লীলাবতী পর্ব – ২১ হুমায়ূন আহমেদ

লীলাবতী

লীলা ময়মনসিংহ জেলখানায় অনেকবার বাবাকে দেখতে এসেছে। শুরুতেই সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, মাগো, মামলা নিয়ে কোনো কথা বলবে না। মামলা নিয়ে চিন্তা করবে উকিল-মোক্তার। কথা বলবে উকিল-মোক্তার। তুমি অন্য বিষয়ে কথা বলো। দুঃখ-কষ্টের কথা বলব না। আনন্দের কথা যদি থাকে বলো।

একটি আনন্দ সংবাদ লীলা দিয়েছে। তিনি অত্যন্ত আনন্দ পেয়েছেন। পরীবানুর সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে মঞ্জুর। সিদ্দিকুর রহমান সংবাদ শুনে বলেছেন, আমি আমার দীর্ঘ জীবনে অল্প কিছু ভালো সংবাদ পেয়েছি, এটা তার একটা। যদি সম্ভব হয় বিবাহের পরে পরীবানু এবং মঞ্জু যেন আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।

বিবাহের উপহার হিসাবে আমি তাদের দানপত্র করে কিছু বিষয়-সম্পত্তিও দিব। মাগো এখন আমাকে বলো, এই দুইজনের বিবাহের চিন্তাটা কি তোমার মাথায় এসেছে?লীলা বলল, হ্যাঁ।সাবাস বেটি। সাবাস। কেউ কোনো বড় কাজ করলে আমরা বলি সাবাস। কেন বলি জানো?

জি না।তাহলে আমার কাছ থেকে শোনো। পারস্যের এক সম্রাট ছিলেন, নাম শাহ আব্বাস। উনি ছিলেন মহান সম্রাট। সারাজীবন তিনি বড় বড় কাজ করে গেছেন। তারপর থেকে কেউ যদি বড় কোনো কাজ করত বা ভালো কাজ করত সবাই বলত— আরো এই লোক দেখি শাহ আব্বাসের মতো! সেখান থেকে হলো সাবাস। কেউ ভালো বা বড় কিছু করলেই আমরা বলি সাবাস।এই গল্প আপনাকে কে বলেছে?

আনিস মাস্টার বলেছে। তার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। মাগো শোনো, আনিস মাস্টারের মামলা কোর্টে উঠতেছে বলে খবর পেয়েছি। এই মামলার যাবতীয় খরচ আমি দিব। তুমি ব্যবস্থা করো।আমি যা করার করব।তোমার মা, সে কেমন আছে? সত্য কথা বলবা। আমি বুঝদার মানুষ। আমাকে বুঝা দেওয়ার কিছু নাই।উনার শরীর ভালো না। শরীর খুবই খারাপ। তবে মাথা এখন ঠিক আছে। চিন্তা-ভাবনা পরিষ্কার।

আলহামদুলিল্লাহ। শরীরের সুস্থতা কোনো বিষয় না মা। মনের সুস্থতাই সুস্ততা।রমিলাকে মূল বাড়ি থেকে শহরবাড়িতে নেয়া হয়েছে। তার সেবার সব দায়দায়িত্ব নিয়েছে পরীবানু। কাজটা সে করে কঠিন শৃঙ্খলায়। একটুও এদিকওদিক হবার উপায় নেই। প্রতিদিন দুপুরে কর্পূর মেশানো গরম পানি দিয়ে গোসল। এই গোসল রমিলাকে করতেই হবে। একবেলার জন্যেও বাদ যাবে। না। গায়ে জ্বর থাকলেও বাদ যাবে না। বিকালে পাকা পেঁপে।

পরীবানু মুখে তুলে পেঁপে খাওয়াবে। সেখানেও না করা যাবে না। খাওয়া-খাদ্যের হাত থেকে বাচার জন্যে রমিলা প্রায়ই নানান কৌশল করেন। কোনো কৌশলই কাজ করে না। একদিন তিনি বললেন, মাগো, তোমাকে একটা সিমাসা দেই। যদি সিমাসা ভাঙাতে পারো তাহলে খাব। ভাঙাতে না পারলে খাব না। সিমাসাটা হলো—

নাই পুষকুনির নাই জলে

নাই পদ্ম ফোটে

কও দেখি জিনিসটা কী

বুদ্ধি থাকলে ঘটে।

পরীবানু বলল, আমার ঘটে কোনো বুদ্ধি নাই। একটা বুদ্ধি আছে, আপনি না খাওয়ার মতলব করছেন। লাভ নাই, হাঁ করেন।

রাতে পরীবানু ঘুমায় রমিলার সঙ্গে। রমিলা নানান বিষয়ে কথা বলেন। কিন্তু একবারও জানতে চান না সিদ্দিকুর রহমান মানুষটার কী হলো। তিনি কোথায় আছেন কীভাবে আছেন। লীলা একদিন বলল, মা, চলেন। আপনাকে বাবার সঙ্গে দেখা করিয়ে আনি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে গিয়ে বললেন, নাগো মা, না।

লীলা বলল, না কেন? মানুষটাকে আমি সারাজীবন দেখেছি মাঠে ময়দানে, খোলা জায়গায়। আইজ সে তালাবন্ধ, এইটা দেখতে মন চায় না।মা, আপনার কি মানুষটার জন্যে খারাপ লাগে না? রমিলা লীলাকে বিস্মিত করে দিয়ে বললেন, সেই রকম খারাপ লাগে না।কেন সেই রকম খারাপ লাগে না? মানুষটা হিসাবের মধ্যে পড়ছে, এই জন্যে খারাপ লাগে না।বুঝিয়ে বলেন। হিসাবের মধ্যে পড়েছে মানে?

রমিলা শান্ত গলায় বললেন, আল্লাহপাক হিসাবে দুনিয়া চালান। তাঁর হিসাবে ক্ৰটি নাই। মাসুদরে তোমার পিতা তালাবন্ধ করছিল, আল্লাহপাক সেই হিসাবে উনাকে তালাবন্ধ করেছেন। মাসুদ চলে গেছে, আল্লাহপাক সেই হিসাব করে আরেকজনরে উপস্থিত করেছেন, তার নাম মঞ্জু।

আপনার মতো চিন্তা করতে পারলে সুখে থাকতে পারতাম।তুমি যে আমার মতো চিন্তা করবা না, সুখে থাকবা না— এইটাও আল্লাহ পাকের হিসাব।লীলা বলল, মা, আপনি তো ভবিষ্যৎ বলতে পারেন, এই মামলার রায় কী হবে বলতে পারেন? রমিলা বললেন, কোরান মজিদে আল্লাহপাক বলেছেন– নাসরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন কারিব।

এর অর্থ কী? এর অর্থ, আল্লাহ তাদের বিজয় দান করেন, যারা এর উপযুক্ত। আমার হুজুরের এই আয়াতটা খুব পছন্দ ছিল। হুজুরের কথা তো তোমাকে বলেছি। বলি নাই?বলেছেন। এখন বলুন বাবা কি বিজয়ের উপযুক্ত? সেই বিবেচনা আল্লাহপাক করবেন। হিসাব তাঁর কাছে।

পরীবানুর সঙ্গে এখন তার প্রবল সখ্য হয়েছে। প্রায়ই নিশিরাতে তিনি ধাক্কা দিয়ে পরীবানুর ঘুম ভাঙান। পরীবানু আতঙ্কিত গলায় বলেন, মা, শরীর ঠিক আছে? কোনো অসুবিধা? রমিলা চাপা গলায় বলেন, কোনো অসুবিধা নাই। তুমি একটা গীত করো। শুনি।

পরীবানু প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গেই গীত ধরে—

পীরিতের ভাঙা নাও

নিয়া বান্ধই কোথায় যাও

কোন পবনে নাম লেখাও

দেখাও যৈবনের বাহার।।

গান শুনতে শুনতে রমিলা হাত রাখেন। পরীবানুর পিঠে। নিজে গানের তালে তালে মাথা দোলাতে শুরু করেন। একসময় ক্ষীণ এবং অস্পষ্ট স্বরে তিনিও পরীবানুর সঙ্গে গাইতে থাকেন— দেখাও যৈবনের বাহার।পরীবানু গান শেষ করে বলে, মা, খুশি হয়েছেন?

রমিলা বলেন, তোমার সকল কর্মকাণ্ডেই আমি খুশি। আমার যদি বিষয়সম্পত্তি থাকত সব তোমারে দিয়া যাইতাম। আমার কিছুই নাই।আপনার এমন এক জিনিস আছে যা অন্য কারোর নাই, সেইটা আমারে দিয়া যান।কোন জিনিসগো মা? ভবিষ্যৎ বলার ক্ষমতা। এইটা আমারে দিয়া যান।হাতে থাকলে দিতাম। আমার হাতে নাই।

আশ্বিন মাসের এক মধ্যরাতে রমিলা লীলাকে ডেকে পাঠালেন। শান্ত গলায় বললেন, মাগো শোনো, আমার দাদি শাশুড়ির মৃত্যু যখন উপস্থিত হয় তখন তোমার পিতা তার জন্যে দিঘির পাড়ে একটা ঘর বানায়ে দিলেন। মউত ঘর। আমার দাদি শাশুড়ির মৃত্যু মউত ঘরে হয়েছিল। তিনি বড়ই কষ্ট করেছিলেন। তাঁর শরীর পচে গিয়েছিল, চউখ গলে গিয়েছিল। আমি তার সেবা করতাম।

শেষের দিকে তার উপর আমি বড়ই নারাজ হয়েছিলাম। আল্লাহপাক তার হিসাব ঠিক রাখবেন। আমারও আমার দাদি শাশুড়ির মতো কষ্টের মৃত্যু হবে। আমার শরীর পচে গেলে যাবে। আমি চাই না তখন কেউ আমার সেবা করুক। তুমি আমার জন্যে মাউত ঘর বানাতে বলো।লীলা বলল, আমি আপনার জন্যে মউত ঘর বানাব না। আপনার যদি মৃত্যু হয় এই বাড়িতে হবে। আপনার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমি আপনার সেবা করব।

মাগো, অতি ভয়ঙ্কর মৃত্যু আমার জন্যে অপেক্ষা করতেছে। আমি চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতেছি।রমিলার শেষ ভবিষ্যৎবাণী ফলে নি। তিনি কার্তিক মাসের তিন তারিখ নিজ বিছানায় শুয়ে মারা গেছেন। সামান্যতম মৃত্যুযন্ত্রণাও তার হয় নি। তাঁর ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি দেখে মনে হচ্ছিল, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তার মনে হয়েছে রঙ্গে ঢং-এ জীবনটা তো ভালোই পার করলাম।

লীলা তার মায়ের মৃত্যুর বিষয়ে লিখল— মৃত্যুর সময় আমি তাঁর পাশে ছিলাম। সেদিনই তিনি নতুন সাবান দিয়ে গোসল করে নতুন শাড়ি পরলেন। লজ্জিত গলায় আমাকে বললেন, কাঁচা সুপারি, খয়ের আর চুন দিয়ে একটা পান খাব মা। ঠোঁট লাল করব। আমি পান এনে দিলাম। উনি বললেন, চুনটা ভালো না। শঙ্খ চুন আনায়ে দেও। শঙ্খ চুন আনতে বাজারে লোক গেল।

আমি বললাম, আজ মনে হয় আপনি ভালো বোধ করছেন। আসুন বাগানে গিয়ে বসি। তিনি বললেন, না। তারপরই তাঁর মধ্যে সামান্য অসুস্থতা দেখা গেল। তিনি বললেন, আমার মাথাটা তোমার কোলে নাও। আমি তার মাথা কোলে নিলাম। তিনি অস্পষ্ট স্বরে বললেন, আল্লাহপাক আমার অপরাধ ক্ষমা করেছেন। আমি বললাম, মা, আপনি তো কোনো অপরাধ করেন নাই। অপরাধের ক্ষমার প্রশ্ন আসছে কেন?

তিনি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, সব মানুষই অপরাধের মধ্যে বাস করে গো মা। পায়ের নিচে পড়ে পিঁপড়া মারা যায়, সেটাও তো অপরাধ। আমার বিরাট ভাগ্য আল্লাহপাক আমার সব অপরাধ ক্ষমা করেছেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। আমি এত সহজ এবং এত সুন্দর মৃত্যু আগে কখনো দেখি নি। ভবিষ্যতে কোনো দিন দেখব তাও মনে হয় না।

মঞ্জু তাঁর স্ত্রী এবং ঝড়-তুফানকে নিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে গেছেন। লীলাবতীকে বলেছেন, মা, আমি তো ঘরজামাই না। ঘরজামাই হলে ভিন্ন কথা ছিল। আমি এখন একা না, আমার স্ত্রী আছে, দুই পুত্ৰ আছে।লীলাবতী বলল, পরী কি আপনার সঙ্গে যেতে চায়?

মঞ্জু বিরক্ত হয়ে বললেন, তার আবার চাওয়া-চাওয়ি কী? আমি যেখানে যাব সেও সেখানে যাবে।দেখা গেল পরীবানু শুধু যে একা যেতে চাচ্ছে তা-না জাইতরী-কইতরী দুই বোনও যেতে চাচ্ছে। লীলাবতী বলল, তোমরা কেন যাবে? কইতরী জবাব দিল না। জাইতরী বলল, আমি যাব।লীলাবতী বলল, কেন?

জইতরী মাটির দিকে তাকিয়ে রইল। জবাব দিল না। মঞ্জু বললেন, আমার অঞ্চলে ভালো স্কুল আছে। আমি তাদের স্কুলে ভর্তি করে দিব। চোখে চোখে রাখব। এইখানে তুই ছাড়া আর কে আছে? তুই নিজেও তো সারাজীবন থাকবি না। তোর বিয়ে হবে। তুই চলে যাবি স্বামীর সংসারে। এই দুই মেয়ে এত বড় জায়গায় একা একা ঘুরবে? এটা তোর কেমন বিবেচনা?

লীলাবতী চুপ করে গেল। তার একবার বলতে ইচ্ছা করছিল, মামা, তোমার যুক্তি মানলাম। কিন্তু আমি এখানে একা পড়ে থাকব এটা তোমার কেমন বিবেচনা? সে কিছু বলল না।মঞ্জুর সঙ্গে যাবার জন্যে আরো দুজন তৈরি হলো। একজন বদু আরেকজন নিরঞ্জন। বদু বলল, আপনি যেখানে আমি সেখানে। এখন আমারে মারেন কাটেন আপনের বিষয়। নিরঞ্জন কিছু বলল না। সে বিনা প্রয়োজনে কথা বলে না। যাওয়া বিষয়ে কোনো কথা বলার প্রয়োজন সে বোধ করছে না। মঞ্জু ঠিক করেছেন, নিরঞ্জনকে নিয়ে তিনি একটা ভাতের হোটেল দিবেন।

হোটেলের নাম দিবেন। হিন্দু-মুসলিম হোটেল। হোটেলের একজন বাবুর্চি নিরঞ্জন, আরেকজন তিনি নিজে। আগের মতো দিন কাটালে এখন হবে না। আয়-রোজগারের পথ দেখতে হবে। ছিলেন একা মানুষ, হুট করে সংসার বড় হয়েছে। সংসারে এখন আটজন মানুষ। ঝড়-তুফান। ঝড়-তুফানের মা। জাইতরী-কইতরী। বদু এবং নিরঞ্জন। এর মধ্যে বদু একাই তিনজনের ভাত খায়।

মঞ্জুর ভাতের হোটেল চালু হয়েছে। হোটেলের নাম হিন্দু-মুসলিম হোটেল না। পরীবানু এই নাম রাখতে দেয় নি। পরীবানুর যুক্তি হলো, হিন্দু-মুসলিম হোটেল নাম দিলে হিন্দুও সেই হোটেলে যাবে না, মুসলমানও যাবে না। মঞ্জু পরীবানুর যুক্তিতে মোহিত হলেন। হোটেলের নাম হলো আদর্শ হোটেল। মঞ্জু তার স্বভাব মতো এক সপ্তাহ হোটেল দেখেছেন। এখন আর কিছু দেখছেন না। এখন দেখছে পরীবানু। সে ভালোভাবেই দেখছে।

হোটেল ভালো চলছে। হাটের দিনে তিনবার হাঁড়ি চড়াতে হয়। হোটেলের ভেতর কাস্টমারদের জায়গা দেওয়া যায় না। কাস্টমাররা থালা হাতে হোটেলের বাইরে বসে যায়। তিন আইটেম রান্না হয়— ভাজি, ডাল, মাংস। মাছের কোনো আইটেম এখনো চালু করা হয় নি। এর পেছনেও পরীবানুর হাত আছে। পরীবানুর যুক্তি— মাছ সবাই বাড়িতেই খায়। হোটেল-রেন্টুরেন্টে সবাই মাংস খেতে চায়।

হোটেলের বাজার এবং টাকা-পয়সার হিসাবের দায়িত্বে আছে বদু। আগে তার দিন কেটেছে শুয়ে-বসে, এখন সে নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসূতও পাচ্ছে না। রাত নটায় হোটেল বন্ধ করে সে ঘরে ফিরে। তার সঙ্গে হোটেলের এক কর্মচারীও। (মিলন হাওলাদার, ডাক নাম হাওলু মিয়া) আসে। যার কাজ হচ্ছে, বদুর গায়ে তেল ডলা। একসময় বদুর দিন কাটত অন্যের গায়ে তেল ডলাডলি করে, এখন অন্য একজন তার গায়ে তেল ডলাডলি করছে। জীবনের এই উত্থানে সে চমৎকৃত।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *