শেয়ালের পাঠশালা-পল্লী কবি জসীম উদ্দীন

শেয়ালের পাঠশালা-পল্লী কবি জসীম উদ্দীন

শেয়াল কিছুদিন হইতে কিছুই খাইবার পায় না। বর্ষাকালে সমস্ত দেশ পানিতে ভরা। গেরস্ত বাড়ি হইতে হীস-মুরগী ধরিয়া আনিয়া যে মাঠে লুকাইবে, সেই মাঠ এখন পানিতে ডুবুডুবু। না খাইয়া, না খাইয়া শেয়ালের পেট পিঠের সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে। কোথায় খাইবার পাওয়া যায় ? কুমীরের বাচ্চাগুলি নদী দিয়া সাতার কাটিয়া বেড়ায় । তাদের ধরিতে পারিলে বেশ মজা করিয়া খাওয়া যাইত ; কিন্তু নদীতে নামিলেই কুমীর আসিয়া তাহাকে ঠ্যাং ধরিয়া টানিয়া লইয়া গিয়া একবারে জলপান করিয়া ফেলিবে। অনেক ভাবিয়া-চিন্তিয়া শেয়াল এক ফন্দি বাহির করিল।

 

নদীর ধারে এক উচু টিলার উপরে ঝাউ গাছের ডাল পুঁতিয়া শেয়াল এক পাঠশালা খুলিল ৷ ইদুর, মাকড়সা, আরশোলা, ঝিঁঝি পোকা আর ব্যাঙ হইল পাঠশালার পড়ুয়া । কয়েকটি জোনাকী ধরিয়া

আনিয়া এক নাদা গোবরের সঙ্গে আটকাইয়া রাতের কালে পাঠশালা আলো করা হইল। মাথায় ভাঙ্গা হীড়ীর টুপি, বগলে পল্মপাতার সুঙ্গীপুথি, কাধে গরুর খুঁটার কলম গঁজিয়া কাশ ডাটার লাঠি হাতে করিয়া শেয়াল লেজ চাপা দিয়া বসিয়া পড়াইতে আরম্ভ করিল।

 

ইঁদুর পড়ে চিকির মিকির চিক, আর দীত দিয়া ধান চিবায়। শেয়াল তাকে শিখাইয়া দেয়- কি করিয়া রাতের বেলা গেরস্তের গোলা কাটিয়া কালাই, মসুরি বাহির করিয়৷ আনিবে। বেড়ালকে ফীকি দিয়া কি করিয়া ঘরের কলাটা পেয়ারাটা লইয়া আসিবে ।

 

মাকড়সা তার পেটের ভিতর হইতে সূতা বাহির করে, তারপর এডালে ওডালে সেই সূতা টানাইয়া সুন্দর জাল তৈরি করে। শেয়াল

 

শেয়ালের পাঠশালা ৩৭

 

তাকে শিখাইয়া দেয় কিভাবে সেই জালের এক পাশে চুপটি করিয়া বসিয়া থাকিবে, কোনো পোকা উড়িয়া আসিয়া সেই জালে আটকা পড়িলে সে কি করিয়া এক লাফে যাইয়া পোকাটিকে ধরিয়া খাইবে ।

 

আরশোলাকে শিখাইয়া দেয় কি করিয়া সে দেয়ালের বা ঘরের

চালার এক পাশে মরার মতো হইয়া চুপটি করিয়া থাকিবে । আর সেই

পথে পিঁপড়ে বা ডাশ পোকা আসিলে এক লাফে যাইয়া তাহাকে

ধরিয়া খাইবে ৷ মাকড়সার জালের ধারেও সে চুপটি করিয়া বসিয়া

থাকিতে পারে। জালে কিছু আটকাইলে ঠোট দিয়া জাল টানিয়া

আনিয়া সে পোকাটাকে খাইতে পারিবে, কিন্তু সাবধান ! অত বড়

দেহটা লইয়া সে যেন মাকড়সার জালের উপর দিয়া না চলিতে যায়।

তাহা হইলে জাল ছিড়িয়া সে মাটিতে পড়িয়া যাইবে।

 

ঝিঝিঁ পোকা ঝি ঝি ঝি বি! করিয়া গান গায়। কত রকমের সুরই তার জানা । সরু, মোটা, মিহি, চড়া কত ভাবেই সে গান করে। কিন্তু গান গাহিলেই তো তার পেট চলিবে না! শেয়াল তাহাকে শেখায়- অনেক রাতে যখন সবাই ঘুমাইয়া পড়ে তখন কি করিয়া চুপি চুপি উঠিয়া কপিগাছের নরম ডোগাগুলি খাইয়া যাইবে ।

 

ব্যাঙকে শেখায় কি করিয়া রাতে-দিনে ঘরের ভিতর হইতে ঝোপের ভিতর হইতে মশা-মাছি ধরিয়া খাইবে, কিন্তু সাবধান! সাপে যেন ধরে না। যদি ধরে, তবে সে এমন চিৎকার করিবে যে, সেই শব্দ

শুনিয়া লোকে আসিয়া সাপটিকে মারিয়া ফেলিবে।

 

ইঁদুর, মাকড়সা, আরশোলা, বিবি পোকা, ব্যাঙ সবাই শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালায় পড়িয়া ভারি খুশী । এতো যেমন তেমন গুরুমশায় নয়! সকল জানোয়ারের চাইতে বেশী চালাক স্বয়ং শেয়াল পত্তিত।

টিকটিকি টিকটিক করিতে করিতে দেশ-বিদেশে এই পাঠশালার খবর বলে।

 

ইঁদুরের চিকির মিকির, ব্যাঙের ঘঙর ঘঙর, আর ঝিঁবি পোকার বঝি-ঝি-ঝি। পড়ুয়াদের পড়ায় সমস্ত কাশবন ওলট পালট। শোনা-

 

৩৮ বাঙ্গালীর হাসির গল্প

শোনি শেয়ালের এই পাঠশালার খবর কুমীরেরও কানে গেল । কুমীর ভাবিল, তাই তো ইদুর, ব্যাঙ, আরশোলা সকলের ছেলেমেয়েই শেয়ালের পাঠশালায় পড়িয়া কত কি শিখিয়া ফেলিল, আর আমার সাতটি ছেলে কেবল পানির মধ্যে সাতার কাটিয়া বেড়ায়, এখনও মাছটা-আঁশটা ধরিতে শিখিল না।

 

একদিন কুমীর তার সাতটি বাচ্চাকে সঙ্গে করিয়া শেয়াল পণ্ডিতের পাঠশালায় আসিয়া হাজির ।

 

“শেয়াল মামা! বাড়ি আছ নাকি ?”

 

শেয়াল বলিল, “একটু দূরে থাকিয়া কথা বল কুমীর-ভাগনে!

তোমাকে দেখিয়া বড় ভয় পাই ৷”

 

কুমীর একগাল হাসিয়া বলিল, “মামা! ভয় পাওয়ার কথা নয়!

আমার সাতটি ছেলেকে তোমার পাঠশালায় ভর্তি করিয়া দিতে চাই ।

ওরা বড় দুষ্ট । ওদের কিছু বিদ্যা শিখাইয়া দাও ।”

 

খুশী হইয়া শেয়াল বলিল, “বেশ! বেশ!! ভাগনে, অল্পদিনেই

আমি ওদের বিদ্যাদিগ্‌গজ করিয়া দিব ।”

 

শেয়ালের পাঠশালা ৩৯

 

কুমীর তার সাতটি বাচ্চাকে শেয়ালের পাঠশালায় ভর্তি করিয়া

দিয়া গেল ।

 

পরদিন শেয়াল কুমীরের সাতটি বাচ্চার একটিকে খাইয়া ভোরের

নাস্তা করিল। দুপুর বেলা সেই কাশখাগড়ার বনের ধারে নদীতে ভুসুত

করিয়া কুমীর আসিয়া ভাসান দিল ।

 

“কি মামা, আমার বাচ্চারা কেমন লেখাপড়া করিতেছে ?”

 

শেয়াল উত্তর করিল, “তারা পড়াশুনায় বেশ মনোযোগী । সাতটি

দিন যাইতে দাও ভাগ্নে দেখিবে ওদের লেখাপড়ায় কত বড় করিয়া

দিই ।”

 

কুমীর বলিল, “ওদের কি একবার দেখিতে পারি না, মামা ?”

 

শেয়াল উত্তর করিল, “কেন দেখিতে পাইবে না ভাগ্নে ? তুমি

ওখানে থাক। আমি একে একে আনিয়া তাহাদের দেখাই।” এই

বলিয়া শেয়াল একটি একটি করিয়া পাঁচটি বাচ্চাকে দেখাইয়া

একটিকে দুইবার আনিয়া দেখাইল ৷ বোকা কুমীর ভাবিল তার সাতটি

বাচ্চাকে দেখিল।

 

এমনি করিয়া রোজ শেয়াল সকালে কুমীরের এক একটি বাচ্চা

খাইয়া নাস্তা করে, আর কুমীর আসিলে একটি বাচ্চাকে বার বার

দেখাইয়া তাহাকে বুঝায়। সাতদিনের দিন সকালে বাকী বাচ্চাটিকে

খাইয়া শেয়াল পাঠশালার ঘর ভাঙিয়া উধাও ।

 

দুপুর বেলা কুমীর আসিয়া দেখিল, কোথায় মাস্টার, আর কোথায়

তার পড়ুয়াদল! শূন্য কাশপাতার বন বাতাসে হেলিতেছে দুলিতেছে।

কুমীর সবই বুঝিতে পারিল। নিজের বোকামির জন্য মাথায় থাপ্পড়

মারিল। ছেলেদের জন্য কাঁদিয়া বুক ভাসাইল ৷ তারপর প্রতিজ্ঞা

করিল, “শেয়াল! তুমি আর কোনোদিন নদীতে পানি খাইতে নামিবে

না? নদীতে আসিলে ঠ্যাং ধরিয়া টানিয়া লইয়া গিয়! তোমায় উচিত

শিক্ষা দিব”

 

8০

 

শেয়াল আর কুমীরের ভয়ে নদীতে নামে না। নদীর ধারে বালুর

 

বাঙ্গালীর হাসির গল্প

 

উপরে উঠিয়া কাকড়াগুলি দল বাঁধিয়া এদিকে-ওদিকে যায়। মাঝে

 

ক্ষুধায় পেট

 

খাই খাই করিতেছে।

 

মাঝে দীড়াইয়া রোদ পোহায়। কতদিন আর লোভ সামলান যায়!

 

পানিতে টানি

 

যেই শেয়াল কাঁকড়া ধরিতে নদীর কিনারে আসিয়াছে,

কুমীর ভুসুত করিয়া উঠিয়া শেয়ালের একটি ঠ্যাং ধরিয়া

নিয়া লইয়া গিয়াছে। তারপর শেয়াল কুমীরে টানাটানি,

 

হানাহানি করিতে করিতে তাহারা এক কাশবনের মধ্যে আসিয়া পড়িল । তখন শেয়াল তাড়াতাড়ি একটি কাশের ডাটা তুলিয়া লইয়া

 

বলিল, “ভা

 

যদি ধরিতে তবেই আমাকে আগ্নে! ধরিলে তো ধরিলে আমার লাঠিগাছা। আমার পাটকাইতে পারিতে। এই যে আমার পা।” বলিয়া শেয়াল কুমীরের মুখের কাছে লাঠিখানা ধরিল। বোকা কুমীর শেয়ালের ঠ্যাং ছাড়িয়া দিয়৷ যেই লাঠিখানা ধরিয়াছে, অমনি শেয়াল একলাফে যাইয়া বালুর চরায় উঠিল ৷

 

কুমীর

 

তখন বলিল, “আচ্ছা

 

তোমাকে পাইবই ।”

 

শেয়াল! যাও। একদিন না একদিন

 

ইহার পর কুমীর শেয়ালের খোঁজে এখানে ওখানে কতই ঘুরিয়া

 

বেড়ায়। শেয়াল আর কুমীরের ভয়ে পানিতে নামে না।

 

সেলি” কুমীর করিল কি, বালুর চরার উপর যাইয়া মরার মতো শুইয়া রহিল। দূর হইতে শেয়াল তাহাকে দেখিয়া ভাবিল, হয়তো কুমীরটি মরিয়াই গিয়াছে। যদি মরিয়া থাকে তবে কুমীরের মাংস খাইয়া কিছুদিন আরামে কাটান যাইবে । কিন্তু তার আগে ভালোমতো জানিতে হইবে কুমীরটা সত্য সত্যই মরিয়াছে কি না। যদি মরিয়া থাকে তবে সে পা নাড়া দিবে ।”

 

বোকা কুমীর তখন পা নাড়া

 

দিল।

 

শেয়ালের পাঠশালা ৪১

 

সে হাত নাড়া দিবে ।”

 

বোকা কুমীর আবার হাত নাড়া দিল ৷

 

শেয়াল বলিল, “বেশ বুঝিলাম কুমীরটা মরিয়া গিয়াছে। যাই বালুর চরা হইতে দীতে ধার দিয়া আসি। মরা কুমীরটা খাইতে হইবে ।”

 

কুমীর ভাবিল, শেয়াল একবার কাছে আসিলে হয় ; ধরিয়া এক নিমেষে ওকে খাইয়া ফেলিব ৷” এই বলিযা কুমীর চুপ করিয়া শুইয়া রহিল ।

 

দাতে ধার দেওয়ার নাম লইয়া শেয়াল ওদিকে গেরস্ত পাড়ায় যাইয়া খবর দিল, “কি চাই, ডাঙার উপর কুমীর আসিয়া শুইয়া আছে ।” গেরস্তরা সবাই কুমীরের উপর চটা । কুমীর কাহারও ছেলে খাইয়াছে, কাহারও মেয়ে খাইয়াছে। আর গরু, বাছুর, ছাগল, ভেড়া যে কত খাইয়াছে তাহার লেখা-জোখা নাই। তাহারা দল বাধিয়া লাঠি সরকি পাটকেল লইয়া আসিয়া কুমিরটিকে মারিয়া ফেলিল।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *