার করলাম।
মঞ্জু, সাহেব বললেন, তিটমরা কিটি কিটরো? যার অর্থ— তোমরা কী করো? জইতরী বলল, মিটজ কিটরি। অর্থ হলো, মজা করি। বাচ্চা দুটি কী সুখেই না আছে! মঞ্জু সাহেব যে আনন্দ নিয়ে এদের সঙ্গে খেলছেন আমি কোনোদিনও এত আনন্দ নিয়ে কারো সঙ্গে খেলতে পারব না। খেলতে পারলে ভালো হতো। লীলাবতীকে বলতাম, তিটুমি কিটেমন ইটাছ? (তুমি কেমন আছ?) সে বলত, ভিটালো (ভালো)। আমি বলতাম, বিটসো (বসো)। সে বলত, কিটি কিটরেন? (কী করেন?) আমি বলতাম..
আমি রাতে ভাত খেলাম না। রাগ করে খেলাম না তা না। ভাত না খাওয়ার পেছনে একটাই উদ্দেশ্য কাজ করছিল। কোনোভাবে লীলাবতীর কাছে খবর যাবে আমি ভাত খাই নি। সে আসবে আমার কাছে। আমাকে বলবে, আমার উপরে রাগ করে ভাত খাচ্ছেন না— এটা কেমন কথা? খেতে বসুন।লীলাবতী এলো না। আমি তিনটা পৰ্যন্ত জেগে বসে রইলাম। সেই রাতে যথারীতি আবারো লীলাবতীকে স্বপ্নে দেখলাম। আমি ভাত খাচ্ছি। সে আমার সামনে বসে আছে। তার হাতে বেত, মুখে হাসি। আমি বললাম, তুমি বেত হাতে বসে আছ কেন?
সে বলল, তুমি খাওয়া নিয়ে গণ্ডগোল করবে। আর আমি তোমার মাথায় বেতের বাড়ি দেব। বেশি করে ভাত নাও।আমি ভাত নিলাম। সে বলল, এখন আমাকে বলো যূথি মেয়েটা কে? তুমি যতবার অসুস্থ হও ততবার যূথিকে ডাকো।যূথি আমার খালাতো বোন। ওর বিয়ে হয়ে গেছে।বিয়ে হোক বা কুমারী থাক, খবরদার আর কখনো যূথির নাম মুখে আনবে না।আচ্ছা।যদি আবার কোনোদিন যূথির নাম মুখে আনো আমি কিন্তু বেত দিয়ে তোমাকে মারব।আমার যে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি সেটা বুঝতে পারছি। সুস্থ মাথার মানুষ রোজ রাতে একই ধরনের স্বপ্ন দেখবে না।
স্বপ্ন ছাড়াও আমার অসুস্থতার আরো একটা লক্ষণ প্ৰকাশ পেয়েছে। দস্তয়োভস্কির ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্টের অনুবাদ এখন বন্ধ। এখন আমি খাতায় গুটিগুটি করে একটা শব্দই লিখি। শব্দটা— লীলাবতী। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা এই জিনিস। আমার হাতে লেখা এক পৃষ্ঠায় থাকে। পঁচিশ লাইন। প্রতি লাইনে লীলাবতী লেখা হয়। আটবার। অর্থাৎ পৃষ্ঠায় দুইশবার করে এই নাম লেখা হচ্ছে। আমি তিনশ’ আঠারো পৃষ্ঠা লিখে ফেলেছি। তার মানে এখন পর্যন্ত আমি ছয়ত্ৰিশ হাজার ছয়শাবার লিখলাম–লীলাবতী। খারাপ কী!
মালেক ভাই যদি শুনেন আমার এই অবস্থা, তিনি কী করবেন? প্রথমে কিছুক্ষণ হাসবেন। তার বিখ্যাত ছাদ ফাটানো হাসি। তারপর বলবেন, তোমার নাম বদলে মজনু রাখলে কেমন হয়? শোনো আনিস, জায়গির মাস্টারের সঙ্গে জায়গির বাড়ির মেয়ের প্ৰেম প্ৰায় শাশ্বত বাংলার বিষয়। এই বাংলায় এমন কোনো জায়গির শিক্ষক ছিলেন না যার সঙ্গে সেই বাড়ির কোনো মেয়ের প্রেম হয় নাই। অন্য কিছু কি করা যায় না?
নতুন কিছু করো। সবচে ভালো হয়, এই লাইনটা যদি ছেড়ে দাও। তোমার ক্ষমতা আছে। ক্ষমতা ব্যবহার করো।একমাত্র মালেক ভাই বলেছেন আমার ক্ষমতা আছে। আমি জানি, যে ক্ষমতা আছে সেই ক্ষমতা নিম্নশ্রেণীর ক্ষমতা। এই ক্ষমতার সবচে’ বড় প্রকাশ, লীলাবতী লিখে পাতা ভরানোতে সীমাবদ্ধ। কোনো বানান ভুল হবে না। লাইন সোজা হবে। প্রতি পৃষ্ঠায় দুশবার করে লেখা হবে। অক্ষরগুলিও হবে সুন্দর। এর বেশি ক্ষমতা আমার নেই। তবে এই ক্ষমতাও অগ্রাহ্য করার মতো না।
